বিমান বিহারী সেন

চমকে উঠলাম। আজ আবার অতলের কোন গভীর থেকে কানে ভেসে এলো সেই সুর। বেজে উঠলো শ্যামের বাঁশি। এখন তো পাঁচ পুরুষের সময় কাল বহে চলেছে। তবে সে দিন ছিল অভিযোগের সুর, শাসনের বার্তা। আজ সেই সুর সোহাগ মাখা। শ্রদ্ধা জড়ানো। 

করুন ইতিহাসের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাতাগুলো হঠাৎ করে চোখের সামনে একের পর এক খুলে যেতে লাগলো। স্মরণ সে পথেই নিবিড় করে হাঁটতে লাগলো।

 মনে পড়ে লড়াই তখনও তীব্র। যদিও তীব্রতর থেকে খানিকটা নেমে এসেছে। খিদে মেটানোর লড়াই, সম্মান রক্ষার লড়াই, মাথা গোজার লড়াই। বাংলা ভাগের তাড়নায় প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আর মা-বোনেদের ইজ্জত রক্ষা করার অভিপ্রায়ে বাপ পিতামহের ভিটে মাটি থেকে উৎপাটিত হয়ে, ভাগ্য বিরম্বনায় জর্জরিত হয়ে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে একদা নিজের দেশের একাংশকেই পরদেশে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আর ধীরে ধীরে নিজের জন্মভূমি পিতৃপুরুষের ভিটে মাটি চোখের সামনে সব হয়ে গেল বিদেশ চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে।  তাদের মধ্যে আমার বাপ ঠাকুরদারা ছিল। 

ভিটেমাটি, বসতবাটি, জমি জিরেত, ক্ষেত ভরা ধান, মাছভরা পুকুর, গোয়ালভরা গরু, সুস্থ সাজানো নিশ্চিন্ত জীবন হঠাৎ করে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। সবকিছু ছেড়ে এক অনিশ্চিত হৃদকম্পমান জীবনকে বেছে নিতে হয়েছিল উপায় অন্তর না পেয়ে।  মূল ভুমি থেকে উৎপাটিত হয়ে মানুষ হলো ছিন্নমূল। তারা ভয়ার্ত হয়ে, ক্ষুধার্ত হয়ে, চোখে দুঃস্বপ্ন নিয়ে অনিশ্চয়তার সাগর পাড়ি দিয়ে কলকাতার বুকে হাজির হলো। যার যা অবস্থান ছিল সব ঘেঁটে গিয়ে তকমা পেল শরণার্থী। শুরু হল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। পায়ের নিচে জমি বলতে কলকাতার ফুটপাত, মাথার উপরে সামিয়ানা খোলা আকাশ, দেওয়াল বলতে পিলারে গম্বুজে ছেড়া কাপড় দিয়ে আটকে রাখা। তৃষ্ণার জল – কলকাতার ফুটপাতে পাতা কলের জল, ক্ষুধার আহার – লঙ্গরখানার খিচুড়ি। লজ্জা নিবারণের বস্ত্র- অপরের দয়ার উপর নির্ভরশীল। এমনি করেই তাদের দিন, মাস, বছর কেটেছে।

 আমার বাবাকে এই অবস্থার শিকার হয়ে সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল এদেশে তার মাথার উপর তখন বৃদ্ধ অসুস্থ পিতামাতা, নিজে সস্ত্রীক, আমরা অপরিণত তিন ভাই বোন। ক্ষুধার আহার জোগাড় করতেও তাকে বারবার লঙ্গরখানার লাইনে দাঁড়াতে হতো। আমরা এগিয়ে গিয়ে বাবার হাত থেকে সে খিচুড়ির পাত্র নিয়ে আসতাম যাতে বাবা আবার তাড়াতাড়ি  গিয়ে সেই লাইনে দাঁড়াতে পারে।  খিচুড়ির পাত্র নিয়ে আমরা যখন নিজেদের অস্থায়ী আস্তানায় পৌঁছতাম তখন মায়ের চোখ ছলছল করে উঠতো। অস্ফুটে বলতো হায়রে – অদৃষ্ট। চোখের জল আঁচলে মুছে তিনি শ্বশুর-শাশুড়ির ক্ষিদে নিবৃত্তি করার ব্যবস্থা করতেন। ঠাকুমা ঠাকুরদার অস্বস্তি হতো ছেলে এখনো ঘরে ফেরেনি কি করে তারা আহার মুখে তোলে। পিতা, মাতা, পরিবার আর সন্তান-সন্ততি নিয়ে সুস্থ জীবনের যে চালচিত্র ছিল আজ তার বেহাল দশা।  আমরা আবার এগিয়ে যেতাম লঙ্গরখানার পথে বাবার শ্রম লাঘব করার জন্য খিচুড়ির পাত্র গুলো আমরা ভাই-বোনরা হাতে হাতে নিয়ে নিতাম তার কষ্ট লাঘব করার জন্য। 

