রম্যরচনা

অধ্যায় : ১৬

রাস্তাভর্তি কুকুরের পাল ঘুরে বেড়ায় দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা। ওই রাস্তাই তাদের বাড়িঘর। তা ঘুরে বেড়াক ক্ষতি নেই, রাস্তা সবার ঘুরে বেড়ানোর জন্যই। পাগল-ফকির, গাড়ি-ঘোড়া, লোকজন ইত্যাদি সবাই যদি ঘুরে বেড়াতে পারে কুকুরদের বাধা কোথায়? কুকুররা সরকারকে ট্যাক্স দেয় না বলে রাস্তায় ঘুরতে পারবে না এই যুক্তি হাচিয়া ফাল মানে না। তার আপত্তি অন্য জায়গায়। রাস্তায় কুকুরগুলি ঘুরে বেড়ায় বলে নয়, আপত্তি তারা দিনরাত যে পরিমাণে চিল্লামিল্লি করে তার জন্য। এমনিতে কুকুরকে তার বড়ই অপছন্দ। লোকে বলে প্রভুভক্ত জীব। প্রভুভক্ত না হাতি। শখ করে সে একবার একটা কুকুর পুষেছিল যে তাকে কামড়ে দিয়েছিল। তার মতে, কুকুর মূলত বেইমান প্রাণী। না হলে যে প্রভু যত্নআত্তি করে তাকে কামড়ায়?

কুকুর কেন, যে কোন পশু বা পাখিকেই হাচিয়া ফাল অপছন্দ করে। সে দেখেছে, সব জাতীয় পশু বা পাখি সর্বদা শত্রুভাবাপন্ন, অন্তত তার ক্ষেত্রে। চিড়িয়াখানাতে গিয়েও সে এই ব্যাপারটার প্রমাণ পেয়েছে। জগতে কে যে মিত্র তা বোঝে না সে। স্বগোত্রভুক্ত কোন মানুষকে সে আজ অব্দি বন্ধু হিসেবে পেল না, পশু-পাখিরা তার বন্ধু হতে যাবে কোন্ দুঃখে বা আহ্লাদে?

হচ্ছিল কুকুরদের কথা। পাড়ার ওই কুকুরগুলি তার লাইফ হেল করে দিল। তারা যখন সদলবলে সমবেত কন্ঠে নানা বিচিত্র শব্দে গগনভেদী চিৎকার শুরু করে তখন মনে হয় জগতে কুকুর ব্যতীত আর কোন প্রাণী বসবাস করে না। কেবল ভারতবর্ষ নয়, সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশ, ইংল্যান্ড-আমেরিকা-জার্মানি-জাপান-ফিনল্যান্ড এমনকি, পাকিস্তান-সিরিয়া-লেবানন-আফগানিস্তান পর্যন্ত কুকুরদের অধিকারে চলে গেছে। কুকুরদের সাম্রাজ্যে মানুষ নামের এক অসহায় জীব ক্রীতদাস হিসেবে বসবাস করে। ভীতসন্ত্রস্ত অপেক্ষায় কখন প্রভুরা আর্তনাদ ও হুংকার থামাবে আর সে শান্তিমত তার কাজকর্ম করতে পারবে।

রাস্তার ওই নেড়ি কুকুরদের চেয়েও তার বেশি রাগ হয় কুকুরপ্রেমীদের ওপর। তারা বেপাড়ার লোক, এসে যখন-তখন কুকুরপ্রীতি প্রদর্শন করে যায় চার-পাঁচটা বিস্কুট বা মুরগির দোকানের ফেলে দেওয়া মাংসের চাট বিলিয়ে। তাদের পাড়ায় থাকে খালুচ্চি খোল নামে এক জমির দালাল। তার বউ এক ডাকসাইটে মহিলা। সে তার মেয়েকে সঙ্গে করে সপ্তাহে অন্তত দুবার একটা নীল ফাইবারের বালতিভর্তি ভাত নিয়ে কুকুর সেবা করতে বেরোয়। মোড়ে মোড়ে এক এক খাবলা ভাত তুলে কুকুরগুলিকে খাওয়ায় আর দল বেঁধে কুকুররা তাকে ভিড় করে দাঁড়ায়। লেজ নাড়তে নাড়তে হাউ-হাউ করে ভাত খায়। হাচিয়া ফালের ইচ্ছে করে খালুচ্চি খোলের বউকে ধরে মাথার সব চুল কামিয়ে ন্যাড়া করে দেয়। কী দিয়ে চুল কামিয়ে মহিলার মাথা ন্যাড়া করে দেবে সেটা পর্যন্ত জোগাড় করে রেখেছে সে। একটা ধারালো ক্ষুর, যা দিয়ে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাথা কামিয়ে দেওয়া যাবে এবং সে ইদানিং দাড়ি কামায় ওটা দিয়ে। প্রবল বাসনা হয় যে কোনদিন মহিলা কুকুর খাওয়াতে রাস্তায় নামলে ধরে তার মাথা ন্যাড়া করে দেবে চুল কামিয়ে, কিন্তু মনের ইচ্ছে মনেই থাকে। সাহস হয় না মহিলা খুব ডাকসাইটে বলে। ধরে তার মাথা ন্যাড়া না করুক অন্তত এ প্রশ্নটাও করতে বুকে বল পায় না সে, ‘দুদিন তো এক বেলা তুমি খাওয়াচ্ছ কুকুরদের। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর দায়িত্বে কে আছে?’

সারাদিনই চলে কুকুরদের চিৎকার। কিন্তু রাত বারোটার পর থেকে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়। পাড়া-বেপাড়ার সব কুকুর একসঙ্গে সম্মিলিতভাবে এমন হল্লা করতে থাকে যে মনে হয় জগতে কুকুর ছাড়া আর কোন জীব বাস করে না। ঘুম, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি জীবনের সমস্ত কাজ থেমে থাকে। এমনই অতিষ্ঠ লাগে যে হাচিয়া ফাল ভাবে এর চেয়ে আত্মহত্যা করাও শান্তির।

এলাকার কাউন্সিলর চাঙ্গাচমক গমক। উপায়ান্তর হয়ে তাকে একদিন গিয়ে ধরল হাচিয়া ফাল। জানালো যে কুকুরদের অত্যাচারে তার ঘুম-খাওয়া বন্ধ হতে চলেছে। যেভাবেই হোক পাড়া থেকে যেন কুকুরদের তাড়ানো হয়। কাউন্সিলর হিসেবে তার এলাকার নাগরিকদের সুখ-সুবিধে দেখা যেহেতু তার কর্তব্য। তার কথা শুনে চাঙ্গাচমক গমক প্রায় আতঙ্কিত গলায় বলল,

‘পাগল! কুকুর তাড়াতে গেলে আমাকেই সবাই তাড়িয়ে দেবে। কুকুর তাড়ানো দূরের কথা, কুকুরদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই গণরোষের শিকার হতে হবে। তুমি কুকুর তাড়ানো বাদ দিয়ে অন্য যেকোনো কাজের কথা বল। পেয়ে যাবে।’

হাচিয়া ফাল বিমর্ষ গলায় জানালো যে কুকুরদের যদি না তাড়ানো হয় তো সে আত্মহত্যা করবে আর তাতে কারণটাও সুইসাইড নোট হিসেবে রেখে যাবে। সেটা কি ভালো হবে? চাঙ্গাচমক গম্ভীর ভাবে বলল,

‘তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ? দাঁড়াও, এক্ষুনি আমি পুলিশ ডাকছি। কোমরে দড়ি দিয়ে জেলে পুরে দেব।’

বিপদ বুঝে হাচিয়া ফাল নরম হল। বলল,

‘আরে, ওটা একটা কথার কথা। আত্মহত্যা তো দূরের ব্যাপার, আমি কোন জীব হত্যাই করি না। অত সাহস নেই আমার।’

চাঙ্গাচমকের মুখ তবুও গম্ভীর। হাচিয়া ফাল আর কিছু বলার সাহস পেল না। লোকটার কাছে আসাই বেকার হয়ে গেল, বিপদেরও বটে। কুকুরগুলোর কোন ব্যবস্থা করা তো দূরের কথা, উল্টে তাকেই পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখালো। এই লোকটাও যে শত্রু তাতে কোন সন্দেহই নেই। বেজার মুখে সে যখন চলে আসছে তখন চাঙ্গাচমক গমকের এক চ্যালা বলল,

‘আরে, মানুষের সঙ্গে থেকে এই কুকুরগুলোর চরিত্র মানুষের মতো হয়ে গেছে। সারাদিন হল্লাচিল্লা লেগেই আছে ব্যাটাদের।’

কুকুরদের চিল্লানোতে হাচিয়া ফাল অতিষ্ট হয়ে নানা উপায় ভাবতে লাগল। খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিলে কেমন হয়? কিন্তু বিষ জোগাড় করা এক হাঙ্গামা। একগাদা ইটের টুকরো নিয়ে রাতের বেলা হাচিয়া ফাল তার ছাদে উঠে গেল। কুকুরগুলি বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করছিল বাড়ির সামনে। তারপর একটি হঠাৎ শরীর টান টান করে গলা তুলে আর্তনাদ শুরু করল। তার সঙ্গে থাকা অন্যগুলিও তাতে প্রবল উৎসাহ পেয়ে মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে চিৎকার জুড়ে দিল। হাচিয়া ফাল কুকুরগুলির দিকে তাক করে ঢিল ছুঁড়তে লাগল একের পর এক। কয়েকটি কুকুরের গায়ে লাগলোও কিছু ঢিল। তারা কেঁউ-কেঁউ আওয়াজ তুলে পালিয়ে গেল। ঘন্টাখানেক এইরকম অক্লান্ত ঢিল ছুঁড়ে সে কুকুরের দলকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে মহা উল্লাসে ঘরে নেমে এল।

পরদিন সকালে পশুক্লেশ নিবারণী সমিতির পাঁচ জন সদস্য হাচিয়া ফালের বাড়ি এসে হাজির। তাদের দেখে হাচিয়া ফাল অবাক। তাদের অভিযোগ শুনে হতবাক। তারা বলল,

‘তুমি কাল সারারাত ধরে ঢিল ছুঁড়ে কুকুরদের অমানবিক নিপীড়ন করেছ। সবাই দেখেছে। অন্তত একশ জন সাক্ষী আছে। তার জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হিসেবে এক্ষুনি দিতে হবে তোমাকে। না হলে তোমাকে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করা হবে যাতে পাঁচ বছর হাজতবাস অনিবার্য।’

হাচিয়া ফাল অজ্ঞান হতে হতে সামলে নিল। সে জানত, অন্ধকারে ছাদে উঠে কুকুরদের ঢিল ছুঁড়লে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু শত্রুরা ঠিক দেখে নিয়েছে। চারপাশে এত শত্রু থাকলে সে কোথায় যায়? প্রাণের দায়ে তাকে জরিমানা হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করতে হল।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *