অমিতাভ সরকার
এই বসন্ত জানালে বিদায়
গীতিকার শ্যামল গুপ্ত
জীবন কোন মানুষকে কোথায় যে নিয়ে যায়, সেটা তার নিজেরও জানা থাকে না। ভাবনা আর বাস্তব – সময়ের অগ্রগতিতে ঠিক কোথায় গিয়ে উপনীত হয়, সেটা কি শুধুই প্রচেষ্টা নাকি পূর্বনির্ধারিত – এর প্রকৃত সদুত্তর কিছু না থাকলেও কিছু মানুষের সাধনা, ভালোবাসা হয়ে ওঠে একটা অনন্য দৃষ্টান্ত।
যাঁকে নিয়ে এই লেখা, তিনি শ্যামল গুপ্ত। হ্যাঁ, গীতিকার শ্যামল গুপ্ত।
‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’, ’ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে’, ’আমি নিরালায় বসে’, ’বনের পাখি গায় বোলো না বোলো না’, ’এ জীবনে আমি যারে চেয়েছি’, ’যে আঁখিতে এত হাসি লুকানো’, ’আমায় তুমি যে ভালোবেসেছো’, ’সোনা রোদের গান আমার নতুন পাতার গান’, ‘পুজোর ছুটি’, ‘শূন্য ঘরে ফিরে এলাম’, ’যেথায় গেলে হারায়’
-প্রভৃতি বহু কালজয়ী গানের জন্ম তাঁর কলম থেকেই। আধুনিক বেসিক গানের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রের গান, রম্যগীতি, রাগাশ্রয়ী সব ধরনের গানই লিখেছেন। প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে সামিল না হয়ে কিংবা সংখ্যার দিকে না ভেবে নিছক ভালোবেসেই গান লিখেছেন। ওঁর নিজের কথায়- ‘মনের আনন্দে গান লিখেছি। চেষ্টা করেছি যাতে গানের ভাষা-ভাব চটুল না হয়। একটা কাব্য থাকে। গভীরতা থাকে। তাছাড়া খুবই সচেতন থেকেছি যাতে অন্য কারও প্রভাব আমার গানে না পড়ে। আমি মনেপ্রাণে চাইতাম আমার গান যেন অন্য কারোর মতো না হয়।’

তবে শুধুই তাঁর জীবন বা সৃষ্টিকর্মের ক্লান্তিকর বিবরণ লেখা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বর্তমান কালে মানুষ যখন নীতিবোধ, আত্মপ্রত্যয় হারিয়ে মিথ্যে যশোলিপ্সার পিছনে ছুটে বেড়ায়- আদর্শ, ব্যক্তিত্ব, মর্যাদার কথা চিন্তাও করে না- শ্যামল গুপ্তের জীবন সেখানে এক অনন্য নজির হিসাবে আমাদের মনে ছাপ ফেলে যায়, বিস্মিত হতে হয়, নতিস্বীকার করতে হয় তাঁর মানবিক-দর্শনের কাছে।
বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও সাহিত্য ভালোবাসতেন। গানের প্রতিও টান ছিল ছোটোবেলা থেকেই। নিজে মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু একটা সময় সম্মানীয় পদের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন শুধু গান লিখবেন বলে। তখন গীতিকারদের আয় তেমন কিছু ছিল না। অনেকক্ষেত্রে এমনও হয়েছে, যে তাদের যোগ্য স্বীকৃতিটুকুও দেওয়া হয়নি। অনিশ্চয়তার জীবন তো ছিলই- তাছাড়া তখন গীতিকার হিসাবে অজয় ভট্টাচার্য, সুবোধ পুরকায়স্থ, শৈলেন রায়, মোহিনী চৌধুরী, প্রণব রায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের বেশ নামডাক। এইরকম একটা সময়ে শ্যামল গুপ্ত কিন্তু সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন, যা মোটেও সহজ ছিল না। কারোর প্রতি কোনো পক্ষপাত ছাড়াই কিংবা চলচ্চিত্র শিল্পের বিশেষ কোনো দলের গোষ্ঠীভুক্ত না হয়েও শ্যামল গুপ্ত হয়ে উঠেছিলেন একজন বিখ্যাত গীতিকার। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা। ব্যক্তিজীবনে মানুষটি ছিলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী।
কিন্তু এই পরিচয় দিয়ে ওঁর আইডেনটিটি খুঁজবার চেষ্টা করা বৃথা। তিনি ছিলেন যেমন গভীর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, তেমনি দায়িত্বশীল অথচ একরোখা সংবেদনশীল- এক কথার মানুষ।
স্ত্রী সন্ধ্যা, বন্ধু গায়ক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে ছিল তাঁর বৃত্ত। তবে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, পবিত্র মিত্র, কানন দেবীরাও এই নিকট বৃত্তে ছিলেন। তবে নিজস্ব গণ্ডীর মধ্যে থাকতে পছন্দ করলেও সেই সময়ের সব নাম করা সুরকার, শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সবার সঙ্গে সদ্ভাব সম্ভ্রম বজায় রেখে চলতেন। সবচেয়ে বড়ো কথা- নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী গীতিকার তো বটেই, গুণী ব্যক্তিদের প্রাপ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তাঁকে যারা বুঝতেন – তারা জানেন, সিদ্ধান্তহীনতায় উনি কখনো ভুগতেন না। আপাত বজ্রগম্ভীর অথচ কোমলপ্রাণ দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী এই সঙ্গীতসাধক নিজের লক্ষ্যে চিরকালই অবিচল থেকে গেছেন।
এ তো গেল মানুষ শ্যামল গুপ্তের কথা। আসুন এবার ওঁর জীবনের দিকে আলোকপাত করা যাক।
জন্ম ১৯২২(মতান্তরে ১৯২৫) সালের ৩রা ডিসেম্বর। বাবা নৃপেন্দ্রকুমার, মা মহামায়া। জন্ম কলকাতায় হলেও আদতে বিহারের মুঙ্গেরের জামালপুরে থাকতেন, আর ওঁদের আদিবাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের হালিশহরে। বাবা এবং ঠাকুর্দা ওকালতি করলেও মাত্র আড়াই বছর বয়সে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর পুরো পারিবারিক ওকালতির জীবিকা ত্যাগ করে পরিবারকেই কলকাতায় চলে আসতে হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শ্যামল গুপ্ত লেখাপড়ায় ভালো ছাত্র ছিলেন। দুই দাদার সঙ্গে স্কটিশচার্চ কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ওই স্কটিশচার্চ কলেজিয়েট স্কুল থেকেই সেই আমলে চারটি লেটার ও স্টার মার্কসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ওখান থেকেই আই এ পরীক্ষাতেও সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। তারপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে রসায়ন বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হন এবং উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৪৩ সালে বি এ ডিগ্রীলাভ করে চাকরির সন্ধানে পুণে চলে যান। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ এক্সপ্লোসিভ ল্যাবরেটরিতে কেমিস্টের চাকরি লাভ করেন। তবে ১৯৪৭ সালে জীবিকা ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। এক বছর মতো বিজ্ঞাপনে কাজ করলেও সেটাও ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর গান লেখার জীবিকায় আত্মনিয়োগ করেন।
একসময় কবিতা গল্পও লিখতেন। ‘তরণী’, ‘অভ্যূদয়’, ‘একক’ ইত্যাদি পত্রিকায় কবিতা লিখেছেন। ‘বসুমতী’, ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় ওঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। ‘আঁধারে আলো’ এবং ‘বধূবরণ’ শ্যামল গুপ্তের লেখা উপন্যাস। ‘বধূবরণ’, ‘পুতুলঘর’ চলচ্চিত্রের কাহিনী এবং চিত্রনাট্য শ্যামল গুপ্তের নিজেরই লেখা। রবীন্দ্রনাথ ‘শেষসপ্তক’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ছিল তাঁর গীত রচনার আদর্শ এবং প্রেরণা।
কলকাতায় থাকাকালীন পড়াশোনার সঙ্গে কিছুকাল গান শিখেছেন পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী এবং তারাপদবাবুর ছাত্র মণি ঘোষের কাছেও। এমনকি ট্রেনার কমল দাশগুপ্তের কাছেও ছমাস গান প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় গীতিকার হিসাবে তাঁর প্রথম রেকর্ড বেরোয় ‘অন্তবিহীন নহে তো অন্ধকার’ এবং ‘প্রণাম তোমায় হে নির্ভয় প্রাণ’। সুর এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র(অবশ্য বাংলা গানে তাঁর তখনও সেইরকম নাম হয়নি। জগন্ময় মিত্রের ‘চিঠি’ এবং ‘সাতটি বছর পরে’ বেরোয় এর ঠিক পরেই। এই রেকর্ড বেরোনোর পর জগন্ময় মিত্রের বিশাল নামডাক হয়।)।
গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তা হেমচন্দ্র সোম শ্যামল গুপ্তের স্বকণ্ঠে দুটো রেকর্ড বার করেন। প্রথমটিতে ছিল ১৯৪৭ সালে সুবোধ পুরকায়স্থের রচনা এবং গোপেন মল্লিকের সুরে ‘জানি ভুলে যাবে মোরে’ এবং ‘তুমি আর আমি ছিনু যে’। দ্বিতীয় রেকর্ডের গানদুটো ছিল শ্যামল গুপ্তের নিজেরই লেখা ‘আমার ক্লান্ত বকুল শাখার পরে’ এবং ‘যে পথে তোমার কথা ছিল আসিবার’। শেষোক্ত গানদুটোয় সুর দিয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র। কিন্তু যেমন ভাবা গিয়েছিল রেকর্ড দুটো সেরকম সাফল্য পাইনি। তখন হেমচন্দ্র সোমের নির্দেশেই গান গাওয়া ছেড়ে শুধুমাত্র গান লেখার দিকেই নজর দিতে শুরু করলেন।
গীতিকার হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন ১৯৫২ সালের পুজোর গান হিসাবে ‘পাষাণের বুকে লিখ না আমার নাম’ থেকে। গানটির সুরকার এবং শিল্পী হিসাবে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়েরও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে (সঙ্গীত জগতে তখন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য অনেকটা পরিচিত নাম।
এই গান বেরোনোর আগে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের তেমন নামযশ হয়নি।)। এরপর শ্যামল গুপ্তকেও আর পিছনে তাকাত ফিরে তাকাতে হয়নি। এমনও হয়েছে, উনি গান লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর বোম্বেতে বসে কানু ঘোষ, বিনোদ চট্টোপাধ্যায়ের মতো সুরকারেরা তাতে সুর বসিয়েছেন, তালাত মাহমুদ, মান্না দে, গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলে তাতে কণ্ঠ দিয়েছেন। এইসব গান হয়ে গেছে কালজয়ী। শ্যামল গুপ্তের লেখায় গান গেয়েছেন – যূথিকা রায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন গুপ্ত, ইলা বসু, গায়ত্রী বসু, সুপ্রীতি ঘোষ, বাণী ঘোষাল, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পিন্টু ভট্টাচার্য, নির্মলা মিশ্র, অপরেশ লাহিড়ী, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, ললিতা ধর চৌধুরী, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, মৃণাল চক্রবর্তী, থেকে শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সবাই। সুরকার হিসাবে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, দুর্গা সেন, আলি আকবর খাঁ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অনুপম ঘটক, রবীন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অনিল বাগচি, অনল চট্টোপাধ্যায়, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, ভি বালসারা, অজয় দাস, সুপর্ণকান্তি ঘোষ- সবার সঙ্গেই কাজ করেছেন।
১৯৪৯ সালে ‘অভিমান’ বাংলা চলচ্চিত্রে রামচন্দ্র পালের সুরে ‘একটু কাছে এলে হায়’ গান দিয়ে গীতিকার হিসাবে আত্মপ্রকাশ। গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ভাগ্য বলে কিছু একটা কাকতালীয় ব্যাপার মনে হয় থাকে। পরবর্তীকালে সন্ধ্যার সঙ্গেই শ্যামল গুপ্তের প্রেম এবং অনেক পরে গিয়ে পরিণয় ১৯৬৬ সালের ১০ই মার্চ। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে সেই যুগে দাঁড়িয়ে সামাজিক পারিপার্শ্বিক বিরোধিতা এবং নানাবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শ্যামল গুপ্তের ভালোবাসার কাছে অবশেষে গিয়ে ধরা দিতে হয়। তবে দুজনকে অপেক্ষাও করতে হয়েছে অনেক বছর। এই শিল্পী-দম্পতির একমাত্র কন্যা সৌমি(ঝিনুক)। শ্যামল গুপ্ত আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বোঝাপড়া ছিল দেখবার মতো এবং এ যুগের বিচারে তা যথেষ্ট শিক্ষণীয়ও বটে। গায়িকা হিসাবে সন্ধ্যা তখন খ্যাতির শীর্ষে। লাজুক, বিনয়ী, সম্ভ্রমশীলা এই কিংবদন্তীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে ওঁর বর্ণময় সঙ্গীতজীবনে অগ্রগতির পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে স্বামী হিসাবে সবসময় উৎসাহ দিয়ে গেছেন, পাশে থেকেছেন, সঙ্গীত সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে কখনো কোনো বাধাপ্রদান করেননি। শিল্পীর সংসারজীবন তো অনেক কঠিন। নানা চড়াই-উৎরাই, প্রলোভন, উপেক্ষা পার করে তবে নিজেদের ঠিক থাকতে হয়। তাই মানুষ হিসেবে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, সমীহবোধ, ভরসা রাখা জরুরি। ওঁদের দুজনের মধ্যে সেটা ছিল যথেষ্ট পরিমাণেই। তবে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্যামল গুপ্ত ওঁর নিজস্ব সত্ত্বাও বজায় রাখতেন। স্ত্রীর পরিচয়ে পরিচিতিলাভ তিনি করেননি, করতেও চাননি- চিরকালই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে গেছেন- সেটা সম্ভব হয়েছে ওঁর অদম্য আগ্রহ, অধ্যাবসায় এবং নিষ্ঠার কারণেই। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সুবিধা-অসুবিধার বিভিন্ন দিকে স্বামী শ্যামল গুপ্তের যথেষ্ট লক্ষ্য ছিল, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও কর্তব্যপরায়ণ স্বামীর ওপর সাংসারিক ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন। পাঠক-পাঠিকারা বুঝতেই পারছেন, নীতিগত দিক থেকে শ্যামল গুপ্ত অভিভাবকের মতো স্ত্রী সন্ধ্যাসহ গোটা পরিবারকে কীভাবে আগলে রাখতেন। শিল্পীর আগে তো মানুষ। জীবিকাগত বিরোধ কিংবা স্ত্রী সাফল্যে এগিয়ে গেলে স্বামীর নিরাপত্তাহীনতাবোধ- এসবের সম্ভাবনা তৈরি হয়নি কারণ যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব পাণ্ডিত্য -সব দিকেই শ্যামল গুপ্ত ছিলেন দাপুটে পুরুষ। হ্যাঁ, মেয়েরা তো এমন স্বামীই চায়- যে মানুষটা সারাজীবন তাকে আগলে রাখবে।
দুজনের বোঝাপড়াও ছিল চোখে হারানোর মতো। ব্যক্তিগত জীবনেই শুধু নয়, বাংলা সঙ্গীতেও ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন রেখে গেছেন এই শিল্পীযুগল। এঁদের যুগলবন্দীতে বেশ কিছু অসাধারণ গান সৃষ্টি হয়েছিল। ‘ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে’,’আমি তার ছলনায় ভুলব না’, ‘কাঞ্চন কাঞ্চন পাহাড়ে’,’কাগজের এই নৌকা আমার’, ‘আসে না প্রীতম’,’চন্দন পালঙ্কে শুয়ে’,’স্বপ্ন ভরা অন্ধকারে’ -ইত্যাদি বেসিক গান কিংবা ‘আঁখি জাগে শ্যাম রূপ রাগে’, ’বাসর আমার হলো আজ খেলাঘর’, ’ও বকবকবকম পায়রা’ ইত্যাদি চিত্রগীতি আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, ‘আশা’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘দেড়শো খোকার কাণ্ড’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ’মায়ামৃগ’, ‘নিধিরাম সর্দার’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘মুখার্জি পরিবার’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘সাগিনা মাহাতো’,’সুদূর নীহারিকা’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘ইন্দিরা’ -ইত্যাদি সিনেমায় শ্যামল গুপ্ত গীতিকার হিসাবে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রে তিনশোর মতো গান ধরে তাঁর রচিত গানের সংখ্যা দু’হাজার হবে। ১৯৬৩ সালে ‘আধুনিক গান’ নামে শ্যামল গুপ্তের একটি গীতসংকলন প্রকাশিত হয়। হিন্দি ঠুংরী থেকে বাংলা গান রচনা কিন্তু শ্যামল গুপ্তের কলম থেকেই। এছাড়া মহালয়ার দিনে বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান ‘দুর্গা দুর্গতিহারিণী’-র গান লেখার জন্য তিনি ছাড়া অন্য কারোর কথা ভাবাই যায়নি।
শ্যামল গুপ্তের লেখা অন্যান্য গানের মধ্যে -’যৌবন তরঙ্গে দেয় দোল’,’জীবনের এই যে মধুর ভালবাসার দিনগুলি’,’জনশক্তির প্রাণবন্যায় নব যৌবন ওরে জাগলো’,’ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে শিয়রে’,’দূরের পাহাড় যেন কত শান্ত ছেলের মতো’,’সাড়ে সাত কোটি মানুষের আজ একটি নাম মুজিবর’ -এইরকম প্রচুর গানের কথা উল্লেখ করা যায়। সহজ, প্রাণবন্ত অথচ পরিশীলিত আবেগময় ভাষা – আমাদের চারপাশের চেনা ছন্দের ভিতরে দৃশ্যমান যা যা- সেসবই অতি বাগাড়ম্বর, ক্লান্তিকর নাটকীয়তা, বাহুল্যবর্জিত হয়ে রূপক রূপকথার মিশেলে ফুটে উঠতো দারুণ শব্দবন্ধে- বাস্তবতাও ছিল- তবে কখনো তা গানের কাব্যিক ভাবকে লঘু করে দেয়নি, হারিয়ে যেতে দেয়নি বিষয়বস্তুর প্রাকৃতিক নিজস্বতাকে। এখানেই শ্যামল গুপ্তের গীতিকার হিসাবে আসল কৃতিত্ব।
সারাজীবনের গান লেখার সৃষ্টিকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং বাংলা সঙ্গীতে ওঁর এই অবদানের জন্য ১৯৭১ সালে ‘জয়জয়ন্তী’ সিনেমার জন্য বিএফজে পুরস্কার এবং ১৯৭৬ সালে ‘হারমোনিয়াম’ চলচ্চিত্রে গান লেখার জন্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কার লাভ করেন।
শ্যামল গুপ্ত দীর্ঘায়ু ছিলেন। কাজের ফলাফল নিয়ে কোনোরূপ প্রত্যাশা তিনি রাখতেন না। মনের আনন্দে নিজেকে লেখায় নিয়োজিত রাখতেন। আশি বছর বয়সেও গান লিখেছেন। প্রথম দিকে প্রচুর ধূমপান করলেও পরে এসে ছেড়ে দিয়েছিলেন। খাদ্যরসিক মানুষ ছিলেন।
২০১০ সালে ২৮শে জুলাই সাতাশি বছর বয়সে ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কার্যত সঙ্গীহীন -একা হয়ে পড়েন। তবে এরপরও উনি বারো বছর জীবিত ছিলেন। ২০১১ সালে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান দেওয়া হয়।
২০২২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি নব্বই বছর বয়সে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় এক অনুপম গীতিকার-কণ্ঠশিল্পী জুড়ির এক স্মরণীয় অধ্যায়।
মানুষ চলে যাওয়া মানেই তার সব শেষ হয়ে যায় না। কর্মকাণ্ড, কিছু শিক্ষা, নীতিবোধ- আদর্শ রয়ে যায় আগামী পৃথিবীর জন্য, মানুষের জন্য, শিখবার জন্য- এমনকি ভুল করেও তার সংশোধনের জন্য।
শ্যামল গুপ্ত তাই আজও তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যেই রয়ে গেছেন।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শ্যামল গুপ্তের কথায় একটি গানের কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে-‘যদি সত্যিই আমি গান ভালোবেসে থাকি/পৃথিবী তোমায় যাই জানিয়ে আমার গানে আমি থাকবো বেঁচে মরণকে হার মানিয়ে।’
পরিশেষে এটাই বলতে হয়, উনি মরণকে হার মানাতে পেরেছেন কিনা জানিনা, তবে মানুষ হিসেবে স্রষ্টা হিসাবে তিনি যে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে -এতে কোনো দ্বিধার অবকাশ থাকতে পারে না। সাফল্য কী ব্যর্থতা -দুই ক্ষেত্রেই নিষ্প্রভ থেকে কাজ করে যাওয়াটা সবার দ্বারা হয় না। শ্যামল গুপ্ত পেরেছিলেন।
এই স্মরণীয় গীতিকারকে অন্তরের প্রণাম। শেষ লাইনে তাঁর কথা দিয়েই গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করলাম- ‘এ পথ ফুরাবে কোন প্রান্তে!’
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
