নাফিস আনোয়ার

“দাদা, ট্রেনটা শ্রীরামপুর দাঁড়াবে?” 

 গ্যালোপিং লোকালটা সবে ব্যান্ডেল স্টেশনে ঢুকছে, এমন সময় পিছন থেকে মহিলা কণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে ঘুরে তাকাতেই পৃথিবীটা দুলে ওঠে আর্যর। 

 শ্রীময়ী…! 

 হাতে একটা মাঝারি সাইজের ছাই রঙা ট্রলি ব্যাগ। পরনে সাদা সালোয়ার, গাঢ় নীল কামিজ। লাল-নীল রাজস্থানী বাঁধনির ওড়নাটা তেরচা ভাবে পেঁচিয়ে বাঁধা বুকের উপর। মুখটা কি ভারি হয়েছে আগের থেকে? চোখের শ্যাওলা রঙা চশমাটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রথমেই।  স্টাইলিশ, পাঁচকোনা… নাকি ছয়! এক ঝলক দেখে এর বেশি পরিবর্তন ধরা পড়ে না আর্যর চোখে।

 পনেরো বছর… ঠিক কতটা সময় পনেরো বছর! সবচেয়ে চেনা গলার স্বরটাও কি এভাবেই সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যায় পনেরো বছরে! ভাবে আর্য।

 ট্রেনটা আজ বেশ ফাঁকা। মানুষজন লাগাতার উৎসবে মাতামাতির পর ফুরসৎ খুঁজে নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে বোধহয়। শ্রীময়ীকে জানালার সিটটা ছেড়ে দিয়ে পাশের সিটে বসে আর্য। চেনা স্পর্শ ছুঁয়ে যায় এক যুগ পরে। সন্ধ্যা নেমেছে বাইরে। রোদের তেজ দিনেরবেলায় যথেষ্টই। বেশিক্ষণ ঘোরাফেরা করলে আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি শুরু হয়৷ কিন্তু সূর্যদেবের পশ্চিমাভিমুখে পদচারণ যত দীর্ঘ হয়, আবহাওয়ার পট পরিবর্তন ঘটতে থাকে দ্রুত। আর এখন সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসে যেন শীত শীত ভাব। দুপুরের রোদ-গরম এভাবেই সন্ধ্যায় শান্ত-শীতল হয়ে বিস্মৃতপ্রায় হয়ে যায়; কথাটা মানুষের জীবনেও সত্য। যে মানুষটার ভালোবাসাকে হেলায় হারিয়ে দূরে চলে গিয়ে ‘জিতে গেছি’ মনে করেছিল আর্য, তার স্পর্শ এত বছর পরে এভাবে আরাম দেয় কেন! বিচলিত বোধ করে সে। নরম বাতাস এখন শ্রীময়ীর চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে পাশ ফিরে তাকায় সে। দৃষ্টিতে বিহ্বল ভাবটা একবার দেখা দিয়েও কঠিন হয়ে ওঠে মুখটা।

 “কেমন আছিস?” গলার স্বরেও সেই শুষ্কতার আভাস পাওয়া যায় এবার।

 “ভালো। তুই?”

 “আমিও। কবে ফিরলি?”

 “দিন কুড়ির ছুটিতে এসেছি। বাবার বাৎসরিক কাজ ছিল,” ‘বাবা’ শব্দটা উচ্চারণের পর আচমকা চোয়াল শক্ত হয়ে যায় আর্যরও।

 থমকে যায় শ্রীময়ী। খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে, যেন ভিতর থেকে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। তারপর বলে, “ওহ্! সরি। শুনে খুব খারাপ লাগল। কবে…? কী হয়েছিল কাকুর?”

 “ওই আর কী…বছর চারেক হয়ে গেল… স্ট্রোক। আমি ফেরার আগেই সব শেষ…”

 “কাকু আমায় খুব স্নেহ করতেন। বোটানিক্যাল গার্ডেনের সেই বিখ্যাত বটগাছের তলায় বসে আমাদের পিকনিকের কথা মনে আছে তোর? কাকু আর আমি ডুয়েট গেয়েছিলাম— “তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে…” ধীরে ধীরে, যেন পুরোনো কথা মনে করতে কষ্ট হচ্ছে, এমনভাবে স্মৃতির অতলে ঝাঁপ দেয় শ্রীময়ী। গলার স্বরটা কি একটু কেঁপে ওঠে তার!  

 “স্নেহ, ভালবাসা… এসব কথা বলে আর কিছু লাভ আছে শ্রী! আমার পরিবারের সবাই তোকে স্নেহ করত। বিশেষত বাবা।  আর সেই তুই…” একটা দীর্ঘশ্বাস কথাটা শেষ করতে দেয় না আর্যকে। চাপা একটা অভিমান ঘিরে ধরে। কিন্তু চারপাশের সহযাত্রীদের কারণে অথবা দীর্ঘকাল বিদেশে থাকার সহবতের কারণেই, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয় সে। 

“তবু অপেক্ষা করলাম না… কাউকে কিছু  না জানিয়ে চলে গেলাম… পালিয়ে গেলাম… এই তো! তোর মতো সাহস ছিল না যে। আর তুই তো জানিস, তোর মতো করে ভাবতেও পারিনি কোনওদিন… আর এসব কথার কোনও মানে হয় না এখন। তুই ভাল আছিস, যা সবথেকে বেশি চেয়েছিলিস তাই তো পেয়েছিস, আবার কী!” এক টানে কথাগুলো বলে দম নেয় শ্রীময়ী। 

 “কেন তুই পাসনি?”

 “পেয়েছি তো। কোনও অভিযোগ তো করিনি। না সেদিন। না আজকে। করেছি কি?” সেই পনেরো বছর আগের শ্রীময়ী ফিরে আসে যেন।  শান্ত, মৃদুভাষী কিন্তু প্রয়োজন পড়লে দৃঢ়স্বরে নিজের কথাটা জানিয়ে দিতে পিছপা হতো না যে।

 “এভাবেই কত তর্ক-বিতর্ক, মান-অভিমানের পরেও আবার আমরা সহজেই এক হয়ে যেতাম, তাই না! সবকিছু কেমন পাল্টে গেল যেন!” আশ্চর্য শান্ত হয়ে যায় আর্যর গলা। শেষ কথাগুলো স্বগতোক্তির মতো শোনায়। চুপ করে যায় শ্রীময়ীও। স্মৃতির পাতাগুলো কুড়ি একুশ বছর পিছিয়ে যেতে থাকে দ্রুত।

****

 নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময় সেটা। রোমান্টিক নব্বই পেরিয়ে গেলেও তার আবেশ কাটেনি তখনও। মোবাইল এসেছে, তবে তা আজকের মতো শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়নি। মাঠে ময়দানে লাল পতাকার দাপটও অব্যাহত তখন। কলেজে কলেজে স্বাধীনতা গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের স্লোগান উঠছে।  কে জানত আর বছর ছয়েক পরেই হারিয়ে যাবে সব দাপট। তারপর মিলিয়ে যাবে। ঠিক যেভাবে মিলিয়ে গেল আর্য শ্রীময়ীর প্রেম। নাকি রয়ে গেল কিছু? 

 শ্রীরামপুরের মেয়ে শ্রীময়ী, একরাশ স্বপ্ন আর দিঘির মতো টলটলে গভীর দুটো চোখ নিয়ে কলকাতা শহরের নামী কলেজে জুলজি অনার্স পড়তে এসেছিল সেই সময়েই। আর এসেই দক্ষিণ কলকাতার ছেলে আর্যর প্রেমে পড়ল সে। আর্যও পড়ল। অথবা উল্টোটাই। সেটা কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। কলেজ শেষ হতে হতে দু’জনে হয়ে উঠল কলেজের ‘মোস্ট হ্যাপেনিং কাপল্’। আর্য কলেজে ফার্স্ট, শ্রীময়ী সেকেন্ড।  তারপর এক সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স। জীবন একেবারে সরলরেখায় চলছিল দু’জনের। আর্যর উকিল বাবা, অধ্যাপিকা মা ছেলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি কোনওদিন। শ্রীময়ীর বাবা ছিল না, মা সরকারি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, রাশভারী মানুষ, কিন্তু মেয়ের পছন্দে আপত্তি ছিল না তাঁরও। সবাই জানত— দু’জনের এক হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

 তবু কোথায় যেন তাল কাটছিল ধীরে ধীরে। অনেকদিন পর তাদের সম্পর্ক ভাঙার খবর পেয়ে আর্যর বাবা বলেছিলেন, “তোদের ভালবাসায় কোনও রাখঢাক ছিল না, তাই এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল।” তখন অবশ্য সে আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায় গবেষণা করছে। এই আমেরিকা যাওয়া নিয়েই সমস্যার শুরু। শ্রীময়ীর নিঃশর্ত ভালবাসা পেতে পেতে আর্য ভুলেই গিয়েছিল তার আলাদা কোনও সত্তার কথা। ভেবেছিল, সে যা করবে, শ্রীময়ীও তাই করবে। কিন্তু একদিন শ্রীময়ী তা করল না। 

 সেদিন আর্যর বাড়িতে এসেছে সে, যেমন প্রায়ই আসত। এবং এ বাড়িতে সে মেয়ের মর্যাদাই পেত বরাবর। আর্য তখন ফর্ম ফিলাপ করছে জিআরই-র।

 “এই তোর পাসপোর্ট সাইজ ফটো দিস তো।”

 “কীসের জন্য রে?” 

 “জিআরই-র ফর্ম ফিলাপে লাগবে।”

 “কিন্তু আমি তো দেব না ওসব পরীক্ষা। তাছাড়া দিলে পাবও না।” 

 “পাবি পাবি। আমি আছি তো।”

 “আমার কোনও ইচ্ছা নেই বিদেশ যাওয়ার।” মৃদু স্বরে জানিয়েছিল শ্রীময়ী। কিন্তু সে স্বরের দৃঢ়তা অনুভব করতে পারেনি আর্য। একপ্রকার উড়িয়েই দিয়েছিল কথাটা। শ্রীময়ী আর্যর ছায়া। আর্যকে অনুসরণ ছাড়া উপায় কী তার!

****

 শ্রীময়ী কিন্তু যায়নি। আর্য জোর করেছিল খুব। পরে বুঝেছিল হবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার দৃঢ়তা মায়ের থেকে পেয়েছিল বোধহয় শ্রীময়ী। খুব ছোটবেলায় বাবা চলে যাওয়ার পর একা হাতে তাকে মানুষ করেছিলেন মা।  অতএব হাল ছেড়ে দিয়েছিল আর্য। অবশ্য তার এসব নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর সময়ও ছিল না তখন। ‘সব পেয়েছির দেশ’ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নতুন জগৎ, নতুন জীবনের আস্বাদ তখন তার চোখে-মুখে। শ্রীময়ীর জন্য একটু মন খারাপ করেছিল হয়তো, সে তো প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার আগে দেশের জন্য, মা-বাবার জন্যও মন খারাপ করে সবার। কিন্তু আমেরিকান স্বপ্নগুলো তার থেকে  অনেক অনেক বড় হয় যে। তাকে ছুঁতে অনেক কিছুই ছাড়া যায়, ছাড়তে হয়…  এমনকি ভালোবাসাকেও।

 এয়ারপোর্টে আর্য শ্রীময়ীকে বলেছিল, “এখনও সময় আছে শ্রী। পরীক্ষা দে। চলে আয়।”

 “আমি আছি। তুই ফিরে আয়।”

 “যদি না ফিরি?”

 “যদি ভালবাসিস, ঠিক ফিরবি,” ছলছল চোখে হেসেছিল শ্রীময়ী। 

 “আমি ফেরার জন্য যাচ্ছি না…” হেসে বলেছিল আর্য। হেসেছিল শ্রীময়ীও।  কিন্তু তার সেই হাসিমুখের গভীরে বিষণ্ণ চোখদুটোর দিকে আর্যর দৃষ্টি যদি যেত তাহলে সে দেখতে পেত শ্রীময়ীর চোখে বিশ্বাস হারানোর আশঙ্কাগুলো জল হয়ে ফুটে উঠছে তখনই। 

 মোবাইল থাকলেও সাগরপারে ফোনে যোগাযোগ রাখার খরচ প্রচুর। ই-মেইলে যোগাযোগ রাখা যেত। কিন্তু ওখানে পৌঁছেই একগাদা ব্যস্ততায় জড়িয়ে গিয়েছিল আর্য। থাকার ব্যবস্থা করা, পার্ট টাইম কাজ, পড়াশোনা— প্রচুর চাপ তখন। ফলে যোগাযোগ কমে আসছিল ধীরে ধীরে। নাকি ইচ্ছা করেই যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিল আর্য! সে ততদিনে অনুভব করতে শুরু করেছে— ফুরিয়ে আসছে সম্পর্কটা। নাকি সে চাইছিল ফুরিয়ে যাক সম্পর্কটা! নিজের মতো করে সম্পর্ক ভাঙার যুক্তিগুলোও সাজিয়ে  নিচ্ছিল পরপর— মফস্বলের মানসিকতা, অল্পতে সন্তুষ্টি, কেরিয়ারের ঊর্ধ্বগমনে বাধা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর মাঝে বেশ কিছুদিনের বিরতির পর শ্রীময়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে আর্য দেখল ওপারে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ইমেইল, ফোন, কোনও কিছুতেই শ্রীময়ীকে পাওয়া গেল না আর।  

 মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত! কখন যে তা কী চায়! আর্যর মনে হয়েছিল ভালই হল বোধহয়। শ্রীময়ী তো আসলে একটা পিছুটান। আর নিজের স্বপ্ন ছুঁতে গেলে পিছুটান রাখতে নেই। তবু বছর দেড়েক পরে ছুটিতে দেশে ফিরে শ্রীময়ীর বাড়ি গিয়েছিল খোঁজ নিতে। বাড়ির বাইরে তালা আবিষ্কার করা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। পাড়া-প্রতিবেশীরা জানিয়েছিল বিশেষ কিছু না জানিয়ে মা-মেয়ে চলে গেছে পাড়া ছেড়ে। শ্রীময়ীর মা সম্ভবত উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার নিয়েছেন কোথাও, এ সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছিল কেউ কেউ।  হাঁফ ছেড়ে বেঁচে ছিল আর্য। ‘যা গেছে তা গেছে’ ভেবে নিয়ে, সমস্ত দায় শ্রীময়ীর উপর সঁপে দিয়ে, নিজের ঊর্ধ্বমুখী কেরিয়ারের দিকে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিল সে। আর্য স্বীকার করুক আর না করুক ভালবাসা বদলে গিয়ে শ্রীময়ী যে শুধু তার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল, সেটা সে ভাল করে বুঝে গিয়েছিল। আর স্থান বদলালে অভ্যাস বদলায়। এটাই সত্যি। 

 এরপর কেটে গেছে বহুদিন। গত পনেরো বছরে সব কিছু নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে আর্য। প্রবাসে সংসার পেতেছে। কর্মক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছে। আবার অর্থবান এনআরআই-এর মতো জন্মভূমির প্রতি নস্টালজিয়ায় কিছু সম্পত্তিও খরিদ করেছে এখানে। বছরে দু’বছরে একবার করে আসে। বাবা চলে গেলেও মা আছেন। দেখা করে, সময় কাটায়। তারপর আবার ফিরে যায় নতুন দেশে। নতুন না, এখন সেটাই তো তার দেশ। পুরনো দেশটা এখন কেবলই ফেলে আসা স্মৃতি, রোমন্থন করা যায়, ফিরে যাওয়া যায় না আর। একটা জিনিসই অপূর্ণ রয়ে গেছে এখনও— সে পিতা হতে পারেনি। সে দেশের আইন কানুনের জটিলতায় সন্তান দত্তক নেওয়াও সম্ভব হয়নি নানা কারণে। 

****

 ট্রেন ছুটে চলেছে অন্ধকারের বুক চিরে। চন্দননগরের পরে লম্বা এক দৌড়। সোজা শেওড়াফুলি। আর্যদের উল্টো দিকে বসে থাকা যাত্রীটি জানলায় হেলান দিয়ে ঢুলছেন। সম্ভবত অফিস থেকে ফিরছেন। এই কামরার অধিকাংশ যাত্রীই অফিস ফেরত। শ্রীময়ী যে তা নয় সেটা তার ট্রলি ব্যাগ দেখলে বোঝা যায়। কোথা থেকে আসছে শ্রীময়ী? শ্বশুরবাড়ি! আড় চোখে শ্রীময়ীর সাজপোশাকের দিকে একবার দেখে নেয় আর্য। দু’হাতে দুটো সোনার চুড়ি। বাঁহাতে ডিজিটাল রিস্টওয়াচ। সাদা রঙের কামিজে নীল রংয়ের বড় বড় ফুল আঁকা।

 কী ভাবছে এখন শ্রীময়ী! আর্যর কথা? তাদের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা? নাকি তার মতোই সব পিছনে ফেলে অনেক এগিয়ে গেছে শ্রীময়ীর জীবনটাও। সেটাই স্বাভাবিক। স্বামী সংসার সন্তান এসবের বাইরে ভাবার সময়ই হয়তো নেই। হঠাৎ এসব কথা কেন ভাবছে আর্য! তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে বহুকাল আগে। তার জন্য যদি মনে খেদ থেকেও থাকে, তাকেও সে পেরিয়ে এসেছে অনেকদিন আগে। আর নিজের কেরিয়ার গড়ার যুদ্ধে শ্রীময়ীর ভালবাসার বলি চড়ানোকে   সামান্য কোল্যাটেরাল ড্যামেজ ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি কখনও আর্য। আর সেই ড্যামেজ কন্ট্রোল করে গত পনেরো বছরের উন্নতিতে নিজের জিতই দেখেছিল আর্য। তাহলে কি এতদিন ভুল ভেবেছিল? ভালোবাসার কিছু রেশ এখনও কি লুকিয়ে ছিল মনের অন্দরে গোপন কোনও কুঠুরিতে? আর হঠাৎ শ্রীময়ীকে দেখে কি উন্মুক্ত হয়ে গেছে সেই চোরা কুঠুরির দরজাটাই?

 “কোথায় গিয়েছিলিস?” অবশেষে বলে ওঠে আর্য।

 “আমি কালিম্পং-এ থাকি। ওখানে সেন্ট্রাল স্কুল ফর টিবেটানস-এ চাকরি করি। তুই কি কালনা গিয়েছিলি?”

 কালনায় আর্যর মামার বাড়ি, শ্রীময়ী সেটা জানে। কত কিছুই তো সে জানে। ছয়-সাত বছরের সম্পর্কে একটা মানুষের জীবনের অনেক কিছুই জানা হয়ে যায়। বিশেষত সে সম্পর্ক যদি এতটা ঘনিষ্ঠ হয়। অথচ তারপরের পনেরো বছরে দু’জনের জীবনের যে বিরাট বদল, তার সামান্যতম হদিসও নেই অন্যজনের কাছে। আর এখন জানতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই কোনও, অতীত যেন অন্ধকার, সব রং শুষে নিয়ে সে নিকষ কালো।

 “শ্রীরামপুরে নামবি তো?” মনের মধ্যে দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করে আর্য। 

 “হ্যাঁ মা থাকেন ওখানে।” ছোট্ট জবাব দেয় শ্রীময়ী।

 আবার কবে শ্রীরামপুরে ফিরেছে শ্রীময়ীরা? পনেরো বছর আগে কোথায় চলে গিয়েছিল তারা? কেন গিয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুব জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, প্রশ্ন করলেও উত্তর পাবে না।    

 “কাকিমা একা থাকেন? কেমন আছেন উনি?” বাকি সব প্রশ্ন বুকের গভীরে চালান করে দিয়ে জিজ্ঞেস করে আর্য। ট্রেন তখন শেওড়াফুলি ছাড়ছে, পরের স্টেশন শ্রীরামপুর।

 “না, আমার মেয়ে থাকে ওঁর সঙ্গে। আছেন মোটামুটি। আমায় আসতে হয় মাসে দু’মাসে একবার করে,” নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে শ্রীময়ী। সত্যিই নির্লিপ্তি! নাকি এড়িয়ে যেতে চায় শ্রীময়ী! 

 “ও তাই! কত বড় হল তোর মেয়ে? কোন ক্লাসে পড়ে?”

 “এই তো ক্লাস নাইন হল এবারে। কাল ওর জন্মদিন। তাই আসতে হল ছুটি নিয়ে,” একথা বলতে বলতে হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়ে গেছে, এমন ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে শ্রীময়ী। 

 “আসি রে, ভালো থাকিস।” ট্রলিটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে হাসার চেষ্টা করে শ্রীময়ী। জোর করে হাসি আনতে গিয়ে মুখের আড়ষ্ট ভাবটা আরো প্রকট হয়ে যায়। আর্যর চোখে চোখ রাখে একবার, তারপর দ্রুত সরিয়ে নেয় চোখ দুটো। চোখের তারার অস্বাভাবিক চাঞ্চল্য। দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যায় শ্রীময়ী। যেন পালিয়ে যাচ্ছে আবার। শ্রীরামপুর স্টেশনে ট্রেন থামতেই ঝটপট নেমে যায় সে, একবার ফিরেও তাকায় না। আর্য দেখার চেষ্টা করে জানলা দিয়ে। ট্রলি ব্যাগ হাতে ট্রেনের সমান্তরালে হেঁটে আসছে শ্রীময়ী। স্টেশনের হলুদ আলোয় চোখের কোনাটা কি চকচক করছে তার? বুঝতে পারে না আর্য।

 ট্রেন ছাড়ে। আনমনা হয়ে আর্য ভাবতে থাকে আজকের এই অদ্ভুত সাক্ষাৎ-এর কথা। যে দুটো পথ বহুদিন আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল তাকে কিছুক্ষণের জন্য আবার মিলিয়ে দিয়ে এ কী নতুন খেলা খেলল তাদের অদৃষ্ট! 

 আজকের শ্রীময়ীকে বড্ড অচেনা লাগে। প্রথম থেকেই বড় অসহজ যেন সে। অনেক কথা সে বলল বটে তবু কোনও কথাই যেন বলল না সে। 

 ট্রেন গতি নিয়েছে এখন। শ্রীরামপুরের পর সোজা হাওড়া, মাঝখানে কোথাও দাঁড়াবে না গ্যালোপিং লোকাল। যেখানে শ্রীময়ী বসেছিল সেই জানলার ধারের সিটটা এখন আর্যর দখলে। শ্রীময়ীর সাথে প্রেম দেওয়া-নেওয়ার সেই প্রথম দিনটা থেকে আজকের শ্রীরামপুর স্টেশনে তাড়াহুড়ো করে নেমে যাওয়া— এই পুরো সময়টার ফ্ল্যাশব্যাক আবারও চলতে থাকে তার মনের গহনে। যেন অনেকগুলো ফ্রেম, মনের স্ক্রিনে পরপর আসছে আর চলে যাচ্ছে। হঠাৎ কয়েকটা ফ্রেম পরপর দাঁড়িয়ে যায় আর্যর মানসপটে। বিদ্যুতের মতো কিছু কথা মনে পড়ে যায়। সাহসের অভাবের কথা কেন বলছিল শ্রীময়ী! কীসের সাহস! আবার তো ওরা ফিরে এসেছে শ্রীরামপুরে। তাহলে কোন কাজের জন্য তারা সবকিছু ছেড়ে চলে গিয়েছিল অনেক দূরে! শ্রীময়ীর মেয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে না থেকে বৃদ্ধা মায়ের কাছে থাকে কেন! ওর স্বামীর পরিচয়ই বা কী! তিনি কোথায় থাকেন! শ্রীময়ী কি তবে সিঙ্গেল প্যারেন্ট, ঠিক তার মায়ের মতো? মেয়ে ক্লাস নাইনে উঠবে বলল না? আগামীকাল তার জন্মদিন… তাহলে মেয়ের বয়সটা আর্যের প্রথমবার আমেরিকার যাওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে যে! আর্যের মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর যত পরিষ্কার হতে থাকে, অঙ্কগুলোও মিলে যেতে থাকে পরপর। আর ফ্ল্যাশব্যাকের ছবিগুলো অদৃশ্য সুতোর বন্ধনে মালার মতো জুড়ে গিয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে তাকে। এক ভীষণ অস্থিরতা গ্রাস করে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন। শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যেতে থাকে ঠাণ্ডা স্রোত। তবে কি শ্রীময়ীর সন্তান…! 

 তীব্র উত্তেজনায় সিট থেকে উঠে দাঁড়ায় আর্য।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *