তুষার বরণ হালদার

লেখক পরিচিতি 

তুষার বরণ হালদার নদীয়ার আড়ংঘাটা গ্রাম থেকে স্কুল শিক্ষা শেষ করে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা  সম্পন্ন করেন। পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি পান নদীয়া জেলার অসংগঠিত শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর গবেষণা করে । গবেষণা কর্মের ওপর ভিত্তি করে দুটি বই এবং  বিভিন্ন গ্রন্থ ও জার্নালে বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের জন্য তিন বার পুরস্কৃত হন। এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য। বর্তমানে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত দক্ষিণবঙ্গের একটি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক।

বিষয় পরিচিতি

(ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু বীর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাত্রিকার মুক্তির জন্য। তাদের মধ্যে অনেকের নাম আমরা জানি, তার থেকে বেশি না জানি আরও অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম। তাঁদের সংগ্রাম ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনে অমর হয়ে রয়েছে; অক্ষয় গাথা হয়ে বিরাজ করছে। অথচ তাঁদের সম্পর্কে সেভাবে কোন আলোচনা বা উল্লেখ চোখে পড়ে না। গান্ধী, নেতাজি, প্যাটেল, আজাদ বা ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, বিনয় – বাদল – দীনেশ এবং আরও বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে আমরা অবহিত। অথচ এর বাইরে যে বহু মানুষ ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছিলেন যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনে অসাধারন কৃতিত্ব, সাহস এবং আত্ম্যোৎসর্গের অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। কেতাবি অর্থে যাঁদের বলা হয় ‘Unsung Heroes’ তাঁদের কথাই আমরা  অবজ্ঞাত স্বাধীনতা সংগ্রামী, এই নতুন ধারাবাহিকে  নিয়মিত আলোচনা করব।)

জোড়া খুন ও শহিদ বিপ্লবী বৈকুণ্ঠ সুকুল (শেষ পর্ব)

