আশিস ভৌমিক
লেখক পরিচিতি
(জন্ম 5 ই এপ্রিল 1974, গ্রাম -বৃন্দাবনচক , পাঁশকুড়া , পূর্ব মেদিনীপুর ।প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামে ।উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় ।সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ।গৃহ শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য চর্চা । বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন । প্রথম কাব্যগ্রন্থ “”হিরণ্ময়ী ” । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” কালবেলা “।
চতুর্থ পর্ব
হিরো টুইন্সের পাতাল অভিযান
এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু দুই যমজ ভাই তাদের বাবা কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পাতাল-লোকে যাওয়ার জন্য তারা তাদের বাবা কাকার পথ অনুসরণ করল অর্থাৎ পাতাল-লোকের প্রবেশ দ্বারের মুখে খেলার মাঠে জোরে জোরে চিৎকারপুর্বক খেলতে লাগল। তাদের একটানা জোরে জোরে চিৎকার শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন নরকদেব এক্সিবালবা। আগের বারের মতই এবারেও তিনি দুটি দূত পাঠালেন সমন পাঠিয়ে যে, তারা যেন এক্সিবালবার সাথে দেখা করে এবং সেখানে এসে খেলে এক্সিবালবাকে যেন হারিয়ে দেয়।
যমজ দেবতার নরকে অভিযান
অতঃপর দুই ভাই নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তারা মার কাছ থেকে আগেই জেনে মিয়েছিল যে, তারা বাবা ও কাকা কি কি ভুল করেছিল। সেই মতন জেনে তারা নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল তারা নরকের দেবতার পাতা ফাঁদে পা দিল না।
ভুকুব ক্যাকিক্সের পরাজয়
জিবালবায় অবতরণের আগে, যমজ ভাইবোন ভুকুব ক্যাকিক্সকে পরাজিত করে, সে মিথ্যাভাবে নিজেকে সূর্য ও চাঁদ বলে দাবি করে। ধূর্ততা এবং বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে, তারা ভুকুব ক্যাকিক্সকে একটি পাথর দিয়ে আঘাত করে, যার ফলে সে তার শক্তিশালী রত্নখচিত দাঁত, যা তার শক্তির উৎস, হারিয়ে ফেলে। দুই ভাই ক্যাকিক্সের মিথ্যাচার এভাবেই প্রমাণ করে। এরপর তারা পাতালে প্রবেশ করে। সেখানে যাওয়ার পথে তার বাবা কাকার ন্যায় প্রত্যেক স্তরে নানান পরিক্ষার সন্মুখীন হন। কিন্তু এক্সিবালবা যতগুলি পরীক্ষায় বসতে দিল ততগুলিই পরীক্ষায় তারা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হল। অনেক নৃশংস পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার পর, তারা তাদের শেষ রাতটি বাদুড়ের ঘরে কাটায়, যেখানে একটি ভয়ঙ্কর বাদুড় হুনাহপুর মাথা কামড়ে ধরে। দেবতারা তখন এক্সবালাংখুয়েকে তার ভাইয়ের মাথাকে বল হিসেবে ব্যবহার করে বল খেলা খেলতে বাধ্য করে! এক্সিবালবা চালাকির সাথে তার ভাইয়ের মাথাটি খরগোশের মাথার সাথে পরিবর্তন করে, হুনাহপুর মাথাটি তার শরীরে পুনরায় সংযুক্ত করে। আসলে পাতালের প্রভুরা যমজদের মৃত দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু সক্ষম হচ্ছিল না। তখন ক্ষিপ্ত এক্সিবালবা প্রতারণার আশ্রয় নিল। তিনি একটি বড় মশার রূপ নিয়ে কামড়ালেন দুই ভাইকে। কিন্তু কিছুই হল না তারা আগে থেকেই এরজন্য প্রস্তুত ছিল। তারা মশা মারার জন্য খন্তির মতন একরকম কাঠের টুকরো নিয়ে সে মশাকে তাড়া করতেই মশা জীবন বাঁচাবার জন্য পালাতে বাধ্য হল। তারপর এক্সিবালবা তাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে আদেশ দিলে তারা সুকৌশলে সে আদেশ অমান্য করল। হুনাহপু এবং এক্সিবালেংখুয়ে নরকদেবকে বলল তারা খেলতে এসছে, বসতে আসে নি। নরক দেবতা কি ওদের সাথে হেরে যাবার ভয়েই খেলতে চাইছেন না? তাই কি এমন করে সময় নষ্ট করছেন?
এক্সিবালবা বলাই বাহুল্য দুই ভাইয়ের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তার ধারণা হল যে, নরকে অবস্থিত সব নরকের দূতদের সামনে এমন কথা বলে দুই ভাই তাকে অপমান করছে। সে রেগে গিয়ে দুই ভাইকে বলল না, তিনি ভয় পান নি। এবার খেলতে বসা যাক। এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু এমন কথা শুনে হাসল। এটাই তো তারা চেয়েছিল।
এক্সিবালবা জানত সঠিক ভাবে খেললে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে তিনি জিততে পারবেন না। কারণ তার বয়স হয়েছে; ওদিকে দুই ভাইয়ের বয়স কম, ক্ষিপ্রতা বেশি তাই ওদের জেতার সম্ভাবনা বেশি। তাই তিনি কাঁটাওয়ালা বলের সাহায্যে খেলা শুরু করলেন। তার দুই হাত ছিল মোটা কাপড়ে মোড়া। ফলে তার হাত কাটবার ভয় ছিল না। কিন্তু দুই ভাইয়ের তো তা ছিল না। তারা রেগে গেল এক্সিবালবার ওপরে এমন অন্যায় খেলার অপচেষ্টার কারণে। তারা পরিষ্কার বলল তারা এক্সিবালবা ন্যায্যভাবে না খেললে খেলতেই রাজি নয়। তখন বাধ্য হয়ে ভাল ও কাঁটা মুক্ত বলের সাহায্যে খেলতে শুরু করল।
দুই ভাইয়ের এটা ভালই জানা ছিল যে, তারা জিতলে নরক থেকে জীবন্ত বেঁচে ফিরবে না। তাই চালাকি করে তারা প্রথমে হারবার জন্য খেলতে শুরু করল। অহেতুক পয়েন্ট নষ্ট করতে থাকল। তাতে ফল হল। এক্সিবালবা সহজেই জিতলেন। তারপর বরফের খেলা আগুনের ওপরে ঝাঁপ দেবার খেলা শুরু করলেন। প্রতিবারই ইচ্ছা করে হারলেন দুই ভাই।
অবশেষে দুই ভাইয়ের সাথে নরকদেবের শেষ খেলায় সত্যকারের খেলা শুরু হল। প্রত্যেকটা ম্যাচে হারতে আর ভাল লাগছিল না দুই ভাইয়ের। আর তাই তারা শেষ ম্যাচে সত্য সত্যই জিতলেন। সরাসরি আংটার মধ্যে বল গলিয়ে পিছিয়ে থেকেও নিয়মের সুযোগ নিয়ে জয়লাভ করে।
তাতেই এক্সিবালবা বুঝলেন, দুই ভাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন। তারা সব ম্যাচেই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরেছেন তাও বুঝতে পারলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুই ভাইকে এক বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিতে বললেন। দুই ভাই তাতে ঝাঁপ দিতে সম্মত হলেন। তাতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল। তারপর নরকদেব তাদের ছাইকে রক্তের নদীতে ফেলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে, এটাই ছিল দুই ভাইয়ের গোপন খেলা। দুই ভাইয়ের জানা ছিল যে, ঐ নদীতে তাদের ছাই ফেললেই তারা আবার বেঁচে উঠবেন। তবে মনুষ্যরূপে নয়, কাটলফিশ মাছের রূপে। সেই জন্যই তারা ঝাঁপ দিতে রাজি হয়েছিলেন। এর জন্য একটা গোপন মন্ত্র বলতে হত। ঝাঁপ দেবার পূর্বে দুই ভাই মনে মনে এই মন্ত্র বলে নিয়েছিলেন। ফলে কাটলফিশের রূপে জীবন নিয়ে ফিরতে অসুবিধা হল না।
তাদের এমন চমকপ্রদ যাদু দেখে এক্সিবালবা চমকে গেলেন। তিনি দুই ভাইকে কাটলফিশের রুপ থেকে মনুষ্য রূপে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবার গোপন রহস্য কি তা জানতে চাইলেন। দুই ভাই তাকে জানাল কীভাবে তারা এই ব্যাপারটা সম্ভব করেছে। শুধু জানাল না যা, তা হল আসল মন্ত্রের পংক্তিটা। তারা একটা মন্ত্র মিথ্যা মিথ্যা বানিয়ে বলল যে এই মন্ত্র বলে ঝাঁপ দিলেই হবে। তারা যেভাবে বেঁচে ফিরেছে, নরকের রাজাও সেভাবেই ফিরে আসবেন। নির্বোধ এক্সিবালবা সে কথা বিশ্বাস করে ঐ বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিলেন। এর ফলে তিনি মারা গেলেন। তার ছাইকে মাটিতে পুঁতে দিলেন। এর ফলে এক্সিবালবার ফিরে আসবার কোনও সম্ভাবনা রইল না। এই ভাবে এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু জিতে গেলেন!
বিজয়ী যমজ পাতালের বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করে তাদের সমস্ত মন্দ কাজ করার অন্ধকার শক্তি কেড়ে নেওয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের শ্রদ্ধা এবং শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতি দেয়।
শুধু তাই নয়, এরপর তারা তাদের বাবার ধড় আর মুন্ডু একত্র করে তাকে জীবিত করেন। কবর থেকে কাকার মৃতদেহ তুলে এনে তাঁকেও জীবিত করেন। তাদের কাকা ভুকুব হুনাহপু পাতালেই রয়ে যান এবং তিনি দেবতা হিসেবে সকল মানুষের দ্বারা সম্মানিত হন। অপরদিকে হুন -হুনাহপু ভুট্টার দেবতা বা প্রথম পিতা হয়ে ওঠেন এবং তিনি বর্তমান বিশ্ব যুগের স্রষ্টা।
হিরো টুইনস জিবালবা ছেড়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরে আসে। তারা আকাশে উঠতে থাকে, সূর্য এবং চাঁদে পরিণত হয়। এখন যেহেতু সূর্য এবং চাঁদ আকাশে ছিল এবং পৃথিবীকে আলোকিত করেছিল, স্রষ্টা দেবতারা সাদা এবং হলুদ ভুট্টা ব্যবহার করে মানুষের চূড়ান্ত রূপ তৈরি করেছিলেন। ভুট্টা হল সেই মূল্যবান পদার্থ যা শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের এবং স্থায়ী মানুষ তৈরি করতে সফল হয়।
এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
অন্যান্য মেসো আমেরিকান সভ্যতাতেও অনেকটা এই যমজ নায়কের সমতুল্য কাহিনী পাওয়া যায়।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে, এক্সিবালেংখুয়ে এবং হুনাহপু ছিলেন যথাক্রমে পৃথিবীর শাসক এবং আকাশের দেবতা। পরে দুজন যথাক্রমে চন্দ্রদেব এবং সূর্যদেবে রূপান্তরিত হন।
পুরাণ অনুযায়ী দুই ভাই পরে তার বাবা ও কাকাকে নরক থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে, মায়া সম্রাট আসলে হয় এক্সিবালেংখুয়ে কিংবা হুনাহপু দেবের পুত্র। এই কারণেই মায়ারা আহাওকে এত মান্য করত।
মায়াদের বহু সাহিত্যে এই দুই ভাইয়ের সম্পর্কে অনেক ছড়া আছে। এবং অনেক পিরামিডে দুজনের অনেক চিত্র অঙ্কিত আছে।
মায়া দেবতাদের মধ্যে, ইক্সকুইক অপরিহার্য কারণ পোপোল ভুহের ইতিহাসে তিনি নারী বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে , তার নামের অর্থ নারীর রক্ত, শক্তি, প্রাণশক্তি, বা প্রাণবন্ত রক্ত। তিনি মায়া সংস্কৃতিতে নারীর পবিত্রতা, সৌন্দর্য, শক্তি, মূল্য এবং বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার লক্ষ্য ছিল দুই যমজ বীরের জন্ম দেওয়া এবং জিবালবার একমাত্র নারী হিসেবে তিনি পাতালের সাথে পৃথিবীর মিলনের প্রতিনিধিত্ব করেন।
বানর জমজের কাহিনী
মায়া সংস্কৃতিতে যমজ সন্তানের জন্ম খুবই বিরল এবং তাই যাদুকরী। মায়া দেবতা এক্সপিয়াকোক এবং এক্সমুকেনের দুটি যমজ সন্তান ছিল, হুন হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু (“প্রথম যমজ” নামে পরিচিত)। তাদের মধ্যে মায়া দেবী এক্সবাকিয়ালোর আরও দুটি যমজ পুত্রও রয়েছে, এই যমজদের নাম হুন বাটজ এবং হুন চৌয়েন, তারা “বানর যমজ” নামে পরিচিত ছিল। এরপর আসে হিরো টুইন্স যা দ্বিতীয় যমজ।
