পাঠক মিত্র
পাঠকের অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি
মানুষ যা-বলতে চায় তা কি সবসময় আসলে বলে, মানুষ যা-দেখতে চায় তা ও কি সবসময় দেখতে পায়। তা নয়। সেই না-পাওয়া বিষয়ের খোঁজে যখন গল্প বলার বিষয় হয়ে ওঠে, তখন তা নিছক গল্প বলার জন্য গল্প হয়ে ওঠে না। আবার সেই বিষয় শুধুমাত্র সময়ের দ্বিরালাপে খেলা করে না। বৃহত্তর সময়-যন্ত্রে বিষয় আবিস্কারের নেশায় এক অনন্য বিষয় হয়ে ওঠে। যা কোন কৌণিক বিন্দু দিয়ে বিচার্য নয়। স্থানিক বিন্দু দিয়ে যার শেষ সীমানা টেনে দিতে পারে না। তখন গল্পে যেন সমাজ চেতনার জন্ম হয় নিজের মতো করে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। রাজনৈতিক ভাবনার নির্যাস জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকই, মানবিক চেতনাকে অস্বীকার করবে আর জীবন চালিত হবে এমন কল্পনা মানুষের বিড়ম্বনাকেই বাড়িয়ে তোলে। এমনতর বিষয়ের সময়-যন্ত্রে শরদিন্দু সাহা’র গল্পসংগ্রহ-২।
মানুষের ঘরবাড়ি আর ঘরের আশপাশ থেকে নির্গত দূর্গন্ধ শরীর ছেড়ে মনের কোনে এসে বাসা বেঁধেছে। মানুষের কষ্টের হিসেব নিয়ে নিরাময়ের নিদান দেবে এমন মানুষ কোথায়? স্বপ্নের জন্ম হচ্ছে, অচিরেই মৃত্যু হচ্ছে, তবুও নতুন স্বপ্নরা এসে গোল পাকাচ্ছে। আকাশচুম্বী চাওয়া-পাওয়ার দ্বৈরথের কৃষ্ণ গহ্বরে সব নিঃশেষ হয়ে যাব না তো? এই অক্টোপাসের বাঁধন ছেড়ে কবে হবে মুক্তি? শিকড়ের টানে মাটির গন্ধ এসে লেপটে দেবে তো আমাদের জীবন! ‘আকাশমাটি’ গল্পে এমন প্রশ্নের ইঙ্গিত রয়েছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের প্রশ্নের ধাঁধায় জড়িয়ে উত্তরের জন্য অপেক্ষায় থেকেছেন, আর-একবার অন্তত মুক্ত বাতাস এসে আমাদের ধুয়ে দিয়ে যাক, প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তো করে দিক। মানুষের অস্তিত্ব সঙ্কট মানুষকেই যেন আর বিব্রত না-করে। ভোগবাদী মনন এসে আর যেন কড়া নেড়ে না-বলে এবার সময় হয়েছে বিদেয় হও। ‘বিশ্বামিত্রের খড়ম’ গল্পে আসে এমন এক দুঃসময়ের চালচিত্র যার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ তো নয়ই, বরঞ্চ প্রতি পদক্ষেপে রয়েছে দুঃসহ যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। ঘোর আঁধার, আশ্রয়ের জায়গাটুকু কারা যেন কেড়ে নেবে বলে হাত পাকাচ্ছে অন্ধিসন্ধি করে। তবুও মানুষের খোঁজার লিপ্সা তো থেমে থাকে না, সে নিজের পথ ধরেই চলে আপনমনে। না হলে লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তাটা যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আত্মশক্তি বিকাশের মূলমন্ত্র ব্যক্তির নিজস্ব লড়াইয়ের হার-জিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, চলার পথই নির্দেশ করে তার উত্তোরণের দিশা। ব্যক্তি ও সমাজ তো বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়, একে অন্যের পরিপূরক। সমাজের ক্রিয়াকলাপ চিহ্নিত করে দেশ কালের বিবর্তনের ধারাপাত। তাই তো জরুরি হয়ে ওঠে নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধাবিত শক্তির স্বরূপকে চিনে নেওয়া। কে বা কারা দেবে সেই সন্ধান? তবু বিভীষিকা অগ্ৰাহ্য করে শুরু হয় পথ হারানোর পথ খোঁজা। পাদুকার অন্বেষণ প্রতীকী হয়ে ধরা দেয়, শরদিন্দুর গল্পের বিষয় হয়ে ওঠে।
কথাকারের সৃষ্টিতে যে সংঘর্ষের জন্ম হয় ভাষার প্রকরণ তা পাঠকের মনোযোগ দাবি করে। সময়ের ভাষাকে অস্বীকার করে নয়, বরঞ্চ সঙ্গে নিয়ে ভাষার ভাঙাগড়া চলে যাতে করে আগামীর পথনির্দেশ সৃষ্টির তালে তালে তাল মেলাতে পারে।
জীবন জিজ্ঞাসাকে সমাজ দর্শনের আলোকে আলোকিত করতেও কথাকার পিছপা হন নি। তিনি দেখতে চান, দেখাতে চান, কখনো এমন করে দেখাতে চান, গল্পের শরীরে যেতে যেতে একসময় শরীর মুক্তির খেলা খেলে।
‘ব্রত যামিনী’ গল্পে যে যন্ত্রণা ও অসহায়তায় ব্যক্তির অস্তিত্ব বিপন্ন তা গোটা মানবজাতির কল্যাণকামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বৈরতন্ত্রের উল্লসিত উদ্যাপনেরই ছাড়পত্র। জাদুবাস্তবতার মোড়কে এমন এক যাপনের ইঙ্গিত লেখক করেছেন যা হতে মানুষের আশু মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। সময়ের আড়ালে অতিক্রান্ত সময়ের রোদন যা এই গল্পের মূল চরিত্রকে তাড়িত করেছে তাকে স্বীকার করবে তা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থায় অভাবনীয়। মানুষের অব্যক্ত ক্রন্দন আজ গণতন্ত্রের হত্যাকারীদের মর্মে প্রবেশ করে না, অস্পষ্ট হয়ে যায় মানুষের মুখ ওই ধনকুবেরদের সম্পদের উৎসবে। তাদের ক্ষুদ্র সংস্করণ অহরহ ঘিরে রয়েছে বিরাট জনগোষ্ঠীকে যত্রতত্র। মানুষের আবেদন-নিবেদনকে ওরা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ বোঝা দায়। গল্পের আড়ালে অসংখ্য গল্প এখানে কিলবিল করে। এই গল্পে রয়েছে বহুমাত্রিকতা, অন্ধকারের স্তরগুলো সরিয়ে আবিষ্কারের অপেক্ষায়।
শরদিন্দু তাঁর গল্পে বার বার এই প্রশ্ন রেখেছেন যে কেউ কেউ বাঁচার তাগিদে চেনা জগৎটাকে খানিকটা ওলটপালট করে নেয় যদি কোনো সূত্র খুঁজে পেয়ে যায়। ‘আলোময়ীর পাঠশালা’য় জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। একদিকে বাঁচার সংগ্ৰাম অন্যদিকে জীবনকে আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখা – কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা এই নিয়েই নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, নিজেকে আর পাঁচজনের সুখ-দুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে নেওয়া। মানুষের এমন স্বভাবধর্মকে অস্বীকার করার কী জো আছে! শরদিন্দুর এই গল্পে নতুন এক ফর্মের সূচনা হয়। জীবনের গল্পটা চলতে চলতে অন্য অনুভবে সাঁতার কাটে। কোথাও বাঁচার ভিন্ন ভুবন গড়তে পারলে স্বস্তি হয়। এক-একটা মুহূর্তের যোগফল নানা বৃত্তের চেহারা নেয়। বাঁচার এই নতুন সমীকরণ আজ-কাল-পরশু পাল্টে গেলেও পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু জীবনের পরিমাপ বিন্দু বিন্দু আলো হয়ে ছড়িয়ে যায় নানা মাত্রায়।
চলমান জীবনের ফাঁকফোকরে অন্তহীন যোগাযোগের সূত্র আবিষ্কার করে চলে মানুষ প্রতিনিয়ত। একসময় পড়ন্ত বেলায় আলো ফুরিয়ে এলে ঘরে ফেরার তোড়জোড় করে। এমন মানুষের কাছে জেনে নেওয়া বড় জরুরি তারা কী হারিয়েছে, কী পেলে তারা জীবনের স্বাদকে চেটেপুটে নিতে পারবে। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ উঠে এসেছে এমনই অনেক ভাষ্য, যা হয়ত আমাদের জানা নেই, কিন্তু জেনে নিতে হবে। সাঁইত্রিশটি গল্পের সমন্বয়ে এই গল্পসংগ্ৰহে শরদিন্দুর আরো এমন অনেক গল্প আছে, যা মানুষের অস্তিত্ব সংকট, শূন্যতা, হতাশা, মৃত্যু, স্বাধীনতা, দেশভাগ শিশু শ্রমিকদের যন্ত্রণা এইরকম নানা জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাই শরদিন্দুর এই সৃষ্টিতে মজে যাওয়া জরুরি বিশেষ করে এই বন্ধ্যা সময়ে যখন আমরা ভাবনাচিন্তার সুলুক সন্ধানে খুঁজে বেড়াচ্ছি হন্যে হয়ে। কথাকারের সৃষ্টিতে ডুব দিলে পাঠক বঞ্চিত হবেন না এটা নিশ্চয় করে বলাই যায় । আসলে শরদিন্দুর গল্প পাঠে যে চেতনার উন্মেষ ঘটে, আসলে তা পাঠকের অন্তর্জগতেরই প্রতিচ্ছবি।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
গল্পসংগ্রহ-২
শরদিন্দু সাহা
ছোঁয়া, কলকাতা-১২
