শরদিন্দু সাহা

লেখক পরিচিতি

বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই  বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।

বিষয় পরিচিতি

(রেভারেন্ড জেমস্‌ লঙ  যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)

              

আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী 

এমিলি আজ ঠাকুরপুকুরের দূরের গ্ৰামগুলো থেকে সবে ঘরে ফিরেছে, চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ কিন্তু উচ্ছলতার খামতি নেই। উদ্‌গ্ৰীব হয়ে জানতে চাইল – তোমার প্রবাদমালার কাজ কি অন্য কাজের চাপে চাপা পড়ে গেছে? বললাম, কেন বল তো! নতুন কোনো মেয়েদের প্রাণের কথা জেনেছ নাকি? বলল, ‘বাংলার মেয়েদের জ্ঞানবুদ্ধির সীমা পরিসীমা নেই, বলে কিনা, “লোভের নিকটে যদি ফাঁদ পাতা যায়। সাপ ব্যাং পশু পক্ষী কে কোথা এড়ায়।” এমন গভীর কথা পল্লী-বাংলার মেয়েদের মুখে মুখে ফেরে যে। ওদের ভাব প্রকাশের ভঙ্গি দেখে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। তোমার কি মত, আমি কি ভুল কিছু বলেছি, বল না?’ বললাম, তুমি যে কি অমূল্য রতন সংগ্ৰহ করে এনেছ, তুমি নিজেই জানো না। আমার প্রবাদ সংগ্ৰহে নতুন পালক জুড়ল। এমিলি তৃপ্ত স্বরে জবাব দিল, ‘আমি যে তোমার জীবন চর্চার সঙ্গিনী,  সবকিছু ভাগাভাগি করে নিতে হবে না, না হলে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে এত দূর এলাম কেন! তোমার প্রথম প্রবাদগ্ৰন্থ নিয়ে কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার কানে কানে কত কথা আসে, মিশনারি মর্টনের ‘দৃষ্টান্তবাক্য সংগ্ৰহ’-এর পরে তোমার কাজের প্রশংসা হচ্ছে। আমার মনে হয় কি জানো, এই কাজ থামালে চলবে না। এই প্রবাদের মধ্যেই রয়েছে প্রবাহমান জীবনের একতা। ইংরেজি প্রবাদ আছে না – ‘Men are all made of the same paste’।’ একদম খাঁটি কথা বলেছ এমিলি। দেশ হতে পারে ভিন্ন, মহাদেশ হতে পারে ভিন্ন, পৃথিবীর সংযোগে রয়েছে এক মহাপ্রাণ। প্রবাদমালার অন্দরমহলে রয়েছে সেই ঐক্যের সুর। এই যে ইতালীয় প্রবাদের কথাই বলো না – ‘শত্রু সরাইলে সকলেই সাহসী।’ এর সমভাবনায় বাংলা প্রবাদ হলো – ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’। আর একটা রুশিয় প্রবাদ শুনলেই তুমি অবাক হয়ে যাবে, যেমন ধর – ‘জাত মানুষ মাত্রেরই আহারের ব্যবস্থা আছে।’ এবার বাংলা প্রবাদের কথা বলি – ‘জীব দিয়েছেন যিনি, আবার দেবেন তিনি।’ কীরকম অদ্ভুত মিল না বলো। ধর্মভাবও আছে আবার বাঁচার মন্ত্রও কেমন যুক্ত হয়ে আছে। এই হলো প্রবাদের জোর। চলো, দুজনে মিলে বাংলার মেয়েদের অন্তরের ভাষাগুলো ওদের জন্যই বের করে আনি আর পৌঁছে দিই পাশ্চাত্যের দরবারে। ওরাও জানুক কোথায় রয়েছে সাদৃশ্য আর কোথায় রয়েছে বৈসাদৃশ্য। শীঘ্রই আমাকে বাবু নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। শুনেছি কাশীপুরের দিকেই থাকেন। তাই যেখানেই থাকুন আমি ঠিক খুঁজে নেব, বড্ড দরকার মানুষটিকে। প্রবাদের ভাণ্ডার নিয়ে সংসার সাজিয়ে বসে আছে যে।