ইতিমধ্যে দু বছর কেটে গেছে ১৯৩৪ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিক বৈকন্ঠ সুকুলকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলাবার জন্য আনা হয়েছে গয়া সেন্ট্রাল জেলে। তাকে রাখা হয়েছে ৭ ডিগ্রী কনডেমড সেলে। বিভূতি বাবুরা তা জেনেছেন। সুকুলরা জেনেছেন যে বিভূতি বাবুরা আছেন ওই ১৫ ডিগ্রির তিনটে পাশাপাশি সেলে। বিভূতি বাবুর বিস্ময়ের সীমা নেই সেদিনকার বালক দু চার বছরের অনন্য তপস্যাই হয়ে উঠেছেন দুর্জয় কিশোর, দিয়েছেন ধনুকে টংকার, অভিমন্যুর শক্তিতে কিশোর ঘটিয়েছেন আজ  ‘ নীরব তরণ ‘ ‘ মহা বরষার রাঙা জলে ‘। সকলকে পশ্চাতে ফেলে  যাত্রা। তার মহান অগ্রজের গৌরবে ভেবে ভেবে তন্ময় হন, তার দুটি চোখ চকচক করে।
   ফাঁসির পূর্ব দিন ১৩ই মে ১৯৩৪ সাল ৭ ডিগ্রি সেল থেকে সন্ধ্যায় আনা হবে সুকুলকে ১৫ ডিগ্রির এক নম্বর সেলে। এক নম্বর সেল থেকেই অপেক্ষিত ফাঁসির আসামিকে অতি প্রত্যুষে নিয়ে যাবার নিয়ম ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য। সেদিন অপরাহ্নে জেনারেল লকআপ নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই খোলা হবে। কয়েদিদের যার যার ব্যারাকে ও সেলে ঢোকানো হচ্ছে। বিভূতি বাবুরাও তালা বন্ধ হয়ে গেছেন সাত তাড়াতাড়ি। এবার বিভূতি বাবুর লেখার মর্ম উদ্ধৃত হচ্ছে:
   ” তখন সন্ধ্যা হয়নি, বিকেলটা সন্ধ্যার দিকে চলেছে, প্রচন্ড শীতে কম্বল কুর্তা গায়ে চড়িয়ে লোহার গড়াদ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ঝনঝন আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে  বৈকুণ্ঠ  ১৫ ডিগ্রির করিডোরে ঢুকলেন চিৎকার করে বললেন  ‘ দাদা, আ গ্যয়া। “
   ” অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ জেলার ডেপুটি জেলার বড় জমাদার সেপাই শান্তি অনেকে সবাই মিলে মহাসমারোহে  তাকে নিয়ে এসেছে এক সেল থেকে অপর আর এক সেলে ।এক নম্বর সেলে ঢোকাবার সময় ফাঁসির আসামির শিকল বেরি কেটে দেওয়ার নিয়ম। জেল মৃত্যু পথযাত্রীদের জন্য এইটুকু মমতা দেখানোর বিধান আছে। কিন্তু সুকুলজির বেলায় তার ব্যতিক্রম, এখানে মহা শক্তিমান ব্রিটিশ রাজ মায়া-মমতা দেখাতে অনিচ্ছুক। সুকুলজির পায়ের বেরি কাটা হলো না। শৃঙ্খলিত সিংহ গহ্বরে ঢুকে গেলেন। জানিনা এই শিশুর চোখে কি ওরা বন্দী প্রমিথিউসের চোখের আগুন দেখেছিল! “
   ” আমি সে যুগে গান গাইতাম বেশ জোড়ালো কন্ঠে। স্বদেশী গান গাইতাম মোজাফফরপুর জেলে ক্ষুদিরামের ভাঙা সেলে বসে ওই জেলের গরাদের নিচে বসে বহুবার ‘ হাসি হাসি পরব ফাঁসি ‘ গানটি গেয়েছি। জেলের বাইরে যখনই এ গান গেয়েছি গান শেষ না হতে কেউ চলে যেতে পারত না। গানের ভান্ডার আমার কাছে ছিল বাংলা, হিন্দি, উর্দু সহ বহু গানের। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুরু করেছি গান, গরাদ ধরে আকাশের পানে তাকিয়ে কাঁদছি। গান গাইছি আমার মন প্রান দিয়ে। পূর্বগামী ক্ষুদিরামের গান শুনতে চাইছেন অনুগামী নবীন ক্ষুদিরাম যার কণ্ঠে ঘাতক এসে পড়াবে ফাঁসি। বহুক্ষণ ধরে গাইলাম গান, মগ্ন হয়ে শুনছে এক নম্বর ছেলের মৃত্যুঞ্জয়ী বালক। আমার পাশের সেলের সংগ্রামী বন্দিরা, সমগ্র জেলের সকল কয়েদি কারুর চোখে সে রাত্রে ঘুম ছিল না, ঘুম ছিলনা সিপাহী মন্ত্রী পাহারাদার অফিসার কারো চোখে। একটা দ্যোতনার অসহায় আবর্তে সবার বুকে ঝড় তুলেছিল। সে ঝড় নির্বাক চোখের আগুন অশ্রু হয়ে ফুটে উঠেছিল। আকাশের চেয়ে থাকার ও অন্ধকারের স্তরে স্তরে চোখের জলের ভাষা, সে ভাষার উত্তাপ অতি গভীরে লুকায়িত। গান শেষ হলো সুকুল বললেন দাদা এবার বাঁশি শুনবো। বিভূতি বাবু বললেন, বাঁশি কোথায় পাব জেলখানায়। একটা খালি দেশলাইয়ের খোল আর এক টুকরো পাতলা কাগজ হচ্ছে আমার ইমপ্রোভাইজড বাঁশি । সুকুলজি বাঁশির সুর শুনে বলল সুরটা ভারী কোমল। আমি বললাম, এটা বিসমিলের সব ফরোসিকা তামান্নার সুর। সুকুল যেন লাফিয়ে উঠলো! বলল গানটার সব পদ তার মনে আছে? বললাম গাইছি:
     ” সব ফরোসী কি তামান্না অব হমারে
                 দিল মে হ্যায়।
     দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু এ
                  কাতিল মে হ্যায়।। “….
বিভূতি বাবুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে চলেছেন সুকূলজিও। বিভূতিভূষণ আর সুকুলজিও তার সঙ্গে শেষের চারটি লাইন গাইলেন –
     ”  অবনা অগলে ওয়ললে হ্যায় আউর
                  না আরমনো কি ভীর।
         সিরফ মার মিটনেকি হসরত আপ
                  দিলে এ বিসমিল মে হ্যায়।। “

   এদিকে রাত আরো এগিয়ে চলেছে। ওয়ার্ডররা চলে গেল। কঠিন বুটের  শব্দ অন্যদিনের মতো হলো না, আজ অতি শান্ত মনে তাদের চলাফেরা। এ ঘরে রজনীর স্তব্ধতা বিঘ্নিত করবার দম্ভও নেই ব্রিটিশ পুলিশদের। ইতিমধ্যে আবার নিশীথের নিরবতা ছিন্ন করে সকল বন্দীরা বিভূতি বাবুকে গাইতে বললেন রবীন্দ্রনাথের সেই গান। বিভূতি বাবু বললেন ওটা তো গান নয় কবিতা। সুকুলজি জোর করলেন – নানা ওটাই গাইতে হবে – ‘ মরণ হে মোর মরণ ‘। বৈকুণ্ঠ বাবু কবিতাকেই  গান হিসেবে গাইলেন:
            ” তুমি কারে করিও না দৃকপাত
                  আমি নিজে লব তব শরণ,
              যদি গৌরবে মরে ল’য়ে যাও
                  ওগো মরণ, হে মোর মরণ।। “
   এদিকে কখন যে ভোর চারটে বেজে গেছে জানিনা সুকু বললেন, দাদা সময় হইল নিকট। এখন এবার শেষের সংগীত হোক বন্দেমাতরম। একসঙ্গে এক নম্বর, আট নম্বর, নয় নম্বর সেলের আমরা সকলে সমস্বরে গেয়ে চললাম বন্দেমাতরম গান। বন্দনা শুধুমাত্র বন্দনা ছিল না, সে ছিল মহা মৃত্যু পূজার মঙ্গলা চরণ ভারত মাতার চরণে সমর্পণ। জেলের গেটের পেটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে পাঁচটা বেজে গেল শীতের ঊষা তখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। একসঙ্গে অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ 15 ডিগ্রির মধ্যে প্রবেশ করল। সুকল ডাক দিয়ে বললেন ‘ দাদা তবতো চালনা হে ‘। ক্রমে ক্রমে সমস্ত সেল পেরিয়ে সুকুলজি কে নিয়ে পুলিশ এগিয়ে চলল ফাঁসি মঞ্চের দিকে। সমগ্র জেলে সমস্বরে ধ্বনি উঠল বন্দেমাতরম। তারপর নিশ্চুপ পৃথিবী, মৃত্যুর পদ সঞ্চারে স্তব্ধ সবার কন্ঠ, কখনো শোনা যাচ্ছে বন্দে মাতরম, ভারত মাতা কি জয়। সেই ধনী মর্মে এসে লাগলো। মাঝপথে সে মহাগম্ভীর ধ্বনি থেমে গেল। আর কিছু শোনা গেল না, সমগ্র কারাগার প্রতিধ্বনিত করে আওয়াজ হল ” হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি …” মানুষের হাতল টানার এক মর্মর শব্দে সমাপ্ত হয়ে গেল এক তরুণ নটরাজের জীবন নৃত্য।                                                

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

সমাপ্ত 

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *