অমিতাভ সরকার

‘আয়ি যো উনকি ইয়াদ’-

সি এইচ আত্মা

শুধু একটা গান। আপনাকে যদি শুধু একটা গান দিয়েই কণ্ঠশিল্পীকে চিনতে বলা হয়  (পুরুষ, নারী বা যে কোনো লিঙ্গবিশেষেই বলা, শিল্পীর তো কোনো জাত, লিঙ্গ ধর্ম থাকা উচিত না), পারবেন?

এমন গান- যে তার মধ্যেই শিল্পীর আসল পরিচয় দেওয়া হয়ে যাবে, অতিরিক্ত আর কিছুই বলতে লাগবে না। যে সমস্ত গান তাঁদেরকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে, সেইরকম কোন কোন গান কোন শিল্পীর জন্য বাছবেন? সায়গলের ‘জব দিল ভি টুট গায়া’, লতা মঙ্গেশকরের ‘লাগ যা গলে’, মুকেশের ‘ম্যায় পল দো পল কা শায়ের হু’…। সেরকমই একটি গান হলো ‘প্রীতম আনমিলো দুখিয়া জিয়া বুলায়ে’, যা প্রথম রেকর্ড হয়েছিল ১৯৪৫ সালে, তাও একটি প্রাইভেট অ্যালবামের গান হিসাবে। তবে শিল্পীর এটিই ছিল প্রথম আত্মপ্রকাশের রেকর্ড। 

গানটি সেসময়ে এত বিখ্যাত হয়েছিল, যে প্রেমে ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রেমলিপ্সু হৃদয়ের শ্রোতা সবার কাছেই জাতীয় সংগীতের মতন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সুরকার ও পি নাইয়ার এই গানটিকে ওঁর ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। 

১৯৫৫ সালে গুরু দত্ত প্রযোজিত  নির্মিত এই সিনেমায় গানটি উক্ত শিল্পী ছাড়াও গীতা দত্তের কণ্ঠে স্থান পায়। যাঁর কথা লিখছি, সেই বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এই গায়কটির নাম হলো চন্দন হাসমতরাই আত্মা(চয়নানি হসমতরাই আত্মা), যিনি ‘সি এইচ আত্মা’ নামেই বেশি পরিচিত।

মূলত গজল, গীত, ভজন, ফিল্মি, নন ফিল্ম বেসিক গানের শিল্পী হিসাবেই সি এইচ আত্মা নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। ওঁর রোমান্টিক সুরেলা কণ্ঠ, গায়কি, নিজস্ব স্টাইল অনুরাগীদের কাছে তখন একটা আলাদা মাত্রা লাভ করত। নির্দিষ্ট ধারার সীমিত সংখ্যক গান গেয়েও প্রশংসা, খ্যাতিতে সি এইচ আত্মা হয়ে উঠেছিলেন অদ্বিতীয়, অপ্রতিরোধ্য। 

তখন সময়টা ছিল কে এল সায়গলের। কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা এই গায়ক-অভিনেতার তখন প্রচুর ফ্যান-ফলোয়ার। জীবনের শুরুর দিকে লতা মঙ্গেশকর পর্যন্ত কুন্দনলাল সায়গলের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। কিশোরকুমারও নিজে স্বীকার করেছেন, সায়গলকে তিনি গুরু মানতেন এবং তাঁর প্রথম দিকের গানগুলিতে সায়গলের গায়কির প্রভাব যথেষ্ট মাত্রায় ছিল। সেই সময়টা সায়গলের ক্রেজ এতটাই ছিল, যে হাবিব ওয়ালি মহম্মদ, মাস্টার মদন, মুকেশের মতো একঝাঁক উদীয়মান কণ্ঠশিল্পীরা ওই কিংবদন্তী পাঞ্জাবী গায়ক-অভিনেতাকেই অনুকরণ করতো। সি এইচ আত্মাও এই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি (এমনকি ছোটোবেলাতেও বোনকে সায়গলের মতো গলা করে গেয়ে দেখাতেন।)। সি এইচ আত্মার মায়াবী মখমলি স্বরের নিটোল গায়কি সায়গলের অনুরূপ হলেও তাতে স্বকীয়তা বজায় ছিল। সায়গল ছিলেন ওঁর কাছে ঈশ্বরের মতো। সায়গলের শিল্পী-দর্শনকেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন তাঁর এই গুণমুগ্ধ শিষ্যটি। সায়গলের নির্দেশমতো পরবর্তীকালে যেখানে যত গানের প্রোগ্রাম করেছেন, সব অনুষ্ঠানেই সায়গলের ‘কোই মানুষ কিতনা ভি বুরা হো, কুছ হোতি হ্যায় ভালা ই ভি’ গানটি দিয়েই নিজের অনুষ্ঠান আরম্ভ করতেন।

সেই সময়ে তাঁর গান, বিশেষত লাইভ অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয় ছিল।

সেযুগের চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানে কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও সি এইচ আত্মা একটা সম্মানীয় স্থান লাভ করতেন। 

ওঁর প্রতিটি গানের মধ্যে একটা আন্তরিক অনুভব, গভীরতাময় আবেদন, দুঃখ-সুখের ঢেউ ঝরানো দরদভরা আবেগ -এমনভাবে মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠমাধুর্যে প্রকাশিত হতো, যেন মনে হতো, গান নয় কণ্ঠ দিয়ে উনি পুজো করছেন। স্তব বা মন্ত্রপাঠ করার মতো স্নিগ্ধ, শান্তিসুষমারসসিঞ্চিত  এই মরমি কণ্ঠ এমনভাবে সুরের মায়াজালে শ্রোতাদের বেঁধে রাখতো, যে অচিরেই তাঁরা শিল্পীর অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে সংপৃক্ত হয়ে পড়তেন। 

সি এইচ আত্মার জন্ম ১৯২৩ সালে সিন্দে এলাকায়, যা বর্তমানে পাকিস্থানের অন্তর্গত।  গানের প্রতি এতটাই টান ছিল, যে করাচি শহরে পড়াশোনার পর রেডিও অফিসারের কর্মজীবনও তাঁর ভালো লাগেনি। ১৯৪৫ সালে প্রথম রেকর্ড ‘প্রীতম আনমিলো’, (উল্টো পিঠে ছিল- কউন নগর মেরা’) বেরনোর পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যান। তবে আত্মার ক্যারিয়ার ছিল দশ বছরেরও কম সময় (মূলত চার থেকে পাঁচের দশককেই তাঁর ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ বলা যায়)। সিনেমায় প্লেব্যাকের ক্ষেত্রে ‘নাগিনা’ (১৯৫১) চলচ্চিত্রে শংকর-জয়কিশানের সুরে সি এইচ আত্মা প্রথম গান গেয়েছিলেন। সুরকার ও পি নাইয়ার ওঁর গুণগ্রাহী ছিলেন। ও পি তাঁর সুরকার হিসাবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘আসমান’(১৯৫২)-য়ে সি এইচ আত্মাকে প্লেব্যাক করান। এই সিনেমায় তাঁর একক কণ্ঠে ‘ইস বেওয়াফা জাহান মে ওয়াফা’, ’রাত সুহানি হাসতে তারে’, ’কুছ সমাজ নহি আয়ে মোহে ইস দুনিয়া কি বাত’ -ইত্যাদি গান খুব হিট করে (এই সিনেমায় গীতা দত্ত, রাজকুমারী গান গেয়েছিলেন। 

ও পি নাইয়ারের ক্যারিয়ার গড়ার পিছনে এবং শুরুর দিকের সাফল্যে সি এইচ আত্মার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে লতা মঙ্গেশকর এবং আত্মা দুজনেই সায়গলের ভক্ত হওয়ায় দুজনের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। এই সূত্র ধরেই সি এইচ আত্মা ‘আসমান’ চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকর এবং ওপি নাইয়ারকে একসঙ্গে কাজ করানোর চেষ্টা করিয়েছিলেন, যদিও সেটা সফল হয়নি। নাইয়ার  লতাজিকে দিয়ে তাঁর সুরে কোনোদিনই কোনো গান গাওয়াননি।)। সেইসময় গীতা দত্ত, সুরাইয়া, লতাজি, আশা ভোঁসলে, মান্না দে- সবাই ওঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। সুরকার অনিল বিশ্বাস, বিনোদ চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি সেযুগের বিখ্যাত সব সুরকাররা সি এইচ আত্মাকে দিয়ে গান গাইয়েছেন। মুরলি মনোহর স্বরূপের সুরে শওকত পরদেশীর রচনায় সি এইচ আত্মার গাওয়া গজল, ভজন (যেমন- ‘ঘনশ্যাম হৃদয় কে’, ‘মন মন কি গতি’) এখনও মননশীল শ্রোতাদের কাছে তেমনি মর্মস্পর্শী। সমসাময়িক শিল্পী এবং ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য  অনুযায়ী, সি এইচ আত্মা নিরহংকারী, দয়াশীল, পরোপকারী, নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মানুষের দোষগুণ নিয়ে কখনো ভাবিত হতেন না। নিজেও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। আধ্যাত্মিক ভাবনাও তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যেত। 

হিন্দি ছাড়াও সিন্ধি, গুজরাটি, বাংলা, উর্দু -অনেক ভাষাতেই তিনি কণ্ঠদান করেছিলেন। তবে বাংলা আর বাঙালির সঙ্গে সি এইচ আত্মার যোগসূত্র -‘না মিটিতে সাধ মোর এ জীবনে মোর মধুরাতি গেল ফুরায়ে'(কথা প্রণব রায়) এবং ‘আমি আজও আগেরই মতো স্মৃতি নিয়ে যাই নিরালায়’-(গীতিকার শ্যামল গুপ্তের লেখা) দুর্গা সেনের সুরারোপিত ১৯৫২ সালে বেরোনো এই দুটি গান দিয়েই। 

সি এইচ আত্মার অন্যান্য গানের মধ্যে ‘চলো না গোরি মচল মচল’ ‘হাজারো গম দিয়ে তুমনে’, ’এক পাল যো মিলা হ্যায় তুঝকো’, ‘ক্যাইসা প্যার কাহা কি’, ‘ন্যায়নো মে দো নয়ান’,’অ্যায় মেরে দিল’,’হাজারো খোয়াইশে’, ‘ম্যায় নেশে মে হুঁ’,’আয়ে দোস্ত মুঝে অব ইয়াদ না কর’, ‘রঁও ম্যায় সাগর কে কিনারে’, ‘ম্যায় ঘি কা দিয়া জ্বালায়ুঁ’, ‘ও মাঝি রে ও মাঝি’, ‘আপনা আপ পেহচান রে’ উল্লেখযোগ্য। 

গায়ক-নায়ক হিসাবে অভিনয়ও করেছেন ‘বিল্বমঙ্গল’(১৯৫৪), ‘ভাইসাহাব’(১৯৫৪) চলচ্চিত্রে। শেষবারের মতো ভি শান্তারামের ‘গীত গয়া পত্থর নে'(১৯৬৪) চলচ্চিত্রে তাঁকে অভিনয় করতে এবং ‘মাণ্ডভে তলে গরিব কে দো ফুল খিল রহে হ্যাঁয়’ গাইতে দেখা গেছিল। 

সি এইচ আত্মা ভারতের বাইরে বিদেশে সফররত প্রথম গায়ক ছিলেন। ১৯৫৭ সালে (পূর্ব আফ্রিকায়) কেনিয়ার নাইরোবিতে গান পরিবেশন এবং বিদেশ সফর করেছিলেন। তাঁর দলে গজল-ঈ-শাহেনশাহ তালাত মাহমুদও ছিলেন। তবে এসবের পরেও বলিউড সেভাবে কণ্ঠকে ব্যবহার করেনি। ব্যক্তিগত জীবনেও সুখী ছিলেন না।  

কণ্ঠের মধ্যে দিয়েই অন্তরের ‘পুকার’ বেরিয়ে আসতো তাঁর গানে। ‘জীবন এক অধুরা স্বপ্না’, ‘ক্যাহনে কো বহুত কুছ থা’,’ক্যাইসা প্যার কাঁহা কি মহব্বত’- সি এইচ আত্মার এইসব রেকর্ড শুনলে মনে হয়, গীতিকারেরা যেন তাঁর জন্যই গানগুলো লিখেছিলেন। 

১৯৭৫ সালে লন্ডনে গানের শো করতে গিয়ে তাঁর সেই যে শরীরখারাপ হয়, তারপর আর সুস্থ হননি৷ ইংল্যান্ড সফরের আট মাস পর ওই বছরই ৬ই ডিসেম্বরে সি এইচ আত্মার দুঃখের জীবনের নিষ্পত্তি ঘটে সুরলোকে পাড়ি জমিয়েই। মৃত্যুর সময় বয়স হয়েছিল মাত্র বাহান্ন বছর। কী অদ্ভুত সমাপতন! তাঁর গুরু সায়গলের মতোই বড্ড অকালে তাঁর চলে যাওয়া। বিখ্যাত গজল গায়ক প্র‍য়াত চন্দ্রু আত্মা ছিলেন তাঁর ভাই।

নতুন প্রজন্মের কাছে সি এইচ আত্মা একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। ভারতীয় সংগীতে তাঁর অবদান আজ আর কারোর মনে নেই। গুগল প্ল্যাটফর্মের সময়ে হাতের মুঠোয় ‘সব পাওয়ার দিনে’ এসেও তাঁর নামটাও অনেকে শোনেননি। তবুও তাঁর গান আজও তাঁকে মনে করায় –

‘আয়ি যো উনকি ইয়াদ’, ‘তুঝ বিন শুনি প্রেম ডগরিয়া আজা রে সনম’…। আসলে শিল্পীরা অন্যান্যদের থেকে একটু বেশিই সংবেদনশীল হন। অনেকেই সঠিক সময়ে মনের ভাব ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারেন না। যেজন্য অনেক কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, অসম্মান সহ্য করতে হয়। সি এইচ আত্মার সম্বন্ধে অনেকেই তেমন কিছু জানি না। গুগলের সব তথ্যের সত্যতা সম্বন্ধেও সন্দেহের অবকাশ রয়ে যায়। সার্চ বাটন তথ্য দিতে পারলেও শিল্পীর ভিতরের আসল কষ্টের হদিশ দিতে পারে না৷ তবুও চেষ্টা চলে। চলবেও। সময়ের গল্পকে ছাড়িয়ে সুরের টাইম মেশিনে সি এইচ আত্মা তাই তাঁর মায়াভরা কণ্ঠে সেইসব চিরনতুন গানের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন।

এই আখ্যান একজন উদাসী মানুষের -যিনি গানের জন্য ‘আত্মা’-র সবটা দিয়েছিলেন। প্রাপ্তির বিচার! সে তো… 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

তথ্যসূত্র: 

১. দে দিব্যেন্দু, স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্তরালে(১ ম খণ্ড), উত্তরণ পাবলিশার্স, বর্ণপরিচয় বিল্ডিং, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩

২. গুগল, ইউটিউব, সোস্যাল মিডিয়া, আর যা কিছু…

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *