পাঠক মিত্র
গান্ধীজী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্র
আজকের সময়ে ‘ক্ষমতা’ শব্দটি দুনিয়াজুড়ে নানাভাবে প্রকাশিত । তবে সবথেকে যে ক্ষমতা আজ সমাজের কোনায় কোনায় প্রভাবিত করে তা হল রাজনৈতিক ক্ষমতা । ‘পাওয়ার’ হল রাজনীতির বড় কথা । অথচ গান্ধীজীর কাছে এই রাজনৈতিক ক্ষমতা শেষ কথা নয় । তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা কোনও অন্তিম আদর্শ নয় । জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপন অবস্থার উন্নতিসাধনে জনগণকে সক্ষম করে তোলার এটি অন্যতম সাধন মাত্র । রাজনৈতিক ক্ষমতার অর্থ হল জাতীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জাতীয় জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করার যোগ্যতা অর্জন । সুতরাং সেখানে এক উন্নত ধরনের নৈরাজ্য বর্তমান । এইরকম রাষ্ট্রে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের শাসক । প্রত্যেকে নিজেকে এমনভাবে শাসন করে যে তার ফলে সে কখনও তার প্রতিবেশীর কাছে বাধাস্বরূপ হয়ে ওঠে না । সুতরাং আদর্শ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে কিছু নেই, কেন না সেখানে রাষ্ট্রই নেই ।’ রাষ্ট্র যদি না থাকে তাঁর ক্ষমতার কোনো প্রশ্নই নেই । সেখানে মানুষ নৈতিকতার জোরে হবে নিজে নিজের শাসক । কিন্তু রাষ্ট্র থাকলে গান্ধীজী মনে করতেন, রাষ্ট্র মানেই হিংস্রতা । সেখানে রাষ্ট্রের যত ক্ষমতা বাড়ে মানুষ ততটাই কুঁকড়ে যায় । ধনতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক সব দেশেই একই অবস্থা । গান্ধীজী আরো মনে করেন রাষ্ট্র হল একটা পীড়নমূলক যন্ত্র ।
রাজনৈতিক ক্ষমতা আর ভ্রষ্টাচারের ভয় সবসময় গান্ধীজীকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে । নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু একবার গান্ধীজীকে বলেছিল, করাপশন হল গান্ধীজীর অবসেশন । কিন্তু স্বাধীনতার পর গান্ধীজীর এই ঘোর এমনভাবে কেটেছিল যে তিনি মর্মাহত না হয়ে পারেননি । কারণ স্বাধীনতার পর ক্ষমতার লোভ গ্রাম গ্রামান্তরে এক কাড়াকাড়ির মড়ক লেগে গিয়েছিল । তাই তখন তিনি বলেছিলেন, Today everyday in the congress is running after power, that presages grave danger…It is my firm view that we should keep altogether aloof from power politics and its contagion. সত্যি গান্ধীজীর কথা অনুযায়ী power politics-এর এই সংক্রমণ আজও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি ।
শুধু তাই নয় । ক্ষমতার এই সংক্রমণে বাসা বাঁধে যখন হিংসা ক্রোধ তখন ক্ষমতা গান্ধীজীর কাছে এক রিপুর মতোই তা অশুদ্ধ । আবার এর উল্টোদিকে গান্ধীজী বলেছিলেন, human society is a ceaseless growth and unfoldment in terms of spirituality. আসলে ক্ষমতা যখন আত্মোৎসর্গ, আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধি তখন তা গান্ধীজীর কাছে মোক্ষ । রাজনীতি নিয়ে তিলকের এক কথার প্রেক্ষিতে গান্ধীজী বলেছিলেন, রাজনীতি তাঁর কাছে মোক্ষ, মোক্ষলাভের উপায় নয় । তাঁর কাছে ক্ষমতা হওয়া উচিত এক নৈতিক সত্যদ্রষ্টার আনন্দময় জীবন । এ কথা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে চলতে পারে না । কারণ ‘পাওয়ার’ না থাকলে রাষ্ট্রের পরিচয় থাকে না । কিন্তু গান্ধীজী এই রাষ্ট্র ও তার পাওয়ার বিনাশ করা একেবারে সম্ভব না হলে যতটা সম্ভব হ্রাস করার চেষ্টা করাই সকলের কাছে কাম্য বলে মনে করেছেন । তাই গান্ধীজী চেয়েছিলেন মানব চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন । যদিও এই পরিবর্তন নিয়ে গান্ধীজীর মনে সংশয় ছিলই । তবু তিনি পরিবর্তন আনতে বিশ্বাস করেছিলেন রাজনীতিকে স্পিরিচুলাইজ করতে । তাই গান্ধীজী রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর গুরুত্ব না দিয়ে, দিয়েছিলেন আত্মিক ক্ষমতার ওপর । এই আত্মিক ক্ষমতা দিয়ে গান্ধীজী দেখিয়েছিলেন সোশ্যাল ফোর্স কাকে বলে । তাঁর অসহযোগ আন্দোলনে মানুষ দেখিয়েছে আত্মোপলব্ধি কাকে বলে । সেই আত্মোপলব্ধি নিয়ে মানুষ হাসিমুখে ব্রিটিশের অত্যাচারকে সহ্য করেছে । সেই অত্যাচারে আত্মহুতি দিয়েছে মানুষ তবু হিংস্র হয়ে ওঠে নি । দেশজুড়ে মানুষকে তাঁর আত্মোপলব্ধি নিয়ে বীর করে তুলেছিল ।
গান্ধীজীর ডাকে সারা দেশ অসহযোগ আন্দোলনে স্বতস্ফূর্ত যোগদান করেছিল । কারণ তিনি দেখেছিলেন, the truth is that power resides in the people. মানুষের মধ্যে সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন গান্ধীজী । এ দেশের মানুষের এই শক্তি হারিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন যে এ দেশের মানুষ শুধু প্রাচীনকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিল । তাই তিনি বলেছিলেন, It is good to swim in the waters of tradition, but sink in them is suicide..no moral progress or reform is possible if one is not prepared to get out of the rut of orthodox tradition. By allowing ourselves to be cribbed by cast-iron of social conventions we are lost. আর সে জন্যই তিনি বলেছিলেন যে ব্রিটিশরা জোর করে আমাদের পরাধীন করতে চেয়েছিল বলেই আমরা পরাধীন ছিলাম না । আমরা পরাধীন থাকতে চেয়েছিলাম বলেই আমরা পরাধীন হলাম ।
এ সম্পর্কে ক্লাইভের কথা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে । ক্লাইভের কথায়–‘পলাশী যুদ্ধ জয়ের পর আমরা যখন মুর্শিদাবাদের রাজপথ দিয়ে যাচ্ছি, আমাদের অভ্যর্থনা করতে রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ । তারা যদি ইচ্ছে করত সে দিন ঢিল আর লাঠি দিয়ে আমাদের তাড়িয়ে দিতে পারতো । তা তারা দেয় নি ।’ তখন মানুষের ভিতরের সেই শক্তি না জেগে ওঠার কারণ গান্ধীজী দেখিয়েছেন । তবে মানুষের ভিতরের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুললেন গান্ধীজী পলাশী যুদ্ধের একশো আশি বছর পর । তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন রাজনীতি ও অধ্যাত্মবাদ স্বতন্ত্র নয় । তাঁর কাছে রাজনীতি ও তার ক্রিয়াকাণ্ড হল মূলতঃ পরিশীলিত অধ্যাত্মবাদ । তাঁর কাছে রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড ও মোক্ষ এক ও অভিন্ন । প্রচলিত অর্থে ধর্ম,মোক্ষ ও নীতি বলতে যা বোঝায় রাজনৈতিক নেতা গান্ধীজীর কাছে একেবারে তা নয় । তিনি যা চেয়েছেন তা হল মানুষ তার প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার সাহস নিজের কাছেই যেন দেখাতে পারে । তখন গান্ধীজী বলেছেন, ‘বিবেকের অনুশাসনের বলে মানুষ নিজেকে পাশবিক সত্তার বহু ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে ।’ কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায় তা সবসময় যে হয়ে ওঠে না । কারণ ‘পাওয়ার’ আর নীতিহীনতা একসাথে হাত ধরাধরি করে চলে । তাই ক্ষমতায় থাকা মানুষরা জানতেই পারে না কখন সে নীতিহীন হচ্ছে । এটাই তাঁর অধিকার বলে সে মনে করে । তাই গান্ধীজী মনে করেন মানব চরিত্রের পুনর্গঠন না হলে, ‘পাওয়ার’ সব জায়গাতেই সে সামাজিক, রাজনৈতিক যেখানেই হোক তা একটা সমস্যা । এই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে আজ । আজ রাজনৈতিক ক্ষমতায় কেউ ত্যাগের জন্য আসে না । তাঁরা ক্ষমতা ভোগ করতেই আসেন । কিন্তু গান্ধীজীকে সেই ক্ষমতা গ্রাস করতে পারে নি । গান্ধীজির এক জীবনীকার লুই ফিসার বলেছেন, ‘গান্ধীজী যখন ক্ষমতার তুঙ্গে তখন তিনি প্রতিপক্ষকে ইচ্ছা করলে গুঁড়িয়ে দিতে পারতেন । কিন্তু তা তিনি কখনো করেননি । ক্ষমতার কাছাকাছি এলে তিনি সংকোচ বোধ করতেন । গান্ধীজী কখনো কংগ্রেসের সভাপতি হন নি । এমনকি এক সময় কংগ্রেস থেকে পদত্যাগও করেন । ক্ষমতা তিনি ভোগ করেন নি । চেয়েছিলেন ভালোবাসা । পেয়েছিলেন আনুগত্য …। আনুগত্য ক্ষমতা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতালিপ্সুর কাছে ।’
ক্ষমতা একপ্রকার মানবিক দুর্বলতা যা গান্ধীজী বুঝেছিলেন যেখানে নৈরাজ্যবাদীদের প্রভাব । আর বুঝেছিলেন ক্ষমতার ও পতনের একই উৎস তা হল অহংবোধ । তাই গান্ধীজী নিজেকে অহংশূন্য করতে চেয়েছিলেন । গান্ধীজীর মতে ক্ষমতার প্রয়োজন সাময়িক এবং তার মূল কথা রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, আত্মশুদ্ধি ও মানবচরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন । এই পরিবর্তন হয়তো এখন আর সময়কে বদলাতে পারবে বলে মনে হয় না কারণ বর্তমান রাজনৈতিক পরিক্রমা তা বলছে না ।
ক্ষমতা রাজনীতির সম্পর্কে গান্ধীজীর রাজনৈতিক দর্শনে লেখক রাম বসু অত্যন্ত দূরদৃষ্টি দিয়ে পরিক্রমা করেছেন । শ্রী বসু তাঁর সেই পরিক্রমা অত্যন্ত যুক্তি দিয়ে উপস্থাপনা করেছেন এবং গান্ধীজীর দষ্টিকে নিবন্ধিত করেছেন । ক্ষমতাতন্ত্রের নতুন ভাষ্যে দেখিয়েছেন গান্ধীজীর আধুনিক দৃষ্টি যা চলমান ক্ষমতা রাজনীতিতে বিবেচিত হতে পারা একেবারে সম্ভাব্যহীন । তবে গান্ধীজীর নতুন এই দৃষ্টি শ্রী বসুর কলমে এক নতুন ভাবনা দিতে পারে মাত্র ।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
গান্ধীজীর দৃষ্টিতে আধুনিকতা ও ক্ষমতাতন্ত্র
– রাম বসু
অন্যতর পাঠ ও চর্চা, কলকাতা-৪৭
![]()
