শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
বিদ্রোহের আগুনে মন পুড়ে হলো ছাই
ভবানীপুর অঞ্চলের যে মানুষটি দিনরাত এক করে কাগজটি নিয়ে মগ্ন আছেন তিনি আর কেউ নন স্বয়ং ‘হিন্দুপেট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কথা প্রসঙ্গে বন্ধুবর হরিশচন্দ্রকে বলেই ফেললাম, আপনার কাগজ তো শুধু এদেশে নয়, সুদূর ইংল্যান্ডেও প্রভাব ফেলেছে। আপনার শব্দচয়নে কী এমন জাদু আছে, তাবৎ পণ্ডিতরাও এত সহজে আলোড়িত হয়। হরিশচন্দ্রের মুখে অদ্ভুত দীপ্তি ও আত্মবিশ্বাস যেন অনেক না-বলা কথাই বলে দিল। হেসে বললেন, জেমস্ লঙ আপনি শুধু প্রশংসাই দেখলেন, নিন্দেমন্দ-টা নজরে আসলো না। বললাম, ওটা নিয়ে অত ভাবেন কেন, ওটা তো অঙ্গের ভূষণ। বললেন, তাই যদি হবে এত কথা উঠেছে কেন? আমি তো এইটুক বলার চেষ্টা করেছি – সিপাহী বিদ্রোহ কেবল কুসংস্কারাপন্ন সিপাহীগণের কার্য মাত্র, দেশের প্রজাবর্গের তাহার কোন যোগ নেই। প্রজারা গভর্ণমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞ ও অনুরক্ত এবং রাজভক্তিরও মোটেই অভাব নেই। কেউ কেউ ভাবলো আমি ইংরেজ সরকারের তাবেদারী করছি। হরিশচন্দ্রের মনঃকষ্ট দেখে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, এই নিয়ে অত ভাবাভাবির কারণ ঘটেছে কী? স্বয়ং লর্ড ক্যানিং আপনার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকার আমাদের স্বদেশীদের লর্ড ক্যানিং কে ফিরিয়ে নেবার প্রস্তাব ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উঠলে বাতিল করেছেন। তাই কেবল আপনার সাংবাদিকতার জোরেই সম্ভব হলো। এটা কি কম গুরুত্বপূর্ণ? বললেন, লঙ, সে না হয় আমি আমার কর্তব্যকর্ম করেছি। সরকারের বৈধ শাসনকে সমর্থন করেছি, ইংরেজদের অবৈধ আচরণের প্রতিবাদ করতেও কখনও পিছপা হয় নি। কিন্তু এখন যে শিরে সংক্রান্তি। নীলকর সাহেবরা যেভাবে অসহায় দুঃস্থ গরীব রায়তদের উপর খড়গহস্ত হচ্ছেন, এই তো আর কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না, প্রতিবাদ না করলেই নয়। বললাম, হরিশচন্দ্র, আপনি তো জানেন গত দশ বছর ধরে এমন একটা অমানবিক কাজের প্রতিবাদ করে আসছি। কিন্তু সরকার কিছুতেই কানে তুলছে না, ওদের ধারণা আমি সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছি। উপরন্তু নীলকর সাহেবরা তো কম ক্ষেপে নেই, পারলে আমার কলম থামিয়ে দেয়। হরিশচন্দ্রকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। এদিকে এমিলির শরীরটাও কয়দিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। যা ঝড়বৃষ্টি চলছে, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ঝিমিয়ে আছে। হরিশচন্দ্র থেকে বিদায় নিয়ে পালকিতে চড়েই ঠাকুরপুকুরের পথে যাত্রা করলাম। চিন্তাটা এমনভাবে জাঁকিয়ে বসল, মাথাটা বনবন করে ঘুরতে লাগলো।
কী মনে হলো পরদিন আবারও অস্থিরতা নিরসনের জন্য হরিশচন্দ্রের কাগজের দপ্তরে গিয়ে হাজির হলাম। আমি ঘরে ঢুকেই দেখলাম হরিশচন্দ্রের কোনোদিকেই খেয়াল নেই, একমনে পায়চারী করছেন। আমার উপস্থিতিও টের পেলেন না। নিজেই ওর নীরবতা ভাঙিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আবার কি নতুন বিপদ হলো? উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, লঙ আপনি এসে গেছেন। আপনাকেই এই সময় প্রয়োজন। বললাম, কেন কী হয়েছে! অনর্গল বলে যেতে লাগলো এমন করে যেন এক ভারি বোঝা মাথা থেকে নামাতে পারলে শান্তি পান – আচ্ছা আমাদের গভর্ণমেন্ট করছেটা কী, নীল চাষীদের আর বাঁচতে দেবে না নাকি? দিনরাত দলে দলে নীলকরসাহেবদের দ্বারা অত্যাচারিত লোক ভিড় করছে। তাদের কাতর আর্তি শুনে উকিলের কাছে সুপারিশ চিঠি পাঠাতে হচ্ছে, কারও মোকদ্দমার হাল শুনতে হচ্ছে, অফিস যাবার সময় হচ্ছে না। মা বলছে, “ওরে মানুষের শরীরে এত পরিশ্রম সহ্য হবে না, মারা পড়বি, কলম রাখ।” আচ্ছা আপনিই বলুন লঙ গরীব প্রজারা ধনেপ্রাণে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমি কি শান্তিতে ঘুমাতে পারি? মনটা আমার বেদনায় ভরে উঠলো। বললাম আমিও রোজ একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছি। এই তো সেদিন সকালবেলা পণ্ডিতের সঙ্গে বসে সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি পড়ছিলাম। এমন সময় নদীয়া যশোর জেলা থেকে প্রায় পঞ্চাশজন রায়ত নীলকুঠির সাহেবের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে আমার দ্বারস্থ হয়। কী আর করবো। ড. আলেকজান্ডার ডাবের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের জন্য মিশনারিদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে এক সভা ডাকা হয়, চার্চ মিশন সোসাইটির কলকাতা শাখার সম্পাদক কাথবার্ট, স্যানডিস ভগবান, মি. সেল, এই শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালিও ছিলেন। আমরা সকলে মিলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে রাজনৈতিক বিষয়টিকে উপেক্ষা করলেও মিশনারিদের কাজ যে অত্যাচারের নীলকরদের জন্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই নিয়ে সবার দৃষ্টিগোচর হওয়া দরকার। এতে এক কাজে দুই কাজই হবে। হরিশচন্দ্র বললেন,আপনিও কি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত? ওঁর কথাটা আমি এড়িয়ে যেতে পারলাম না। বললাম, ‘ এছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা তো খোলা নেই। যাই হোক, শোনা গেল, যশোর নদীয়া প্রভৃতি জেলার জমিদারদের ও প্রজাগণের সঙ্গে নীলকরদের ঘোর বিবাদ বেঁধে গেল। জেলার ম্যাজিস্ট্রেট নীলকরদের স্বজাতীয় হওয়ায় প্রজারা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হরিশচন্দ্রকে বললাম, ‘এই ঘটনায় হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকার ভূমিকা কী হবে? দৃঢ় কন্ঠে বললেন, সম্পাদকের যা দায়িত্ব পালন করবো, কলম ধরবো, দেখি নীলকরদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে পারি কিনা। জানাবো সকলকে কেমন করে কেমন করে চাষিদের সবচেয়ে উর্বর ফসল উৎপাদনশীল জমিতে নীলচাষ করিয়ে কম দামে নীল কিনে নেয়। কী উপায়ে দাদন দিয়ে তাদের ভালো জমিতে নীলচাষ করার জন্য প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়। ফসল খারাপ হলে ঋণের বোঝায় জমি-বাড়ি সবই বন্ধক দিয়ে হয়। উত্তরে জানতে চাইলাম, ‘পারবেন তো, নীলকরদের রোষানলের মোকাবেলা করতে?’ ‘আর কিছু পারি না পারি, দেশের জনগণের সামনে এই জঘন্য অমানবিক ব্যবস্থার কথা তুলে ধরতে তো পারবো। তাছাড়া ইডেন সাহেব তো হুকুম জারি করেছেন যে কৃষকদের নিজ জমিতে নিজেদের ইচ্ছামতো চাষ করবার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। হরিশচন্দ্রকে যত দেখছি, অবাক হচ্ছি, বুঝলাম বাঙালির লড়াই করার মানসিকতা উপেক্ষা করার মতো নয়। আমার ধারণা কতখানি সত্য প্রমাণিত হলো। তাঁর চেষ্টাতেই গভর্ণমেন্ট ‘ইণ্ডিগো কমিশন’ নিযুক্ত করেছে। অনেক জমিদার, রায়ত, সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং মিশনারিদের ডাকা হয়। কমিশনের সভ্যগণ জেলায় জেলায় ঘুরে অত্যাচারের সংবাদ সংগ্ৰহ করলেন। তিনি কমিশনের সপক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। আমিও আমার বক্তব্য পেশ করেছি।
ছাত্রীরা যে যার ঘরে ফিরে গেলে এমিলি আর আমি ঠাকুরপুকুর কোয়াটারে নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে ভাবছিলাম। এটা বুঝতে পারছিলাম মানুষের একটা অবিশ্বাস ক্রমশই মিশনারিদের ঘিরে জন্ম হচ্ছে। এমিলি আমাকে বলল, লঙ, এর পরিণতি কী। বললাম, ভয়ানক এক দুর্দিন দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। এমনও হতে পারে এই ঘটনা ইংরেজ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। বাইরে দেখছ না ঘুটঘুটে অন্ধকার গোটা অঞ্চলটাকে ঘিরে আছে, মানুষের মনেও কালো ছায়া নেমেছে, জীবন হয়ে উঠেছে দুঃসহ, আমার মনটা বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। ইংরেজ বণিকরা জোর পূর্বক চাষীদের দাদন দিয়ে নীল চাষ করতে বাধ্য করছে না কেবল, দাদনের অর্থ শোধ করতে নিরূপায় হলে গরীব মানুষগুলোর বাড়িঘর পোড়াচ্ছে, নারীদের ইজ্জত লুটেছে, এইসব কী সহ্য করা যায়, বল? যিশু বলেছেন, মানুষের কল্যাণ কর, তাতেই মুক্তি ঘটবে। এমিলি জানতে চায়, আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা কী? বললাম, সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, প্রয়োজনে সরকারের কাছে জানতে চাইব, নীলকর সাহেবদের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করার জন্য সরকারের ভূমিকা কি, না হলে ওরা যে মিশনারিদের দিকেই আঙুল তুলবে। এখনও কত কাজ বাকি, এমন একটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ হলে দেশটাই তো রসাতলে যাবে। এমিলি বলে, তাহলে কী দেশে ফিরে যাব? কী যে ওকে বলি, এত সচ্ছল পরিবারের মেয়ে হয়ে আমার জীবনসঙ্গীনী হয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছে মেয়েদের জ্ঞানের আলো দেবে বলে, আজ বোধ হয় দুঃখের ভারে মনটা বিষাদগ্ৰস্ত হয়েছে। ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললাম, ভেবো না, আমার এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস আছে ব্রিটিশ শাসন এইদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। যিশুর বাণী চেতনার উন্মেষ ঘটাবে। এমিলি বলল, কিন্তু এই ভাবে নীলকর সাহেবরা মানুষদের শোষণ করলে ধর্মও যাবে, আধারও যাবে, আমাদের সেবাব্রত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করবে মানুষ, আমরা লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবো না। ঘরের বাইরে জোনাকি পোকারা বনে-বাদাড়ে তখনও মিটিমিটি জ্বলছে। কী অপূর্ব স্বর্গীয় শোভা! এই গড-এর রাজ্যে এত লোভ, এত অত্যাচারী, এত ঘৃণা, না না এরকম অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। এর একটা বিহিত করতেই হবে।
সেই কবে থেকে বাঙলা উত্তাল। তুষের আগুনের মতো লাল হয়ে আছে। কখন যে আগুন দপ্ করে জ্বলে উঠবে কে জানে। ‘ইন্ডিয়ান ফীল্ড’, ‘সংবাদ প্রভাকর’ ‘তত্ত্ববোধিনী-র অক্ষয়কুমার দত্ত, ‘হিন্দু পেট্রিয়ট-এর হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়রা জানপ্রাণ দিয়ে তাঁদের কাগজে দুর্ধর্ষ সব লেখা লিখছেন, রোমকূপ খাড়া হয়ে যায়। সংবাদ প্রভাকরে “নীলকরদের দৌরাত্ম্যে রাইয়ৎ লোকের সর্বনাশ” শিরোনামের কিছু অংশ আমি উল্লেখ করছিঃ ‘…নীলকর সাহেবরা যাহা মনে করেন তাহাই করিতেছেন, ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট বিবেচনা করেন, যে তাঁহারা উত্তমরূপে ভারতবর্ষ শাসন করিয়াছেন, কতকগুলি দুর্বল ইতর চোর ডাকাত দিলেই কি রাজ্য শাসিত হয়? … নীলকর সাহেবরা ম্যাজিস্ট্রেটদিগের নিকট প্রতিবাদরূপে উপস্থিত হইলেও অতি সম্রমের সহিত গৃহীত হয়েন, হরিহর মূর্তির ন্যায় একাঙ্গ হইয়া হাস্যবদনে “সেকেহেন্” করেন, ইংরেজি ভাষায় কথা কহিয়া যাহা বুঝাইয়া দেন সাহেব তাহাই বুঝেন। কোনো কুটিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের শ্যালা কেহ ভাই, কেহ ভগিনীপতি, কেহ পিসে, কেহ জ্ঞাতি, কেহ কুটুম্ব, কেহ গ্ৰামস্থ, কেহ সমধ্যায়ী, এই প্রকার পরস্পর সম্বন্ধে এক একটা সংযোগ আছে, এবং তাহা না থাকিলেও সকলেই “এক সান্কির ইয়ার” কোনো মতে ছাড়াছাড়ি হইবার জো টি নাই। …”জিলা মুরশিদাবাদ, রাজশাহী, কৃষ্ণনগর, যশোহর, পাবনা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ঢাকা প্রভৃতি সকল মিলাতেই নীলকরের অত্যাচার প্রবল রহিয়াছে। ওই সমুদয় সাহেবের কুটীর অধীনস্থ ও নিকটস্থ প্রজাপুঞ্জের দুঃখ বর্ণনা করিতে হইলে হৃদয় অমনি বিদীর্ণ হইয়া যায়। স্থান বিশেষে কেবল দুই-একজন ধার্মিক আছেন, নচেৎ তাবতেই এক ধর্মাক্রান্ত।’ শমানুষ জাগছে সত্যি কথা, কিন্তু
খবর চাপা দেওয়ার জন্য দুষ্ট লোকেরও তো অভাব নেই, প্রশাশনের ঘরে ঢোকার আগেই কারা যেন এসে দরজা জানালা সপাটৈ বন্ধ করে দিচ্ছে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন পিটার গ্ৰান্ট-এর কানে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছয় ততই ভালো কিন্তু বেড়ালের গলায় কে আর ঘন্টা বাঁধে। বাংলা প্রবাদবাক্যে যে কত কিছু শেখার আছে সাহেব-সুবোরা সেগুলো আবার উল্টেপাল্টে দেখার অমূল্য সময় ব্যয় করলে হয়। আমার আবার এসবের বালাই নেই, নিশ্চয়ই খেয়াল কেউ কেউ করেছেন প্রোটেষ্টান্ট যাজক হয়েও ক্যাথলিক পাদ্রীদের সঙ্গে কাজ করতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না কিন্তু এটা বুঝতে পারিনা নীলকর সাহেবদের বাঙালি চাষাভুষাদের ভালোবাসতে এত আপত্তি কেন হয়! এরা এখনও সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে শেখে নি। বুঝলে এমিলি, বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা নীল কমিশনের সামনে আমার বক্তব্যকে মান্যতা দিয়েছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না যদি না পল্লীগ্ৰামে ভারতীয় জেলাশাসক নিয়োগ না হয়, দেশজ পত্র-পত্রিকার বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। হরিশচন্দ্র বললেন, শুনেছেন লঙ, কাঙাল হরিনাথ নাকি নীলকর সাহেবদের অমানবিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন অথচ তিনি তাঁর ‘গ্ৰামবার্তা-প্রকাশিকা’ পত্রিকায় সিপাহী বিদ্রোহের সময় রাজস্রোত্র লেখেন। সে কথা যদি বলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রামগোপাল ঘোষ, রমা প্রসাদ রায়ের মতো নেতৃবৃন্দ মিছিলে হেঁটেছিলেন, তাতে দোষের কিছু নেই, ঘটনার প্রেক্ষিত নিয়ে ঘটনার মূল্যায়ণ হয়, মানুষের মন বুঝতে সময় লাগে কিনা। এই দেখুন না সার্চ মিশনারি সোসাইটির কলকাতা শাখার সেক্রেটারি রেভারেন্ড কাথবার্ট যেমন আমার নীলবিদ্রোহ নিয়ে বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন কিন্তু ‘বেঙ্গল হরকরা’ কী বলেছেন জানেন, বলেছেন, ‘গত ষোলো বছর ধরে রাস্তায় ঘাটে এই পাদ্রী সাহেব যিশু খ্রিস্টের কথা বলছেন না, তিনি দেশদ্রোহিতার মন্ত্র ছড়িয়ে যাচ্ছেন।’ আমি মৌনতা অবলম্বন করেছি, নিজেকে বুঝিয়েছি নিন্দে করছে করুক, একদিন ভুল ভেঙে যাবে যদিও জানি এই সংবাদপত্রগুলো সরকারের অযোগ্যতার সমস্ত খবর গোপন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। হরিশচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমি কিন্তু ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এ কোনো আপোষ করি নি। তুলে ধরেছি গত পরশুর কাগজে কীভাবে রায়তরা প্রহৃত, কারারুদ্ধ, অপমানিত হয়েছে, ঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছে, গ্ৰামের পর গ্ৰাম জ্বালানো হচ্ছে, নারীদের চরম লাঞ্ছনা করছে, ঘরের সঞ্চিত শস্য নষ্ট হচ্ছে। হরিশচন্দ্র, আপনি নিশ্চয়ই খবর রেখেছেন এই জনমত ক্রমগাত জোরালো হচ্ছে যে – নীলকর সাহেবদের বেপরোয়া অত্যাচার মুসলমান আমলের অত্যাচারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে অথচ সরকার ও প্রশাসন উদাসীন। আমি আর একটা কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি বাংলার জমিদার শ্রেণি সাধারণত কৃষকদের জ্ঞানার্জনের বা চিন্তার স্বাধীনতা বা কাজের স্বাধীনতা সংক্রান্ত যে-কোনো আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। তারা উচ্চতম স্তরের নাগাল পাবে কোথায়, নির্ভর করে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও থানা-পুলিশের উপর। লঙ, আমি এইকথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করেছি নীলকরদের দাদন দিয়ে নীলচাষ করিয়ে নেবার ফন্দিতে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে কারণ আপনিও বলেছেন বাংলার কৃষকরা আর ক্রীতদাসের মতো মুখ বুজে সব অন্যায় মাথা পেতে নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত নয়, নীলচাষ করে তারা উপযুক্ত অর্থ পায় না, বরঞ্চ শ্রমিকের কাজ করে বেশি অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছে।
বুঝলেন হরিশচন্দ্র এর ফল সরকারের বিপক্ষেই যাবে। জনমত বিরোধী হয়ে উঠলে স্বয়ং ইংলেণ্ডেশ্বরী এই মাটিতে নেমে আসলেও রাজত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলা ভাষার পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনাবলী উপেক্ষা করা সরকারের পক্ষে নির্বুদ্ধিতার কাজ হবে। সরকারের কাছে আমার আবেদন থাকবে মানবিকতা ও সুশাসনের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে সরকারের এই বিষয়ে খুব দ্রুত সমুচিত ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা উচিত তাহলে নিজেদের স্বার্থও রক্ষা হবে ও বিদ্রোহের সম্ভাবনাকেও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। হরিশচন্দ্র দাঁতে পেন্সিল কামড়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, লঙ আপনার যুক্তি উপেক্ষা করার মতো নয়। আমি তো সরকারকে বারে বারেই সাবধান করছি কোর্টের আমলাদের ভূমিকা, রাজ্যের পুলিশের কার্যকলাপ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের চরিত্র প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজগুলোতে ভর্ৎসিত হচ্ছে। আমার জ্ঞানে গত ষোলো বছর ধরে নীলচাষ দেশীয় সংবাদপত্রতে আলোচিত হচ্ছে এবং এতে সাধারণ মানুষও আলোড়িত হচ্ছে। লঙ, বাংলার গভর্নর সেক্রেটারি কমিশনের সভাপতি ডব্লিউ এস সিটন-কার আপনাকে সমর্থনও করেছেন। হ্যাঁ ‘হিন্দু প্যাট্রিয়টে তো ছাপাও হয়েছে এই পুস্তিকাটি ‘বাপ্রে বাপ! নীলকরের কী অত্যাচার।’ আমি উমাচরণ দে-র এই পুস্তিকাটির কথা কমিশনে উল্লেখও করেছি। এই পুস্তিকার ইংরেজি অনুবাদ সিটন-কার সাহেবের হাতে তুলে দিয়েছি। ডব্লিউ এফ ফার্গুসন নীলকরদের প্রতিনিধি হয়ে ‘ইন্ডিগো কমিশন’-এ বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। বুঝলেন লঙ, সম্পূর্ণ ঘটনাটা বাংলার গর্ভনরকে বিশদভাবে জানালে একটা সুরাহা হতে পারে। আমি ইতিমধ্যেই গর্ভনর গ্ৰান্ট সাহেব এবং তাঁর সেক্রেটারি সিটন-কার-এর কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাংলার নীলচাষীদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছি। গর্ভনর সাহেব বলেছেন, ‘ রেভারেন্ড লঙ, কোনো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তো আপনি নীলকর সাহেবদের আচরণের বিরোধিতা করছেন না।’ এমিলিও আমাকে এই কাজে সাহস যুগিয়েছে। লঙ এই কাজে আমিও সম্পূর্ণভাবে আপনার পাশে আছি। তাছাড়া আপনি তো সমাজতাত্ত্বিকের ভূমিকা পালন করছেন। হ্যাঁ আমি অনুভব করছি ভারতবর্ষের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে জাগরণের লক্ষণগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, অধিকার সচেতনতার ঢেউ এসেছে। একে কাজে লাগাতে হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীও যুক্তিবাদী শ্রেণিচেতনা নিয়ে মনুষ্যত্বের অবমাননার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। আমার নীলচাষ সম্পর্কিত লেখায় আমি এই ধারণাই প্রকাশ করেছি। সিপাহী বিদ্রোহের প্রভাবকেও জনমতের প্রশ্নে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপনার সঙ্গে আমি সহমত লঙ শুধু তাই নয়, আমি উইলসনের আইনের তীব্র সমালোচনা করি। বেয়নেটের ডগায় কৃষকদের ভয় দেখিয়ে জোর করে তাদেরকে দিয়ে নীলচাষ করানো ঘোরতর অপরাধ। হরিশচন্দ্র জানেন তো আপনি বেঙ্গল হরকরা পত্রিকা আমাকে আক্রমণ করে কী লিখেছে। কী লিখেছে বলুন তো? নিজ মুখে উচ্চারণ করতে সংকোচ হচ্ছে, লিখেছে, আমি নাকি গত ষোলো বছর ধরে রাস্তায় ঘাটে যিশু খ্রিস্টের কথা বলছি না, দেশদ্রোহিতার মন্ত্র ছড়িয়ে যাচ্ছি। লঙ, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ওদের গায়ে জ্বালা ধরেছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে, আপনি ঠিক পথেই চলছেন।
এমন যন্ত্রণা দগ্ধ সময়ে একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি যে আমার হাতে পৌঁছে যাবে আমার কল্পনাতেও ছিল না। যে প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি দিনরাত হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম তারই উত্তর স্বপ্নের মতো দোলা দিতে লাগল। এক একটা পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি আর শিউরে উঠছি। শব্দ আর বাক্য তো নয় যেন জ্যান্ত মানুষগুলো আমার চোখের সামনে ঘোরাফেরা করছে। খালি মনে হচ্ছে সমাজের মানুষগুলো আমাকে প্রশ্ন করে এক্ষুনি জবাব চাইছে, অথচ কোনো জবাব আমার কাছে তৈরি নেই। অগত্যা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য নাটকটি অর্থাৎ ‘নীলদর্পণ’-এর লেখক আমারই প্রাক্তণ ‘চার্চ মিশনারি সোসাইটি’র ছাত্র বর্তমানে ঢাকায় ব্রিটিশ সরকারের ডাকবিভাগে কর্মরত দীনবন্ধু মিত্রকে লিখলাম – এমন সব ঘটনা তুমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছ, নীলকর সাহেবদের হাতে নিরীহ মানুষগুলোর প্রতি এমন নির্মম অত্যাচার ও নিপীড়নের তুমি নিজে সাক্ষী হয়েছো? যে উত্তর এসেছিল কয়েকদিন পরেই, আরও ভয়াবহ আরও মারাত্মক, আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল, কি করব আর কি না করব ভেবে ওঠার আগেই এমিলি সমাধান বাঁচলে দিল। বলল, এই মানুষগুলোকে যে কোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে। তুমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে এমন জায়গায় পৌঁছে দাও, যাতে কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে পারে, নিরীহ পল্লী চাষীদের উপর নীলকরদের এমন অসহনীয় অভব্য আচরণ কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না। আমি ভালো করেই জানি নালিশ জানালে নীলকুঠির সাহেবেরা আমাকে ভারত ছাড়া করবে। ওরা চাষীদের ক্রীতদাস বানিয়ে রেখেছে, নারীদের ইজ্জত লুটেছে। এরাই আবার নিজেদের সভ্যজাতি বলে মনে করে। এর নাম শাসন, না শোষণ, ইংরেজ প্রশাসনকে এর জবাবদিহি করতে হবে। নীল কমিশন নীলচাষ ও নীলকরদের জন্য তেমন কিছু নিয়ম বেঁধে না দিলেও, জেলাগুলোকে আরো বেশী মহকুমায় বিভক্ত, সর্বত্র আদালত প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বটে, সৈন্য মোতায়েন করেছে বটে, সুবিচার তো পেল না। মনে মনে ঠিক করে নিলাম কাল-ই গভর্নর গ্ৰান্ট সাহেবের সেক্রেটারি ও নীলকমিশনের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট সিটন-কার-এর সঙ্গে ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি নিয়ে আলোচনা করবো। ওর সুচিন্তিত মতামত জরুরি। আমার ভাবনা অনুযায়ী কাজ হলো। আমি বাংলা ভাষা জানার ফলে তর্জমা করতে সুবিধা হলো। তিনি আলোচনা প্রসঙ্গে জানালেন অতি শীঘ্রই গর্ভনর গ্ৰান্টকে নাটকটির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলবেন। পরদিন গ্ৰান্ট সাহেব সিটন-কারকে জানালেন তিনি দ্রুত নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ চান। কিন্তু মুশকিল হলো নাটকটির অনুবাদ করবেন কে? এমিলি বলল, এমন একজন লেখককে নির্বাচন করতে হবে যিনি বাঙলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই সমান দক্ষ, একমাত্র তাহলেই এর মর্মার্থ বিদেশীরা উপলব্ধি করতে পারবেন। এমন দুরূহ কাজ মধুসূদন দত্ত ছাড়া আর দ্বিতীয় কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। কাকতালীয় ভাবে মাইকেল তখন মাদ্রাজ থেকে খিদিরপুরে এসেছেন। গিয়ে দুপুরবেলায় হাজির হলাম। চেয়ারটা টেনে বসতে দিলেন, বলুন রেভারেন্ড লঙ কী মনে করে অসময়ে? বললাম, আপনার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি, ফেরাতে পারবেন না। প্রস্তাবটা রাখতেই প্রথমে নিমরাজি হলেও আমার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না। বললেন, আমি নীলচাষ ও নীলকরদের সম্বন্ধে এতটা ওয়াকিবহাল নয়, আচ্ছা চেষ্টা করে দেখব, তাছাড়া দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা আর ‘ বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নিয়ে খানিকটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। দীনবন্ধু মিত্র’র নাটকটি সম্বন্ধে সংক্ষেপে জানাতে উৎসাহিত হলেন। বললেন, কলিকাতার দুই-তিনজন বন্ধু আমাকে ‘নীলদর্পণ’ নাটকের কথা জানিয়েছে, হয়ত আপনার মুখ থেকে শুনে থাকবে।
মাইকেল মধুসূদন একদিন নিজেই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আমাকে সুখবরটি দিলেন। রেভারেণ্ড লঙ, অবশেষে আপনার কথা রাখতে পেরেছি। বললাম, কী নাম দিয়েছেন? বললেন, ‘Nil Durpan or The Indigo Planting Mirror’, জানিনা বিদ্বজ্জনরা পড়ে কি বলবেন, তবে লেখকের লেখার মুন্শিয়ানা আছে, নাটকটি জনপ্রিয় হবে, একথা বলতে পারি। কিন্তু ইউরোপীয়ান সাহেবদের আঁতে ঘা লাগবে। বললেন, ঢাকা থেকে বাংলায় ছাপা হয়েছে শুনেছি। নামের জায়গায় তো লিখে দিয়েছেন ‘নীলকর-বিষধর- দংশন- কাতর- প্রজানিকর- ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভি- প্রণীতং’। প্রকাশকের নাম কিছু ভেবেছেন? বললাম, না। তবে মুদ্রকের নাম নিয়ে ভেবেছি – Calcutta/C H Manuel, Calcutta Printing and Publishing Press No. 10, Weston’s Lane, Cussitollah/1861। মাইকেল আমার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে ভুললেন না। ইংরেজি অনুবাদ ছাপার কাজ শেষ হওয়ার সংবাদ শুনে অনেকটাই স্বস্তি পেলাম। এমিলি’র মনটাও শান্ত হলো। বললো, এবার একটা সুরাহা হওয়ার অন্তত সম্ভাবনা তৈরি হবে কারণ আমি বিশ্বাস করি ইংল্যান্ডের শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে এবং সরকারকে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত জানাবেন এবং নীলকরদের উপর চাপ তৈরি হবে। আমি এমিলিকে বললাম, এর যাবতীয় কৃতিত্ব দীনবন্ধু মিত্রের। এমন হৃদয়স্পর্শী সংলাপে গোটা ঘটনাকে নিয়ে নাটক না লিখলে বোধ হয় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির গর্ভনরও নড়েচড়ে বসত না। গুয়াতলীর মিত্র পরিবারের দুর্দশার চিত্র বড় বেদনাদায়ক। সিটন-কার আমাকে বললেন, সামান্য কিছু কপি ছাপা হলে আসল উদ্দেশ্য সাধন হবে না, কমপক্ষে পাঁচশত কপি ছাপানো হোক। গ্ৰান্ট সাহেব আগে নাটকের মূল বিষয়বস্তু শুনেছেন কিন্তু ইংরেজি অনুবাদ পড়ে তিনি আতঙ্কিত হন। হরিশচন্দ্র বললেন, দীনবন্ধু মিত্রের লেখকের মুখবন্ধে ‘সরল ভাষা কিন্তু সত্য ঘটনা’ এই কথাটায় শিলমোহর দিয়ে আপনি সাধারণ ইংরেজ জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছেন এ নাটক নাটকের বানানো গল্প নয়, জীবন থেকে তুলে নেওয়া বাস্তব অবস্থার সঠিক প্রতিফলন। তাছাড়া নীলকর সাহেব আর তার কর্মচারীদের অত্যাচার, নৈতিক অধঃপতন, মিশনারি পাদ্রীদের যে নির্মল ও মানবিক চিত্র আঁকা হয়েছে তা যথাযথ। আমার মুখবন্ধে আমি বলতে চেয়েছি যারা দুর্বল তাদের অসহায়তার কথা নীলদর্পণ নাটকে বলা হয়েছে। কেমন ভাবে একজন ভদ্র রায়ত নীলচাষের পূর্বে নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে নিজের জমিতে চাষাবাদ করে দিন কাটাচ্ছিল, নীল চাষ কিভাবে দাদন নিতে বাধ্য করল যাতে নিজের জমিতে নিজের ফসল উৎপাদন উপেক্ষা করতে হলো। শেষ অবধি তাতেই সে সর্বস্বান্ত হল এবং ভূমিদাসে পরিণত হয়ে শেষে ভবঘুরেতে পরিণত হলো। সর্বদাই নীলকর সাহেবদের পক্ষে জেলাশাসকদের বিচার যায়। নাট্যকার নীলের চুক্তির আইনি স্বীকৃতির বিসময় ফলের উল্লেখও করেছেন নাটকে। হরিশচন্দ্র এ-ও বললেন, এই মুখবন্ধ ইউরোপীয় পাঠকের কাছে হলো আসল রথী, ‘নীলদর্পণ’নাটকটি কেবল চলমান রথ।
অনেক আলোচনার পর সরকারি খামে বইগুলি বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি ইংল্যান্ডেও পাঠানো হয়। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে ব্রিটিশ প্রশাসন ও শাসনকর্তারা কি তাঁদের দায় এড়াতে পারেন? আমি চক্ষুশূল হয়ে উঠলাম ‘ইংলিশম্যান’ ও ‘বেঙ্গল হরকরা’ পত্রিকা দুটির যারা প্ল্যানটারদের হয়ে সব সময় লড়াই করে চলেছে। ওরা আমার বিরুদ্ধে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করতে শুরু করেছে। আমি তাতে দমে যাবার পাত্র নই। দীনবন্ধু মিত্র তার ভূমিকায় লিখতে কার্পণ্য করে নি – ‘সম্পাদক-যুগল সহস্র মুদ্রালাভ পরবশ হইয়া উপায়হীন দীন প্রজাগণকে তোমাদের করার কবলে নিক্ষেপ করিবে আশ্চর্য কি?’ ল্যান্ডহোল্ডার্স অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মি. ফার্গুসন নীলকরদের প্রতিনিধি হয়ে বাংলার সরকারের কাছে জানতে চান যে এমন ‘ক্ষতিকর, বিদ্বেষপূর্ণ মিথ্যা প্রচার নীলচাষ সম্পর্কে কারা করেছে!’ তিনি মনে করেন এই মিথ্যা প্রচারের উদ্দেশ্য দেশদ্রোহিতার ইন্ধন জুগিয়ে শান্তিভঙ্গ করা। নীলকর সাহেবরাও কম যায় না। তারা এই নাটকের লেখক ও প্রকাশক কে জানার জন্য কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। মুদ্রক ম্যানুয়াল সাহেবকে ধরে আনা হয়। আমি ম্যানুয়ালকে সত্যি কথাই বলতে বললাম যে আমি-ই
তাঁকে নাটকটি ছাপানোর জন্য নিয়োগ করেছি। কোর্টে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় জানিয়েছি যে দেশজ পত্রপত্রিকায় কী লেখা হচ্ছে সেটাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারিনা। আমি চিরদিন সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনের নজর এনেছি। কারও বিরুদ্ধে আমার কোন বিদ্বেষ নেই। আমি চাই সুশাসন ও সরকারের সুনাম। সেই সুনাম বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোন ঘটনা আমার চোখে এলে আমি সেটা কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে আসাকে কর্তব্য বলে মনে করি। একই উদ্দেশ্যে আমি এই বাংলা নাটকটির বিষয়বস্তু যাতে প্রশাসকরা বুঝতে পারেন সেই জন্য এটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছি। যা হবার তাই হলো। স্যার মর্ডান্ট ওয়েলস্ এর এজলাসে আমার বিচার শুরু হলো। ঝানু আইনজীবী পিটারসন নীলকর সাহেবদের পক্ষ হয়ে সওয়াল করলেন। তিনি নিজের বক্তব্য পেশ করে বললেন যে আমি-ই এই নাটকের লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক। তিনি আরো বললেন এ নাটক কেবল ইংরেজ নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে বা দুজন পত্রিকা-সম্পাদকের বিরুদ্ধে নয় – এ নাটক প্রতিটি ইংরেজ ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে আক্রমণ। আমি বিবৃতিতে বললাম আমি একজন মিশনারি, স্থানীয় দেশ ভাষায় প্রকাশিত পত্রপত্রিকায় স্থানীয় অধিবাসীদের যে মনোভাব ফুটে ওঠে তার ব্যাখ্যাতা। এদেশের ইউরোপীয় অধিবাসীগণ যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন এমনটি আমি চাই এবং আমি তাঁদের সুহৃদ। আবার এদেশের স্থানীয় অধিবাসীদের সামাজিক উন্নয়ন ও প্রগতির আমি একজন বড় বন্ধু – আর সেইজন্যই আমার ‘নীলদর্পণ’ প্রকাশনার প্রয়াস।…আমি অনূদিত গ্রন্থটি প্রধানত ব্রিটিশ আইনসভার সঙ্গে সংযুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে প্রচার করেছি যাতে করে যে-কোনো দেশ বা বা যে-কোনো বর্ণের মানুষই নিপীড়িত হন না কেন সেই দেশ বা মানুষ সহানুভূতি ও প্রতিকার পেতে পারেন। গত ১০ বছর আমার অবসর সময়ে লক্ষ্য ছিল এদেশের অধিবাসীদের আধ্যাত্মিক সামাজিক ও বৌদ্ধিক কল্যাণ ভাবনা সম্পর্কে তাদের নিজেদের কি মত সে সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা।…নীলদর্পণে ইংরেজ মহিলাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর অভিযোগে আমি অভিযুক্ত। এই প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই প্রাচ্যের ধারণায় কোন মহিলার পক্ষে সর্বসমক্ষে মুখ দেখানো অথবা কোন পুরুষ মানুষের সঙ্গে ঘোড়ায় চলে যাওয়া খুবই অশোভন। আমি নিজে আমার স্ত্রী সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতে শুনেছি। আমি কিন্তু এই মন্তব্য কে গ্রাম্য অজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছি। কলকাতা কি সিপাহী বিদ্রোহের থেকে পাওয়া শিক্ষা ভুলে গেছে? নীল চাষকে কেন্দ্র করে যে বিষয়টি সমস্ত দেশকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে এবং যার ফলে সমস্ত দেশে সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগের ঘটনা আর গুপ্তহত্যা হয়ে চলেছে সেই সম্পর্কে এদেশের মানুষের চিন্তা ভাবনার কথা প্রকাশক শ্রেণীর কাছে প্রকাশ করে দেওয়া কি কোন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কাজ?… একজন মিশনারী হিসেবে আমি চাই আমার দেশবাসীর ত্রুটিগুলি সংশোধিত হোক। ভারতবর্ষে ২০ বছর থাকার পর আমার কাছে এই সাক্ষ্য প্রমাণ আছে যে ভারতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে যত বাধা আছে তার মধ্যে অন্যতম বড় বাধা হলো আমার দেশের অনেক মানুষের অধার্মিক আচরণ, আমাকে এই দেশের হাজার হাজার মানুষ বলেছে, ‘আপনার দেশের মানুষের কাজের দ্বারাই আমরা খ্রিস্টধর্মকে বিচার করে থাকি, তারা কি বলেন, তার দ্বারা নয়; তাঁদের জীবনযাত্রার দ্বারা খ্রিস্টধর্ম বিচার্য, নীতি কথার দ্বারা নয়।’ যাইহোক মহামান্য বিচারক মহোদয়, আদা রস সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ কাজ মিথ্যা ও মানহানিকর এবং আমার কর্তব্য সেই রায় মাথা পেতে নেওয়া। কিন্তু আমি যতদিন বাঁচবো আর আমার লেখার মত একটা কলম থাকবে আমি নিপীড়িত রাতের পক্ষ নিয়ে লিখে যাবো। অবশেষে রায়দানের সময় বিচারক উল্লেখ করেন আমি একজন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী যাজক সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ায় আমার অপরাধ অনেক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং আরো মন্তব্য করেছেন বহু ইউরোপীয়র অধর্মাচরণ এদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পথে বড় বাধা – একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আদালত আমাকে দোষী সাব্যস্ত করলেন এবং জুরিরাও মনে করলেন না, এই কুৎসা পূর্ন বইটি প্রচারের উদ্দেশ্য সমাজে স্বার্থরক্ষা। কয়েকজন নীলকর সাহেবের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করার জন্য এই বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। আমি বন্ধুমহলে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে এদেশের মানুষের অনুভব সম্পর্কে উদাসীন অজ্ঞ থেকে এই দেশে ভাস্করা ইংরেজদের পক্ষে কতখানি বিপজ্জনক। যাঁরা মনে করেছিলে বিপদ এখনও অনেক দূরে, আমি সেই দলে নই, বছরের পর বছর সেদিকে চোখ বন্ধ করে পারিনি আমি। যদি আমি রায়তদের অভাব-অভিযোগের কথা আর যন্ত্রণার কাহিনি যাঁদের প্রতিকারের ক্ষমতা আছে তাঁদের নজরে না আনতাম এবং সেইসঙ্গে এদেশের মানুষদের অনুভব ও অভিমতের কথা তাঁদের কাছে প্রকাশ না-করতাম তাহলে আমার দিক থেকে সেটা কি বিশ্বাসঘাতকতার কাজ হতো না? হয়তো তারপরেও বিচারক মহোদয়রা ভেবে নিয়েছেন আমি জনস্বার্থ রক্ষার কাজ করিনি, তাইতো এই দন্ড। বিচারে আমার একমাস কারাবাস ও এক হাজার টাকা জরিমানা হলো। নীলকরদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ এমন হয়েছে যে জরিমানার হুকুম হওয়া মাত্র সুপ্রসিদ্ধ কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় জরিমানার হাজার টাকা গুণে দিলেন, আরও অনেক দেশীয় ভদ্রলোকও টাকা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যাসাগর চিন্তিত হলেন। রাধাকান্ত দেব, রমানাথ ঠাকুর, কালীকৃষ্ণ, প্যারীচাঁদ মিত্র, কিশোরীচাঁদ মিত্র, লালবিহারী দে, কালীপ্রসন্ন সিংহ, বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, আলেকজান্ডার ডাফ্ সহ সকল মনীষাকে উদগ্রীব উদ্বেগে একই মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিল এই বিচার। হাজার হাজার নিরন্ন, নিপীড়িত, নিরক্ষর, কৃষক খালি গায়ে দূর গ্রাম থেকে নতশিরে আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমার নিজের জন্য নয়, ওদের জন্যই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। ওরা এই ভেবে দুঃখ পেল যে ওদের সাহেব বাবার শাস্তি দিল বিচারক! সাধারণ জেলে পাঠাবার নির্দেশ থাকলেও প্রেসিডেন্সি জেলের তিনতলার আলাদা একটি ঘরে আমি সস্ত্রীক এখন বন্দী। দলে দলে সাধারণ লোক, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মচারী, দেশীয়প্রধান ও পাদ্রীরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। আমি আপ্লুত ও এমনি অভিভূত ভাবলাম এদেশের মানুষ আমাকে এতটাই ভালবাসে, এইরকম অনুরাগ তো ভারতের বড়লাট বাহাদুরের ভাগ্যে জোটে না। এমিলি কে বললাম, আমি কারাবাসের যন্ত্রণা ভুলে যাচ্ছি, খালি মনে হচ্ছে এনাদের এই প্রেম ও প্রীতির বিনিময়ে আমি তো এখনও কিছু করে উঠতে পারিনি। অথচ, কত কাজ করার বাকি আছে। কত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা প্রতি পদে পদে আমার কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিন্তু এই মানুষগুলোর যন্ত্রণা তো দূর করতেই হবে, তার জন্য দরকার শিক্ষার আলো ছড়ানো, ওদের মাতৃভাষায় অনেক ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশ হয়েছে বটে কিন্তু এইটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে, জ্ঞানের আরও শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটাতে হবে, গ্ৰামে গঞ্জে গ্ৰন্থাগার তৈরির বড় পরিকল্পনা রয়েছে আমার। কাজটা কঠিন, কিন্তু করতে হবে, মানুষের কল্যাণ-ই
তো আমার ব্রত, সেখানে আমি জাত ধর্ম দেশের বিভাজন দেখলে আমার হৃদয় কাঁদে, যিশু খ্রিস্টের বাণীতে মন উদ্বেল হয়ে পড়ে। ত্রিশ হাজার লোকের সইযুক্ত আবেদন পত্র জমা পড়েছে জেলের মেয়াদ কমানোর জন্য, মানুষের চোখের জলও হয়তো এই অক্ষরগুলোতে মিশে আছে কিন্তু তাই বলে বড়লাটের কাছে এই আবেদনপত্র না-পাঠানোর জন্যই আমি অনুরোধ জানিয়েছি। বলো এমিলি, আমি ঠিক করি নি? নিজের শাস্তি লাঘব করার জন্য এই প্রার্থনা জানানোর অর্থই হলো নিজেকে ছোট করা, আমি দেখতে চাই এই নীলকর আর ওদের ধামাধরা মানুষজন কত নিচে নামতে পারে। যিশু খ্রিস্ট অমানুষদের দ্বারা ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, আর আমরা সামান্য জেল-কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। এই বাংলার নীলচাষীদের দুঃখ-দুর্দশা চোখে দেখা যায় না আর আমাদের যন্ত্রণা তো সেখানে তুচ্ছ। এমিলি সহমত পোষণ করে আর বলে লঙ, তোমার এই উপলব্ধির আমি সমান অংশীদার। বুঝলে এমিলি, অনেক কথাই আমার কানে আসছে, চার্চ মিশনারি সোসাইটির একটা বড় অংশ আমার বিরুদ্ধে মিশন হাউসে নালিশ জানিয়েছে আমাকে বিতাড়িত করবে বলে। ওঁরা ভেবেছে এতে আমি আমার কথা বন্ধ করে দেব, কলম থামিয়ে দেব, কিন্তু ওরা জানে না, এর কোনটাই হবে না। নীলকর ও ওদের স্তাবকবৃন্দ, পাদ্রী ও স্বদেশীয়দের একাংশের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে নামবো, দেখি ওরা কতদূর যেতে পারে। লঙ, আমার একটা কথা শোন, তুমি সব কথা জানিয়ে লন্ডনে চিঠি লেখ। ওরাও জানুক, বাস্তব পরিস্থিতিটা আসলে কেমন চলছে, এতে ওদের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। আমি ইতিমধ্যেই জানিয়েছি আমি যেসব কাজ করছি তা পাদ্রী হাফ ও পাদ্রী ওয়াইলাইর সঙ্গে পরামর্শ করেই করছি।
এমিলি চিন্তিত হয়ে যখন দেখল লন্ডনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও বিরোধীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাচ্ছে। লঙকে বলে, তুমি বিচলিত হয়ো না। কী বলছ এমিলি, অস্থির হবো না, আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে ওরা মিথ্যাবাদী, রটনা করে ওদের উত্তেজিত করছে। কিন্তু লঙ, এখানে সময় দিতে গিয়ে তোমার ভার্ণাকুলার বিদ্যালয়ের যে ক্ষতি হচ্ছে, সে খেয়াল রেখেছ। এমিলি, আমাকে তো সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। চারদিকে ভ্যাপসা আবহাওয়া, ভালো করে যে নিঃশ্বাস নেব, ওরা এতটুকু জায়গা ছাড়ে নি। আমার স্বদেশীদের সঙ্গে মতানৈক্যে এতদ্দেশীয়দের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমার কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা। সরকারী আমলারা যাঁরা কয়েকমাস আগেও সমীহ করে চলতেন, যাঁদের হৃদ্য ব্যবহারে আহ্লাদিত হতাম তাঁরাও আমাকে এড়িয়ে চলে। স্বস্তির খবর, গর্ভনর-জেনারেল লর্ড ক্যানিং কলকাতার বিশপ ডঃ জর্জ কক্ষকে চিঠি দিয়ে বলেছেন, ‘ পাদ্রী জেমস্ লঙ মিশনারি কাজ থেকে বিতাড়িত করার যে চক্রান্ত চলছে তার অবিলম্বে বন্ধ করুন। লঙকে বিতাড়িত করলে দেশীয় সাধারণের মধ্যে তার প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া হবে। তাতে আইন শাসন ও শৃঙ্খলা পর্যন্ত বিঘ্নিত হতে পারে।’ শুনেছি ডঃ কটন আমাকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তাতে খানিকটা আস্বস্ত হয়েছি বটে কিন্তু অবস্থার খুব একটা হেরফের হচ্ছে না। ভাবছি, বিলাতের কর্তৃপক্ষকে ব্যাপারটা সবিস্তারে লন্ডনে গিয়ে জানিয়ে আসবো, সঙ্গে তোমাকেও নিয়ে যাব। তুমি রাজি তো? জানি, তোমার মেয়েদের পড়াশোনার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে, কিন্তু এছাড়া আমার কাছে দ্বিতীয় কোন উপায় নেই। এমিলি বললো, আমি বিবাহের পরে কখনো তোমার সঙ্গ ছেড়েছি যে এবার ছাড়বো। এমিলি বুঝলো, আমার কথায় ওঁর এই মুহূর্তে মনটা একটু হলেও শান্ত হয়েছে, একটু দিশাও খুঁজে পেয়েছে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
![]()