হাঁটছি তো হাঁটছি, হেঁটেই চলেছি, হাঁটার যেন আর শেষ নেই। মানুষের খোঁজেরও কি শেষ আছে? চলার পথে অচেনা মুখগুলোকে ডিঙিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া। দিনকে বলি ফুরোস না, রাতকে বলি থেমে যা, আমি আমার জীবনকে এইভাবেই দেখি, এত কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হবে, নতুন মুখগুলো দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ছে আর বলছে, ‘কি রেখে গেলেন ওঁরা, আর কি পেয়েছি।’ কথার প্রতিধ্বনিতে উদ্‌ভ্রান্তের মতো পথের নিশানা মাপা। কেউ কি অপেক্ষা করছে, না আমারই সব ভ্রম। নবীনবাবু যেখানে বসে সময় গোনেন, সেই জায়গাটা আমি বিলক্ষণ চিনি। কিন্তু তিনি হন্তদন্ত হয়ে কলকাতার অদূরে এক পাঠশালায় পণ্ডিতদের সঙ্গে আজ কি কথা চালাচালিতে মগ্ন কে জানে। আমার হঠাৎ চলে আসায় বিব্রত হলেন কিনা জানিনা। প্রেসিডেন্সি কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন এইটুকু জানি কিন্তু মাঝে মাঝেই কোথায় যে ঢুকে পড়েন, কেউ আগাম আন্দাজ করতে পারে না। মন মতলবি আর কি, এই না-হলে কি জগৎ চেনা যায়, মানুষ তো দূর অস্ত। আচমকা ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, ‘ কি রেভারেন্ড লঙ, আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কি মনে করে।’ বললাম, নবীনবাবু, এই তো আর ইংল্যান্ড নয়, কলকাতা, কারও দর্শন পেতে গেলে না বলে কইয়ে আসতে মন্দ লাগে না। বললেন, ‘ আপনি যাজক মানুষ, যিশুর ভাবনায় মগ্ন থাকেন, যুক্তিবাদী , জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির সমর্থক। আপনার মনের তল পাওয়া কঠিন।’ বললাম, আপনি কম-ই বা কীসে! প্রখ্যাত পণ্ডিত ও গবেষক উইলিয়াম উইলসন হান্টার-এর গৃহশিক্ষক। মানুষ আপনাকে ‘নবীন পণ্ডিত’ বলে জানে। আপনি হলেন গিয়ে ‘দেবেন্দ্র সভা’-র অন্যতম রসিক ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। আপনি সেই পণ্ডিত যিনি ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার-এর ‘অ্যানালস অব রুলাল বেঙ্গল’-এ যে বাঁকুড়া, বীরভূম ও বিষ্ণুপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস সংকলন করেছেন, তার প্রধান সূত্র ও খসড়া লিখে দিয়েছেন। ‘সারাবলী অথবা ভারতবর্ষের ইতিহাসের সারসংগ্ৰহ’ আপনার-ই তো লেখা। ভারতবর্ষের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন, এমনভাবে কে আর দেখিয়েছে।  পুঁথি সংগ্ৰহে আপনার অবদানও তো কম নয়। বাঁকুড়া কালেক্টরিতে সংরক্ষিত রাজা গোপাল সিংহ লিখিত প্রাচীন পুঁথি আপনিই তো উদ্ধার করেন। হেসে বললেন, ‘আপনার এত প্রশংসার গূঢ় রহস্য কি আর আমি জানি না ভেবেছেন, জানি। আপনার প্রবাদমালার কাজ আমি অনেকটাই এগিয়ে রেখেছি।’ আপনার কেন বলছেন, বলুন আমাদের কাজ, আপনাকে বাদ দিয়ে এই কাজ করা সম্ভব নয়। চলুন, দুজনে একসঙ্গে চতুষ্পাঠিতে, হাটে-বাজারে ঘুরে দেখি, আরও কত প্রবাদ মুখে মুখে ছড়িয়ে রয়েছে। এই কাজ খুব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে, সবে তো আমরা অর্ধেক কাজ মাত্র শেষ করেছি। আমার কাছে প্রবাদের গুরত্ব অপরিসীম, শুধু মানুষের মনস্তত্ত্ব নয় – সমসাময়িক সমাজের দর্পণও বটে। ব্রাহ্মণ ও শূদ্রকে একই অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়, তৎসম ও দেশি শব্দের সহাবস্থান এই প্রবাদমালায়। 

এমিলি দু’চোখের পাতা এক করে না। মনেপ্রাণে চায় আমি সমাজ কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করি কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণ। মিশনারি যাজকরা চারদিকে জাল বিছিয়ে রেখেছে। এমনিতে ব্যঙ্গ- বিদ্রুপ তো কম করতে ছাড়ে না, সুযোগ পেলেই ইংরেজ সাহেবদের কান ভারি করে। তবু আমাকে সব সময়ই আগলে রাখতে চায়। নিজের ধৈর্য ও মেধা দিয়ে অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেও মুখ বুজে থাকে। বলে, ‘কত কাজ যে মাথায় চাপিয়ে তুমি চলাফেরা কর সে কি আর আমি টের পাই না ভাবো। এই তো কয় বছর আগে পর পর তিনটি গ্রন্থতালিকা প্রস্তুত করলে – ক্যাটালগ অফ দ্যা ভার্নাকুলার লিটারেচার কমিটির লাইব্রেরি, এ রিটার্ন অব দ্য নেইমস এন্ড রাইটিংস অফ ৫১৫ পারসন্স কানেক্টেড উইথ বেঙ্গলি লিটারেচার, আইদার এজ অথরস ওর ট্রান্সলেটর অফ প্রিন্টেড ওয়ার্কস, এ ডেস্ক্রিপ্টিভ ক্যাটালগ অফ বেঙ্গলি ওয়ার্কস এ ক্লাসিফাইড লিস্ট অফ ১৪০০ বেঙ্গলি বুকস এন্ড  পামপ্লেটস। আমি কি বুঝিনা কত পরিশ্রমের ফসল এই কাজ। তারপরেও তো ধাতুমলা প্রকাশ হলো। ‘অন দ্য ব্যাঙ্ক অফ ভাগীরথী’ লিখলে। এত পরিশ্রম শরীরে সইবে কেমন করে! তবু তুমি দিনরাত এক করে পরিশ্রম করে চলেছ নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে। আমার কিছু বলার নেই। শুধু যীশুর কাছে প্রার্থনা করি, তুমি জয়ী হও।’ এমিলিকে বললাম, তুমি এত বেশি ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। বাঁধা আছে বলেই না জয়ের স্বপ্ন দেখি। এমিলি বলল, ‘নবীন বাবু প্রবাদমালার নতুন কি দিশা দেখালেন? আমি ওঁকে জানালাম, আমরা দুজনে কীভাবে নতুন নতুন প্রবাদ সংগ্ৰহ করেছি, যেমন – ‘কন্যের মা কান্দে, আর টাকার পুঁটুলি বান্ধে। গৃহিণী ভাত পায় না, কুত্তা লাড়ে ঘাড়। চালুনী বলে সুঁচ, তুমি নাকি ছেঁদা। জপ নাই তপ নাই ভষ্ম মাখা গায়। যা সংগ্রহ করেছি, তার নমুনা তোমাকে শোনালাম। দেখলে তো প্রবাদে কেমন করে বাংলার মানুষের সুখ দুঃখের পাঁচালী ও মানসিক যন্ত্রণা কথা উঠে আসছে। এবার বুঝলে তো কেন আমি এই প্রবাদমালার পিছনে ছুটে বেড়াই। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য এই বঙ্গদেশ তথা ভারতবাসীর অন্তরের কথা আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করব। তবেই না বুঝব আমি শাসককে জীবনের কোন ফাঁকফোকরগুলো পূরণ করতে বলব, আর কোথায় ওদের ভুলের মাশুল দিতে হবে। এই দেশের মানুষের অনেক সম্পদ আছে, আবার অজ্ঞানতাও আছে, এই অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে হবে। আমাকে আগে বুঝতে হবে এই ভারতভূমি আসলে কেমন, কোন ধাতুতে গড়া। প্রবাদই হবে সেই বোঝার হাতিয়ার। এমিলি আমার কথা শুনে পলক না ফেলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখেও ঘোর স্বপ্ন। বললাম, নবীন পণ্ডিতের সঙ্গে কথা হয়েছে খুব শীঘ্রই আমরা যশোর নদীয়া বর্ধমান ভ্রমণে যাব। তোমার একা থাকতে কোন অসুবিধা হবে না তো। এমিলি বলল, ‘ না, না, আমি কি এত নরম মনের মানুষ যে সামলাতে পারব না। তাছাড়া আমার ছাত্রীরা রয়েছে তো, ওরা আমাকে মায়ের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। তুমি নিশ্চিন্তে যাও।’

বর্ধমান থেকে ফিরে এসে মনে হলো সময়টা একটু হলেও পাল্টেছে। পাল্টানো সময়ের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে এই পরিবর্তনের জোয়ারে একটু হলেও বেমানান লাগল। মনে হল এই পথে হাঁটব বলে তো আমি আসি নি, অন্য পথের সন্ধান আমাকে দিশা দেখাবে, গা ভাসালে চলবে না। কল্পনার নদীতে যখন ডুবুরি সেজে ডুব দিতে চাইছি, হঠাৎই দেখা পেয়ে গেলাম খিদিরপুরের এক অঞ্চলে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই মানুষটি তাঁর সৃষ্টিতে সেতুবন্ধন ঘটিয়েছে গুপ্তকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত আর এক শক্তিমান কবি মধুসূদন দত্তের সঙ্গে। ইতিহাস আশ্রিত বিষয়কে কাব্য রচনার বিষয় করেছেন। বললাম, আপনার ‘পদ্মিনী’ উপাখ্যান আমার সঙ্গেই রয়েছে। বললেন, ‘কেমন লেগেছে আপনার?’ প্রশংসায় পঞ্চমুখ না হয়ে ওঁর বিষয়ের দিকেই খানিকটা ঘুরে গেলাম।, বললাম, এত কবিত্ব শক্তি নিয়ে নিজেকে লালন করাই তো কঠিন। আলাউদ্দিনের চিতোর আক্রমণ এবং জহরব্রতে আগুন জ্বালিয়ে পদ্মিনীর আত্মাহুতি দানের কাহিনী জেনেই এমন হৃদয় বিদারক উপাখ কাব্য নির্মাণ করেছেন যেন এইমাত্র অকুস্থল থেকে ফিরেছেন। আপনাকে বাংলার মানুষ অনেকদিন মনে রাখবে। এখন বলুন তো এর পেছনের ইতিহাসটা কি। জানতে বড় কৌতুহল হচ্ছে। বললেন, ‘ কী যে উত্তর দেব আপনাকে যে নাকি  ইংরেজি, হিব্রু,গ্ৰিক, ল্যাটিন, ফরাসি, বাংলা, সংস্কৃত, ও ফারসি সহ মোট আটটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের জীবনী ও মহম্মদের জীবনী রচনা করেছেন, আমি তো সামান্য কটি কাব্য লিখেছি। রেভারেন্ড লঙ আপনি নমস্য ব্যক্তি।’ বললাম, আপনি মহাকবি কালীদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের অনুবাদ করেছেন, কলিকাতা মহানগরীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ‘কলিকাতা কল্পলতা’রচনা করেছেন, এরপরেও আপনাকে খাটো করে দেখার  জায়গা আছে কি? বললেন, ‘এ প্রসঙ্গে বলতে পারি, আমার কাব্য প্রতিভা যদি কিছু মাত্র বিচ্ছুরণ ঘটে থাকে  সেই জন্য আমি একশভাগ স্যার ওয়াল্টার স্কট, লর্ড বায়রন, টমাস মুরের কাছে ঋণী। আমি খুব মন দিয়ে এঁদের কবিতা পড়েছি।’ আপনার কাব্যে স্বদেশিকতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। আপনার হাত ধরে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে পুরোনো ধ্যান-ধারণা, আপনি ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। ভবিষ্যতের নতুন কাব্যধারার পরিবর্তনের ইঙ্গিত আপনার সৃষ্টিতে বিদ্যমান। আপনার ‘স্বাধীনতা’ কবিতার পংক্তিগুলি তো সবার মুখে মুখে ফেরে। আমিও মুখস্ত বলতে পারি, শুনবেন নিজের কবিতা একজন পাঠকের মুখে – ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব-শৃংখল বল কি পরিবে পায় হে, কে করিবে পায়।’ বললাম, আপনাকে একটা বড় দায়িত্ব নিতে হবে। আপনি তো জানেন, আমি প্রবাদ নিয়ে কাজ করছি। ‘হ্যাঁ, খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ, এই কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের চেতনার উন্মোচন হবে, ভারতবাসীকে সবাই আবার নতুন করে জানতে শিখবে।’ বললাম, সেই কারণেই তো বলছি আপনাকে আমি এমন একটা কাজের দায়িত্ব অর্পণ করব, যা আমার আপনার স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে এনে হাজির করবে। তিনি কাজের হালহকিকত জানতে চাইলেন। বললেন, ‘বাংলার প্রবাদ সংকলন, সম্পাদনা ও প্রবাদচর্চায় প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনার প্রয়োগ করেছেন আপনি।’ জানিনা কতটা করতে সক্ষম হয়েছি, তবে কিছুদিন হলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রবাদের তুলনা ও সাদৃ‌শ্য খোঁজার চেষ্টা করছি। এই কাজটি আমার একার চেষ্টায় সম্ভব নয়। আমি চাই বিদেশি প্রবাদমালাগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের পরিচয় ঘটাতে। জার্মানীয় প্রবাদ, ইতালীয় প্রবাদ, স্পেনীয় প্রবাদ, পর্তুগিজ প্রবাদ, ওলন্দাজী প্রবাদ, দিনেমার প্রবাদ, ফরাসি প্রবাদ ও সবির্বয়া দেশের অসংখ্য প্রবাদ আমি সংগ্ৰহ করে এনেছি আপনাকে দেব বলে। বললেন, ‘আমার কি ভূমিকা?’ বললাম, আপনিই সেই ব্যক্তি যিনি এই প্রবাদমালা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিতে পারবেন। ‘হ্যাঁ শুনেছি বিদেশি প্রবাদের সঙ্গে বাংলা প্রবাদের অনেক মিল। আপনি তো রুশ দেশীয় প্রবাদ ও চীনদেশীয় প্রবাদও সংগ্ৰহ করেছেন।’ যা করেছি বটে। এছাড়াও মালায়ালাম্‌, তামিল, পাঞ্জাবি, মারাঠি, ওড়িয়া, হিন্দি ও নীলগিরি প্রবাদমালাও আমাকে প্রভাবিত করেছে। যেমন ‘গাধাকে পরালে সাজ ঘোড়া নাহি হয়।’, ‘অমৃ‌তও অধিক পান করিলে বিষ হয়।’, ‘স্ত্রীলোক সন্নাসী ধর্ম নিলেও তার বাহন কুশন কমে না।’, ‘জ্ঞাতি কুটুম্বের সহ রাখব প্রণয়। কাষ্ঠ ভিন্ন ভিন্ন হলে অগ্নি নাহি রয়।।’,’ ধর্ম সমান সুহৃৎ নাই। মরণের সঙ্গী যে হয় ভাই।।’ ‘আপন ব্যয়ে উদর ভরে। ডোমে কিন্তু রসুই করে।।’, বললেন, আপনি কি মনে করেন বাংলা প্রবাদের পরে রাশিয়ান প্রবাদমালা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’ বললাম, কেন নয়! শুনলেই বুঝতে পারবেন – ‘এক বুদ্ধি ভাল, দুই বুদ্ধি আরও ভাল।’, ‘এক স্ত্রীকে এক হাট, দুই স্ত্রীতে একটি বাজার।’, ‘জমিদারের দয়া সদর দরজা পর্য্যন্ত।’ আরও যে কত প্রবাদমালা,  রাশিয়ান একাডেমির ভ্লাদিমির ডালের পঁচিশ হাজার রুশীয় প্রবাদের মহাসংকলনটি আমার সংগ্ৰহে আছে। আপনাকেই বাংলায় অনুবাদ করে দিতে হবে। ‘এত বড় দায়িত্ব আমি কি পালন করতে পারব? এই কাজ আপনাকে করে দিতেই হবে, কারণ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি মানব জীবনের শত প্রবাহের এক মেলবন্ধন বিশ্ববাসীকে এক সূত্রে বেঁধে দেয় এই প্রবাদ-স্পন্দন। তবেই তো বোঝা সহজ হবে এই প্রবাদের মিল কতখানি। ভবিষ্যতে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় আগামীতে প্রয়োজন হবে এই প্রবাদ মালা। ‘তা আপনি ঠিকই বলেছেন রেভারেন্ড লঙ, প্রবাদ সাধারণ জনগণের সম্পদই বটে। কথা দিচ্ছি আমি এই অনুবাদের কাজে অবশ্যই আপনার পাশে থাকব কিন্তু আপনার সাহচর্যও লাগবে।’ বললাম, আপনি যখনই আমাকে স্মরণ করবেন আমি উপস্থিত হয়ে যাব। 

একটা বিষয় আজকাল আমাকে প্রকৃত অর্থেই ভাবিয়ে তুলেছে – বাংলা সাহিত্যের এক নতুন ধারা, মুসলমানি বাংলা। মুসলমানি বাংলা বইগুলি আরবি ও উর্দুরীতির অনুসরণে ডান দিক থেকে লেখা শুরু হয়, যা প্রচলিত বাংলা রীতির বিপরীত। যদিও আমার আনুমানিক হিসাব – ৪৬টি ছাপাখানা থেকে বই ছাপা হয়েছে ২৫১টি, সংবাদ-সাময়িকপত্রের সংখ্যা ১৯টি, সংবাদ-সাময়িকপত্রের প্রচার সংখ্যা ৮১০০, মোট ছাপা বই-এর সংখ্যা ৪১৮২৭৫। খালি মনে হয় এই তালিকায় মুসলমানদের বাংলা ভাষার প্রতি ঔদাসীন্য দেখানো হয়েছে। এটি সংশোধন করা উচিত। এ ডেস্ক্রিপটিভ কেটালগ ও বেঙ্গলি ওয়ার্কস-এ আমি ৪১টি মুসলমানি বাংলা ব‌ই-এর উল্লেখ করেছি। এই নতুন ধারার বইগুলির নামও বিচিত্র – বেদারল গাফেলিন, হাজার মছলা, শরজু উজল, কেয়ামত নামা ইত্যাদি। আমার বিশ্বাস একশ্রেণির মুসলমানের কাছে বাংলা ও উর্দুর মিশ্রণে লেখা বইগুলি সমাদৃ‌ত হলেও এই নতুন ধারার সাহিত্য স্থায়ী হবে না। রিটার্ন্স রিলেটিং টু নেটিভ প্রিন্টিং প্রেসেস এন্ড পাবলিকেশন্স ইন বেঙ্গল-এ আমি একটি রীতি অনুসরণ করেছি। তালিকাটিতে প্রকাশের স্থান, প্রেসের নাম, মুদ্রিত বই ও সংবাদ-সাময়িকপত্রের নাম ও পরিচয়, সম্পাদকের নাম, মুদ্রণ সংখ্যা, বিক্রিত গ্রন্থের পরিমাণ ও বইয়ের দাম, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও মন্তব্য উল্লেখ করেছি। ১৯ টি সংবাদ-সাময়িক পত্রে লেখকের নাম থাকলেও সম্পাদকের নাম দিয়েছি। বই বিক্রির জন্য এক চমকপ্রদর ধারণা আমি অবলম্বন করেছি। যেহেতু নিয়মিত বইয়ের দোকানের সংখ্যা কম, আমি হকারদের যারা মাথায় বয়ে নিয়ে কলকাতার রাস্তায় এবং পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়, বিক্রির জন্য তাদের বই কমিশনে দিয়েছি। শত শত মানুষকে এই কাজে নিযুক্ত করতে পেরেছি। এ ডেস্ক্রিপটিভ কেটালগ অফ বেঙ্গলি ওয়ার্কস-এ যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তার লক্ষ্য হলো যারা শিক্ষা, হিন্দু রীতিনীতি, প্রথা অথবা চিন্তাধারার সম্যক পরিচয় পেতে আগ্রহী তাঁদের সাহায্য করা। ১৪০০টি বই ও প্যামফ্লেটের মধ্যে ৯১২টি আমি নিজে দেখিনি। এই ক্যাটালগে আমি অন্তর্ভুক্ত করেছি পাটিগণিত, অভিধান, ইতিহাস ভূগোল, নীতি-উপদেশ, সাহিত্য আইনগ্রন্থ, কাব্য- নাটক-গান, সংবাদ-সাময়িক পত্র, ধর্মতত্ত্ব, ঈশ্বরতত্ত্ব, পৌরাণিক সাহিত্য শৈব ও বৈষ্ণব সাহিত্য, মুসলমানি বাংলা সাহিত্য, এমনকি বাঙালি জীবনে পঞ্জিকার ভূমিকার জন্য পঞ্জিকাকেও সংযোজিত করেছি। আমি মনে করি দেশীয় মহিলারা খুবই বুদ্ধিমতী, অনেকেই তাদের স্বামী বা ভাইয়ের কাছে শিক্ষার পাট নেয়। যদি মহিলাদের সামনে ভালো বই রাখা না যায় তবে তারা খারাপ বই-এ আকৃষ্ট হবে। বাংলা ও সংস্কৃত শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ও  কায়স্থ শ্রেণীর লেখকরাই বাংলা বই লিখেছেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, যারা বই পড়তে পারেন না তারা শুনুন তাদের কাছে যারা বই পড়তে পারে।  নির্দিষ্ট বই আবৃত্তি করা ও সুর করে পাঠ করার জন্য কথকদের কখনো কখনো ভাড়া করা হয়। মেয়েরা গোল হয়ে বসে তাদের কাছ থেকে বইয়ের পাঠ শোনে। ব্রাহ্ম বা হিন্দু মেয়েরাই শুধু গদ্য রচনা উৎসাহ হননি, মুসলমান মেয়েরাও এগিয়ে এসেছেন। ক্রমশ কামিনীসুন্দরী, বামাসুন্দরী, কৈলাসবাসিনি, হরকুমারী রাখালমণি, বসন্তকুমারী, মার্থা সৌদামিনী সিং প্রভৃতি বাঙালি লেখিকাদের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধ কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছে। মহিলাদের মধ্যে প্রথম কাব্যগ্রন্থ কৃষ্ণকামিনীর ‘চিত্তবিলাসিনী’ প্রকাশিত হয়েছে। কৈলাসবাসিনীর হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা ও হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভ্যাস ও তার সমুন্নতি পরে পরেই প্রকাশ হয়েছে।

মাঝখানে অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমার কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে উঠেনি। তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই বুঝলাম, কতটা বুঁদ হয়ে তিনি ইংরেজি প্রবাদের অনুবাদের কাজটা করে চলেছেন। বললাম, কি মশাই আপনাকে বড় বিপদে ফেলে দিয়েছি তো, শরীর মন দুই কেমন আছে। বললেন, ‘আর বলবেন না, এই প্রবাদ অনুবাদের কাজে যে এত আনন্দ ও রস আছে তা তো আগে উপলব্ধি করিনি। আপনি না বললে টেরই পেতাম না আসলে বিদেশি প্রবাদের ধারাটা কেমন করে আমাদের স্বদেশি প্রবাদ এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তবে এটা বলব না যে ওদের স্বাতন্ত্র নেই, অবশ্যই আছে, আর সেজন্যই তো অনুবাদের কাজটা বড় জরুরি। আপনি আগে থেকেই এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এই কাজে অবশ্যই আপনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।’ শুনুন কবি, আপনি এত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজটা করবেন বলেই তো আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছি, না-হয় কি যে ছটফটানি শুরু হয়ে যেত, এই বাংলায় এই সময়ে কে আর এত সময় আর ভালবাসা দিয়ে এ-দায়িত্ব পালন করবেন। শুধু দক্ষতা থাকলে চলে না, নিজের সবটুকু দিয়ে লেগে পড়লেই কোন কাজ সঠিক হয়ে ওঠে। এবার দেখি আপনার অনুবাদের নমুনা। ‘দেখুন তবে এই অনুবাদিত প্রবাদ মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে পারে কিনা। চেষ্টা করেছি যতটা সহজ-সরল ভাষায় সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে তোলা যায় – রুশ: ‘একবার এক জন গান ধরিলে সকলেই তান ধরে।’, ‘দুহিতারে সুন্দরী ভাবেন মাতা। পুত্রে জ্ঞানবান্ ভাবে যেই জন্মদাতা।।’, চীন : ‘বাঘ মরিলে চামড়া রেখে যায়। মানুষ মরিলে নাম রেখে যায়।।’, ‘এক ক্ষণের ভ্রম, চিরকালের অনুতাপ।’, জার্মানীয়: ‘আশায় যে ভর করে, অনাহারে সেই মরে।’ ইতালীয়:‘ছোট চোর ফাঁসীতে মরে, বড় চোর গেঁজের ডোরে।’, ‘ভাল ঘোড়ার লাগাম চাইনে।’, স্পেনীয়: ‘বৈদ্যদের ভ্রম যত, পৃ‌থিবীর গর্ভ তত।’, পর্তুগিজ: ‘যে কুকুর অধিক ডাকে, তার কামড় বড় কম।’, ওলন্দাজী: ‘তুষ ছাড়া তণ্ডুল নাই।’, দিনামার:  ‘পিয়াজ, ধুম, নষ্টনারী, চক্ষে আনে অশ্রুবারি।’ ফরাসি: ‘কুঁজ্‌ আপনার কুঁজ্‌ দেখতে পায় না, পরের দেখ্‌তে পটু।’, সবির্বয়া: ‘যে হাত কাটিতে না পার, তাকে চুম্বন কর।’ কবি মশাই, আপনি আমার আশার অধিক করেছেন। এই সামান্য কটিতেই রয়েছে এত জাদু, বাকিগুলিতে না-জানি রয়েছে কত মণি-মাণিক্য। আপনাকে কি বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব, সেই ভাষা আমার জানা নেই। এক কথায় বলতে পারি  মাতৃভাষায় প্রবাদ মাতৃদুগ্ধের মতো। বাংলার পাঠকরা অবশ্যই উজ্জীবিত হবে। 

‘এ আপনি বাড়িয়ে বলছেন। আপনার বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান সংঘে ‘জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদ’ বিষয় নিয়ে  ভাষণ আমি শুনেছি। প্রবাদ ও সমাজ বিজ্ঞানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক নিয়ে আপনার বক্তব্য ছিল প্রণিধানযোগ্য।’ আর আপনি তো প্রমাণ করেছেন আমার ধ্যান-ধারণাকেই – তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বচর্চাতেও প্রবাদ অতি তাৎপর্যপূর্ণ।

আজ আমার বড় আনন্দের দিন। অসীম শূন্যতাকে দূরে সরিয়ে রেখে জীবনের উষ্ণতা পলে পলে অনুভব করতে পারছি। নবীন পণ্ডিত আর কবি রঙ্গলালকে একই মঞ্চে পেয়েছি যে – প্রবাদচর্চার বিশ্বে এই বিস্ময়কর প্রচেষ্টা অক্ষয় হয়ে থাকবে। আমি একটু চঞ্চল-ই হলাম প্রশংসাবাক্য শুনে। ওঁরা দুজনেই জানতে চাইল, ‘কীভাবে পরিকল্পনা করছেন রেভারেন্ড লঙ।’ বললাম, মনে মনে বাসনা আছে স্নিগরিফের অনুসারে বিষয়ভিত্তিক বিভাগেই সাজিয়ে তুলব। মুখোমুখি বসাতে জবাব দিতে সুবিধেই হলো। বললেন দুজনেই, ‘যদি একটু খুলে বলেন।’ বললাম, এই ধরুন যেমন – ভাষাতাত্ত্বিক, নৃতাত্বিক, রাজনৈতিক ও আইন, প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও স্থান বিবরণ, জাতিতত্ত্ব, ব্যঙ্গাত্মক ও বিদেশীয়। বললেন, ‘সঠিকভাবেই ভেবেছেন।’ বললেন, ‘প্রবাদের তো দু-রকম অর্থ থাকে – বাইরের অর্থ আর ভেতরের অর্থ। প্রবাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সাধারণের কাছে বোধগম্য হয় না। তাহলে কোন অর্থটা গ্ৰহণ করা হবে।’ বললাম, ঐতিহ্য ও পরম্পরায় সাধারণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বচর্চাতেও প্রবাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। হারিয়ে যাওয়া অতীত ইতিহাসকে মনে করায়।

 কবি বললেন, ‘ আপনি কি মনে করেন ভারতীয় প্রবাদে সমাজতত্ত্বের উপাদান অনুসন্ধানে জোর দেওয়া উচিত?’ বললাম, শুধু উচিত বলে থেমে থাকলে চলবে না, শল্য চিকিৎসকের মতো কাটাছেঁড়া করে সারপদার্থ খুঁজে বের করতে হবে। মানুষের হৃদস্পন্দন প্রবাদের ফাঁকে ফাঁকে ঘুমিয়ে থাকে, তাকে জাগিয়ে তোলার আমাদের কাজ। রাশিয়ান প্রবাদে তো রাশিয়ার কৃষক ও নারীদের সামাজিক- অর্থনৈতিক অবস্থা ও সাংস্কৃতিক ঘরানা প্রস্ফুটিত হয়েছে।  নবীন পণ্ডিত বললেন, ‘ মার্শম্যান ও মর্টনের  বাংলা প্রবাদমালায় ভূমিকা সম্বন্ধে যদি কিছু আলোকপাত করেন।’ উইলিয়াম মর্টনের বাংলা প্রবাদ সংকলনে জশুয়া মার্শম্যানের প্রভাবের লক্ষণ ধরা পড়েছে, একজন হুগলি জেলার চুঁচুড়ার আর একজন শ্রীরামপুরের।  এঁদের অবদান অনস্বীকার্য। নীলরতন হালদারের সংস্কৃত প্রবাদ সংকলন – ‘কবিতা রত্নাকর’ দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে। মার্শম্যান ইংরেজিতে ভূমিকা লিখেছেন এবং ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে দিয়েছেন। মর্টন সাহেবের বাংলা প্রবাদ সংকলন ‘দৃষ্টান্তবাক্য সংগ্ৰহ’ প্রকাশিত হয় কলকাতার ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেসে। কবি বললেন, ‘ আপনার প্রবাদমালা মোট কটি খণ্ডে প্রকাশ পাবে?’ বললাম, আশা করছি তিনটি খণ্ডে হবে। প্রথম খণ্ডে থাকবে ২৩৪৮ টি প্রবাদ, দ্বিতীয় খণ্ডে থাকবে ৩২৪৭ টি প্রবাদ আর তৃ‌তীয় খণ্ডে থাকবে ১১৭৭ টি প্রবাদ যা প্রথম খণ্ডের পরম্পরা, হিন্দি ও সংস্কৃ‌ত প্রবাদ থাকবে, থাকবে বাগধারা, নীতিবাক্য, ছড়া, ধাঁধা, খনার বচনসহ লোকসংস্কৃতির বিবিধ উপাদান – লোকঔষধ, লোক নিষেধ, লোকবিশ্বাস। শব্দ বৈচিত্র্য ও প্রয়োগ নিয়ে ভাষাতত্ত্বের এক দুর্লভ সম্ভাবনা তৈরি হবে। দ্বিতীয় খণ্ডের সঙ্গে অর্থাৎ ‘ ইউরোপ ও এশিয়া প্রবাদমালা’র জন্য কবি আপনার পরিশ্রম ও নিষ্ঠা ভোলা যাবে না। বাংলা প্রবাদমালা সম্পাদনায় নবীন পণ্ডিত আপনার ঋণ শোধ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এখন আমি দিন গুনছি তিনটি খণ্ডে ধাপে ধাপে কবে প্রকাশ পাবে। নবীন পণ্ডিত বললেন, ‘আপনি তো বিশ্বনাগরিক। আপনার বিশ্বদর্পণ যেন প্রবাদের মধ্যে বিশ্ব জীবনের ঐকতান। শুধুমাত্র ভারতবর্ষের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য নয় – ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের  প্রবাদ মালার মধ্যে একই জীবনের একতা প্রবাহমান।’ বললাম, পরবর্তী প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে প্রবাদ শুধু ইতিহাসচর্চা বা ভূগোল নয় – একই সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান গবেষণার প্রধান হাতিয়ার এবং বিশ্ববাসীকে একইসূত্রে বেঁধে দেওয়া মানবজীবনের শাশ্বত প্রবাহের এক মেলবন্ধন।

প্রবাদমালা আমার চিন্তায় যে দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে, তার সঙ্গে আমি সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছি দেশীয় প্রেসের। দুটোই মানুষের চোখে আলো ফোটাতে মুখ্য ভূমিকা নেয়। একই উঠোনে ভাইবোনের হেসেখেলে বেড়ানোর মতো। দুইজন দুইদিকে ছুটলেও আদপে গন্তব্য এক। আমি প্রশাসককে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছি  যে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত বইগুলি মোটেই সংকটের কারণ হবে না। কারণ প্রেসের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে ছাপা ও বিষয়গত মান উন্নত হচ্ছে। বইয়ের সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়ছে। এ রিটার্ন অব দ্য নেমস এন্ড রাইটিংস অফ 515 পারসন্স কানেক্টেড উইথ বেঙ্গলি লিটারেচার-এ আমি কোন বাঙালি মহিলার নাম পাইনি। হয়তো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক কুসংস্কার ও স্ত্রীশিক্ষার প্রতি সমাজপতিদের নেতিবাচক মনোভাবেরই  এমনটা হওয়ার কারণ। এরকম সামাজিক বাঁধনে মহিলারা শিক্ষিত হয়ে তাঁদের সুখ দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বই আকারে প্রকাশ করবেন এক অলিক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। আমি বিষয়টি সকলের গোচরে আনার চেষ্টা করেছি। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও বই সংগ্রহের সঙ্গে অনিবার্যভাবেই আমার গ্রন্থ তালিকা প্রস্তুতির ভাবনা শুরু হয়েছে। আমি মনে করি গ্রন্থ তালিকার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গ্রন্থের শিরোনাম, বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত বর্ণনার মধ্যে দিয়ে লেখক দেশ- কাল-সমাজ সম্পর্কে পাঠক-গবেষকরা একটা স্পষ্ট ধারণা পেতে পারে। আমি কলকাতায় এসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, প্যানিজি, জুয়েটের তালিকাগ্ৰন্থ দেখেছি। এছাড়া সমাচার দর্পণ এবং সংবাদ প্রভাকর, সমাচার চন্দ্রিকা, সংবাদ ভাস্কর, পূর্ণচন্দ্রোদয় প্রভৃতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত বইয়ের বিজ্ঞাপন আমার নজর এড়ায়নি। আমি বছর কয়েক আগে স্ব-উদ্যেগে গ্রন্থাবলি প্রকাশ করেছি। এটি ছিল বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত তালিকা। ক্যাটালগ অব দ্য ভার্নাকুলার লিটারেচার কমিটিস লাইব্রেরী ছিল দ্বি-ভাষিক তালিকা। সেই সময় বাকি পাঁচটি তালিকাগুলি প্রস্তুত হয়েছিল ইংরেজি অক্ষরে সরকারি নির্দেশে ও সাহায্যে। ৪৬ টি ছাপাখানা থেকে বাংলা বই ছাপা হত। রামমোহন রায়ের প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ, জয় নারায়ণ ঘোষালের করুনানিধান বিলাস, প্রাণ কৃষ্ণ বিশ্বাসের রত্নাবলী ইত্যাদি। আমার গ্রন্থাবলিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন ছাপাখানার মুদ্রিত প্রায় ১০৪৬ টি বইয়ের নাম বর্ণানুক্রমিকভাবে স্থান পেয়েছে। এই সব গ্রন্থাবলী শ্রীরামপুর যন্ত্রণালয় থেকে মুদ্রাঙ্কিত। আমি তালিকাটি লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউস লাইব্রেরীতে পাঠিয়েছিলাম হাতের লেখায় –  ফ্রম দা অথর এন এলফেবেটিক্যাল ক্যাটালগ অফ ১০০ প্রিন্টেড ওয়ার্কস। বিষয়সূচিতে কত গ্রন্থই না অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেমন ইতিহাস, ভূগোল, গল্প ও উপখ্যান, ঔষধ গ্রন্থ, কাব্যশাস্ত্র, পুরান, নীতিশাস্ত্র, পদার্থ, বেদ-বেদান্ত, বৈষ্ণব গ্রন্থ, ব্যবস্থা গ্রন্থ, শব্দশাস্ত্র ইত্যাদি। সরকার আমাকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছে। আমি কলকাতার প্রেসগুলি থেকে প্রকাশিত বইয়ের তালিকা সংগ্রহ করেছি। এটা আন্দাজ করতে পারছি সম্মুখে আরো দুর্গম পথ, যেভাবে হোক আমাকে অতিক্রম করে যেতেই হবে। কাজের পরিধি লম্বা হচ্ছে কিন্তু ধৈর্য ও একাগ্রতাই হয়তো আমার লক্ষ্য পূরণের কান্ডারী হবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই অনেকটা সময় আমি পার করে ফেলেছি এই ভারতবর্ষে। জানিনা আর কতদিন যীশু আমাকে এই মাটিতে কাজ করার সুযোগ দেবে। কিন্তু এটা জানি আমাকে এই দেশের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে, তা এই দেশের মাটিতে বসে হোক কিংবা আমার স্বদেশের মাটি থেকে, গোটা বিশ্বটাই আমার কাছে আমার দেশ বলে মনে হয়। তাইতো আমি সব দেশের মানুষকে একই সূত্রে গাঁথতে চাইছি। এমিলি বলল, ‘মাটির সীমানা দিয়ে গোটা পৃথিবীকে ভাগ করে দেওয়া আর বালির বাঁধ গড়া সমান কথা।’ এমিলির কথাটা গিয়ে হৃদয়ে বিঁধল। বুঝলাম, শিক্ষাই আনে চেতনা, আর চেতনাই আনে মনের মুক্তি। ডুবুরির মতো ডুব দিতে হবে, তবে যদি আসল ঘরের হদিস মেলে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *