রম্যরচনা
অধ্যায় : ১৫
দুম খো আর হুম দো দুই বিচিত্র চরিত্রের লোক, তারা থাকে পাশাপাশি দুই বাড়িতে। হাচিয়া ফালের বাড়ি থেকে গোটা তিনেক বাড়ির পর। দুম খো অগ্রপাশ্চাত না ভেবেই যে কোন কাজ করে বসে, আর হুম দো কোন কাজের আগে এত বেশি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটাই আর করা হয়ে ওঠে না। এই দুই ব্যক্তির সঙ্গে হাচিয়া ফালের একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক হল এই যে তারা দুজনেই তার নির্ভেজাল শত্রু, এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই
দুম খো সেদিন সকালবেলা নিজের বাড়ির সামনে প্রকাশ্য রাস্তায় ছেলেকে ধরে পেটাচ্ছিল। ছেলেটা তার নিজের যদিও তবুও পেটাতে পেটাতে উত্তেজিত গলায় বলছিল,
‘হাড়-হাভাতে ছেলে, পিটিয়ে তোর বাপের নাম ভুলিয়ে দেব।’
হাচিয়া ফাল যাচ্ছিল তখন সেখান দিয়ে। যাচ্ছিল আরো অনেকেই, তবে কেউই দুম খো যে তার বাচ্চা ছেলেটাকে পেটাচ্ছিল তাতে ভ্রুক্ষেপ করছিল না। কেউ কিছু বলছে না দেখে দুম খো আরো বেশি উৎসাহ পেয়ে ছেলেকে আরো প্রবল বিক্রমে প্রহার করে যাচ্ছিল এমনিতে হাচিয়া ফাল নিজেও বাচ্চাদের পছন্দ করে না, সুযোগ পেলে সেও যেকোনো বাচ্চাকেই মনের সুখে পিটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এখানে তার যে কী দুর্মতি হল! সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে দুম খো-কে বাধা দিয়ে বলল,
‘আহা, আহা! কর কী, কর কী? ছেলেটাকে খামোখা পেটাচ্ছ কেন?’
ছেলে পেটানোতে বাধা পেয়ে দুম খো মারমুখি হয়ে তেড়ে এলো তার দিকে। মনে হলো, ছেলেকে ছেড়ে এবার বুঝি তাকেই পেটাতে শুরু করবে। খানিকটা ভয় পেয়ে হাচিয়া ফাল পিছিয়ে গেল আর দুম খো তেড়িয়া মেজাজে বলল,
‘আমার ছেলে আমি পেটাচ্ছি বেশ করছি, একশবার পেটাব। আমার ছেলে আমি পেটাবো না তুমি পেটাবে? তুমি বলার কে? তোমার ছেলে পেটাচ্ছি আমি যে তুমি বলতে এসেছ?’
তার কথা শুনে আর ব্যবহার দেখে হাচিয়া ফাল রেগে গেল। বলল,
‘আমার ছেলে পেটাবার সাহস হবে তোমার? এসেই দেখো একবার।’
দুম খো সমানতালে জবাব দিল,
‘কোথায় তোমার ছেলে? নিয়ে এসো, এক্ষুনি পিটিয়ে দিচ্ছি।’
কী পাষণ্ড লোক রে বাবা, অন্যের ছেলে পেটাতে চায়! ভাবল হাচিয়া ফাল। অবশ্য সুযোগ পেলে সেও অন্যের ছেলেকেই পেটাবে যেহেতু নিজের কোন ছেলে নেই তার। সেটা মনে হতেই সে বলল,
‘নেহাত আমার ছেলে নেই বলে আনতে পারছি না। না হলে এনে দেখাতাম পেটাবার সাহস কী করে হয় তোমার।’
উত্তর শুনে দুম খো খানিকটা দমে গেল, তবে ফোঁস-ফোঁস করেই বলল,
‘তোমার যে ছেলে নেই আগে বললেই পারতে। পেটাবার প্রশ্নই উঠত না। তোমার যদি সাহস থাকে তো একটা নিজের ছেলে বানিয়ে যেদিন খুশি নিয়ে এসো। দেখবে পেটাবার সাহস হয় কী হয় না আমার।’
একেই বলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা। যে ছেলে নেই তাকে নিয়ে এত কথা কিসের? আবার বলে কিনা ছেলে বানিয়ে নিয়ে আসতে যাতে সে পেটাতে পারে। মামাবাড়ির আবদার নাকি? ছেলে যদি হয়ও হাচিয়া ফাল তাকে পেটাবার জন্য দুম খো-কে ইজারা দেবে কেন? নিজের ছেলে নিজেই পেটাবে।
সকালবেলাতেই এত অশান্তি তার মেজাজ বিগড়ে দিল। এরপর দুম খো-কে শত্রু না ভাবার কোন কারণ আছে কি?
এইরকম ঝামেলার পর সে কোথায় যাচ্ছিল ভুলে গিয়ে ফিরে চলল নিজের বাড়ির দিকে। কয়েক পা যেতেই সে এলো সেই বাড়ির সামনে যেখানে থাকে হুম দো। গেটের কাছে এসেই তাকে দাঁড়িয়ে যেতে হলো। দাঁড়াতে হলো একটা আজব দৃশ্য দেখে। দেখে কী, হুম দো তার ঘরের দরজা থেকে দ্রুত বেগে বাড়ির গেটের কাছে এসেই রাস্তায় পা দেওয়ার মুহূর্তে আবার পিছিয়ে চলে যাচ্ছে ঘরের দরজার কাছে। বারবার ঘটতে লাগল এই ঘটনা। ব্যাপারটা দেখে হাচিয়া ফাল এতটাই অবাক হয়ে গেল যে আর দু পা এগিয়ে গেটের ঠিক মুখটায় ঢুকে দাঁড়ালো। হুম দো তখন পিছিয়ে গিয়েছিল ঘরের দরজার কাছে। পরক্ষণেই তীব্রগতিতে সে ছুটে এল গেটের কাছে এবং সেখানে দাঁড়ানো হাতিয়া ফালকে লক্ষ না করেই রীতিমতো ধাক্কা মেরে বসলো। ধাক্কা খেয়ে প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল হাচিয়া ফাল। কোনক্রমে টাল সামলে নিয়ে মহা বিরক্ত হয়ে বলল,
‘কেমন তালকানা লোক হে তুমি! গন্ডার নাকি? দেখতে পাচ্ছ না আমি দাঁড়িয়ে আছি? ধাক্কা মেরে বসলে!’
কোথায় দুঃখিত হবে তা নয়, মেজাজ দেখিয়ে হুম দো বলল,
‘আমার বাড়ির গেটের সামনে তুমি দাঁড়ালে কেন? ধাক্কা খেতেই হবে। তোমার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ানো তোমাকে আমি ধাক্কা মারতে গেছি?’
‘আচ্ছা অভদ্র লোক তো তুমি, বাড়িতে কেউ এলে গলাধাক্কা দাও!’
হাচিয়া ফাল রাগ দেখালো। হুম দো তাতে বিচলিত না হয়ে উত্তপ্ত গলায় জানালো,
‘একশবার গলা ধাক্কা দেবো। আমার বাড়িতে আমি ছাড়া অন্য কেউ আসবে কেন? বিশেষ করে আমি যখন বেরিয়ে যাচ্ছি?’
হাচিয়া ফাল একটু বিস্মিত হল। জানতে চাইল,
‘বেরিয়ে যাচ্ছ কোথায়? তখন থেকে দেখছি, একবার এগোচ্ছ একবার পিছিয়ে যাচ্ছ। বেরোতে চাইলে কখন বেরিয়ে যেতে পারতে।’
হুম দো জবাবে সমান তিরিক্ষি মেজাজে বলল,
‘আমার বাড়ি থেকে আমি বেরোবো যখন আমার খুশি। তুমি বলার কে? বেরোবো কি বেরোবো না ঘন্টাখানেক ধরে সেটাই ভেবে যাচ্ছি আর তুমি এসে সেই ভাবনাটায় ব্যাঘাত ঘটালে। আবার আমাকেই বলছো অভদ্রলোক? তুমি নিজে কোথাকার ভদ্রলোক হে? আদেখলে এক নম্বরের, যেচে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাও।’
রীতিমতো গলা তুলে ঝগড়া শুরু করে দিল হুম দো। তার উত্তপ্ত গলার আওয়াজ শুনে আশেপাশে দু-চারটে বাড়ির এবং রাস্তা দিয়ে যেতে থাকা কিছু লোকজন বিনা টিকিটে ঝগড়া দেখার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। এই লোকগুলিকেও হাচিয়া ফাল সুবিধের লোক বলে ভাবলো না। সব কটা শত্রু না হলে কি হুম দো তার সঙ্গে ঝগড়া করছে দেখে মজা পায়? এই সব কটা শত্রুকে মজা দেওয়া উচিত নয় ভেবেই সে চুপ করে গেল, ঝগড়াটা আর বাড়তে দিল না। সে চুপ করে যাওয়াতে হুম দো নিজেও আর কিছু বলল না, বরং আগের মত আবার এগোনো-পিছনো শুরু করে দিল। হুম দো-র মত এক শত্রুর ওপর গায়ের ঝাল না মেটানোর অতৃপ্তি নিয়েই হাচিয়া ফালকে বাড়ি ফিরতে হলো।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
