শরদিন্দু সাহা

লেখক পরিচিতি

বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই  বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।

বিষয় পরিচিতি

(রেভারেন্ড জেমস্‌ লঙ  যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)

আগুন জ্বলে রে ওই মহাবিদ্রোহের দাবানলে

ঝড়ের পূর্বাভাস যে উপলব্ধি করছিলাম না পলে পলে তা অস্বীকার করি কি করে কিন্তু সেই রূপ যে টর্নেডোর মতো ধেয়ে আসবে এমন করে আঁচ করা কঠিন ছিল। হয়তো এমনটাই হয়, আপাত শান্ত ধীর স্থির জীবন প্রবাহে কখন যে ঝটকা এসে টালমাটাল করে দেয়, সামলানো দায় হয়ে পড়ে। আমার নিজের জীবনেও এমন মুহূর্ত বারে বারে এসেছে। ভোলা তো সম্ভব নয় আয়ারল্যান্ডের উপর ব্রিটিশ দখলদারীর যে দীর্ঘ জটিল প্রক্রিয়া আয়ারল্যান্ডবাসীর জীবন কেমন করে তছনছ করে দিচ্ছে, আজও যে প্রচ্ছন্ন আক্রমণ আমার কার্যক্রমকে প্রতি পদে পদে ব্যাহত করছে, যা এক অননুমেয় যোগফল। ধরে নেওয়া অমূলক হবে না যা কিছু চলছে এই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন ব্যবস্থায় সম্পূর্নটাই তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কোথাও না কোথাও এই সর্বগ্ৰাসী মনোভাবে ঘুণ ধরেছে অনেক আগেই, হয়তো তা আমার অজ্ঞাতেই ঘটে চলেছে। কত কিছুই তো ঘটে আমাদের জানা বোঝার বাইরে, এ-ও তার আর এক তরঙ্গ। প্রশ্নটা জেগেছিল এই যে এত কর্মকাণ্ড চলছে এটা কি নেহাত অনধিকার চর্চা, যদি তাই না হয়, তাহলে ইংরেজদের মনের বাসনা কি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই দেশের কথা উত্থাপন হয়, এই দেশের মানুষগুলোর কথা ধর্তব্যের মধ্যে আসে নাকি সবটাই সভ্যতার মোড়কে নিজেদের আগ্ৰাসনকে কয়েক কদম বাড়িয়ে তোলা, কে জানে। আমেরিকা ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছে কম দিন তো হয়নি, পারলেন না তো এখনও জেমস্ বুকানন দাসপ্রথা থেকে মুক্তি দিতে, চলছে তো সমান তালে সেই দ্বন্দ্ব আর বিভাজন, গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাশিয়ায় বহমান জার শাসন, কৃষকদের দূরাবস্থার অন্ত নেই। ফরাসি সাম্রাজ্যে নেপোলিয়ন III কেড়ে নিচ্ছে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এমন বিশ্ব ব্যবস্থায় এই ভারতের বুকে দেখা যাচ্ছে এক অশনি সংকেত। 

দমদমের কারখানায় টোটার উপরকার কাগজ গো-বসার দ্বারা আর শূকর-বসার দ্বারা লিপ্ত করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। মানুষের কন্ঠস্বর জোরালো হচ্ছে। স্বধর্মমচ্যুত করা শাসকদের গোপন উদ্দেশ্য। এমনিতেই লর্ড ডালহৌসি যে ভাবে অযোধ্যা রাজ্য ব্রিটিশ রাজ্যভুক্ত করেছে, প্রজারা ভেবেই নিয়েছে এই কাজ জবরদস্তি ও বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কি। এ যেন আগুনে ঘৃতাহুতি। ব্যারাকপুর ও বহরমপুরের এই নিয়ে সিপাহীদের অসন্তোষ মিরাট নগরে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো। ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। ফৈজাবাদের মৌলবী, ঝান্সীর রানী, বিঠুরের নানা সাহেব, নানার সেনাপতি তাঁতিয়া টোপি যাঁরা এমনিতেই ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল, এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র দেরি করছে না। অবস্থা যে ক্রমশ সংগীন হচ্ছে, কলকাতার ইউরোপীয়রা, এই দেশীয় খ্রিস্টানদের মনে জন্ম দিতে শুরু করেছে এক অজানা আতঙ্ক। ইংরেজদের হত্যার খবর পৌঁছচ্ছে কলকাতা শহরের অলিগলিতে। সাংবাদিক গিরিশচন্দ্র ঘোষ বললেন, রেভারেন্ড লঙ ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ ‘দি মেট্রোপলিটন এণ্ড ইটস সেফটি’  পড়েছেন? বললাম, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। আপনি যে সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন যে কলকাতার আশেপাশে সিপাহীদের মতিগতি সুবিধের নয় বলে আপাৎকালের জন্য প্রস্তুত থাকার উপদেশ দিয়েছেন, এই ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে একমত। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি ভিন্নমতও পোষণ করি। আমার মনে হয়েছে আপনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে আমিও দ্বিধা দ্বন্দে কম ভুগছি না। আমি নিজেও নিশ্চিত নই এমন একটি ব্যবস্থা চালু হতে পারে, কোথাও না কোথাও একটা গোলমাল রয়েছে – আপনি একথা বিশ্বাস করেন? গিরিশচন্দ্র মহাশয় ক্ষণিক চুপ করে থেকে বললেন, সত্যি মিথ্যে নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না, তবে কোনো অবস্থাতেই এই মুহূর্তে দেশের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করা আমি সমিচীন মনে করি না। তবে একথা সত্যি দেশীয় সিপাহীদের অনেকাংশেই বঞ্চিত রাখা হচ্ছে । যাঁদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে শাসকগোষ্ঠী শাসন বিস্তার করেছে, তাঁদের যোগ্যতার উপযুক্ত পুরস্কার যদি দেওয়া হতো, যদি শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা তাঁদের প্রতি উদ্ধত ও দুর্বিনীত আচরণ না করতেন, তাহলে মহাবিদ্রোহ কখনোই সম্ভব হতো না।

কলকাতার খৃষ্টধর্মাবলম্বিগণ অলীক আশঙ্কায় উদভ্রান্ত হয়ে দলে দলে আত্মগোপনের চেষ্টা করছেন। এরকম কথাও বাতাসে ছড়াচ্ছে ব্যারাকপুরের সিপাহীরা রাতের অন্ধকারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে হাজির হচ্ছে। দলবদ্ধ হয়ে রাজধানীর অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছে। আতঙ্কে সমগ্ৰ নগর আন্দোলিত হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ও ইউরেশীয়রা ভয়ে শিউরে উঠছে। এমন এক বিপজ্জনক অবস্থায় একজন যাজক হয়ে আমার কি করা উচিত বুঝতেই পারছি না, আমার কোন পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। রাত ক্রমশ আরও ঘন গভীর হয়ে উঠছে। ভাবলাম আর একবার গিরিশচন্দ্রের কাছে যাই। অস্থিরমতি হয়ে পথচলা বড় দায়, তবুও কাঁচা রাস্তায় হোঁচট খেতে খেতে হাতে লন্ঠন নিয়ে পথ জুড়তে জুড়তে সীমানা পার হওয়া, চাঁদের আলোয় পথ চিনতে চিনতে মির্জাপুর স্ট্রিট। ভয় কাবু করেনি বলি কি করে, কখন যে চিৎপুর রোডের এসে পড়লাম নিজেই জানি না, বাগবাজার তখনও অনেক দূর। কত তো হিসেব মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মেলাবো যে সেই পথ তো খোলা নেই। তবুও যেন শোনা যাচ্ছে কত ফিসফিসানি, কখন যদি কোন একটা অঘটন ঘটে যায়! গিরিশচন্দ্র আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে আমাকে বসতে বললেন। বোধ হয় ওনারও কত কথাই না বলার ছিল। ভ্রু কুঁচকে বললেন, এ-ও এক ক্রান্তিকাল, তাই নয় কী! আমার উত্তরের প্রতিক্ষায় না থেকে বলে বসলেন, এই ক্ষোভ প্রশমন করা সহজ কাজ হবে না, আসন্ন পরিবর্তনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন রেভারেন্ড লঙ। কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন, অবুঝ শিশুর মতো থতমত খেয়ে গেলাম। ঘরে তেল বাতির  টিমটিমে আলো বাইরের অন্ধকারকে ভ্রূকুটি করছে যেন। কোন পথটা আসলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে বোঝা কষ্টকর হয়ে উঠছে ক্রমশ। সম্পর্কের সমীকরণটা এতকাল মিলেমিশে বিভাজন রেখাটা ভুলিয়ে দিয়ে দিব্যি চলছিল, এমনটাই স্বাভাবিক, অতীত তার ইতিহাসকে চাপা দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, সামনের দিনগুলো আবছা, ছায়াময়, কে কাকে কখনও আদৌ চিনতে চেয়েছে কিনা, শেকড়ের ঘ্রাণ শুঁকে দেখার তাগিদ অনুভব করেছে কিনা, এই প্রশ্ন এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর সাংবাদিক মহাশয় দুচোখ মেলে দুইজনকে দেখে চলেছি। মোক্ষম প্রশ্ন এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ছে – এই দেশটা আসলে কার? কতগুলো প্রশ্নের উত্তর যেন নিজে থেকেই জন্ম নিতে থাকলো এই সীমাহীন নির্জনতায়।

গিরিশচন্দ্র উত্তর খুঁজেই চলেছেন – হিন্দু মুসলমান এর মধ্যে এই স্পর্শকাতরতা জন্ম নিয়েছে ঠিক কবে থেকে? ইংরেজরা সচেতন ভাবেই তাকে ব্যবহার করছে কোনো আসন্ন বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেতে নাকি কোনো ভবিষ্যতের ঐক্যকে ভেঙে চুরমার করে দিতে। এই মহাবিদ্রোহ কি কোনো সামাজিক আন্দোলন নাকি কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা পর্ব। ‘লিটারারি ক্রনিকল’, ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ও ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকায় তিনি এই বিষয়ে তাঁর যুক্তিও সাজিয়েছেন এবং বিশ্লেষণও করেছেন। এই লড়াই আন্দোলনকে তিনি খাটো করে দেখতে রাজি হননি এবং প্রয়োজনে বোধে সতর্ক করতেও ছাড়েন নি। ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দি প্যানিক ইন ক্যালকাটা’ শীর্ষক প্রবন্ধে কলকাতার শ্বেতাঙ্গ ও ফিরিঙ্গি অধিবাসীদের ভয়ে পাগল হয়ে ওঠাকে বিদ্রুপ করেছেন। জানতে চাইলাম, আপনার এই তিরষ্কারের হেতু কি? এবার ওঁর গলার স্বর একটু কঠোর শোনালো। বললেন, রেভারেন্ড লঙ, এই ভারতবাসীর সংস্কৃতির শিকড়কে আপনারা এখনও চিনতেই পারেননি, হতে পারে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই দেশকে একশ বছর শাসন করছে, কিন্তু দেশের মানুষের ঘাড় মটকাতে গেলে সময় লাগবে। পরাধীনতার জ্বালা এখনও গোটা শরীরে ও মনে বিদ্ধ করে নি, যেদিন হবে, সেদিন বিস্ফোরণ ঘটবে, কোম্পানির শাসকরা নিস্তার পাবে না। কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। যে স্বদেশ মুক্তির উচ্চারণ শুনতে পেলাম ওঁর লেখায় এমন সরাসরি বিদ্রোহের সুর তো ধরা পড়ে না, বরঞ্চ এই সিপাহীদের অস্ত্র পরিহার করলেই ভালো এই উপদেশ দিয়ে তাঁর প্রবন্ধ শেষ করেছেন। বললাম, আপনি তো এই বলে ফিরিঙ্গি ও শ্বেতাঙ্গদের কটাক্ষ করেছেন – বাজীর আওয়াজ যাঁদের ঘুম কেড়ে নেয়, খানসামা ও খিদমতগাররা মেরে ফেলবে এই ভয়ে যাঁরা আড়ষ্ট হয়ে থাকেন, তাঁদের জন্য কিছু করা উচিত নয়, বরঞ্চ জমিদারদের খরচে দেশীয় পাইক বরকন্দাজদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া ভালো। হ্যাঁ আমি ক্যালকাটা ভলান্টিয়ার গার্ডস সম্পর্কে এই কথাও বলেছিলাম, বোধ হয় আপনার নজর এড়িয়ে গেছে – বাঁদরের হাতে খন্তা দেওয়ার চাইতেও তাঁদের হাতে হাতিয়ার দেওয়া বুদ্ধিবিবেচনাহীনতার চরম নিদর্শন হবে। কিন্তু মহাশয় আপনি তো হরিশচন্দ্রের পদাঙ্কানুসরণ করে মধ্যবিত্ত বাঙালির মতো ইংরেজ আনুগত্য দেখাচ্ছেন। আপনি তো বলেছেন ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এ লেখা ‘দি সেপয় মিউটিনি এ্যাণ্ড ইটস অ্যাকশন আপন দি পিপল অব বেঙ্গল প্রবন্ধে, পেপার কাটিং আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি, আপনি নিজের কানেই শুনুন কী লিখেছেন – বাঙালি কখনও অস্ত্রধারণ করতে পারে না, তাঁদের কাজ ও কৃতিত্ব শুধুমাত্র অসামরিক ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ, তাঁদের শতমুখী তীক্ষ্ণবুদ্ধি তাঁদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন করেছে, তাঁরা এটাও জানে যে, পরাধীন জাতিরূপে ব্রিটিশ শাসনেই তাঁরা সর্বাদ্ধিক সমৃদ্ধি লাভ করবে। তাঁরা আশা করে আইন ও নিয়মতন্ত্র সম্মত উপায়ে ব্রিটিশ ন্যায়বুদ্ধির কাছে আবেদন জানিয়ে কালক্রমে উপযুক্ত সময়ে তাঁরা দেশ শাসনের ক্ষেত্রে বিদেশী শাসকদের সঙ্গে মর্যাদা ও দায়িত্ব সমানভাবে ভাগাভাগি করে নিতে পারবে। মহাশয়, আমি প্রথমেই আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। আমি জানি না, আপনি বাঙালি বলতে কাদের বোঝাতে চাইছেন। বৃহত্তর বাঙালিরা কিন্তু ফুঁসছে। মঙ্গল পান্ডের ফাঁসি তাঁদের গায়ে জ্বালা ধরিয়েছে। তাঁরা এই সিপাহী বিদ্রোহকে তুচ্ছ ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। মিরাট, বক্সার, আরা’র বিদ্রোহের সঙ্গে একাত্ম বোধ করছে। তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে রাগে ফেটে পড়লেন – শুনুন, এই হলো একপ্রকার বিদ্বেষ ও কুৎসা। এঁদের বিদ্যা বুদ্ধি ও সম্পত্তির প্রসারকে এই নিন্দুকরা সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের অসম্ভব দাবির পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ বলে জ্ঞান করে, তাঁরা অপদস্থ করতে চায়। কিন্তু মহাশয়, ছোট লাট এই বিদ্রোহকে মোটেই ছোট করে দেখছেন না, বরঞ্চ বৃটেন ও ভারতবর্ষের মধ্যে যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে সেই সম্পর্কে আগাম সর্তক করে দিয়েছেন। গিরিশচন্দ্র বললেন, আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন, আমি মনে করি এই বিদ্রোহ দমনের কৌশল শিক্ষিত ও কর্ম কুশল ভারতবাসীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ও প্রভুত্বের লিপ্সায় তাঁদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়। কিন্তু সিপাহীদের রাগ ও ক্ষোভের কিছু কারণ তো আছে। হ্যাঁ বুঝতে পারছি আপনি প্রথমে এই বিদ্রোহকে ‘সিপাইদের ধর্মঘট’ মাত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, এখন বলছেন বিদ্রোহের সঙ্গত কারণ আছে। যদি সিপাহীদের যোগ্যতার উপযুক্ত পুরস্কার  দেওয়া হতো, যদি শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা তাঁদের প্রতি উদ্ধত ও দুর্বিনীত আচরণ না করতেন, তাহলে এই বিদ্রোহ কখনও সম্ভব হতো না। তবে একটা কথা ঠিক  শিক্ষা ও জ্ঞানের যে স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে তাকে কোনক্রমেই আর রোধ করা যাবে না, কোন অত্যাচার আর দমননীতির দ্বারা আদর্শ ও ভাবধারাকে প্রতিহত করা যাবে না।

গিরিশচন্দ্র মহাশয়ের কথাগুলো মনের অন্দরে এমন আলোড়ন তৈরি করছে যে কিছুতেই নিজের মনকে শান্ত্বনা দিতে পারছি না। আমার নিজের অবস্থানকে অভিজ্ঞতার আলোকে সমান সারিতে আনলে মনে হচ্ছে কোথাও একটা দূরত্ব আমাকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দিচ্ছে না। যে কথা শোনা যাচ্ছে তাকে অবহেলাই বা করি কী করে – ইংরেজ সেনারা নাকি হিন্দু বিদ্রোহীদের বন্দুকের নলের মুখে বাধ্য করছে গোমাংস খেতে আর মুসলমান বিদ্রোহীদের কন্ঠনালীর ভেতর জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছে শুয়োরের মাংস। আহত বন্দীদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইংরেজরা বুঝে উঠতে পারছে না যে এই অত্যাচার ভাঙনের বদলে ভারতবাসীর জাতীয়তাবোধ ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যকে আরও শক্ত বাঁধনে বেঁধে ফেলবে, ভারতবর্ষকে শাসন করা দিনে দিনে আরও দুরূহ হয়ে যাবে।  এর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যখন বাজারে লোকালয়ে বিপণিমধ্যে ভদ্র ও ইতর, পণ্ডিত ও মূর্খ প্রায় প্রত্যেকেই কেউ সংবাদপত্র পাঠ করিলে যুদ্ধের কথা শোনার জন্য জড় হচ্ছে, অনুমান করা কঠিন হবে না যে সামাজিক প্রতিচ্ছবি কতটা সংশয়াপন্ন হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয় হলো এই মহাবিদ্রোহ কোন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় – এই শাসন ব্যবস্থা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ইংরেজ শাসনের ভীতকে না নাড়িয়ে দেয় নাকি শাসকের কড়া শাসনে আবার ঘুড়ে দাঁড়ায়। বড়লাট লর্ড ক্যানিং-এর চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে, সমালোচকরা ব্যঙ্গ করছে ‘ক্লেমেন্সি ক্যানিং’ বলে। তিনি আসলে চাইছেন যতটা সম্ভব রক্তপাত কম করা যায়। চারদিকে খালি নাই নাই শব্দ শোনা যাচ্ছে। ধনীলোকেরা ডাল, চাল, তেল, ঘি ঘরে মজুত করছেন, গরীব মানুষদের ঘরে হাঁড়ি চড়ছে না। সম্বাদ ভাস্বর লিখেছে,  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যখন ভারতীয় সিপাইরা ধর্মমত নির্বিশেষে এককাট্টা হয়ে অস্ত্র ধরছেন তখন  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মতো তেজস্বী ব্যক্তি  চুপ করে আছেন কেন? কালীপ্রসন্ন সিংহ বাঙালিদের নীরবতায় সোচ্চার হয়েছেন, তাঁর মত হলো বহুদিন ব্রিটিশ সহবাসে, ব্রিটিশ শিক্ষায় ব্রিটিশ ব্যবহারেও একশ বছর পার করেও আমেরিকানদের মতো হতে পারেনি। আমার কাছেও দু-চারজন পাদ্রী জানতে চাইলেন আমি এই দুর্দিনে কোন পক্ষ অবলম্বন করছি। এই প্রশ্নে আমার উত্তর হলো আমি দোদুল্যমানতায় ভুগছি। কেবলই মনে হচ্ছে এটা এমন একটা সময় যখন এদেশীয়রা নিজেদের শিক্ষাদীক্ষায়, চিন্তায়, জ্ঞান বিজ্ঞানে জোর কদমে এগিয়ে চলেছে এবং বহু পিছিয়ে পড়া জনগণকে জাগিয়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে তখন এই বিদ্রোহ না এই সম্ভাবনাকে সমূলে নষ্ট করে দেয়। ব্রিটিশদের সঙ্গে এই দ্বৈরথ অন্য অনেক পরিবর্তিত কার্যক্রমকে ধাক্কা মারবে কিন্তু ইংরেজদেরও বৈমাত্রেয় সুলভ বৈষম্যের আচরণ মেনে নেওয়া কষ্টকর। ইংরেজদের উদ্দেশ্যে বলবো এই দেশে শাসনকালকে দীর্ঘায়িত করতে চাইলে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো প্রয়োজন, না হলে বিদ্রোহের আগুন তো কমবেই না, কোন না কোনভাবে ফুঁড়ে বেরবে এমনভাবে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ সামলানো দায় হয়ে যাবে। আগুন যখন একবার জ্বলে উঠেছে, তখন দমন করলেও সহজে নিববে না। তাঁরা বললেন, আমি এই ব্যাপারে কলম ধরছি না কেন? বললাম, আমার বলার মতো সময় এখনও আসেনি, অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা উচ্চারণ করা সহজ নয়, হয়তো আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমনিতেই ইংরেজরা যাজকদের কাজকর্মে খুশি নয়, ওদের উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে এখনও আমাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে, হয়তো তা দৃশ্যত ধরা পড়ছে না। সাবধানে পা ফেলা এই সময় উচিত কাজই হবে। সময় কখনও কখনও এমন এক শিক্ষক হয়ে যায়, তাঁর সামনে নত মস্তকে বাধ্য ছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোন রাস্তা খোলা থাকে না। কিন্তু মনকে তো এত সহজে প্রবোধ দেওয়া যায় না, সে তো তার মতো করে জবাব চাইবেই। বুঝলাম আমার নিজের সঙ্গে নিজের গোপন যুদ্ধটা চেতনে অবচেতনে শুরু হয়েই গেছে। শাসক আর শোষিতের সংজ্ঞাটা বড় গোলমেলে, তা দেশ কাল সীমানা ভেদ করে দূর দূরান্তে ছুটে চলে যেতে চায়, যেন গ্ৰহ নক্ষত্ররাজিকে ছুঁয়ে ফেলে। আমার আমিত্বকেও ধীক্কার জানাতে কুন্ঠা বোধ করে না। ওই উচ্চতায় সামনে যা কিছু দেখি যেন এক অবগুণ্ঠিত পৃথিবী দুচোখ মেলে চেয়ে আছে, হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে এমন এক সত্যকে যা সকল ধর্মের বন্ধনীকে কাঙাল করে দেয়। সকল পোশাক ঝেড়ে ফেলে উলঙ্গ করে দেয়, মানুষের মুখগুলোই ভেসে ওঠে যাদের আমি এক পলক দেখেছি, কিংবা দেখেও দেখিনি অথচ দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছি।

এই বিদ্রোহ কী ভারতবাসীর ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তুলেছে যা মোটেই ঠুনকো হতে পারে না, এর মূল অনেক গভীরে। এই দেশে আমি এমন এমন বৃক্ষের সন্ধান পেয়েছি যাদের শীতল ছায়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যায় কিন্তু প্রচণ্ড ঝড়-তুফানেও দোল খেতে খেতেও সটান দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কী আশ্চর্য এতটুকু গ্লানি ও জড়তা এসে ওদের শরীরকে ছুঁতে পারে না। নির্মল বাতাসের হাতছানিকে উপেক্ষা করে এমন সাধ্য কার! দুচোখ বুজে উপলব্ধিই বলে দেয়, ঝড়ের গতিপথ ও আকার। রক্ত তো ঝরছে এই উত্তাল আন্দোলনে। শত্রুপক্ষ ও মিত্রপক্ষের দ্বন্দ্বে দিশাহারা যারা পুতুলের মতো এপাশ ওপাশ ঘুরে মরছে, যাদের নিয়ে হিসেব কষতে গেলে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ কোন অঙ্কেই ফেলা যাবে না, তাদের দোষ গুণ তো এত সহজে বিচার্য হবে না, আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ছে তাদের নির্বাক চাহনি, কোন দলে যে ভিড়লে তাদের আকাঙ্খা দূরে থাক, প্রয়োজনটুকু মিটবে তারা নিজেরাও কি জানে, অন্যরা জানবে কেমন করে! ব্রিটিশরা তো আইনের যে প্যাঁচ কষছে, এদের তো রেখেছে ব্রাত্য করে। এরা এমন উদাসীন যে উদাসীনতার জন্ম হয়েছে কবে কোনকালে, কী কারণে, এমন ঠিকুজি কে আর গরজ করে লিখে রেখেছে যে জানবে। আমার অনুসন্ধিৎসা আমার পথের নিশানা মেপে দেয়, বলে না এমন তো নয় – হবে হবে, আলবৎ হবে। কত মানুষই তো ঠিকানা থেকেও ঠিকানা বিহীন হয়ে যায়। কবে কোথায় কোন পূর্বপুরুষ জীবনের নোঙর গড়েছিল, কেন গড়েছিল কীভাবে গড়েছিল তার হিসাব নিতে গিয়ে দেখি সুদূর আয়ারল্যান্ড আর এই বঙ্গদেশ খুব কাছাকাছি চলে আসে না বুঝি। এই সময়ের অনেক উচ্চবর্গীয়রা নিজেরা রেষারেষি করে মরে, স্থান নির্ধারণ আর উপাধির গরিমায় ভুলে যায়, নিজের দেশের মানুষরা অপরজন হয়ে নেংটি পরে উদোম হয়ে ঘুরে মরছে অলিতে গলিতে, এদের যে টেনে তুলতে হবে, এমন কী দায় পড়েছে বলুন। আমি জানি না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দমননীতি কতটা সঠিক, সিপাহীদের ইংরেজ সেনা হত্যা কোনো পথ আদৌ দেখাবে কিনা, নাকি সব রসাতলে যাবে অন্তত এই মুহূর্তে আমার অজানা, শুধু বুঝি শুদ্ধিকরণ জরুরি, তবে যদি মান বাঁচে, দূরত্বের যদি অবসান ঘটে। তবে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, এই সত্যটা আমি অস্বীকার করি কোন সাহসে। যে সন্ধিক্ষণে আমি দাঁড়িয়ে আছি তাকে অস্তিত্ব সংকট বলবো নাকি বলবো নতুন সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছি, কারা এর উত্তর দেবে। শাসন করার স্পৃহায় যাঁরা চোখ টাটাচ্ছে তাঁদের লক্ষ্যপূর্ণ হলেও হতে পারে কিন্তু সময়ের আয়নায় যে কালি ছিটোবে এই নিয়ে কোনো সন্দেহ আছে নাকি, কারা এগিয়ে, কতটা এগিয়ে এই নিয়েও সংগত কারণেই প্রশ্নের জন্ম দেবে। তাহলে আমাদের এমন ধর্মাচরণ কোনো দিশা দেখাবে কী।

মহাবিদ্রোহের মৃত্যু নিয়ে ভাবতে গিয়েই মনে হচ্ছে কারা যেন আমার শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কত মানুষই তো ভয়ে কুকড়ে আছে, কী ঘটছে, কেন ঘটছে শুনছে দেয়ালে কান পেতে, একটা শব্দের স্ফূরণ ঘটছে কি ঘটছে না, কানে আঙুল দিয়ে ভাবছে – ওরে বাবারে, কোনো বিপদ ঘটলো বুঝি। চারপাশে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে এমন করে কত কিছুই না যেন ঘটার অপেক্ষায় সময় গুনছে। গোরা সৈন্যদের পায়ের শব্দে জানান দিচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে আকাশ ভেঙে পড়বে বড় রাস্তার মোড়ে যার অভিঘাত এসে পড়বে একটু একটু করে গলির মুখে ঘরবাড়ি গুলোর দরজা জানালার ফাঁক ফোঁকরে। কেউ ইতিউতি জানতে চায় লাশের সংখ্যা কত, অনুমান করা যাবে বোধ হয়, গুলির আওয়াজ কত ভয়ানক হবে। কুকুরগুলো ইতস্তত ভেউ ভেউ করে কখনও গলা ফাটায় আবার নিঃশব্দে নেতিয়ে পড়ে। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি কত কিছুই না পাল্টে দেয়। ঘরবন্দী হয়ে পড়ে থাকা অন্ধকূপে আটকে থেকে হাত পা ছোড়ার সামিল। রাস্তাই যেন কত কথা বলে। বুঝলাম পৃথিবীতে মানুষের আকর্ষণ ছাড়া কোনো বিকল্প হতেই পারে না। এত চোখের জল, এত বিলাপ, এত না-পাওয়ার দুরু দুরু ভাব রোজনামচা ভেঙেচুরে হয় একশেষ। বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝামাঝি যে আরও এক ভাবের জন্ম হতে পারে টের পেতে থাকলাম পা টিপে টিপে। দেওয়াল ভেদ করে যদি অন্যের কানে পৌঁছে যায় কোনো নিজের কথা সেই আশঙ্কায় ঠোঁট চাপাচাপি। এই দ্বন্দ্ব মনে হয় এক পরিহাস। তবুও আগুন ঝরছে ও ঝরাচ্ছে মানুষ। এও যেন ডুবন্ত মানুষের ডুবতে ডুবতেও কখন যেন পাড়ে এসে খাবি খাওয়া। এই অবস্থায় আমারও দৈন্যদশা কম নয়। লর্ড ক্যানিং ব্রিটিশ প্রশাসকের দরবারে এই ঘনিভূত আঁধারের ছবিটা কেমন করে তুলে ধরবেন, কোনো আদেশ-নির্দেশের উপঢৌকন সাজাবেন কিনা তিনিই জানেন। কেন জানি না মনে হয় ঘটমান ভবিষ্যৎ কথা বলবে বলবে করেও কি নীরবতার মাশুল গুণছে! কারা যেন কাঁদছে, কান্নার পাত্র চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে পূর্ব পশ্চিম। এই অসম্ভব সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছে অনেক রূদ্ধ দরজা। কারও মুখ চেনা, কেউবা ভাবছে অচেনা থাকাটাই মঙ্গল। রাতের পৃথিবীটা আমার মন্দ লাগে না। না-দেখা পৃথিবীর আলোতে মাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভোরের আলোরা কথা বলে ওঠে, আমার পথচলা থেমে যায়, মহাবিদ্রোহের আগুনে দগ্ধ হতে হতে আমি দেখে ফেলি সামনের পথটা কতটা পিচ্ছিল।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের কর্ণধাররা কী নড়েচড়ে বসল? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হিন্দুপেট্রিয়ট’-এর সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিব্রত হলেন কিনা বোঝা গেল না, শুধু দু’একবার আমতা আমতা করে বলে উঠলেন, হলেও হতে পারে, এই পৃথিবীতে কত প্রশংসাই ভাগ্যে জোটে, যার আদৌ কোনো সারবত্তা আছে কিনা যাচাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। শুনেছি রামগোপাল ঘোষ মহাশয়, রামতনু লাহিড়ী মহাশয় প্রমুখজন আমার বক্তব্যে সহমত পোষণ করেছেন। আপনি কি সত্যিই মনে করেন সিপাহী বিদ্রোহ কেবল কুসংস্কারাপন্ন সিপাহীগণের কার্য্য মাত্র, দেশের প্রজাবর্গের এর কোন যোগ নেই? নাকি দেখাতে চাইলেন এদেশবাসীরা লর্ড ক্যানিং-এর প্রতি কিরূপ অনুরক্ত এবং ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের প্রতি কিরূপ কৃতজ্ঞ। তিনি উত্তর তো দিলেনই না, বরঞ্চ জানতে চাইলেন আমি কী ধারণা পোষণ করি। আমার ব্যক্তিগত মতামত বললেই হয়তো সম্পাদক মহাশয় তাঁর কাগজে বড় বড় হরফে লিখে ব্রিটিশ গর্ভণমেন্টকে জানিয়ে দেবেন রেভারেন্ড লঙ মহাবিদ্রোহ নিয়ে এই বলেছেন। বললাম, আমি যাজক হয়ে সংবাদপত্রে মতামত দেওয়া কী ঠিক হবে। হয়তো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই নিয়ে নানা কথা উঠবে। এমনিতেই আমার দায়দায়িত্ব নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে, তবে এই কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি মানুষের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না, আর যদি বিদ্রোহের কথাই বলেন এই মুহূর্তে ঠিক বেঠিক কোনোটাই আমি সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি কিন্তু এই কথা বলতে পারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ব্যাপারে আরও সর্তক হলে সিপাহীদের মনে এমন প্রতিহিংসার ভাব জন্ম নিত না। এলাহাবাদে ৮০০ দেশীয় প্রজাকে ফাঁসি দেওয়া বর্বরতা ছাড়া আর কি আবার এ-ও কম নিন্দনীয় নয় যখন বিদ্রোহী সিপাহীরা ইংরেজ বালক বালিকা ও রমণীদের সদলে হত্যা করে কূপের মধ্যে মৃতদেহ নিক্ষেপ করে। বললাম, কিন্তু এটা তো স্বীকার করবেন ব্রিটিশ গর্ভণমেন্টকে ভারতবর্ষ শাসন করতে হলে এদেশীয়দের সংষ্কৃতির প্রতি মনোযোগী অবশ্যই হতে হবে, ডিভাইড এন্ড রুল অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক তাস খেলা খেলছেন তো ব্রিটিশরা। রাজনীতি আর ধর্ম আলাদা হলেও এর পরোক্ষ যোগাযোগকে অস্বীকার করা যাবে না। সম্পাদক মহাশয় এবারও প্রত্যুত্তর করলেন না, শুধু বললেন, আমি গর্ভণমেন্টের বৈধ শাসনকে যেমন সমর্থন করি, আবার ইংরেজদের অবৈধ আচরণের প্রতিবাদও করি। আমি খানিকটা ইতস্তত করে বলেই ফেললাম তাই বুঝি লর্ড ক্যানিং এর ভৃত্য কাগজ ছাপা হলে সংগ্ৰহ করার জন্য আপনার অফিসে এসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সম্পাদক বলে উঠলেন, আপনারা যেমন খুশি বলতে পারেন আমি কিন্তু সৎ সাংবাদিকতায় কখনও পিছপা হই না, ইংরেজ প্রভুরা খুশি হলো কি হলো না, তাতে আমার কী লাভ, ভেবে দেখবেন ‘হিন্দুপেট্রিয়ট’ বন্ধ হয়ে গেলে এই দেশীয়দের যতটা না ক্ষতি, তার দ্বিগুণ ক্ষতি ইংরেজ গর্ভণমেন্টের, সুশাসন দিতে গেলে শাসক ও জনগণের উভয়ই পরস্পরকে জানা জরুরি, আর আমার কাগজও সেই নীতি মেনে চলে, সিপাহী বিদ্রোহের ভালো মন্দ প্রকাশ করার ছলে আমি নির্মোহভাবে প্রতিটি শব্দ চয়ন করি, কী ঘটতে চলেছে সরকার বাহাদুরই ঠিক করুক, আমি তো বাজনদারের কাজ করি মাত্র, বাকিটা না হয় আগামীর হাতে তোলা থাক।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *