রম্যরচনা
অধ্যায় : ২১
কে যেন বলেছিল নাকি কোথায় সে পড়েছিল যে দিনে অন্তত একটি ভাল কাজ করা উচিত। তাতে যে কেবল জগতের মঙ্গল ঘটে এমন নয়, নিজেরও উপকার হয়। তাতে নাকি মনে প্রচুর শান্তি ও আনন্দ পাওয়া যায়, যার ফল হিসেবে শরীরও সুস্থ থাকে। ভাল কাজের কোন বিকল্প নেই, এমনটাই জানা গিয়েছিল। এসব জেনেই একদা হাচিয়া ফাল ঠিক করেছিল যে বাকি জীবন সে কেবলই ভাল ভাল সমস্ত কাজ করে বেড়াবে।
কী কী বিষয় ভাল ভাল কাজের পর্যায়েভুক্ত হতে পারে এই নিয়ে তাকে কয়েক দিন বিস্তর গবেষণা করে কাটাতে হয়েছিল। কাজ তো জগতে আছে প্রচুর, তাদের মধ্যে বাছাই করে নিতে হবে কোন্গুলি ভাল কাজ। তারপর যেভাবেই হোক সেইসব ভাল ভাল কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে সুসম্পন্ন করতে হবে যাতে জগতের মঙ্গল ও তার উপকার হয়।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হাচিয়া ফাল ভাল ভাল কাজের একটা তালিকা বানাতে চেষ্টা করল। গরিবদের বস্ত্র বিতরণ, ভিখিরিদের ডেকে খাওয়ানো, পথ শিশুদের পুস্তক বিতরণ, গৃহহীনকে গৃহদান ইত্যাদি তেরোখানা এমন ভাল ভাল কাজের কথা লিখে সে থেমে গেল এই কারণে যে এইসব বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনসব ভাল কাজের কথা ভাবতে হবে যেগুলি করতে কোন খরচ হবে না এবং সহজেই করা যাবে। একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করলে কেমন হয় অথবা যদি একটা হাসপাতাল বানিয়ে দেওয়া যায়? হ্যাঁ, এইগুলো সত্যিকারের ভাল কাজ যাতে সমাজের উপকার হবে, লোকে তাকে ধন্য ধন্য করবে। ভাবতে গিয়ে বেশ উৎসাহ পেয়ে গেল সে। কিন্তু মন্দির প্রতিষ্ঠা করার বা হাসপাতাল বানাবার পুরো প্রক্রিয়াটা বিবেচনা করতে গিয়ে সে দেখতে পেল, সেখানে প্রচুর অর্থব্যয় করতে হবে। ব্যাপারটা দেখে সে একদম দমে গেল। অন্নদান, পুস্তক প্রদান, গৃহদান ইত্যাদি কাজের চেয়েও মন্দির প্রতিষ্ঠা বা হাসপাতাল বানানোর খরচ বিপুল। অর্থব্যয় ঘটবে না এমন কোন ভাল কাজের কথা ভাবতে হবে।
ভেবে ভেবে দিনের পর দিন কাটতে লাগল। কয়েকশ এমনকি, কয়েক হাজার কাজের তালিকা তৈরি করেও সব বাতিল করে দিতে হল কারণ, প্রত্যেকটিতে কিছু না কিছু টাকা খরচের ব্যাপার এসে যাচ্ছিল। টাকাপয়সা লাগবে না এমন কি কোন ভাল কাজ নেই জগতে? একইসঙ্গে প্রচুর মন্দ কাজের কথাও তার মাথায় আসছিল যেগুলি করতে কোন টাকাপয়সা লাগবে না। যেমন কাউকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া, পায়ে পা বাঁধিয়ে ল্যাং মারা, গালাগাল দেওয়া, কারো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, প্রতিবেশীর ছাদে আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলা ইত্যাদি। এসব মন্দ কাজ করতে তো কোন খরচ হয় না, যত খরচ জড়িয়ে আছে ভাল কাজ করার ক্ষেত্রে। ব্যাপার তো মন্দ নয়!
অর্থব্যয় ছাড়াও অন্য একটা ব্যাপার ছিল। অধিকাংশ ভাল কাজ করার ক্ষেত্রে সে দেখতে পাচ্ছিল, তার শত্রুরা সেসবে উপকৃত হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা একদম মানা যায় না। যেসব ব্যক্তি তার শত্রু হিসেবে তালিকাভুক্ত তাদের উপকার হলে শত্রুতা বৃদ্ধি ঘটবে, তাতে তার বিপদ বেড়ে যাবে। তাই এমন সব ভাল কাজ নির্বাচন করতে হবে যাতে খরচ থাকবে না এবং শত্রুদের উপকার ঘটবে না।
শেষপর্যন্ত হাচিয়া ফাল ঠিক করল যে ঘরে বসে বসে চিন্তাভাবনা না করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া যাক। রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিশ্চয় অনেক ভাল কাজ হাতের কাছে পাওয়া যাবে যেগুলি বিনা খরচে করা সম্ভব। ঘরে বসে ভেবে দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটার কোন সুরাহা হচ্ছে না। তাই সে একদিন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল নিখরচায় ভাল ভাল কাজ করার প্রবল উৎসাহে।
হাঁটতে হাঁটতে একের পর এক ভাল কাজের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছিল সে, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই হয় টাকা-পয়সা খরচ আর নয়তো শত্রুদের উপকার, এ দুটি বিষয়ের একটি বা দুটিই উপস্থিত থাকছিল। তাই প্রবল ইচ্ছে থাকলেও ভাল কাজগুলি করার উদ্যম হচ্ছিল না তার। তবে লোকে বলে, চেষ্টা থাকলে কী না হয়। শেষপর্যন্ত সে একটি এমন কাজ দেখতে পেল যা নিঃসন্দেহে ভাল কাজ এবং যাতে তার কোন শত্রু উপকৃত হবে না বা কোন অর্থব্যয় ঘটবে না।
সেটা এক অন্য পাড়া। মূল রাস্তা থেকে একটা গলিরাস্তা ধরে যাওয়ার সময় সে দেখল একটা জরাজীর্ণ ঘর। প্রায় রাস্তার ওপরেই তার দরজা, সেখানে একটা তালা ঝোলানো। দরজার ঠিক পাশে একটা খুবই ছোট বেদির ওপর একটা গর্ত, সেখান থেকে একটা খুঁটি উপড়ে তার অন্য মাথা পড়ে আছে রাস্তার ওপর যেখানে একটা সাইনবোর্ড আটকানো। সেই সাইনবোর্ডে লেখা বিশ্রী সংঘ। দেখে বোঝা গেল যে সাইনবোর্ডটি কোনক্রমে খুঁটিসুদ্ধ বেদির গর্ত থেকে উপড়ে পড়ে গেছে রাস্তার ওপর। লোকজন সব তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। দেখে সে বুঝল, বিশ্রী সংঘের এমনই হতশ্রী অবস্থা যে সাইনবোর্ড রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, তুলে দেওয়ার কেউ নেই। ক্লাবের সদস্যরা কোথায় আছে কে জানে? দেখে তার বেশ মায়া হল। একটু চেষ্টা করলেই সাইনবোর্ডটাকে তুলে খুঁটিসুদ্ধ বেদির গর্তে বসিয়ে দেওয়া যায়। কেন যে দিচ্ছে না কেউ? লোকরা বড় বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছে আজকাল। সে কালবিলম্ব না করে সাইনবোর্ডটাকে খুঁটিসুদ্ধ তুলে বেদির ওপর বসিয়ে দিতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল এক আজব কান্ড। হইহই করে জনা দশ-বারো বাচ্চা থেকে বুড়ো লোক এসে তাকে ঘিরে ধরল। কোথায় ঘাপটি মেরে ছিল সবাই টেরই পাওয়া যায়নি। সবাই চিৎকার করে বলতে লাগল,
‘তুমি আমাদের সাইনবোর্ড ভেঙেছ।’
সে আপ্রাণ চেষ্টা করল আত্মপক্ষ সমর্থন করার, কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলতেই দিল না। সবাই বলল,
‘তুমি ক্লাবের সাইনবোর্ড ভেঙেছ। পাঁচশ টাকা জরিমানা দাও তার জন্য।’
অতো টাকা ছিলই না তার কাছে। সে সেটা জানালো জনতাকে উপায়ান্তর হয়ে। সবাই বলল,
‘যা আছে তাই দাও। জরিমানা দিতেই হবে, সাইনবোর্ড ভেঙেছ আমাদের।’
দুশো টাকা ছিল তার পকেটে খুচরো-টুচরো মিলিয়ে। সব দিয়ে তবে সে সেই বিশ্রী সংঘের শত্রুভাবাপন্ন সদস্যদের হাত থেকে ছাড়া পেল।
ভাল কাজ করার চিন্তা জলাঞ্জলি দিয়ে সে তখন-তখনই বাড়ি ফিরে এল। ঘরে ঢুকে ভোম্বল হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। ভাল কাজ করতে যাওয়ার এমন বিপত্তি তার মোটেই ভাল লাগল না। সম্পূর্ণ অচেনা একদল লোক তার শত্রু হয়ে গেল! তারা এর আগে তার শত্রু ছিল না। তার মানে, ভাল কাজ করতে গেলে শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাবে? তাহলে কি দরকার ভাল কাজ করার?
পরে খোঁজখবর নিয়ে সে জানতে পেরেছিল আসল রহস্য। বিশ্রী সংঘের সদস্যরা ইচ্ছে করেই তাদের সাইনবোর্ড ওইভাবে রাস্তায় ফেলে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে কাছাকাছি। কেউ তার মত সাইনবোর্ড তুলে বেদির গর্তে বসিয়ে দিতে গেলেই তারা সদলবলে তার ওপর হামলা চালিয়ে টাকা আদায় করে। ওই জন্যই রাস্তা দিয়ে চলা সমস্ত লোকজনরা সাইনবোর্ডটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল।
যে বা যারা বলেছিল নিয়মিত ভাল কাজ করা উচিত তাদের সে হাতের কাছে পেলে তখন পিটিয়ে গায়ের ঝাল মিটিয়ে জেলে যাবে এমনই তার মনের অবস্থা। হাচিয়া ফাল প্রতিজ্ঞা করল যে জীবনে সে কোনদিনও আর ভাল কাজ করতে যাওয়ার চেষ্টা চালাবে না। এই প্রতিজ্ঞার কথা যাতে কোন অবস্থাতেই ভুলে না যায় সেই কারণে সে নিজের জন্য এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল। দু’হাতে নিজের কান ধরে নিজেই নিজেকে ওঠবস করিয়ে গেল টানা একশ একবার।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
![]()