‘পোপোল ভু’ গ্রন্থ অনুযায়ী এই বানর জমজ ছিল খুব হিংসুটে এবং অত্যাচারী। তারা তাদের ছোট সৎ-ভাই হুনাহপু ও এক্সবালাংখুয়েকে ঈর্ষা করতেন এবং প্রায়শই হেনস্তা করতেন। এজন্য তারা বিতাড়িত হন। দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়, লক্ষ্যহীনভাবে এবং তাদের মা এবং পরিবারের দ্বারা পরিত্যক্ত অবস্থায়, যতক্ষণ না তাদের সৎ ভাইয়েরা বড় হয়ে তাদের দাস হিসেবে ধরে আনে। তারা তাদের শিকার করতে এবং তাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য করাত যখন তারা খেলাধুলা এবং নাচ করত। কিছুদিন পরে, “দ্বিতীয় যমজ” আবিষ্কার করে যে উত্তরাধিকারসূত্রে তাদের সৎ ভাইদেরও জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। তারা এর বিকাশ এবং বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। একদিন, তাদের বড় ভাইদের দুর্ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে, হুনাহপু এবং ইক্সবালাঙ্ক তাদের দুষ্ট সৎ ভাইদের একটি গাছে উঠতে বাধ্য করে, যে গাছটি তারা তাদের জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে খুব লম্বা করে তোলে। যদিও দুষ্ট সৎ ভাইরা করুণা ভিক্ষা করেছিল। অবশেষে তারা নামতে না পেরে বানরের লেজসহ বানরে পরিণত হয়। এইভাবে ভাই হুন বাটজ এবং হুন চৌয়েন বানর হয়ে ওঠে এবং তাদের “বানর যমজ” বলা হত ।
তারা যখন ঠাকুমার কাছে ফিরে আসেন, তাদের হাস্যকর ও বীভৎস রূপ দেখে দাদি হেসে ফেলেন। লজ্জায় ও অপমানে তারা বনে পালিয়ে যান এবং পরে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক বানর দেবতা হিসেবে পূজা পেতে থাকেন। তারা শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী ও পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরাও মানব সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন।
এই কাহিনীর মাধ্যমে মায়া পৌরাণিক কাহিনীতে অহংকার ও হিংসার পরিণাম এবং শিল্পের শক্তির প্রতীক হিসেবে বানর যমজদের উপস্থাপন করা হয়েছে।
মায়ার লুকানো ধন
পবিত্র সেনোটগুলি, যাকে জিবালবার প্রবেশদ্বারও বলা হয়, সম্প্রতি তাদের সমস্ত প্রাচীন, লুকানো সম্পদের সন্ধান শুরু হয়েছে! সমস্ত মহান মায়া শহরগুলি সিঙ্কহোলের পাশে অবস্থিত ছিল, যা তাদের প্রয়োজনীয় মিষ্টি জল সরবরাহ করত। ইউকাটান উপদ্বীপ অঞ্চলে মাটির উপরে কোনও হ্রদ বা নদী নেই। অন্ধকার পথ এবং একসময় লুকানো গুহাগুলি এখন সাহসী অভিযাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান।
বৃষ্টির দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন
প্রত্নতাত্ত্বিকরা সম্প্রতি বেলিজের কারা ব্লাঙ্কার একটি সিনোটে মায়া বৃষ্টির দেবতার উদ্দেশ্যে পাথরের হাতিয়ার এবং সিরামিকের নৈবেদ্য আবিষ্কার করেছেন। পবিত্র পুকুরটি ঘন বনে ঘেরা এবং এটি মায়া জল মন্দিরের স্থানও। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন যে এই নৈবেদ্যগুলি সেই সময়ের ছিল যখন ব্যাপক খরা সমগ্র মায়া সভ্যতা ধ্বংস করতে শুরু করেছিল।
বেলিজের কারাকোলের কাছে, একটি বৃহৎ মায়া শহর, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অভিযাত্রীরা লাস কুয়েভাসের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধান করে এবং সেই স্থানের বৃহত্তম পিরামিডগুলির একটির নীচে একটি বিশাল গুহা খুঁজে পান। তারা একটি সিঙ্কহোল এবং একটি ভূগর্ভস্থ নদীও খুঁজে পান যা সম্ভবত এটি একটি আনুষ্ঠানিক স্থান ছিল, যা সিঙ্কহোল বা সেনোট এবং মায়ার পবিত্র বিশ্বাসের মধ্যে যোগসূত্রকে পুনরায় নিশ্চিত করে।
মোহিত সেনোট
মায়াপান ছিল একটি প্রাচীন প্রাচীর ঘেরা মায়া শহর যা চিচেন ইৎজার পতনের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শহরের প্রাচীরের ভিতরে, বেশ কয়েকটি সেনোট রয়েছে, তবে একটি সেনোট – স্যাক উয়ায়ুম – সীমানা প্রাচীরের ঠিক বাইরে অবস্থিত। স্থানীয় গ্রামবাসীরা স্যাক উয়ায়ুম সেনোট থেকে জল পান করে না এমনকি তাদের বাচ্চাদেরও এর কাছে খেলতে দেয় না! সম্ভবত এর দুটি গুহায় মানুষের হাড়ের চিহ্ন ছড়িয়ে থাকার সাম্প্রতিক আবিষ্কার তাদের আতঙ্কের ব্যাখ্যা দেয়!
প্রত্নতাত্ত্বিকরা, সিনোটের অবস্থান দেখে কৌতূহলী হয়ে, এর লুকানো গভীরতা অন্বেষণ করার লোভ রোধ করতে পারেননি। এর জন্য তাদের প্রথমে জলের পৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য ৪০ ফুট নীচে নেমে যেতে হয়েছিল! তারা বিশ্বাস করেন যে সিনোটটি একটি সমাধিস্থল ছিল কারণ তারা এর গভীরতায় মনুষ এবং প্রাণী উভয়ের কঙ্কালের অবশেষ আবিষ্কার করেছিল। গবেষকরা ধারণা করেছিলেন যে মায়াপানের দক্ষিণে সিনোটের অবস্থানটি পাতালের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। যদি তারা কোনও রোগে(প্লেগ) মারা যেত তবে ভুক্তভোগীদের সেখানে সমাহিত করা হতো। তবুও সিনোটটি এখন একটি ঘোড়ার মাথাওয়ালা সর্পের স্থানীয় কিংবদন্তি দ্বারা সুরক্ষিত রয়েছে যা পবিত্র সিঙ্কহোলের রহস্য রক্ষা করে।
সেনোটের পবিত্র আলো
প্রত্নতাত্ত্বিক, গিলারমো ডি আন্দা, চিচেন ইটজার কাছে একটি সেনোটে একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন। সিঙ্কহোলের নীচের জল বছরের দুটি দিন একটি পবিত্র সূর্যঘড়ি হিসেবে কাজ করত: ২৩শে মে এবং ১৯শে জুলাই – যখন সূর্য তার শীর্ষে পৌঁছায় শীর্ষ আলো শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট দিনগুলিতে কোনও ছায়া ফেলে না। সূর্যের আলো সেনোটের ছোট খোলা অংশ দ্বারা নিবদ্ধ হয় এবং নীচের জলে উল্লম্বভাবে নেমে আসে। শীর্ষবিন্দুতে, সূর্য চিচেন ইটজার এল ক্যাস্টিলো পিরামিডের উত্তর-পূর্ব কোণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে উদিত হয় এবং পরে পিরামিডের পশ্চিম সিঁড়ির সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে অস্ত যায়। সেনোটটি লুকানো মায়া সূর্যঘড়ির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রত্নতাত্ত্বিক এবং অন্যান্য সাহসী অভিযাত্রীরা যারা মায়া পাতালের রাজ্যে আগ্রহের সাথে প্রবেশ করে, তাদের মনে ভয় নেই। কিন্তু তাদের কি জিবালবার নির্মম দেবতাদেরও হারিয়ে যাওয়ার মতো বুদ্ধি আছে? অন্তত মায়ার পবিত্র রহস্য আমাদের কাছে আনার জন্য তাদের নরকের নয়টি স্তর অতিক্রম করতে হবে না!
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