এমনি করেই দিন আসত দিন কাটত। প্রকৃতি যে তার নিয়মেই চলে। মানুষের দুঃখ দুর্দশায় তার তো থেমে থাকা চলেনা। সে থেমে গেলে তো সব থেমে যাবে। দিন গড়িয়ে না গেলে মানুষ দুঃখ ভুলবে কি করে। একটু একটু অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকল। কারণটা যে দুঃখের অমাবস্যা সরে গিয়ে সুখের পূর্ণিমা আসছে তা নয়। আসলে ব্যাপারটা একটু একটু করে সহে যাচ্ছে পরিবেশ পরিস্থিতি। তবে কোন কোন দিন সকালে কারা পাঠাতো পাউরুটির গাড়ি জানিনা একটা করে হাতে হাতে পাউরুটি পেতাম। দু-একটা বেশি পেলে জমিয়ে রাখতাম। নতুন রিফিউজির ঢল এলে তাদের হাতে একটু কিছু দিতে পারলে বেশ ভালো লাগতো। লঙ্গরখানার সংখ্যা আরো বাড়তে লাগলো, খিচুড়ি পাওয়াটা আগের মত অত কঠিন হতো না। কিন্তু পাউরুটির সন্ধানে হেঁটে হেঁটে অনেক দূর চলে যেতাম। ওই একটা নেশা যদি এক আধটা বেশি পাই তবে নতুন আসা পরিবারগুলোকে একটু কিছু দিয়ে ভরসা জোগাতে পারব। তবে অনেক সময় এমনি এমনি হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে যেতাম। চোখে তখন এক নতুন বিস্ময়। গ্রাম ছেড়ে এসে এই কলকাতা শহরকে তখন স্বপ্নের জগৎ মনে হতো। চারিদিকে বড় বড় বাড়ি। কত শত মানুষের চলাচল। রাস্তা জুড়ে কত শত গাড়ি। আর এক বিস্ময় ছিল কলকাতার ট্রাম। মাথার উপর একটা লম্বা টিক্কি নিয়ে, ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে নিজের শরীরটাকে সরীসৃপের মত এগিয়ে নিয়ে যেত। কত মানুষ উঠত আর নামত বেশ লাগতো ব্যাপারটা। 

ততদিনে ঠাকুরদা কলেজ স্ট্রিটের সন্ধান পেয়ে গেছে। সেখানে যে বইয়ের রত্নভাণ্ডার। সেখান থেকে আমাদের উপযোগী কিছু বইপত্র যোগাড় করে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের পড়াশোনার পর্বটাকে নতুন করে চালু করার প্রয়াস নিলেন। আমরাও তার সেই প্রয়াসে সঙ্গত করতে শুরু করলাম। যত না আমি তার থেকে বেশি আমার বোনেরা। স্বপ্নভাঙ্গা পরিবারের সদস্য হয়ে আমার তখন স্বপ্নের শহর এই কলকাতার রাস্তায় একটু একটু করে ঘুরে বেড়াতে বেশ মজা লাগত। বোনেরা বোনেদের পড়া করতো ঠিকমতো। কিন্তু আমি না। ঠাকুরদার বই হাওয়ার দাপটে বারে বারে পাতাগুলো মেলতো আবার দাপট কমলেই বইয়ের পাতা বন্ধ হয়ে যেত। ঠাকুরদা বসে থাকতো বইয়ের পাতা খুলে,  উদ্দেশ্য দুঃখের সাগরে যেন তার সোহাগের নাতির বিদ্যা শিক্ষার সমাধি না হয়ে যায়। হাপিত্যেশ তার বসে থাকাটাই সার হতো, নাতির দেখা পাওয়া যেত না। দুহাতে পাউরুটি বগলে মুড়ির ঠোঙা নিয়ে যখন আস্তানায় ফিরতাম তখন ঠাকুরদা অভিযোগের সুরে বলতো সারাদিন কোথায় টোটো করে ঘুরে বেড়াস। এই বেড়ানোর সঙ্গে টোটো শব্দটা যে কেন প্রয়োগ হতো তা বুঝতাম না। হয়তো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোটা ব্যক্ত করতে গিয়ে টোটো শব্দটা সংযুক্ত হতো। ঠাকুরদার এই প্রয়াস আর আমার তার বিপরীত প্রয়াস প্রায়শই ঘটত। আর এই টোটো করে ঘুরে বেড়ানো কথাটা আমাকে বারে বারে শুনতে হত। আমি ভীষণ বিরক্ত হতাম। এর আগে আগে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম  অপ্রয়োজনে এক কথা বারবার বলাটাকেই বুঝি শ্যামের বাঁশি বাজানো বলা হত। মা’র কাছে এই অভিযোগ নিয়ে গেলে বেশি পাত্তা পেতাম না।  মা বলতেন ওনার শ্যামের বাঁশি তোকে মানুষ করার জন্য। আরো বলতেন, এইতো কি অবস্থায় আমরা পড়ে আছি সেখানে যদি লেখাপড়াটা না শিখিস তবে ভবিষ্যতে করে খাবি কি! তখনই বুঝলাম সে রকম তো ব্যাপার নয় শ্যামতো প্রয়োজনেই তার বাঁশিটা বাজাতো রাধা কে আকর্ষণ করার জন্য। ঠাকুরদার পাশে ছিল আমাকে আকর্ষণ করার জন্য।  তার আমাকে পড়তে বসানো আর আমার পড়তে না বসার মধ্যে ঠাকুরদাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিজয়ী হতেন। বিজয়ী হতেন কারণ তাকে বিজয়ী না করতে পারলে, বাবার উত্তম মধ্যম আমার পিঠে পড়তো। মা’র যাতে নিরব সম্মতি থাকত। এখন বুঝি বাবার উত্তম মধ্যম, তাতে প্রচ্ছন্নভাবে মায়ের সমর্থন আর ঠাকুরদার বিজয়ী হওয়ার প্রয়াসের ভেলায় সেদিন যদি গা না ভাসাতাম তবে আজ আমি পরাজিত হতাম।

দিনের পর দিন কেটেছে। মাস গেছে। কেটেছে বছরের পর বছর। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে ধীরে ধীরে। খোলা আকাশের নিচ থেকে গাড়ি বারান্দার নিচে। সেখান থেকে আবার রিফিউজি কলোনিতে। খিচুড়ির পরিবর্তে মাঝে মাঝে ভাত, ডাল আর আলুসিদ্ধ পাওয়া যেতে লাগল। একই স্বাদে বিদ্ধ হতে হতে মরচে পরা জিভটাতে নতুন স্বাদে বেশ তৃপ্ত হতাম। অন্ধকার বিমোচনের জন্য ঘরে ঘরে হ্যারিকেন তার সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে নাম মাত্র দামে কেরোসিন পাওয়া যেতে লাগল।  সরকারি ইস্কুলে পড়াশোনা শুরু করা গেল। একটু একটু জায়গা জমিও মিলতে থাকলো মাথা গোজার  ঠাইয়ের জন্য। তখনই মনে হয়েছিল মনুষ্যত্বটা কি সাগরের মত!  একটা কূল যখন তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয় তখন আর একটা কুল চর তৈরি করে দেয় সেখানে বসত গড়ার জন্য। 

এমনি করে এগোতে এগোতে সময় গড়াতে গড়াতে নিজেরা পায়ের তলার মাটি পেতে লাগলাম, শিক্ষায় গতি এলো, বিদ্যা দিয়ে, শ্রম দিয়ে মাথা উঁচু করে নিজেদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা হল। সুখী জীবনের সফল নৌকা হালে পানি পেয়ে মসৃণ ভাবে চলতে লাগলো। কিন্তু এদিকে আবার সমযের যা কাজ সে তাই করল। কেড়ে নিল ঠাকুরদা, ঠাকুমা, পিতা মাতাকে। 

আমরা ছোটরা বড় হলাম। সংসার পাতলাম। সংসারের সুফলে সন্তান-সন্ততি এলো ঘরে। ধীরে ধীরে আমরা বড়রা বুড়ো হলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বড় হল। আবার তাদের সন্তান-সন্ততি হল। সেদিন নিজের ঠাকুরদা শ্যামের বাঁশিটা বাজাতেন।  নিজের চোখে দেখলাম  আসা যাওয়ার খেলা। পরপর পাঁচটা পুরুষ। ঠাকুরদা, বাবা, আমি, পুত্র আর পৌত্র। এই আসা-যাওয়ার স্রোতে আজ আমি নিজে ঠাকুরদা। হঠাৎ আমার স্থবির, একঘেয়ে জীবনে নাতির মুখে শুনতে পেলাম সে বলছে, দাদু নিচে চলো “টোটো” এসেছে চলো একটু “টোটো” করে ঘুরে আসি। পুরুষান্তরে আবার সেই শ্যামের বাঁশিটা শুনতে পেলাম।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *