কুন্তল দাশগুপ্ত

পঞ্চম পর্ব

৬. আয় রে তবে ভুলের ভবে…

তুমুল শ্রাবণ। চারদিকে সবুজ ঝামরে উঠেছে। ডিভিসি জল না ছাড়লেই হল। বাঁধ না ভাঙে। বাঁধের আড়ালে লুকিয়ে বেড়াই সাগর যেন না টানে। অতলে তলিয়ে না যাবার চেষ্টায় একটার পর একটা ঢেউ ভেঙ্গে মাথা উঁচু রাখা কতো যে কঠিন! ছায়াবৃত্ত অতি ধীরে এগিয়ে আসছে। সূর্য থেকে মুখ ফেরাচ্ছে পূর্ব গোলার্ধ। বহু পথ পার হয়ে দিঠির খুশিয়া নিয়ে মেহলী আকাশ জুড়ে এসেছ। ভুল। এই ভুলগুলো বেঁচে থাক। অথই দুঃখ-সাগরে সাঁতরাতে  সাঁতরাতে মানুষ নয় ভুলেই বাঁচুক। লাল মেঘ সাঁতরায়ে আসিতেছে ফিরে…  নাঃ আপাতত  আকাশে কোনও ধবল বক নেই তবে মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে… কে যে কাকে বসিয়ে রাখে একা দ্বারের পাশে। একা… সাহিত্য সম্রাট বলেছেন  “কেহ একা থাকিও না”। ভুল তো। বিপুলা এ ধরণীতে কেই বা দোকা? একা এসেছিস ভবে একাই তোকে যেতে হবে নারী বাড়ি টাকাকড়ি সঙ্গে তো যাবে না।

তবু সবাই সঙ্গী খোঁজে। কেন?  ভাব বিনিময়য়? আড়ি বিনিময় নয়? আরেঃ জম্পেশ  শত্তুর জীবনে না থাকলে যাপনটাই আলুনি।  অজাত-শত্রু ধারণাটাই ভুল।  ভুল করা সকলের বার্থ -রাইট। ভুল করলে তবে না শিখবে। শেখাবে কে? শিক্ষক। ভুল। পৃথিবীতে শিক্ষক বলে কেউ কোনদিন ছিল না, নেই, আর আসবেও না। মানুষ শেখে নিজে নিজে। যারা শিক্ষক বলে পরিচিত তারা আসলে পরামর্শ বিক্রেতা। শিক্ষা নাকি দানের জিনিষ? ফুঃ। মাইনে না পেলে কটা মাস্টার পড়াত তা জানা আছে। তবে হ্যাঁ, সে সব ছিল এককালে। বাঘেরহাটে , হেড স্যার অনঙ্গবিহারী  চট্টরাজ। জমিদারের করুণা আর ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের খামখেয়ালের ওপর চূড়ান্ত অভরসায় চলত তাঁর একলার সংসার। গরীব ছিলেন কিন্তু পাঠদানে দানবীর। ভুল ছিলেন স্যার … শুনতে পাচ্ছেন… আপনি ভুল ছিলেন, নইলে আপনার মৃত্যুর পর ঘাট খরচা যোগার করতে, শ্রাদ্ধ করতে ভিক্ষের দরকার পড়ল কেন? এত সিনিয়র দাদারা থাকতে একটা ক্লাস এইটের বাচ্চাকে আপনার মুখাগ্নি করতে হল কেন?  আপনার বইপত্র অধিকার করে নিতে যেদিন স্কুলের লাইব্রেরিয়ান এলো সে আপনার ডায়রিগুলো পায়নি। চুরি গিয়েছিল। চোর কে আপনি জানেন?

জানেন!…জানি, জানেন আর চোরের দণ্ড বিধানও করেছেন। স্বাধীন ভারতের মাটি পায়নি আপনার স্বপ্নের ইতিবৃত্ত। চোরটা পেয়ে হারানোর প্রথম শোকটাকেই শেষ ভেবেছিল। ভুল ভেবেছিল… ভুল ভাবনার মাশুল মানুষকে সারা জীবন গুনে যেতে হয়। … এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার সাজি নতুন মেঘের লালিমার দিকে চেয়ে রহিয়া রহিয়া নহে ঝরঝর করি তুমুল বৃষ্টি যাইতেছে শুধু ঝরি। মেঘ-মুলুক থেকে যতই চোখ রাঙাও ঠাকুরমশাই ভুল গাওয়া ইজ আওয়ার বার্থ রাইট। এই একার বৃষ্টি এত কথা বলে! কথাগুলো একটা আরেকটার ওপর অভারল্যাপ করতে থাকে। শেষতক কী হল? না গান দাঁড়াল। যে গানের সুরই ধরা দিক না কেন গলা ছেড়ে গেয়ে নিলেই হল। বাণীর তোয়াক্কা করে কোন আহাম্মক ? এবার এসেছে শ্রাবণ আকাশ ছেয়ে আসে মৃত্তিকা সুবাস বাতাস বেয়ে… হে-হে ঠাকুরমশাই বৃষ্টির সুবাস পাচ্ছিলে লেখার সময়? হয়? বাপু হে যেটা পাচ্ছিলে সেটা ভেজা মাটির গন্ধ। তুমি ঠাকুর কাব্যের দোহাই দিয়ে বাস্তবতার তোয়াক্কা করনি। ওই যে গানটা ভেঙে মোর ঘরের চাবি… হি-হি-হি ও ঠাকুর চাবি যদি ভেঙে ফেলি তবে তালা খুলব কি করে সেটা তোমার মাথায় আসেনি বোলো না, পেত্যয় যাবে না। আসলে যাবির সাথে রাইমের ঝোঁক, ব্যাস হয়ে গেল রাইমের ফান্দে পড়ে বগার মত কাঁদছ আজও, কাঁদবে আগামীতেও।

নাঃ বৃষ্টিটা ধরছে না তো। আঁধার ঘনাচ্ছে। একটু পরেই বর্ষানন্দে মাতোয়ারা সবুজের মহিমা কালো ঘোমটায় মুখ ঢাকবে। চোখাচোখি হবে না। ধুৎ, তারচে সাইকেলটা সিঁড়ির নীচে রেখে হাঁটা লাগাই, তুমুল ভেজাও হবে আর সবুজ মাখাও হবে। হুঁ হুঁ মোর কোন ইন্দ্রধনুউউউউ কার হুঁ হুঁ  হুঁহুঁতে চায় হৃদয় হারাতে চায়। এবেরে গেটে তালা দিয়ে চাবি দিতে যেতে যেতে একলা পথে পাব সবুজ সাথি ঘোর লেগেছে ওরে আমার ঘোর চায় না ছাতি… আহ… কে যে বৃষ্টিকে চপলা চঞ্চলা মেয়ে রূপে দেখেছে এ তো শালা প্রবল পুরুষ যেন বর্শাধারী শিকারী বন্য মহিষ বা বরাহ কিংবা গণ্ডার শিকারে দৌড়ে চলেছে… স্কুলের পেছনের বরজটায়  কাজের ধুম লেগেছে পিনুর। বরজের মাথার ছাউনি হালকা করছে ওরা। ভিজে ঝুপ্পুস তিনজনে। পিনুর বউ ছাউনি হালকা করছে বাইরে থেকে… ওর শঙ্খের মতো স্তন মথিত করছে  বৃষ্টিপুরুষ। শিহরিত হচ্ছে মেয়ে। ওর বৃন্ত যুগল প্রখর। এতটা দূর থেকেই স্পষ্ট। পিনু আর তার শাগরেদ ভোলা ভিতরে জল নিকাশি পোক্ত করছে। থাক ওরা ওদের মতো।

আহ…  বেড়াচিতাগুলো  চেতিয়ে উঠেছে… একটু হ্যান্ডসেক হয়ে যাক… তোমরা বুঝি শক্তি সঞ্চয় করে রাখছ বসন্তে ফুল ফোটাবে বলে? ও বাবা আবার গা দুলিয়ে হাসি হচ্ছে! বেশরম কাঁহিকা। হুঁ কদমের গন্ধ… তাহার ছাদে যখন ওঠে তারা  আমার মনে পুবাল হাওয়া ছোটে তাহার হৃদে ঝরে শ্রাবণধারা এবং তাহে  কদম ফুটে ওঠে… আরেঃ এটা কীসের ঝাড়? একটা থোপায় দুই রঙের ফুল! কিন্তু তোরা ভারী বজ্জাত… লাল-হলুদই পছন্দ করলি?  কী বলছিস? সবুজ ফুল দেখেছি কিনা?  দেখেছি কী রে, রীতিমতো চাষ করেছি। আমাদের বাঘেরহাট স্কুলের বাগানে ফুলিয়েছিলাম সবুজ ক্রিসেন্থিমাম। বর্ষার ফুল। এত হাসাহাসি কেন?  ও ফুলিয়েছিলাম বলেছি বলে? বেশ বাবা ফুটিয়েছিলাম… হয়েছে তো?  ওহে দীর্ঘ  শিরঃ তৃণ দল তোমরা যে সকঞ্চি মার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছ হে। যাই কী করে? শালা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় সাধে বলেছে! হামাগুড়ি দেওয়াবি নাকি তোরা? এই দ্যাখ ধুতির কামাল… অ্যায়  ডান-বাম কোমরে গুঁজে দিলুম… হুঁহুঁ কেমন মিনি স্কার্ট! এইবার কী আটকাতে পারবি?  চারিদিকে সুধাভরা ব্যাকুল শ্যামল ধরা কাঁদায় রে অনুরাগে প্রভু তোমা লাগি… অ্যাঃ পেইরে এইচি… হিহি  গেরামের ভাষা… থাউক গা, ধুতি নাবায়ে আর কাম নাই। যাই গা চাবি দিয়া আসি। টুক কইরা কুলুঙ্গিতে গোছাখান রাইখ্যা হেরপর বাঁধের রাস্তা ধইরা…

অরে তোগো সোন্দা সোটে দ্যাখবি যদি আয়…  হাইরে… হেইডা কেডা, গাল ফোলায়ে অ্যাক্কেরে উঁ…  মত্ত দাদুরী! বুজঝি বুজঝি, অ্যাক্কেরে ফাটি যাওত ছাতিয়া।  ডাকো বাছা ডাকো। এ ভরা শ্রাবণ মাহ শ্রাবণ শূন্য মন্দির তোর… শরীর শরীর তোমার মন নাই ব্যাঙ? মন না মিললে কী শরীর মেলে?  মেলে বাবা মেলে। নইলে মা  দুগগার মাটি মিলত না। ফুঃ। যত সব বাখোয়াজ। কামেতে ভুবন ভরিছে দপ দপ করি রক্ত-আলোক সব বেপাড়ায় জ্বলিছে… ওরাই রাতে ভ্রমর হয়ে নিশি পদ্মের মধু যে খায়। সব জানি হে। মানুষ মাত্রেই মাপনদার। মানুষের চোখে হুল, জিভ, এমনকি আঙুলও… এ এ এ ই দেখেছ  এত লাফালাফি কেন রে? নিশ্চয়ই এটা মাদী ব্যাঙ… অভিসারে চলেছে… এখুনি তো ভবলীলা সাঙ্গ হোতো রে মেয়ে। যা যা ডাক এসেছে তোর। ডাকঘরে তোর রাজার চিঠি ধূলায় হচ্ছে ধূলি হারিয়ে না যায় গভীর প্রেমের আখর গুলি। অভিসার মানে যাওয়া, ততটা নয় যতটা যেতে চাওয়া… চির অভিসারী মানুষ চলেছে অনন্তের পথে… এই বরষা-দিন এই ভিজে হাওয়া  সেঁতিয়ে ফেলে কই জীবকুলকে? বরং সে কী গভীর বাণী আসে ঘন মেঘের আড়াল ধ’রে সারা শরীর আকুল ক’রে দিগন্তরের শরীর চাহে সে কী … আচ্ছা মেয়েরা কী লুঠ হতে চায়?  লৌকিক জীবনে বা ইতিহাসে তাকালে এমন উদাহরণ প্রচুর।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা বারো খণ্ড জুড়ে উত্যক্ত এমনকি ধর্ষিত হয়েও রাধা বিরহ পর্বে কৃষ্ণবিরহী হয় কীভাবে? সাহিত্য তো জীবন থেকেই নেওয়া। কী জানি, নারীর মন? দেবা ন জানন্তি কুতঃ মনুষ্যা। বুঝি এখানে খেলা চলিবে না, সাবধানে দূরে দাঁড়ানোই ভালো। যাক, সন্ধ্যে নামলেও সদরে তালা পড়েনি। চাবিটা বৈঠকখানায় টেবিলের ওপর চুপচাপ রেখে চলে যাই, ডাকব না কাউকে। এস্রাজ… মধুজা… দক্ষিণী তালিম… এই শ্রাবণ সন্ধ্যায় ছেড়ে যাওয়া…  শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে… কাকে চাও মধুজা এই বেহাগে এই সিক্ত সন্ধ্যায় কার সুর বাহারে মথিত হতে চাও… কার মধুজা তুমি কার… পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে …  এই গভীর আকুতি কি ভূতকালের প্রতি নাকি আগামীর প্রতি মধুজা?  এক কুয়াশা জমাট দ্বীপের উপকূলে তুমি এক অস্পষ্ট তনুরেখা অথচ মনে তুমি মারিয়ানা… দেখা যায়… ডোবা… নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে  শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে… আআআহ… মধুজা তুমি; তোমার গান বিঘন বর্ষায় তীব্র ছাতিম গন্ধ… অসময়ের… ভারী অসময়ের…  যা কিছু জীর্ণ আমার, শীর্ণ আমার জীবনহারা, তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে ভুখের ‘পরে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক… ও ঠাকুর তুমি কেন এ গান লিখলে… একলামিকে এই কামমোহিত শ্রাবণ সন্ধ্যায় কেন উন্মাদের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় মাখিয়ে দিচ্ছে মধুজা… অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে মন থেকে বনে… স্থির থাকা অসম্ভব… এই বৈঠকখানা বাতাস চাহিদা পূরণে অক্ষম… পদক্ষেপ যেন মাতাল, নিয়ন্ত্রণহীন… বৃষ্টি; আবার; আমার তৃষার ‘পরে আমার ভুখের ‘পরে ঝরে ঝরে ঝম্পি ঘন গর্জন্তি সন্ততি, ভুবন ভরি বরখন্তিয়া কান্ত পাহুন কাম দারুণ,সঘনে খর শর হন্তিয়া… বৃষ্টি মথিত বনজ কুসুম গন্ধ এ কী আনন্দ একী আনন্দ আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ আজি বিশ্ব মথিয়া উঠিছে জাগিয়া অচেতন থেকে চেতন ছুটি ঝড়ের সঙ্গে করতালি দিয়া পথ থেকে পথে উন্মাদ পথ হারানোর নেশাতুর  নিশি বৃষ্টি ঝরিয়ে আরো কাঁদ সে যে গান শুনিয়েছিল তাহার পরশ লেগে হৃদয়ের পদ্ম বনে শ্রাবণ ওঠে জেগে …

শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার খুলেছে ওই অনেক দূরে, বনের মাথায় মেঘ আকাশে ডমরু বাজে কী গম্ভীরে! কাজল মেঘের রহস্য ছায় যাবৎ জীবতনুর ‘পরে, ঝর ঝর ঝর বৃষ্টি পরে একলা আমার ভিতর ঘরে। অন্ধকারের ঘনিমাতে হারিয়ে গেছে সুপথ খোঁজা, উল্টো হাওয়ায় সেই বিরহীর অন্ধ বিমন যাচ্ছে বোঝা,  মরতে বসা নদীর বুকে ষাঁড়াষাঁড়ি বাণের ভুল; ভুলের ভবে অসম্ভবে ভাঙছে ভাঙছে নদীর কূল… ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা…  ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি নেমেছে অন্ধকার… এই অন্ধকারে জন্মের ক্রন্দন ওঠে…  আমাদের মৃত্যু আলোয় আলোময় আমার আঁধার ভালো … পৃথিবীর সব বীজ অঙ্কুরিত হোক মা-টির গর্ভে  এসো হে ধাত্রী খুলে ধরো গর্ভমন্দিরদ্বার ধারণ করো আগামীকে… বৃষ্টি ধুয়ে দিক সর্ব কলুষতা দুজনে চলো গাই আগামী-গান, বাতাসে কান পেতে শুনতে পাও নাকি প্রাচীন রাগে বাজে নতুন তান। আআআআআহ … উমমমম্ম… হা আআআআআআ… 

  #

কালিন্দী যখন দোর খুলে বাইরে এলো তখন রাত ঘন হয়েছে। বৃষ্টি থেমেছে। আকাশ নিকষ অন্ধকার। ওই অন্ধকার উঠোনে কেটে রাখা তাল-গুঁড়ির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা বীর্যে-বৃষ্টিতে মাখামাখি সুকান্তিকে যখন কালিন্দী পাঁজাকোলা করে ঘরে তুলে আনল তখন তার ধুম জ্বর।   

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *