বিশ্বজিৎ মণ্ডল
১.
পুন্ড্র পাড়ার হারু মণ্ডলের নাম শুনলে আশপাশের পাঁচ গাঁয়ের মানুষ একটু সাবধান হয়ে যায়। হারু মণ্ডল স্বভাব চোর—এ কথা প্রায় সবাই জানে। অবশ্য বড় চোর নয়, ছিঁচকে চোর। কারও উঠোন থেকে মেজে রাখা বাসনপত্র , কারও বারান্দা থেকে শুকোতে দেওয়া জামা, কোথাও সাইকেল , কোথাও দোকানের ক্যাশ বাক্সের টাকা—এই তার চুরির সাম্রাজ্য। তাই কেউ কেউ তাকে ঠাট্টা করে বলে, ‘ ছিঁচকে চোর’।
হারুর বয়স সাতান্ন। মুখে সারাবছর খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত। গায়ে পুরোনো ফতুয়া, কোমরে মলিন লুঙ্গি। দেখলে মনে হবে, এই মানুষটির জীবনে চুরি ছাড়া আর কোন কাজ নেই।
আসলে কাজ আছে। কাজ করতে পারে না—এটাই তার দুর্ভাগ্য।
একটিমাত্র মেয়ে তার। গঙ্গার ওপারের লোকপুরের এক সাইকেল মিস্ত্রি ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দিয়েছে। মেয়ে-জামাই খুব একটা আসে না। লোকজন বলে, হারুর জামাই নাকি শ্বশুরের পরিচয় দিতে লজ্জা পায়।
হারু এসব শুনে হেসে উড়িয়ে দেয়।
‘চোরের মেয়ের জামাই হয়েছে, এত লজ্জা কিসের? বিয়ের আগে তো জানত!’
কথাটা বললেও বুকের ভেতর কোথাও একটা কাঁটা বিঁধে থাকে।
সেদিন বিকেলে পুন্ড্র পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বসেছিল হারু। দোকানে আরও কয়েকজন গ্রামের লোক। চায়ের সঙ্গে যথারীতি শুরু হয়েছে গ্রামের খবরের আলোচনা।
নিতাই চা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—কী হারু, আজকাল তোর চুরির খবর শুনি না। তোর এখন ওইসব করতে হাত-পা কাঁপে নাকি?
হারু চায়ে ফুঁ দিতে দিতে বলল,
—বয়স হয়েছে রে। এখন চুরি করতেও হিস্যাব কত্তে হয়।
—কীসের হিস্যাব ?
—যার কাছ থেকে লিব, তার ঘরে আবার কী আছে!
সবাই হেসে উঠল।
ওপাড়ার স্বপন কাকা বলল,
—তুই তো বড় নীতিবান চোর!
হারু এবার চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—সব ঘর থেকে চুরি করা যায় না রে। কিছু ঘর থাকে, যেখানে হাত বাড়ালে নিজের হাতটাই পুড়ে যায়।
চায়ের দোকানে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। কেউ
কেউ কথাটার মানে বুঝল না।
সন্ধ্যার একটু আগে হারু বাড়ি ফিরছিল। পঞ্চায়েতের পুরোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটার সামনে এসে দাঁড়াল। বহুদিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা সেই ঘরটায় আজ কয়েকজন লোক ঢুকছে।
হারু দাঁড়িয়ে শুনল তাদের কথা।
—কাল থেকেই ডাক্তার বসবেন।
—ওষুধপত্রও এসেছে?
—হ্যাঁ। টিকার ফ্রিজও এসেছে। গ্রামের বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হবে।
হারু কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই বলল,
—বাচ্চাদের টিকা! ভালোই তো।
কিন্তু সেদিন রাতেই আকাশের চেহারা বদলে গেল।
দিগন্তজুড়ে কালো মেঘ। তারপর শুরু হল বৃষ্টি।
প্রথমে টুপটাপ। তারপর ঝমঝম। তারপর যেন আকাশের সব দরজা একসঙ্গে খুলে গেল।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুন্ড্র পাড়ার নিচু জমিগুলো জলে ভরে উঠল। নালা উপচে জল ঢুকল রাস্তায়। হারুর কুঁড়েঘরের চাল দিয়ে টুপটাপ জল পড়তে লাগল।
ঘুম আসছিল না তার।
হঠাৎ বাইরে একটা শব্দ শুনে হারু দরজা খুলে তাকাল।
দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকটা অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। ক্লাবের পাশের এই ঘরটা নিচু এলাকায়।
হারুর চোখ কুঁচকে গেল।
সে বুঝতে পারল—স্বাস্থ্যকেন্দ্রটা গ্রামের সবচেয়ে নিচু জায়গায়। সেখানে জল জমতে শুরু করেছে।
আর সেখানে রাখা হয়েছে টিকার ফ্রিজ।
হারু কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ঘরের কোণে রাখা পুরোনো লোহার শিকটার দিকে তাকাল।
নিজের মনেই বলল,
—যাবি?
