রক্তিম ভট্টাচার্য
পাথুরে দেওয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে শরীরটা। পা-দুটো বুকের সঙ্গে বাঁধা, হাতগুলো টিকটিকির মতো ছড়ানো। মন্দিরের গাত্রে একের পর এক খাঁজে পা দিয়ে হয়ত সহজেই ওঠা যেত – কিন্তু না। ও এভাবেই উঠতে পছন্দ করে। শরীরের সঙ্গে দেওয়ালের স্পর্শে ওর ওম অনুভব হয়। ঘ্রাণ নেয় পাথরের। এই পাথরের ভেতরেই খোদিত হয়ে আছে ওর জন্মকথা। তাকে বার বার চিনে নিতে চায় ও। শরীরে শরীরে মেখে ঈশ্বরলাভের অনন্য তৃপ্তি সঞ্চয় ক’রে ও এগিয়ে যায় গর্ভগৃহের দিকে।
ও আসলে কে? কেউ জানে না। ও নিজেও না। ওকে কেউ দেখেনি কোনওদিন। ও হয়ত নিজেও নিজেকে দেখেনি। ও কি কোনও প্রাণী? জানা নেই। পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ? তাও জানা নেই। জড়বস্তু? একেবারেই না। বায়বীয় পদার্থ? তাও না। তাহলে নিজেকে ও জানান দেয় কীভাবে? না থেকেও কীভাবে থাকা যায়? ছায়াও তো নেই। তবু, ও আছে। ওর শরীর, পাথুরে দেওয়ালের স্পর্শ ওকে জানান দেয় – ও আছে। ওর অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে একেবারেই মূল্যবান না হলেও ওকে এখানে থাকতেই হবে। প্রাণের অনন্ত সূচিমুখের যে প্রান্তে সভ্যতার ইঙ্গিত মেলে, সেখানে পৌঁছতে হবে ওকে একদিন। তার জন্য এই মন্দিরই ওর সম্বল। এখানেই ওর জীয়নকাঠি। এখানে না এলে ওর চলে না।
বেশি দাবিদাওয়া নেইও ওর। সরীসৃপের মতো দেওয়ালে ভর ক’রে ক’রে গর্ভগৃহের দিকে যাত্রা। তারপর দৈবাৎ জলের সংস্পর্শে এলে একটু নিজেকে জিরিয়ে নেওয়া। তারপর আবার গাঢ় অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে নিয়ে একেবারে অন্তঃস্থিত কোণে দেবমূর্তিকে দেখা। শুধু দেখা। আর, কিচ্ছু না। কোনও চাহিদা নেই, প্রার্থনা নেই। শুধু খানিকক্ষণের অপেক্ষা। তারপর আবার একই পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া। কোথায় ফিরে যায় ও? জানে না কেউ। ওকেই তো কেউ জানে না, ফলত ওর আসা বা যাওয়া নিয়ে কারোর মাথাব্যথাও নেই। স্বয়ং ভগবানেরও না।
ও আসে। রোজ আসে। পাথরে খোদিত ইতিহাস আর পুরাণের কল্পলোকে নিজেকে জারিত ক’রে আবার ফিরে যায়। কোথায় ফেরে সে? কেউ জানে না। ও নিজেও জানে না। আসলে ওর আসা বা যাওয়া – কোনওটাই মহাজাগতিক সঙ্কেতে নয়। স্বেচ্ছাগমনে অলস অভিপ্রায় ওকে নিয়ে আসে এই মন্দিরে। আড়াল থেকে, একেবারে জমাট বাঁধা অন্ধকারের কোণ দিকে দেবমূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর মনে হয়, এ এক নিরক্ষীয় দরবার। মহাকালের অন্ধস্নেহের সর্বোত্তম স্বীকৃতি। এখানে ওর থাকা দরকার। অথবা, এখানে ওর আসা চূড়ান্ত নিষিদ্ধ।
ও তখন ফেরার পথ ধরে। একইভাবে শরীরে শরীর টেনে চলে যায়। আবার আসবে বলে।
পশ্চিমে কিছুদূর গেলেই নদীর চর। খামখেয়ালি অথচ সদালাপী নদী বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণতোয়া। আবার, পাগলপারা বর্ষায় তার খরস্রোতা উন্মাদনা দেখেনি – এমন কাউকে এখানে পাওয়া যাবে না। মন্দিরের দেওয়াল পর্যন্ত চলে আসে জল। কত মানুষ, পশু-পাখির কাছে মন্দিরই তখন বাঁচার আশ্রয়। শতাব্দীপ্রাচীন ত্রাণকেন্দ্র। প্রধান পুরোহিত প্রবালকৃষ্ণ, দেবতার ভোগ বেশি পরিমাণেই রাঁধেন তখন। বরাবর, স্বহস্তে। গ্রামে-গঞ্জের মানুষ যেমন তাঁর পুজোর সুখ্যাতি করেন, তেমনই সুস্বাদু রন্ধনের। ধন্য ধন্য করে সবাই।
ও চুপিসাড়ে দেখে। লুকিয়েচুরিয়ে তখন ও ঢুকে যায় গর্ভগৃহে। একা একা দেবমূর্তির সঙ্গোপনে কেমন ক্লান্ত, অসাড় হয়ে পরে ও। অসামান্য ব্যঞ্জনসমূহের সুমিষ্ট সুবাসে প্রাণ ছটফট করে। কতদিন ওর খাবার জোটে না। শেষ কবে পেটভরে খেতে পেয়েছিল, মনেই পড়ে না। গ্রীষ্মের তাপ, বর্ষার জল আর শীতের হিমই ওর এখনকার খাদ্যবস্তু। শরীর দিয়ে শুষে নেয় ও প্রকৃতির অমৃতভাণ্ডার।
তবে এই সময়টা ওর বড় প্রিয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ওর কাছে অবিশ্বাস্য আশীর্বাদ। স্নেহসূচক বরাভয়মুদ্রা। এটুকু সময়ই ও ওর দেবমূর্তিকে একাকী পায়। নিজের কাছে। ইচ্ছে হয়, আত্মগোপন ক’রে রাখে। বরাবরের মতো লুকিয়ে ফেলে বক্ষপিঞ্জরে। কিন্তু, তা তো হবার নয়। এই দেবমূর্তি যে সবার – তার অভয়মুদ্রা সবার – তার আহ্বান সবার। ওর একার কিচ্ছু নয়। শুধু এই জমাট-বাঁধা অন্ধকারই ওর একান্ত পবিত্র আড়াল – একমাত্র আবাসস্থল। যদিও ও পরিযায়ী, তবুও তো নীড়ে ফেরে একবার হলেও। প্রদক্ষিণ করে দেওয়াল বেয়ে। নিশুতি রাতের মতো নিজেও কেমন ছায়া-ছায়া অবয়ব হয়ে ওঠে। ব্যক্তিত্ব চলে আসে অজান্তেই। শরীর গজিয়ে ওঠে রিপুর চিত্রাঙ্কনে। বাতাসের পাক বেয়ে জমে ওঠে ছায়া। আলোর চিত্রপটে সেজে ওঠে কমনীয়, প্রগলভ বাস্তুদোষ। বিপুল প্রসারিত দুই পেলব বাহুমূল, সঞ্চিত অমৃতকলসের মতো স্নিগ্ধ দুই স্তন, কম্পিত রামধনুর মতো ছিপছিপে তনুবর, জ্যোৎস্নার মায়াভরা গভীর নাভিকুণ্ড, আদরে পেছল-কাটা মোহাবিষ্ট ঊরুদ্বয় আর…। আর, বিস্ময়াভিভূত উপত্যকার খাঁজে জীবনের সুধাপাত্র – আলোকের উৎস। গোলাপকাঁটার মতো গুচ্ছকেশে ঢাকা পালকগাত্রের মতো ওই যোনি – নিজেকে ওর রাজকন্যা মনে হয়। যেন অতলান্ত সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক বহু-প্রাচীন রাজ্যে ছিল ওর বাস। পাহাড়-পারের রাজপুত্রের জন্য সযত্নলালিত, রক্ষিত এই শরীর আজ প্লাবনের কাছে উন্মুক্ত। দীর্ঘশ্বাস ছুটে যায়। হাওয়ায় ফিসফিসানি কাটে ওর জন্মদাগের ক্ষত। অতীত মনে পড়তেই মিলিয়ে যেতে থাকে যাবতীয় সম্পদ। ও আবার হয়ে যায় সেই অদ্ভুত এক পিণ্ড – সম্ভবত যার পা-দুটো বুকের সঙ্গে বাঁধা, হাতগুলো টিকটিকির মতো ছড়ানো।
লোকমুখে ফেরে এক আজন্মসঞ্চিত রীতিকথা। কোনও এক কালে মহর্ষি ত্রিভীষক এই অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিলেন উত্তরাভিমুখে। পথিমধ্যে ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েন প্রখর রৌদ্রের কোলেই। না ছায়া, না আশ্রয়। তবু, শরীর যেন গ্রাস ক’রে নেয় অপূর্ব এক দৃশ্য। অপার্থিব এক কন্যার দেহে মিশে যাচ্ছে তার দেহ-মন-আকুতি। বহুদিনের সুপ্ত কামনা-বাসনা যেন একযোগে গড়ে তুলেছে দৃঢ় অভিসন্ধি। ষড়রিপুজয়ী মহর্ষির কানে যেন বেজে ওঠে দুন্দুভি-দামামা, অষ্টপ্রহরের কূজন-কাকলি ভেদ ক’রে উঠে আসে ঊর্মিমালার প্রত্যয়। ঊর্মিমালা! তাঁর বাল্য-সহচরী! এখানে, এভাবে! তাঁর স্বপ্নচারিণী হয়ে! এতটাই বাস্তব সে দৃশ্য, মহর্ষির মনে হয় যেন একছুটে গিয়ে স্পর্শ করেন তাঁকে। পবিত্র ওমে ঋদ্ধ করেন নিজেকে।
কিন্তু কোথায় কে! লীন সে তাপের প্রভাবমুক্ত হতেই জেগে ওঠে প্রান্তর। পথের রুক্ষালাপ। মহর্ষি ধাতস্থ করেন নিজেকে। উঠে বসেন। গেরুয়াবস্ত্রের শোধনে খুঁজে নেন জলাশয় – এই ক্ষীণতোয়া নদী। স্মরণ করেন বাল্যকথা। সহচরী ঊর্মিমালা এখন অমৃতলোকে। ত্রিভীষক এখন ইতিহাসের পাতায় এক অধ্যায়। তবু, অন্তঃপুরে সিক্ত হয় মহাসিন্ধুর ধ্বনি। আর্দ্র হয়ে ওঠে হৃদয়ের বেড়াজাল। এতদিনের দীর্ঘ সাধনা তাঁকে বাধ্য করে পার্থিব সমাপতনকে দেবতার ইচ্ছা বলে মেনে নিতে। কিন্তু কেন? কেন সে ফিরে এল এভাবে? এখানেই কি তবে…
শুনেছিল বটে সে গোপন ষড়যন্ত্রের কথা। ঊর্মিমালার বাল্যপ্রেম দমনে রাশভারী পিতৃব্য তাঁকে তুলে দেন দক্ষিণভূমের এক রাজকুমারের হাতে। সম্প্রদান করেন ঊর্মিমালার দেহ। মন পড়ে থাকে ত্রিভীষকের কালললাটে। একটিমাত্র রাতেই নাকি আত্মগোপন করেন ঊর্মিমালা। ত্রিভীষক সকালে ওঠে শোনেন, ঊর্মিমালা পলাতকা। মুহূর্তে নিজেকে শান্ত করেন ত্রিভীষক। প্রবল রক্তক্ষরণ রোধ করার চেষ্টাও করেননি তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন। বাণপ্রস্থের ডাক শোনেন অচিরেই। মিলিয়ে যান অন্য অতীতের পাতায়। মুছে ফেলেন বুকে আঁকা পত্ররেখা – টান হারায় ঊর্মিমালার। ত্রিভীষক তোলেন গেরুয়াবস্ত্র, কটিদেশে মৃত্যুর উপাখ্যান। ঊর্মিমালা! আর কোনওদিন – যুগ, শতাব্দীর ব্যবধানেও নিস্তরঙ্গ জীবনের মায়াবী হাওয়ায় হিল্লোল জাগিয়ে শোনা যায়নি তার নূপুরধ্বনি। ঊর্মিমালা মিশে যায় জনস্রোতে, কিংবদন্তী হয়ে।
ভোর হচ্ছে। চরাচরে খেলা করছে রক্তিম উর্ণনাভ। মায়াজাল বিস্তার ক’রে পৃথিবীকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় ব্রতী সপ্তাশ্বরথ। জারুলগাছের কোণ থেকে সূর্য উঁকি দিতেই এখানে শুরু হয় মানুষের ভিড়। নদীর চরে এখন অজস্র মানুষের মাথা। গাদাগাদি ক’রে শুয়ে থাকা আর্ত, নিপীড়িতের দল। তারা রাজনীতি জানে না। জানে না যুদ্ধের আদিম ইতিহাস। মেলবন্ধনের মেদুরতা যে অক্ষয়ধামের মোহমাত্র – এব্যাপারেও কুটিলতা নেই তাদের। একটাই কেবল উদ্দেশ্য – দেবমূর্তির কাছে সমর্পণ। তীব্র, ভাবাবেগ-আক্রান্ত আত্মসমর্পণ। নেই কোনও রীতি-নীতি, নেই পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন। নেই মাল্যার্পণ। কেবল আত্মসমর্পণ। নৈবেদ্যের থালায় নিজেকে সাজিয়ে বিনীত সাষ্টাঙ্গশয়ন। মহাস্থবির হয়ে আশ্রয়ের অন্বেষণ। চিরন্তন।
গর্ভগৃহে তখন লুকোচুরি। ওর অপাপবিদ্ধ বিজারণ-ক্ষমতায় মুগ্ধ সে দেবমূর্তি। অল্প কিছু কি কথা হয় ওদের মধ্যে? কেউ জানে না। হাওয়ার ওজন ভারী হয়ে ওঠে। এক অতিলৌকিক আস্তরণ ভেসে ওঠে। সূক্ষ্ম সে রেশমি-কুয়াশা আর কেউ না দেখতে পেলেও ঠিকই অনুধাবন করেন প্রবালকৃষ্ণ। গম্ভীর হয়ে ওঠেন। বুকের কাছে ভারী অস্বস্তি হয়। বেদনার তীব্র স্বর পাক খেয়ে উঠে দলা পাকিয়ে যায় গলার কাছে আসে। প্রাণসখার পরিণতি কিছুমাত্র বিচলিত করেনি যাঁকে, প্রস্তরবৎ বাইরে বসে থাকেন তিনি। এক মূর্তিমান অভিশাপ হয়ে।
সময় কাটে। ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে ভিড়। সরের প্রলেপ মুছে যায় বর্তমানের চাপে। ভারটা যেন আচমকা লাঘব হয়ে যায় চারপাশে। গর্ভগৃহে স্থাণু দেবমূর্তির চরণে কয়েক বিন্দু অশ্রুজলই তাঁর আজীবনের সঞ্চয় হয়ে রইল ভেবে বড় হতাশ লাগে নিজেকে। প্রবালকৃষ্ণ কিছুটা সময় নেন। গুছিয়ে নেন নিজেকে। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েন মন্দিরের কাজে। ভোগ রাঁধতে হবে যে!
হাটুরের দল আজ যেন বড় বেশি ভীত, সন্ত্রস্ত। পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। বছরের ঠিক এই একটি দিন তাদের মন বসে না কাজে। বিক্রিবাটা সেরে দৌড়তে থাকে ঘরে। উদাসী হাওয়ার পথ বেয়ে শোনা যায় তাদের পদধ্বনি। সুপ্রাচীন কোনও অভিশাপ কি জেগে উঠছে আবার? যে পালাবদল বছরের পর বছর বুকে ধরে গুমরে থাকেন প্রবালকৃষ্ণ, তা কি শেষ হতে চলেছে, না নতুন শুরু? প্রলয়ের কাল কি আসন্ন? বুঝতে পারেন না তিনি। তিনি প্রবালকৃষ্ণ পুরোহিত, শাস্ত্রজ্ঞ। তবে ত্রিকালদর্শী নন। অনাগত বিপদের বা স্বস্তির সংকেত ধমনীতে প্রবাহিত হয় না। তিনি শুনেছেন, এই মন্দির নাকি নতুন মহারাজের পছন্দ নয়। একদিনই এসেছিলেন তিনি, আগমনের ঢক্কানিনাদে যেন গর্জে উঠছিল প্রশস্তিবাক্য। বিরক্ত হয়েছিলেন প্রবালকৃষ্ণ। বলেননি কিছুই। স্বাগত জানিয়েছিলেন, পুজো দিয়েছিলেন আলাপী সম্ভাষণের পর। পরিয়ে দিয়েছেন জয়টীকা। কিন্তু, মহারাজের ভ্রূকুটি বড় বিব্রত করেছিল তাঁকে। বাইরে বারংবার উচ্চৈঃস্বরে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল রণবাদ্য। কিছুক্ষণ পরই আছড়ে পড়ল গোলাবর্ষণ।
“এই মন্দির বড় বেশি অন্ধকার, হে ব্রাহ্মণ! সংস্কার প্রয়োজন”।
চমকে উঠেছিলেন প্রবালকৃষ্ণ। অশুভ ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হয়নি প্রাজ্ঞ মানুষটির।
“কেন মহারাজ?”, যথাসম্ভব উত্তেজনা প্রশমন ক’রে উচ্চারণ করেছিলেন তিনি।
“গর্ভগৃহ যেন বড় বেশি স্তব্ধ। কেমন যেন নিশুতি। মন্দিরের গর্ভগৃহে জনসাধারণের প্রবেশ। সেখানে, এত অন্ধকার কেন থাকবে দেবালয়ে? আমি রাজজ্যোতিষীর সঙ্গে কথা বলে আপনার সঙ্গে আলোচনায় বসব। আজ আসি”।
আর কিছু না বলেই অভ্যাসমাফিক প্রণাম সেরে চলে গিয়েছিলেন মহারাজ। প্রবালকৃষ্ণ কোনওমতে প্রস্তুত করেছিলেন অনুনয়, “সংস্কার না করলেই কি নয়?” কিন্তু বলা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীরগাত্র থেকে যেন উঠে এসেছিল দীর্ঘশ্বাস। আর, রক্তের গন্ধ!
আজই সেই দিন। প্রবালকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথামাফিক আলোচনা সেরে মন্দির সংস্কার শুরু করতে চলেছেন মহারাজ। প্রবালকৃষ্ণ নিম্নকণ্ঠে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর হৃদয়ের কু-বার্তা কিছুতেই এড়াতে পারেননি তিনি। এও জানতেন, এতে সকলের মনে সন্দেহেরই উদয় হবে। মন্দির সংস্কার ধার্মিক রীতি। সেখানে প্রশ্ন উঠবে কেন? তাও প্রধান পুরোহিত-ব্রাহ্মণের তরফে? তাঁর তো বরং সাগ্রহে সহযোগিতার কথা! তবু মহাকালের ক্ষোভের কথা ভেবেই নিজেকে নিয়ে ভাবেননি। জানতেন, ধোপে টিকবে না। জনমানসের বিশ্বাসের অজুহাতও এক্ষেত্রে গ্রাহ্য নয়। সাধারণ চরের মানুষ কি আর কালপ্রবাহের খোঁজ রাখে? তাদের আশ্রয় রক্ষিত হলেই হল।
সময় গড়ায়। প্রবালকৃষ্ণ ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েন ইতিহাসের মর্মরধ্বনির কাছে। যে প্রাচীন অভিশাপের রুধিরধারা বয়ে চলেছে এই মন্দিরের ভিতে, তার কী হবে? ত্রিভীষক যে বলেছিলেন, এখানেই রয়ে যাবে তাঁদের অন্তিম মিলন! নবরূপায়িত মন্দিরে কে পূজিত হবেন? দেবমূর্তি যে স্বয়ং বিপদগ্রস্ত!
প্রবালকৃষ্ণ ওকে খোঁজেন। ও কোথায়? কোথায় ওর পাতাল থেকে উঠে আসা অবয়ব? কোথায় সেই নদীর চর থেকে উঠে আসা জ্যোতির্ময়? কোথায় সেই জন্মদাগের ক্ষতের মতো মুখস্ত কিংবদন্তী? পাগল পাগল লাগে নিজেকে প্রবালকৃষ্ণের। রাজার অনুচর এবং অমাত্যদল প্রায় এসে পড়েছেন, আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এরপর আসবেন রাজজ্যোতিষী। শেষ মুহূর্তের লগ্নবিচার সমাপন করলেই মন্দির সংস্কারের কাজ শুরু হবে। তবে কি আর কিছুই করার নেই? উল্কাপাত থেকে পরিত্রাণ নেই এই অভিশাপের?
গর্ভগৃহের বাতাস কেমন ভৌতিক। দেবত্বের ছোঁয়াও নেই সেখানে। দেবমূর্তির কাছে বসে রয়েছে ও। আজ কোনওরকম ক্লিষ্ট নয় ও, নয় আহ্লাদিতও। বরং, কিছুটা অভিমানী। অনুযোগের আবেশ। ওর তো পাপ ছিল না কোনও! তবে কেন!
দেবমূর্তি চুপ। বরাবরের মতোই। অভয়মুদ্রা কাঁপছে কেবল। খানিক যেন বিব্রত, বিমর্ষ। রক্তক্ষয়ী সেই হাত আজ ক্লান্ত। ও কি আসবে আর কোনওদিনও? সংস্কারসাধিত দেবভূমে দেবমূর্তি থাকবে, তবে প্রাণ থাকবে না। ও থাকবে না সম্ভবত, কারণ এই অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্ভগৃহেই তো ওর অধিষ্ঠান। ওর আড়াল, ওর আশ্রয়। এর জন্যই তো ও আসে। ভোগ বিতরণের সময়টুকুর ওর উপভোগ্য। কারণ ওটুকু সময়েই অন্নপূর্ণার আগমন। বাকি সময় তো রক্তের, ক্ষুধার আর অতৃপ্তির। এই মন্দিরের আশীর্বাদ তাই কারোরই কাজে আসে না। নদীর চরের মানুষগুলো তাই বারবার আকুতি-আর্তনাদ নিয়ে এলেও কোনও স্বপ্ন সফল হয়নি তাদের। তবে, নতুন মন্দিরে কি মুছে যাবে সেই ঘৃণা? নতুন প্রাণসঞ্চার হবে? রাজজ্যোতিষী কি জানেন অভিশাপের এই কাহিনি?
তিনি কি জানেন, ত্রিভীষকের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরে স্বয়ং ত্রিভীষকই পূজিত হন এত বছর ধরে? তার অস্ত্রনির্মাতা প্রবালকৃষ্ণের হাতে?
ঊর্মিমালার আত্মগোপনের সেই অভিশপ্ত রাতে প্রবালকৃষ্ণের সাহায্যেই ওকে প্রাসাদের বাইরে বার করে এনেছিলেন ত্রিভীষক। নিয়ে এসেছিলেন এই স্থানে। বলেছিলেন, মন্দির প্রতিষ্ঠা ক’রে রচনা করবেন তাঁদের অমরপ্রেমের উপাখ্যান! প্রবালকৃষ্ণের তুলে দেওয়া তরবারিতেই কর্তন করেছিলেন ঊর্মিমালা মস্তক। অপ্সরাবৎ শরীরটা যেন বুঝেই উঠতে পারেনি ঘটনার আকস্মিকতা। ত্রিভীষক নিজেদের অমর করতে চেয়েছিলেন। আর প্রবালকৃষ্ণের সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করতেন এই প্রেমমন্দির – যেখানে যুগলের শোণিতবৃষ্টিতে গড়ে উঠত ভিত।
হয়নি তেমনটা। ঊর্মিমালার রক্তে মাটি ভিজলেও ত্রিভীষক ভয় পেয়েছিলেন। পারেননি, আত্মহননের দায়ভার গ্রহণ করতে। পালিয়ে গিয়েছিলেন। প্রবালকৃষ্ণ অস্ত্রার্পণ করলেও ব্রহ্মহত্যার পাপ করতেন না। জানাতেনও না ত্রিভীষকের পরিচয়। পরে তার মৃত্যুসংবাদ পেলেও তার ব্রাহ্মণ-ছদ্মবেশে ক্ষত্রিয়জন্মের কথা এতদিন লুকিয়েই রেখেছিলেন। কিন্তু, নতুন মন্দিরের ইতিহাস রচনা যদি করেন মহারাজ, লিখতে হবে সেই অদ্ভুত দিনলিপি। পৃথিবীর বুকে এক দগ্ধ রক্তক্ষয়ী অক্ষয়-প্রেমের শিলালিপি শোভিত হবে। প্রবালকৃষ্ণ কি পারবেন? বড় অসহায় লাগছে নিজেকে আজ। দেবমূর্তিতে ত্রিভীষকেরই প্রাণ সঞ্চার ক’রে ওকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে উৎসর্গ করেছিলেন প্রবালকৃষ্ণ। আজ কি সে দায় আবার নেওয়ার পালা? অভিশাপের হাত থেকে কি অব্যাহতি মিলবে না কোনওদিন? ও কোথায়? কোথায় ও?
ম্লান গর্ভগৃহে ও আজ নিষ্কৃতিমৃত্যুর প্রথম শরীক। নিজেকে কেমন নির্ভার লাগছে আজ। সে-দিনের বিস্ময়ের অপভ্রংশ কোনওদিনই বাস্তবানুগ বুঝতে পারেননি ও। নতুন সংস্কারে ঋণখেলাপীর মতো ওকে আর ঘুরে বেড়াতে হবে না বাস্তুঘুঘুর মতো।
ও ফিরে যেতে থাকে রূপালী রেখার পথ ধরে। উন্নত শির, ঋজু। শরীর নেই বটে, অনুভব তো ফিকে হয়নি। ওটুকু দিয়েই বাঁচবে ও। নদীর চরেই। অগুণতি বঞ্চিত মানুষের ভিড়ে। যারা রোজ দেখে, আলেয়ার মতো কোনও এক দেবশিশু যেন জোনাকি হয়ে উড়তে উড়তে মিলিয়ে যায় মন্দিরে।
আর প্রবালকৃষ্ণ দেখছিলেন রক্তে-ভেজা শূন্যস্থান। শুধু এক কর্তিত-মস্তক ছদ্মবেশী নারী-শরীর পড়ে রয়েছে নদীর চরে একা। পা-দুটো বুকের সঙ্গে বাঁধা, হাতগুলো টিকটিকির মতো ছড়ানো।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
