তপোপ্রিয়

সমস্যার নির্জন প্রহর

জীবনের সংকটগুলিতে সবসময় স্থির থাকা যায় না। তখন দেখেছি কোন অভিজ্ঞ পরামর্শ খুবই উপকারে লাগে যদি সেই উপদেশ মানা যায়। এমনই এক সংকটে পড়েছিলাম একবার। 

এক ওনার সাধিত এডভেঞ্চারের নেশায় কয়েকজনের সঙ্গে মিলে একটা ছোটখাটো কনসালটেন্সি তৈরি করে ব্যবসা শুরু করেছিলাম শেয়ার বাজারে। প্রথম প্রথম টাকা-পয়সা দিয়েছিলাম নিজেদের পকেট থেকেই। সেই টাকায় কম দামে শেয়ার ধরে রাখা, দাম বাড়লে বিক্রি করে মূলধনী লাভ। তারপর বাইরে থেকে লোকের টাকা দিয়ে শেয়ার কিনিয়ে দিতে শুরু করলাম। আর সেটাই হলো কাল। টাকা একটা বিরাট নেশা। সেই নেশা মানুষকে সব সময় বিভ্রান্ত করে দেয়। আমরাও ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছিলাম। লোকের টাকা দিয়ে শেয়ার কিনে তাকে ডেলিভারি না দিয়ে সেই টাকা ব্রোকারের ঘরে জমা রেখে ফাটকা খেলা শুরু করলাম। এই করতে গিয়েই ফেঁসে গেলাম। ব্রোকার সব টাকা মেরে দিল। কিছুতেই তার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারলাম না। তার জেল -হাজত, মামলা-মোকদ্দমা সবই হলো, কিন্তু লোকটা এমনই কানকাটা যে শত হেনস্থা সত্ত্বেও টাকা ফেরত দিল না। যারা আমাদের টাকা দিয়েছিল তারা এসব কথা শুনলো না। আমার বাড়িতে শুরু হলো পাওনাদারদের হানা। লোকেরা টাকা বেড়ে যাবে আশা পেলে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে টাকা ঢেলে দিতে পারে, কোন প্রশ্ন করবে না। আর যদি এমন ইঙ্গিত পায় যে সেই টাকা মার যাবে তো কোন যুক্তিবুদ্ধির ধার ধারে না, ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সময় একদিনও কেউ অপেক্ষা করে না, কোন কথা শুনতে চায়না। 

হিংস্র পাওনাদারদের আক্রমণে আমি রীতিমতো পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। লক্ষ লক্ষ টাকার দায়। এই দায়কে আমি দেনা বলে মানতে নাড়াচ্ছিলাম এই কারণে যে লোকগুলো ফটকা খেলার কথা মাথায় রেখেই টাকা দিয়েছিল আর যতদিন লাভ পাচ্ছিল একবারও টাকা তুলে নিতে চায়নি। নিয়মিত লাভ পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতেই তারা টাকা ফেরত চাইতে লাগলো, এতোটুকু সময় দিতে রাজি হলো না। আমরা টাকা ফিরিয়ে দেবো বলছিলাম, কিন্তু তখন তখনই দেওয়া সম্ভব ছিল না। ব্রোকার আমাদের সমস্ত টাকাও আটকে দিয়েছিল, আমরাও তখন কপর্দকহীন। আমরা বলছিলাম, ব্রোকারের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার হলেই টাকা ফিরিয়ে দেব। যুক্তি ছিল, পাটকা খেলার জন্য টাকা যে ব্রোকারের ঘরে রাখা হয়েছে এটা তো সবাই জানতো। লোকগুলো এই যুক্তি মানতে চাইল না। তারা আর তখন ব্রোকারের ঘরে না কোথায় টাকা আটকে গেছে তা শুনতে রাজি নয়। আমাদের ভুল হয়ে গিয়েছিল, আগে শর্তগুলি কিছুই লিখে না রেখে মনের আনন্দে মানি রিসিট দিয়ে দিয়েছিলাম। এখন তাই টাকা মেটাবার দাবি চাপলো আমাদেরই ওপর। 

