সঞ্জীব দেবলস্কর
এ অসম্পূর্ণ যাত্রার বিবরণটি আমি যখনই লিখতে বসি, তখুনিই মধ্যপথে থেমে যায়। আসাম রাজ্য সরকারের লাল রঙের নাক কাটা বড় বাসে চেপে আপন মনে কাহিনিটি সাজাতে গেলেই দুচোখ ঘুমে ভারী হয়ে আসে। কখনও দেখি গাড়িটি বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেছে। কোন দিনই আর শেষটায় পৌঁছতে পারিনি।
রাতে বিছানায় শুয়ে মনের মধ্যে গল্পটাকে নাড়াচাড়া করতে গেলেও এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। ঠিক যখন মনে হয়—এইবার শেষটা ধরা পড়েছে—দু চোখে ঘুম নেমে আসে। আর ঘুম ভাঙার পর দেখি, সেই অংশটা আর মনে নেই।
আসলে গল্পটি শুরু করেছিল আমার দাদা। কিন্তু শেষ করার সুযোগ তাঁরও হয়নি।
সে চল্লিশ বছর আগেকার কথা। দাদামণি তখন একটি টেকনিক্যাল স্কুলে আবাসিক ছাত্র। দিকশূন্যপুরের পথে, পুবের কোনা গ্রামের কয়েক মাইল আগে একটা বাজার। বাজারের পাশেই একটি নির্জন টিলা—অন্ধকারে যার গায়ে কোনও গাছপালার নড়াচড়া নেই। আশপাশে মনুষ্য বসতির কোন চিহ্ন নেই। দামাল স্বভাবের অগ্রজ এ পথে পায়ে হেঁটে, সাইকেল চেপে রাত বিরেতে খুব ঘুরতো। এমনই এক রাতে এখানে শুনেছিল—একটি নারীকণ্ঠের আর্তনাদ।
চিৎকার নয়। কাতর অনুনয়ও নয়। যেন কেউ বহুদিন ধরে ডাকছে। সাহসী দাদাও সেদিন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। হাইওয়ে ধরে দৌড়তে দৌড়তে কয়েক মাইল পেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে এক ঘুপচি দোকানের কাছে পৌঁছে গিয়ে দেখলো দোকানি ঝাপ ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক’জন আড্ডাবাজ বাড়ি যাব যাব করছে। এদের ওখানে গিয়ে চিৎকারের কথাটা বলতেই লোকগুলো একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। হাসিটা বড্ড অদ্ভুত—আর এদের কারও চোখে কোনও আলো নেই।
একজন শুধু বলল,
“ওদিকে তাকিও না। শুনেছ—এইটুকুই যথেষ্ট।”
এই পর্যন্তই শুনেছিলাম আমার দাদার মুখে। বেশ কয়েকবছর আগে।
এরপর একদিন দাদামণি এ গল্পটি বলতে বলতে মোক্ষম সময়ে এসে আচমকা থেমে গেল। শব্দ খুঁজে পেল না। তারপর … ধীরে ধীরে আলঝাইমার এসে তাঁকে গ্রাস করল। এমনি একদিন স্মৃতির ভিতরেই দাদা হারিয়ে গেল।
কিন্তু গল্পটা হারায়নি।
মনে হল —গল্পটি সেই অবধি আমার পেছনে পেছনে হাঁটছে। কতদিন হল আমি যেখানে যাই, গল্পটিও সেখানে যায়। যেন আমাকে নিয়ে যেতে চায় কোন এক দিকশূন্যপুরে।
এই নামটি অবশ্য আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কী এক তীব্র আকর্ষণে মাঝে মাঝেই আমি ওই রুটের বাসে উঠে বসি। জানালার ধারে একা বসে বাইরে তাকিয়ে থাকি। রাস্তায় কোত্থাও বাসটা একটু থামলেই আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি, মনে হয় বেশিক্ষণ থেমে আছে বাসটি। আমার যে আর তর সয় না। দিকশূন্যপুরে কেউ বুঝি আমার অপেক্ষায় রয়েছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকি, রাস্তার ধারে মুহূর্তের জন্য আসে এক একটা ঝাপসা সাইনবোর্ড—তারপরই মিলিয়ে যায়।
আমি নিশ্চিত—ওই পুবের কোনা গ্রামের ঘুপচি দোকানের লোকগুলো সব জানত। ওরা কোনও কারণে কিছুই বলতে চাইছিল না।
স্থির করলাম, আমি নিজেই রহস্যটা ভেদ করব। প্রয়াত দাদার শেষ না করা গল্পটা শেষ করব। কিন্তু যতবারই লিখতে বসি, কোনও না কোনও বিঘ্ন ঘটে যায়। বাসে বসলে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বস্তি বাজারের ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে– । কিন্তু মনের ভিতর কাহিনিটি এগোয় না। কে যেন বিদ্রুপ করে বলে ‘তোমরা করিমপুরের গলা চেপে ধরে হত্যা করেছ। আর এখন বেরিয়েছ দিকশূন্যপুরের সন্ধানে। ফিরে যাও নিজের আস্তানায়।’ আমি লেখার টেবিলে বসেই ঘুমিয়ে পড়ি। আর নয়তো মোক্ষম সময়ে কলমের কালি শুকিয়ে যায়, ঘরের আলো নিভে যায়, নয়তো হঠাৎই টেলিফোনটি বেজে ওঠে। কিংবা দেখা দেয় অন্য কোনও বিপত্তি–
এই যেমন আজ—আমার স্ত্রী হঠাৎ আলো নিভিয়ে বলল,
“অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাও।”
আমি শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই মনে হল—আমার বাস চলছে। বরাক- কুশিয়ারার পাড় ঘেঁসে ভারত-বাংলা আন্তর্জাতিক বোর্ডারের গা ঘেঁসে– ।
কন্ডাক্টর আর কাউকে ডাকছে না।
বাসে আমি একাই যাত্রী। …
সকাল সাতটায় দিকশূন্যপুর এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা ছিল।
কিন্তু পথে বেরিয়ে দেখি—আমার চেনা পথে আর সেই জায়গার নামই নেই। সরকারি সাইনবোর্ডে নেই, রাস্তার ধারে দোকানের নামলিপিতেও নেই—কোথাও না। যেন নামটি কখনও ছিলই না।
আমি কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“এই শিলচর করিমগঞ্জ রুটে দিকশূন্যপুর বলে কিছু নেই। আর আজ্ঞে, করিম মিয়াঁর নামে ওই পুরাতন শহরটিও এখন নিশ্চিহ্ন। তবে…”
“তবে কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে আমার দিকে তাকাল।
ঠিক আমার প্রয়াত দাদার মতো তাকানো।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
“রাতে অনেকেই ওই গ্রামটির কথা বলে, মাঝপথে গাড়ি থেকে নেমে যেতে চায়।”
সেই মুহূর্তে আমার কানে ভেসে এল সেই পরিচিত আর্তনাদ।
আমি বুঝতে পারলাম—
দিকশূন্যপুর কোনও বাস্তব জায়গা নয়।
এটা একটি অসম্পূর্ণ গল্প। যে এ গল্পটি একটিবার শুনে ফেলে, সে নিজেই তার চরিত্র হয়ে যায়।
আজও মধ্য রাতে ঘুম ভাঙলে মনে হয়—
কেউ আমাকে ডাকছে। আমি জানি, একদিন না একদিন
আমাকেই গল্পের শেষ পর্বটি বলতে হবে।
কিন্তু তখন…
শোনার মতো আর কি কেউ থাকবে!
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