কিছুক্ষণ পর নিজেই উত্তর দিল,
—যেতে তো হবেই।
কিন্তু কেন যেতে হবে, সেটা তখনও হারু নিজেও পুরোপুরি জানত না।
শুধু জানত—আজ রাতে তাকে আবার চুরি করতে হবে।
তবে এই চুরির মাল সে নিজের ঘরে আনবে না।
এই প্রথম, হারু মণ্ডল চুরি করতে বেরোল মানুষের জন্য।
২.
রাত তখন প্রায় দুটো।
বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু পুন্ড্র পাড়ার চারদিক তখনও জলে থইথই। কাদা মাড়িয়ে হারু মণ্ডল ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলল। হাতে সেই পুরোনো লোহার শিক। মাথায় ছাতা নেই। ভিজতে ভিজতেই সে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে এসে হারু থমকে দাঁড়াল।
দরজায় নতুন তালা।
হারু তালাটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তুই তো আমাকে চিনিস না রে তালা। কিন্তু আমি তোকে ভালো করেই চিনি।
কথাটা বলেই শিকটা তালার ফাঁকে ঢুকিয়ে দিল।
কয়েক মিনিটের চেষ্টায় তালা খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হারুর বুকটা ধক করে উঠল।
ঘরের মেঝেতে হাঁটুসমান জল ।
এক পাশে কয়েকটি কার্টন ভাসছে। আর দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট সাদা রঙের ফ্রিজটি। তার নিচের অংশ ইতিমধ্যে জলেতে ডুবে গেছে।
হারু বিড়বিড় করে বলল,
—বাঁচবি তোরা?
সে জানত, ফ্রিজের ভেতরে কী আছে। টিকা। গ্রামের শিশুদের জন্য রাখা টিকা। সেগুলো নষ্ট হয়ে গেলে শুধু কিছু ওষুধ নষ্ট হবে না—নষ্ট হবে অনেক শিশুর নিরাপত্তা।
কিন্তু ফ্রিজটা একা তোলা সম্ভব নয়।
হারু চারদিকে তাকাল।
একটা বাঁশের খুঁটি পড়ে আছে।
সে সেটা টেনে এনে ফ্রিজের নিচে ঢুকিয়ে দিল। তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলতে লাগল।
ফ্রিজ নড়ল না।
হারুর শরীর কাঁপতে লাগল।
—শালা! এত ভারী!
সে আবার চেষ্টা করল।
এইবার ফ্রিজটা সামান্য নড়ে উঠল।
হারু হাঁফ ছেড়ে নিজেকে বলল,
—চল বুড়্যে, তুই আর আমি আজ একসঙ্গে চুরি করি।
অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর অবশেষে ফ্রিজটাকে দরজার কাছে নিয়ে এল সে। তারপর বাঁশের সাহায্যে টেনে টেনে বাইরে বের করল।
কিন্তু কোথায় রাখবে?
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারদিকে জল।
তখনই তার চোখ গেল পাশের পুরোনো প্রাথমিক স্কুলের দিকে। স্কুলটি একটু উঁচু জায়গায়। বারান্দাও বেশ উঁচু।
হারু ফ্রিজটা সেখানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কাদার মধ্যে টেনে নিয়ে যেতে যেতে তার পা বারবার পিছলে যাচ্ছিল। একবার পড়েও গেল। কনুইয়ে আঘাত লাগল।
তবু উঠল।
কারণ সে জানত, এবার যদি ফ্রিজটা পড়ে যায়, তার চুরির গল্পটা অন্যরকম হয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত ফ্রিজটা স্কুলের বারান্দায় তুলে রাখল।
তারপর আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিরে গেল।
এক এক করে ওষুধের কার্টনগুলোও সরিয়ে আনতে লাগল।
প্রতিটি বাক্স মাথায় তুলে যখন সে স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল—এ কেমন চুরি!
চুরি করে মানুষ জিনিস লুকিয়ে রাখে।
আর সে চুরি করে জিনিস পাহারা দিচ্ছে!
শেষ কার্টনটি সরানোর পর হারু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজায় ফিরে এল।
তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
হারু দরজাটা বন্ধ করে আবার তালা লাগিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ তালাটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর তালাটাকে বলল,
—আজ তোর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কিন্তু চুরিটা তুই বুঝবি না।
বাড়ি ফিরে হারু চুপচাপ ভিজে কাপড় খুলে শুকোতে দিল।
তার কনুই থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল। স্ত্রী বহু বছর আগে মারা গেছে। ঘরে তার দেখার মতো কেউ নেই। তাই নিজের ক্ষত নিজেই মুছে নিল।
তারপর খাটের ওপর শুয়ে পড়ল।
ঘুম এল না।
মনে হল, সকালে কী হবে?
মানুষ কি বুঝবে?
নাকি বলবে—স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চুরি হয়েছে, আর চোর হারুই?
সকালে সত্যিই হইচই শুরু হয়ে গেল।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তালা ভাঙা দেখে প্রথমে ছুটে এলেন স্বাস্থ্যকর্মী মিতালি।
তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই চিৎকার করে উঠলেন,
—সব শেষ!
পঞ্চায়েতের প্রধান ছুটে এলেন।
—কী হয়েছে?
মিতালি বললেন,
—ফ্রিজ নেই! ওষুধের বাক্সগুলোও নেই!
একজন বলল,
—আমি জানতাম। হারুর কাজ।
আর একজন বলল,
—চোরের হাত থেকে গ্রামের হাসপাতালও রেহাই পেল না!
কথাগুলো দূর থেকে শুনছিল হারু।
সে কিছু বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
পঞ্চায়েত প্রধান বললেন,
—পুলিশে খবর দাও।
মিতালি তখনও ঘরের ভেতর খুঁজছিলেন।
হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল মেঝেতে।
—এক মিনিট!
তিনি বাইরে বেরিয়ে স্কুলের দিকে ছুটলেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর গলার আওয়াজ শোনা গেল,
—এদিকে আসুন! তাড়াতাড়ি!
সবাই ছুটে গেল।
স্কুলের উঁচু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ফ্রিজ।
পাশে সারি করে রাখা ওষুধের কার্টন।
সব শুকনো।
সব অক্ষত।
মিতালি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
পঞ্চায়েত প্রধান বললেন,
—এগুলো এখানে এল কী করে?
কেউ উত্তর দিল না।
হারু তখন ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে।
মিতালির চোখ গিয়ে পড়ল তার ওপর।
হারু চোখ সরিয়ে নিল।
মিতালি ধীরে ধীরে বললেন,
—হারুদা…
হারু এবার তাকাল।
—আপনি রাতে এখানে এসেছিলেন?
হারু চুপ।
—তালাটা আপনি খুলেছিলেন?
দীর্ঘ নীরবতার পর হারু মাথা নাড়ল।
মিতালি আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—চুরি করেছিলেন?
হারু এবার মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
চারপাশে আবার ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু এবার সেই চোরের মুখে এমন এক অদ্ভুত শান্তি ছিল, যা কেউ আগে দেখেনি।
মিতালি ধীরে ধীরে কাছে এসে বললেন,
—কী চুরি করেছিলেন?
হারু স্কুলের বারান্দায় রাখা ফ্রিজটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—জলের হাত থেকে তোমাদের জিনিসগুলো।
কথাটা শুনে কেউ হাসল না।
বরং সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই দূর থেকে সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল।
লোকপুর থেকে হারুর মেয়ে আর জামাই এসেছে।
মেয়েটি ভিড়ের মধ্যে বাবাকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
সে বুঝতে পারল—আজ তার বাবার জীবনে এমন একটা দিন এসেছে, যেদিন চোরের পরিচয়টা হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।
কিন্তু সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তখনও কেউ জানত না।
কারণ হারুর এই ‘চুরি’র বিচার এখনও বাকি।
৩.
স্কুলের বারান্দায় তখন গ্রামের প্রায় সবাই জড়ো হয়েছে। একদিকে উদ্ধার হওয়া ফ্রিজ ও ওষুধের বাক্স, অন্যদিকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে হারু মণ্ডল। এতদিন যাকে নিয়ে ঠাট্টা হয়েছে, যার নাম শুনে মানুষ ঘরের দরজা এঁটে দিয়েছে, আজ সেই হারুকেই ঘিরে কেমন একটা অস্বস্তিকর নীরবতা।
পঞ্চায়েতের প্রধান গম্ভীর মুখে বললেন,
—হারু, তালা ভেঙে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকেছিস। আইন তোকে চোরই বলবে।
হারু মাথা নিচু করে বলল,
—জানি।
—তাহলে?
হারু একটু চুপ করে থেকে বলল,
—আইনের কাছে আমি চোর। কিন্তু ওই রাতে যদি তালা না ভাঙতাম, তাহলে এই জিনিসগুলো আজ জলের তলায় পড়ে থাকত।
মিতালি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—প্রধানসাহেব , হারুদা ঠিকই বলছে। টিকাগুলো নষ্ট হয়ে গেলে গ্রামের কতগুলো বাচ্চার ক্ষতি হত, আমরা কেউ জানি না।
একজন বৃদ্ধ কৃষক এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তিনি এবার বললেন,
—চুরি করেছে ঠিকই। কিন্তু নিজের ঘরে তো কিছু নিয়ে যায়নি।
পাশ থেকে আরেকজন বলল,
—চোরের আবার ভালো-মন্দ কী?
বৃদ্ধ লোকটি শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
—মানুষের বিচার শুধু কাজ দিয়ে হয় না, কাজের কারণ দিয়েও হয়।
হারু মাথা তুলল।
তার চোখে জল চিকচিক করছে।
এমন কথা তার জন্য কেউ কোনদিন বলেনি।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে সামনে এল তার মেয়ে গঙ্গা।
বাবার সামনে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
হারু অবাক হয়ে বলল,
—তুই এলি?
গঙ্গা উত্তর দিল না।
তারপর বাবার কনুইয়ের ক্ষতটা দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠল।
—এটা কীভাবে হল?
হারু হেসে বলল,
—চুরি করতে গিয়ে একটু পড়ে গিয়েছিলাম।
গঙ্গার চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি এখনও চুরি করো বাবা?
হারু মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
—হ্যাঁ রে। তবে কাল রাতে প্রথমবার মনে হল, চুরি করেও কাউকে ঠকাইনি।
গঙ্গা বাবার হাতটা ধরে বলল,
—তুমি আমাকে লজ্জা দাওনি বাবা। এতদিন আমি ভাবতাম, তোমার জন্য লোকের সামনে মাথা নিচু করতে হবে। আজ মনে হচ্ছে, তোমার মেয়ে বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।
হারু আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
পঞ্চায়েত প্রধান এতক্ষণ সব শুনছিলেন। তিনি এবার বললেন,
—হারু, তোকে থানায় পাঠানোর কথা উঠেছিল। কিন্তু একটা শর্তে তুই ছাড় পাবি।
হারু অবাক হয়ে বলল,
—কী শর্ত?
—আজ থেকে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রাতের পাহারার দায়িত্ব তুই নেবি।
ভিড়ের মধ্যে হাসির শব্দ উঠল।
হারুও হেসে ফেলল।
—চোরকে পাহারাদার বানাবেন?
প্রধান বললেন,
—চোরই ভালো পাহারা দিতে পারে। সে জানে, চোর কোথা দিয়ে ঢোকে।
মিতালি হেসে বললেন,
—আর জানে, কোন জিনিস চুরি করা উচিত আর কোনটা নয়।
হারু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আমি রাজি।
সেদিন দুপুরে গ্রামের লোকজন মিলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিষ্কার করল। জল সরানো হল। ফ্রিজ আবার নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হল। ওষুধপত্র গুছিয়ে রাখা হল।
মিতালি হারুর কাছে এসে বললেন,
—আপনি না থাকলে এগুলো আজ থাকত না।
হারু মাথা নাড়ল।
—আমাকে ভালো মানুষ বানিয়ে ফেলবেন না দিদি। আমি এখনও হারু চোর।
মিতালি হেসে বললেন,
—মানুষের নামের পাশে বদনাম অনেকদিন থাকে। কিন্তু একটা ভালো কাজ কখনও কখনও সেই বদনামের ভেতর আলো ঢুকিয়ে দেয়।
হারু দূরে তাকিয়ে বলল,
—আমার আর বড় কিছু চাই না। শুধু চাই, মেয়েটা যেন আর আমার জন্য লজ্জা না পায়।
সন্ধ্যায় গঙ্গা বাবার হাতে নতুন একটা গামছা দিয়ে বলল,
—এটা রাখো। কাল থেকে তো তোমার নতুন কাজ।
হারু গামছাটা হাতে নিয়ে হেসে বলল,
—বেতন কত দেবে জানিস?
—কত?
—জানি না। তবে আজ একটা জিনিস পেয়েছি।
—কী?
হারু মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোর বিশ্বাস।
গঙ্গা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
সেদিন রাতেই হারু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বারান্দায় বসে পাহারা দিতে শুরু করল।
চারদিক নিস্তব্ধ। দূরে গঙ্গার জল বয়ে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ সরে চাঁদ উঠেছে।
হারু কোমরের চাবিটা স্পর্শ করল।
এই চাবি এখন তার কাছে অন্যরকম।
যে হাত এতদিন তালা খুলে অন্যের জিনিস নিয়ে পালিয়েছে, সেই হাতেই আজ তালা বন্ধ করে মানুষের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব।
হঠাৎ তার মনে হল, মানুষ তাকে পুরোপুরি বদলে দেয়নি। বরং সেই মানুষটি তার ভেতরেই ছিল—শুধু এতদিন কেউ তাকে খুঁজে দেখেনি।
পরদিন সকালে মিতালি এসে দেখলেন, হারু ঘুমায়নি।
তিনি বললেন,
—রাত কেমন গেল?
হারু হেসে বলল,
—চোরের রাত ভালো যায়নি। পাহারাদারের রাত ভালো গেছে।
মিতালি বললেন,
—এবার চুরি ছাড়বেন?
হারু একটু ভেবে বলল,
—পুরোপুরি পারব কি না জানি না। অভ্যাস বড় জিনিস। তবে একটা কথা বলতে পারি—
—কী?
—এখন থেকে যদি চুরি করি, মানুষের বিপদ চুরি করব। কারও ঘরে ঢুকে দুঃখ রেখে আসব না।
মিতালি হেসে ফেললেন।
কথাটা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
পুন্ড্র পাড়ার মানুষ হারুকে নিয়ে নতুন করে কথা বলতে শুরু করল। কেউ বলল, সে চোর। কেউ বলল, পুরোনো অভ্যাস একদিনে যায় না। আবার কেউ বলল, মানুষকে তার সবচেয়ে খারাপ কাজ দিয়ে সারাজীবন বিচার করা যায় না।
কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই একমত হল—
হারুর সেই রাতের চুরি অন্য সব চুরির মতো ছিল না।
সে চুরি করেছিল একটি ফ্রিজ, কয়েক বাক্স ওষুধ আর কিছু টিকা—কিন্তু নিজের জন্য নয়।
সে চুরি করেছিল বন্যার জল থেকে গ্রামের শিশুদের নিরাপত্তা।
চুরির সেই রাতে হারুর পকেটে এক টাকাও ঢোকেনি।
বরং কনুইয়ে লেগেছিল ক্ষত।
তবু সেই চুরির পর তার জীবনে প্রথমবার এমন কিছু এসেছিল, যা কোনো চোরের ভাগ্যে সচরাচর জোটে না—মানুষের বিশ্বাস।
আর তাই পুন্ড্র পাড়ার লোকেরা পরে সেই ঘটনাকে এক নামেই ডাকত—
‘অপরূপ চুরির গল্প।’
কারণ সেই চুরিতে হারু কিছু নেয়নি।
বরং নিজের পুরোনো পরিচয়টাই চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল।
আর রেখে গিয়েছিল একজন নতুন মানুষকে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