মানুষের চেহারা পাল্টে যায় খুব তাড়াতাড়ি। এই চেহারা পাল্টানো এমন যে আজন্ম যাকে একরকম বলে দেখেছি মুহূর্তের মধ্যে দেখি সেই অন্যরকম, তাকে কোনদিন চিনতাম বলে মনে হয় না। পাওনাদারদের চেহারা তো পাল্টে গেলই, যারা আমার সঙ্গী ছিল তারাও দেখি গা বাঁচাতে ব্যস্ত। পরে এমন হলো যে কেউ আর আমরা কারো পক্ষে কথা বলতে পারছিলাম না। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমার চারপাশের সমস্ত লোকই শত্রুভাবাপন্ন, সবাই আমার সামনে-পিছনে সব সময় আমাকে বেকায়দায় ফেলতে চেষ্টা করছে এমন অবস্থা কতটা দুঃসহ মুখোমুখি না হলে বোঝা যায় না।

সমস্ত টাকা আমি একা কেন ফেরত দেবো, এটাই ছিল আমার আপত্তি। আলোচনার পর অবশ্য আমার সঙ্গীরা নিজেরাও কিছু কিছু পার্টির টাকা মেটাবার দায়িত্ব নিল, তবে বেশির ভাগটা থাকলো আমার ওপর। যুক্তি ছিল, আমার তো তবু চাকরি আছে, কিন্তু আমার সংগীতের আয়ের কোন বিকল্প উপায় নেই। পার্টিরা অবশ্য সময় দিতে রাজি হল, নিয়মিত কিস্তিতে টাকা শোধ করা হতে থাকবে এই শর্তে। এই ব্যাপারটাই আমার মানতে কষ্ট হচ্ছিল। যে টাকা আমি মেরে দিইনি সেই টাকা আমি কেন মেটাবো ব্যক্তিগতভাবে? 

সে সময় চাকরি থেকে আয়ও এত বেশি নয়। সেই টাকা থেকে নিজের খরচের পর পাওনাদারদের কয়েক লক্ষ টাকা শোধ করতে কত বছর লেগে যাবে ভাবতে গিয়ে মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। তার ওপর রয়েছে মায়ের ডাক্তার আর ওষুধপত্রের খরচ। এক-দু বছর হলো মাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে গিয়েছিল মায়ের। সেই ভয়ংকর রোগ থেকে যদিও প্রাণে বেঁচে ফিরেছে এবং কোন ক্ষতি হয়নি কিন্তু সাবধানে থাকার দরকার আছে যাতে আবার না কিছু ঘটে যায়। তার জন্য কিছু খরচ অপরিহার্য। দেনার দায় এমন অযৌক্তিকভাবে ঘাড়ের ওপর চেপে বসার পর আমার বিদ্রোহী হওয়ার ইচ্ছে হতো প্রায়ই। বেপরোয়া হয়ে প্রায়ই ভাবতাম, একটি পয়সাও দেব না কাউকে। দেখি কার ক্ষমতা কিভাবে আমার কাছ থেকে টাকা আদায় করে। তবে বেশিক্ষণ মনের এই জোর বজায় রাখতে পারতাম না। পাওনাদাররা যখন বাড়িতে এসে যা নয় তাই বলতো খুব অসহায় লাগতো। সারাদিন কাঁটা হয়ে থাকতাম কখন এসে পাওনাদার কেউ বেল বাজায়। লোকের আগমন বুকের মধ্যে অসম্ভব আতঙ্ক সৃষ্টি করত। এর মধ্যে একজন আবার থানায় অভিযোগ জানিয়েছিল। পুলিশের ভয়ে এক রাত কাটিয়েছিলাম শিয়ালদা স্টেশনের পাশে এক গেস্ট হাউসে। 

রাতে ঘুম হতো না দুশ্চিন্তায়। কিভাবে অত টাকা শোধ করব? শোধ না করেও বা বাঁচবো কী করে? সব সময় মাথার মধ্যে অস্থিরতা। কোন কাজই মন দিতে পারতাম না। এই দুঃসময়ে একমাত্র মা আমাকে অনবরত সাহস দিয়ে যেত। 

‘আরে অতো ভেঙ্গে পরিস না। নিজেকে শক্ত রাখ্, দেখবি সব ঝামেলা মিটে যাবে।’

দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসতো না যখন নিজের ঘরে বসে পাগলের মত হা-হুতাশ করতাম। মা-ও স্থির থাকতে পারতো না। বিছানা থেকে উঠে এসে বসত আমার পাশে। গায়ে-পিঠে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো,

‘কেন এমন পাগলামি করছিস? দুরবস্থা কারো চিরকাল থাকে না। বুকে সাহস আন্। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা কর্ যাতে এই অবস্থা থেকে রেহাই পাস্।’

কোনভাবেই যখন আমি শান্ত হতাম না তখন মা তার শেষ সম্বল সারা জীবনের গয়নাগাটি আমার হাতে তুলে দিতে চাইতো। জানতাম মা জীবনভর এসব বুকে আগলে এসেছে, প্রাণ থাকতে হাতছাড়া করতে পারবে না। বহু অর্থকষ্টেও এসব গয়না বিক্রি করেনি। কিন্তু এখন আমার শোচনীয় অবস্থা দেখে সেসব গয়না ও বিক্রি করে দেনার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার পরামর্শ দিতে লাগলো। 

মাঝেমধ্যেই আমি বেপরোয়া হতে চাইতাম। বলতাম, যা হয় হবে, কাউকে কিচ্ছু দেব না। আমি নিজে তো কোন টাকা মেরে দিইনি। আমার এই উষ্ণতা মা চুপ করে শুনত। কিন্তু কখনো সমর্থন করত না। যতই রাগ করি না কেন মা আমার মনোভাবের বিরোধিতা করতে ভয় পেতো না। নরম গলায় সবসময় একটা কথাই বলতো, 

‘টাকা তুই মারিস নি সত্যি। আমি জানি সেটা। কিন্তু বাবা, লোকগুলো তো তোমাকেই টাকা দিয়েছে। এখন সেই টাকা তোমাকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। এটা তোর দায়, তুই অস্বীকার করতে পারিস না। যাদের কাছ থেকে তুই টাকা নিয়েছিস তাদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া তোর কর্তব্য। যত কষ্টই হোক তোকে এই কাজটা করতেই হবে।’

এই নীতি থেকে মাকে একবারও সরে আসতে দেখিনি। আমি টাকা মারিনি, বিনা শোধ করতে আমার অকথ্য কষ্ট হবে জেনেও মা সবসময় আমাকে ওই একই কথা বলতো। আমি রেগে গেলেও মা হয়তো তখন কার মত চুপ করে যেত, কিন্তু পরে আবার একই কথা বোঝাতো। মায়ের পরামর্শ শুনে শুনে আমিও একসময় তারপর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পেরেছিলাম। 

সারাজীবন মাকে এমনই দেখেছিলাম। এখন বিশ্লেষণ করে দেখতে পাই, মা কখনো সমস্যা থেকে পালিয়ে যেতে চাইত না। সমস্যা এলে তাকে মোকাবিলা করার মনোভাবটা আমার মধ্যে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া উপহার। মা বিশ্বাস করত, সমস্যা একা আসেনা, সঙ্গে নিয়ে আসে সমাধানের ইঙ্গিত। সেই ইঙ্গিতটুকু ধৈর্য ধরে বুঝে নিতে হয়। ধৈর্য হারালে চলেনা। তাহলে সমাধানের সূত্র অনাবিষ্কৃত থেকে যায়।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *