প্রীতন্বিতা
লেজার রশ্মি
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি লেজারকে বিজ্ঞানী মাইমান প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। আর দশটা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মত দেখে হয়তো সেদিন অনেকেই বুঝতে পারেনি কতটা সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে এর মধ্যে। প্রায় একই সময়ে কম্পিউটারকেও হাতে পেয়েছিল মানুষ। আজ কম্পিউটার প্রযুক্তি যেমন জগত ছেয়ে ফেলেছে তেমনি তার সঙ্গে প্রায় সমানে সমানে এগিয়ে যাচ্ছে লেজার। সায়েন্স ফিকশন অবশ্যই লেজারকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করেছিল আরও আগে থেকে।স্টার ওয়ার্স সিনেমাগুলির তুলকালাম জনপ্রিয়তা লেজারকে সর্বসাধারণের আলোচনায় নিয়ে আসে। ওই সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলিতে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে লেজারকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, রশ্মিবন্দুক বা আলোর তরবারি হয়ে ওঠে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার।

লেজার আর এখন কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণাগারের গণ্ডি কাটিয়ে লেজার মানুষের সমস্ত ক্ষেত্রগুলিতে আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে। চিকিৎসা, শিল্প, বিনোদনের জগত থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি, যোগাযোগ, মহাকাশযাত্রা, সামরিক ক্ষেত্র ইত্যাদি সব জায়গাতেই লেজার অপরিহার্য। চিকিৎসায় লেজার হল রক্তপাতশূন্য ছুরি। খুব সহজে এর সাহায্যে রুদ্ধ ধমনী মুক্ত করা যায় এবং স্থানচ্যুত রেটিনাকে স্বস্থানে স্থাপন করা সম্ভব। লেজারের করাত ব্যবহার করে শক্ত ও মোটা ধাতব পাতকে সহজেই কাটা হয়। লেজার দিয়ে ধাতব, এমনকি মাটির পাত্রকেও ফুটো এবং ঢালাই করা যেতে পারে। লেজার রশ্মি দিয়ে ভিডিও ডিস্ক চালানো ছাড়াও প্রিন্টিং প্লেট এক্সপোস করা হয়, টিভি সিগন্যাল ও কন্ঠস্বরের সাহায্যে বহু দূরে নিয়ে গিয়ে ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতি পাওয়া সম্ভব। নিশানা নির্ধারণ ও রিমোট সেন্সিং-এর কাজেও লেজার বেশ কার্যকরী।
লেজার কথাটির পুরোটা হচ্ছে লাইট অ্যাম্পলিফিকেশন বাই স্টিমুলেটেড এমিশন অফ রেডিয়েশন। প্রকৃতপক্ষে লেজার হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের আলোকগুচ্ছ যা সাধারণ আলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে উত্তেজিত ও নিক্ষেপ করে পাওয়া যায়। এই রশ্মিগুচ্ছ চূড়ান্তভাবে একমুখী ও তীব্র।
সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যেতে পারে। মনে করা যাক, ঘরে একটা ষাট ওয়াটের বাল্ব জ্বালানো হল। সারা ঘর আলোতে ভরে যাবে, কারণ আলো এখানে একসঙ্গে সমস্ত দিকে যাচ্ছে এবং এভাবে সমস্ত দিকে বিচ্ছিন্নভাবে যেতে যেতে আলো দুর্বল হয়ে পড়বে। লেজার আলো কিন্তু এভাবে বিভিন্ন দিকে যায় না। আলোকগুচ্ছকে একটি খুবই সরু রশ্মিতে সঙ্ঘবদ্ধ করে তার শক্তিকে তীব্র ও জোড়ালো করে একই দিকে পাঠানো হয়। এই তীব্রতায় রয়েছে এত জোর যে মাত্র কয়েক মিলি ওয়াট লেজার ল্যাম্প চোখে পড়লে কেউ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। লেজারের একত্রিত আলোকগুচ্ছ একমুখী হওয়ার জন্য তীব্রতা অক্ষুণ্ন রেখে বহুদূর চলে যায়। কয়েক ওয়াটের লেজার ল্যাম্প পৃথিবীতে জালালে তা চাঁদ থেকে স্পষ্ট দেখা যাবে, যেখানে কলকাতা শহরের সমস্ত আলো চাঁদ থেকে দেখা সম্ভব নয়। এভাবে লেজার রশ্মি পৃথিবী থেকে চাঁদে পাঠিয়ে ও তার প্রতিফলিত রশ্মি পৃথিবীতে গ্রহণ করে চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব খুবই নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব।
লেজার রশ্মির কম্পাঙ্ক প্রায় এক এবং এদের মধ্যে বর্ণভেদ থাকে না। সাধারণ আলো কিন্তু নানা রঙের মিশ্রণ। অবশ্য এমন লেজারও আছে যাদের কম্পাঙ্ক এবং রং ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তবুও তারা একসঙ্গে একটি মাত্র রঙের আলো নিক্ষেপ করে। লেজারের এসব ধর্মগুলি কাজে লাগিয়ে তাদের নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার বেড়েই যাচ্ছে। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় আমরা ক্রমশ লেজার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
