সুতপন চট্টোপাধ্যায়

    বেগম

পুর্ব দিল্লির জসোলায় একটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটুটে মারকেটিং ম্যানেজমেন্টের প্রথম দিনের ক্লাসে  চোখে পড়েছিল বেগমকে। নিজের পরিচয় দেবার সময় সে বলেছিল, পুর্ব আফ্রিকার কেনিয়া থেকে এসেছে সে। কেনিয়ার রাজধানীর একটি এজেন্সির মাধ্যমে এখানে ভর্তি হয়েছে। সেই দেশের কোটায়। সেই দেশের স্কুল লিভিং স্তরে সে প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ণ। 

এম বি এ পড়তে এখানে এসেছো কেন? আমার এই প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর দিয়েছিল বেগম।

বলেছিল, আমি এই শিক্ষা নিজের দেশে প্রয়োগ করতে চাই। দেশে ফিরে যাব। অন্য দেশে যাবার মত রেস্তো তার পরিবারের ছিল না। তাই ভারতে। এখানের শিক্ষার উপর তার অগাধ বিশ্বাস।

তার উত্তর থেকে শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে একটি ব্যাপার খুব পরিস্কার হয়েছিল, মেয়েটি  অন্তর থেকে খুব গোছানো, ভাবনায় পরিচ্ছন্নতার ছাপ, শব্দ প্রয়োগের চাতুর্য লক্ষ্য করার মতো।

সবশেষে আমার পরিচয়ের পর্বের পর সে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিল, স্যার আপনি কখনও আমাদের দেশে গেছেন?  

আমি বলেছিলাম, না। বেগম সে দিনই আমন্ত্রণ করে বলেছিল, একবার আসবেন আমাদের দেশে। খুব ভালো লাগবে। দিল্লীর মত এমন গা জ্বালানি গরম নেই। কাঠ ফাটা রোদ নেই, লু বয় না। সারা ক্লাসের মতোই আমিও অবাক হয়েছিলাম। আফ্রিকা অথচ গরম নেই? মেয়েটা কি বানিয়ে নিজের দেশের গুণগান করছে? 

যদিও দিল্লিতে তখন ভরা গ্রীষ্ম। একটি ছেলে উত্তর দিয়েছিল, অপেক্ষা কর শীত এলে বুঝতে পারবে এই শহরটা আসলে কী? 

বেগম কালো, প্রায় সারে পাঁচ ফুট লম্বা, কোমড় ছাপানো চুল, তীক্ষ্ণ দু’চোখের দৃষ্টির আড়ালে অনুসন্ধানের পরিচয় প্রকট হতে আরম্ভ হল। সঙ্গে নেতৃত্ব দেবার একটি প্রবনতা চোখে পড়ল। এই বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য এই বিশেষ গুণ খুব জরুরি আমি বার বার আমার ক্লাসে উল্লেখ করি। 

আমি একদিন প্রশ্ন করি, আচ্ছা বিপণন বা মার্কেটিং কেন শিখতে চাও?

বেগম উত্তর দিয়েছিল, আমার পরিবার মধ্যবিত্ত, চা বাগানে কাজ করে, তাদের রোজগার তেমন কিছু নয়। আমি লোন নিয়ে পড়তে এসেছি। আমাদের দেশে অনেক কোম্পানী যা বিক্রি করতে চায় তাই বিক্রি  করে। আমি সেই অভিমুখ বদলে আমাদের দেশের মানুষ কি ভালোবাসে, কি চায় সেই ব্যাপারে কাজ করতে চাই। আমি আমার দেশের মানুষের চাহিদা জানি। কিন্তু সেটা মেটে না। 

আমি কিচুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি বেগমের দিকে। বেগম আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, স্যার, আমি কী ভুল বললাম? 

আমার মুখ থেকে বেড়িয়ে এসেছিল, ভুল নয়, একেবারেই নয়। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?

বেগম সরল উক্তি করেছিল, আমি আমদের দেশের ইতিহাস পড়েছি। খুউব মন দিয়ে পড়েছি। বলে থেমে গেল সে। 

এর পর আর কোন প্রশ্ন থাকে না। দেশকে চিনতে গেলে দেশের ইতিহাস, ভূগোল ও মানুষ চিনতে হয়। তবেই তাদের চাহিদার হদিস মেলে। সে যে কেন মার্কেটিং পড়তে এসেছে সে ব্যাপারে আমার আর কোন সন্দেহ ছিল না। 

২

শিক্ষা শেষ হলে দেশে ফিরে গিয়ে ছিল বেগম। যাবার আগে আর একবার আমাকে তাদের দেশ দেখতে আমন্ত্রণ করেছিল। দু বছর পর আমার ছাত্র ছাত্রীরা ছিটকে পড়েছে দেশে বা বিদেশে। যেমন হয়। তাদের শূন্য স্থান ভর্তি করেছে অন্য দল। এভাবেই পেশাদার ইস্কুল চলে। আমি এক সময় চাকরির চাপে পছন্দের পার্ট  টাইম শিক্ষকতা ছেড়ে দিই। আমদানী ও রপ্তানী বিষয়ে শিক্ষাগত মান উন্নত করে মার্কেটিং ছেড়ে জীবনের পথটা চুপিসারে  বদলে নিই। ফলে দেশের চেয়ে দেশের বাইরে যাতায়াত বেড়ে যায়। বাজারে আমার চাহিদাও বেড়ে যায়। কারণ একটাই। মুক্ত বাজারে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে আমার মত টাট্টু ঘোড়া সবার দরকার। আমি তখন দু বছর এক কোম্পানিতে  থাকার পরেই ব্যাঙ্গালোরে ঝাঁপ দিই। পরের বার মুম্বাই বা আমেদাবাদে। হপ্পিং-ফ্লাইট জীবন। 

একবার কাতার যাচ্ছি। বিমানে দুবাই থেকে এক সম্ভ্রান্ত মহিলা উঠলেন। তার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন চেনে চেনা মনে হল। মুখটা চেনা কিন্তু আমার স্মৃতিতে যে মুখটি জেগে আছে সে এই মহিলা নন। কিছু একটা মিল আছে কিন্তু আগ বাড়িয়ে আলাপ করা বাতুলতা। আমার রোয়ের পাশ দিয়ে তার একবার পিছনের সিটের দিকে এগিয়ে যাওয়া আমি লক্ষ করেছি, কথা বলার সুয়োগ নেই। কাতার এয়ার লাইন্স খুব উন্নত পরিষেবার জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। সেখানে আমার কোন রকম বাচালতা প্রথা বিরুদ্ধ। তাই চেষ্ঠা করি নি। কাতারে নেমে তাকে আর দেখতে পাইনি। এমন কতও কি না হয় পৃথিবীতে। আর বেগম যদি হয়ও তবে আমাকে মনে  আছে কিনা কে জানে? ফলে ভুলেই গেলাম কাজের তাড়নায়।  

 মিটিং ছিল কাতারের এক কোম্পানীর মালিকদের সঙ্গে। ভারত থেকে তারা আমদানী করতে চায় আমাদের তৈরী একটি বিশেষ দ্রব্য যা অন্য দেশ থেকে আমদানী করলে অনেক খরচা পরে। তাই তাদের সঙ্গে দেখা করার কথা, দাম দস্তুর করা, বিনিময় মুল্য পাঠানর পদ্ধতি যাকে লেটার অফ ক্রেডিট নামে কুলীন করে রেখেছে সারা বিশ্ব, সেটা ঠিক করে অর্ডার পকেটে পুরে ফেরা। এই আমার যাত্রাপথ। কী কারণে সেই রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়াল একটি মধ্য বয়সী তরুণী। মরিয়াম। নামটি শুনে আমি গোপনে গুগুল করে দেখলাম “মরিয়াম” নামের মানে শুদ্ধতা। তাকে ডেকে নিলেন কোম্পানীর মালিক। বললেন, আপনাকে আমাদের মার্কেটিং হেডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আমাদের কথার মধ্যে ওনার ইনপুট অনেক কাজে লাগবে। কেন জানি বিমানে সেই মহিলার কথা মনে হল। কিন্তু না সে তো মধ্য বয়সী ছিলেন! আলোচনার দিন ঠিক হল পরের দিন। আমি মরিয়ামকে দেখে অবাক। কেতাদুরস্ত, সাহেবী পোষাকে সুগন্ধ পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে আমার সামনে বসল মধ্য প্রাচ্যের এক মুসলিম তরচাজা আধুনিক মহিলা। মরিয়াম আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট করেছে। বিজনেস কার্ডে জ্বলজ্বল করছে তার উল্লেখ।

অনেক প্রশ্নে মরিয়াম রাজি হল, অনেক শর্ত মানল না। আমাদের দাম নিয়ে সে দর কষাকষি করল অনেক ক্ষণ। তারপর সে এমন একটি দাম দিল যা আমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। চেয়ারম্যানকে ফোন করলাম রাতে।  রাজি হলেন কিন্তু তারও কিছু শর্ত দিলেন। সেটা মরিয়াম না মানলে আমার ফিরে আসার কথা। পরের দিন মিটিং এ মরিয়াম মালিকদের সঙ্গে এল। আমার চেয়ারম্যানের শর্ত ওরা মানল। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হল। তিন দিন পর আমি কাতার ছাড়লাম। সেদিন মরিয়ামকে মনে হয়ে ছিল এক তেজী ছুটন্ত ঘোড়া।

৩  

ফ্যামিলি নিয়ে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করছি, এমন এক দিনে চেয়ারম্যান ডেকে পাঠালেন। কেনিয়ার একটি কোম্পানী আমাদের সঙ্গে আমদানী চুক্তি করতে ইচ্ছুক। আমাকে কিছুদিনের মধ্যে কেনিয়া যেতে হবে। তিনি আরো বললেন, তিনি খবরটি  পেয়েছেন কাতারের কোম্পানীর মালিকের থেকে। ওদের সঙ্গেও কাতারের কোন ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। সেই সুত্রে।

মোম্বাসা সমুদ্রবন্দর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে এই কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়। নাইরোবি বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে মোম্বাসা অনেকক্ষণ। সেদিন বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন মিটিং। ভারতের গুজরাত প্রদেশ থেকে বহুকাল আগে, ব্রিটিশ রাজত্বে একদল মানুষকে কচ্ছ অঞ্চল থেকে পাঠানো হয়ে ছিল কেনিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া রেল লাইনের শ্রমিক হিসেবে। তাদেরই দুই পরবর্তী প্রজন্ম এই বিশাল কোম্পানির মালিক। সময় মানুষকে দরিদ্র থেকে কত বিত্তবান করে, না দেখলে আন্দাজ করা মুশকিল। 

বোর্ড রুমে মিটিং। দুই ভাই। রমেশ প্যাটেল ও রাজীব প্যাটেল আমার উল্টো দিকে বসে। প্রথমেই আলাপ পরিচয়ের পর রমেশ বললেন, কাতারের আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে আপনাদের কথা শুনি। আমাদের শিকড় তো ভারতেই, তবে এখন আর  আমদের কেউ নেই সেখানে। আমরা বহু বছর এখানের নাগরিক। তবে দু বছর অন্তর ভারতে বেড়াতে যাই। ভালো লাগে। আমি এই পরিচয় পর্বের মর্মাথ জানি। আলোচনাকে  ঘরোয়া করার পদ্ধতি, গুছিয়ে সহজ করার প্রচেষ্ঠা মাত্র। মিটিং শুরুর আগে রমেশ নিজেদের মধ্যে একবার আলোচনা করল গোপনে। তারপর বলল, আর একজন আমাদের সঙ্গে  জয়েন করবে। বলতে বলতে যে ঘরে ঢুকল তার পরিচয় দিলেন রমেশ। আমাদের কোম্পানির মার্কেটিং ডিরেক্টার। বেগম। বিজনেস কার্ড বিনিময় হল। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আমরা যে যার চেয়ারে বসে। আলোচনা শুরু হল। আমার  স্থির বিশ্বাস আমাকে সে ভুলে গেছে। একবার আমার কার্ডের উপর চোখ বুলিয়ে পাশে সরিয়ে রাখল।  তার পর পদবি ধরে সম্ভাষণ করে জানাল, সে দেশের বাজারের অবস্থা, বাজার কি প্রত্যাশা করে, মানুষ কী চায় আর তাদের সেই চাহিদা পূরণ করতে কি কি ভেবেছে বেগম। না বেগম নয় বেগমের কোম্পানী। বিষয়টি খুব চিত্তাকর্ষক। আমরা আমদের বাজার বুঝতে পণ্য তৈরি করি। অন্য দেশের সেই পণ্যের চাহিদা বুঝতে সে দেশের লোক লাগে তাই এই বিনিময় প্রথা। মানুষ সব এক, কিন্তু বিভিন্ন দেশে তাদের চাহিদা আলাদা আলাদা। এ এক বিশাল গোলোক ধাঁধাঁ। বেগমের কথা শুনতে শুনতে আমি ফিরে গিয়েছিলাম সেই জসোলার ম্যানেজমেন্ট ইস্কুলে। সেই বেগম এখন অনেক পরিণত, বিচক্ষণ ও তুখোর বুদ্ধিমতী। আমার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে তাঁর শর্ত গুলো তীক্ষ্ণ তীরের মতো আমার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। তার প্রশ্নের ধরণ তাদের মালিকরাও ধরতে পারছিল না। এক সময় তার তূনীর থেকে শেষ তীরটি এসে পড়ল আমার কোর্টে। টানা কম করে পাঁচ বছরের জন্য কন্ট্রাক্ট করতে চায় তারা তাদের তিনটি শর্তে। আবার সেই রাতেও ফোন করতে হল। চেয়ারম্যান রাজি হলেন। পরের দিন কন্ট্রাক্ট সই হল দুপুর একটায়। লাঞ্চের টেবিলে বেগম আমাকে হেসে বলল, “নেগোসিয়েশান” চ্যাপ্টার পড়িয়েছিলেন আপনি আমাদের ক্লাসে, ঠিক ঠাক শিখেছি তো?

আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, তুমি চিনতে পেরেছো আমায়? 

–পারব না?

আমাদের কথার মধ্যে রাজেশ বলল, বেগম, আগের পরিচিত না কী?

বেগম খুব গর্বের সঙ্গে উত্তর দিল, উনি আমার শিক্ষক। আমার স্যার।

রমেশ বলল, কই আগে তো বলো নি? 

বেগম হাল্কা হেসে বলল, উনিই আমাদের পেশাদার হতে শিখিয়েছিলেন।

আমার মাথার মধ্যে তখন অন্য এক অদ্ভূত অনুভূতি। মরিয়াম, বেগম এমন সব মেয়েরা সারা পৃথিবীতে আজ কি গতিতে দাপটে পেশাদার  হয়ে উঠছে!  

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *