শরদিন্দু সাহা

লেখক পরিচিতি

বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই  বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।

বিষয় পরিচিতি

(রেভারেন্ড জেমস্‌ লঙ  যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)


ঘরের ভেতর ঘর কে করে তার দর

ঠাকুরপুকুরের জলাশয়ের কিনারে সারি সারি গাছগুলোর ডালপালা আজ হঠাৎ আসা দমকা  হাওয়ায় বেসামাল হয়ে পড়ছে। যত সময় গড়াচ্ছে শুধুই মনের কোনায় জোরে জোরে ধাক্কা মেরে কে যেন বলছে – যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল ঘটনা পরম্পরায় তা কি আজও পূর্ণ হয়েছে? টের পাচ্ছিলাম ক্রমশ, আমি কি সেই, না অন্য কেউ। হিসেবটা বড় গোলমেলে, কে যে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কোন কাজে মনোনিবেশ করছে বোঝাই কষ্টকর হচ্ছে। এই তো মনে হলো সেদিনের কথা, কোনো এক সাঁঝবেলার নিল আকাশ, পাখিদের গুঞ্জনে মুখর, ওরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে ডানা ঝাপটিয়ে, সারাদিন শূন্যে ঘুরেফিরে কখন যে দূর লোকালয়ে এসে চুপটি করে ভেবে নিয়ে আবার ডানা মেলেছে দিগন্তে। দিন ফুরিয়ে গেলে ওদের সেই চঞ্চলতায় ছুঁয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডা বাতাস। ঠিক এমনি সময় কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরীর গ্ৰন্থাগারিক প্যারীচাঁদ মিত্র বলে চলেছেন কথার পিঠে কত কথা। কে তাঁকে থামায় – রেভারেন্ড লঙ, গভীর ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে দেখলাম আলোরা ঝলমল করে উঠেছে।  ভোরের আলোয় এখনও যেন জীবন্ত হয়ে আছে এমন সব মুহূর্তরা যা ইহজন্মে কখনও মুখোমুখি হই নি। বললাম, কী দেখলেন মিঃ মিত্র? গ্ৰন্থাগার-এর স্বপ্ন, থরে থরে বই সাজানো রয়েছে, পড়ুয়ারা নিজের তাগিদেই খোঁজ নিচ্ছে এমন সব বইয়ের যা ছিল এককালে কল্পনাতীত। নিজের ইচ্ছেগুলো পূর্ণ হয়ে প্যারীচাঁদ-এর স্বপ্নের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে দেখে তৃপ্তিতে মন ভরে উঠলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলেই ফেললাম, কিছু কিছু কল্পনা কখনও কখনও বাস্তবের সঙ্গে মিলেও তো যায়। এই তো ভার্ণাকুলার লিটারারী রিলিজিয়াস ট্রাক্ট সোসাইটির উদ্যোগে ঠাকুরপুকুর, আগরপাড়া, কলকাতা, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, ছাপ্রা, সোলা, বল্লভপুর, রতনপুর ও কার্পাসডাঙ্গাতে দশটি গ্ৰন্থাগার স্থাপিত হয়েছে। আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে বললেন, রেভারেন্ড লঙ, আপনি গোপন করে যাচ্ছেন কেন, এই সংস্থার সভাপতি আপনিই তো স্বয়ং। আমি এ-ও জানি কিছু গ্ৰন্থাগারে ইংরেজি বইয়ের সঙ্গে বাংলা বইও পাঠানো হয়েছে। হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন কেন্দ্রীয় গ্ৰন্থাগারে আটশত বাঙলা বই দেওয়া হয়েছে আর নতুন বই প্রকাশিত হলে তা খরিদ করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেভারেন্ড লঙ, আপনার এই কাজ কত যে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা নিশ্চয়ই একদিন উপলব্ধি করতে পারবে। এই পিছিয়ে থাকা সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর জন্য গ্ৰন্থাগারই হবে একদিন প্রকৃত অবলম্বন। এমন একজন স্বদেশী মানুষের কাছ থেকে সমর্থন পেয়ে ভাবলাম হয়তো ঠিক পথেই হাঁটছি।

আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি ইংরেজি উন্নত ভাষা হলেও জনগণের ভাষা নয়। এটা তো ঠিক বিদেশী ভাষায় শত পারদর্শিতা অর্জন করলেও ইংরেজরা কোন বিদেশীকে, অধীনস্থ এদেশীয়দের, তাঁদের ভাষায় পন্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইবেন না। কি জানি দেশীয় চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এই বিষয়ে আমার ভাবনার সঙ্গে কতটা একমত হবেন। মতপার্থক্য তো থাকতেই পারে, তাই বলে দৃশ্যমানতাকে তো অস্বীকার করা যাবে না। এক শ্রোতা দর্শকাশন থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল, ‘ সাহেব বাবা আপনি যে এত মাতৃভাষা আর স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন তা-কি মাতৃভাষায় ঘরের মেয়েদের শিক্ষিত করে তুলবেন এই লক্ষ্যে নাকি ধরে ধরে মাথাটা চিবিয়ে খৃষ্টান বানাবেন বলে?’ কথাটা আমার কানে বাজল, জবাব না দিয়েই চেয়ার ছেড়েছিলাম। নিজেই জবাব না দেবার জ্বালায় কয়দিন ধরে অস্থির-ই ছিলাম। প্রশ্নটা তো শুনতে ভারী সোজা মনে হয়, উত্তরটা কিন্তু এত সহজ নয়। কারণ এই প্রশ্নকে ঘিরে লুকিয়ে আছে এদেশীয় সমাজ-কাঠামো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা আর ধর্মীয় বাতাবরণ। কোন পথে কার মুক্তি এই কথাটা এড়িয়ে যাবার মতো নয়। তবে ছাত্রটিকে দেখা হলে উত্তরটা দেবার জন্য অন্তরে এক অবিমিশ্র তাড়নাও উপলব্ধি করছিলাম প্রতি পদে পদে। কারণ আমি  অস্বীকার করতে অপারগ হচ্ছিলাম এই পরম সত্য কথাটা, এখানের ছেলেমেয়েদের জ্ঞানার্জনের আগ্ৰহ, পরিশ্রম করার মানসিকতা, অকৃত্রিম ভাষায় সত্য কথা বলার ব্যাকুলতা, নিরাভরণ বাকপটুতা আর ধর্মবিশ্বাস আমার মনের কোণে ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে। আর সেই কারণেই দ্বন্দ্বটা আমার উদ্দেশ্যর সঙ্গে সঠিকভাবে রফা করতে পারছে না। আমি ইচ্ছে করলেই আমার নিজস্ব বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারি না আবার ভিন্ন পথে হাঁটলে একদিকে যাজক শ্রেণী অন্যদিকে প্রশাসকরা আমাকে তুলোধুনো করে ছাড়তে দ্বিধা করবে না।

রামগোপাল ঘোষ মহাশয় বললেন, ‘রেভারেণ্ড লঙ সমাজসেবা করবেন ভালো কথা, কিন্তু তার আগে আমাদের সমাজটাকে জানুন, বুঝুন।’ আমি-ই তো নিজেই সেই আশা নিয়ে পথচলা শুরু করেছি, ঘোষ মহাশয় যদি সেটা জানতেন তাহলে আর বিতর্কের জায়গাটাই তৈরি হতো না। না জেনে আমরা কত মন্তব্যই না করে ফেলি। কিন্তু এই উপদেশও বেদনার নয়, মানুষটাকে যখন বলা হয় ‘ভারতের ডেমোস্থেনিস’ আর ইনিই তো জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুনকে মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন। ঘোষ মহাশয় প্রশংসায় পঞ্চমুখও হলেন, ‘ আপনার ‘এ ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ’ আমি খুঁটিয়ে দেখেছি, দারুন কাজ হয়েছে, এই শতাব্দীতে তো বটেই, আগামী শতাব্দীর লেখক-গবেষকদের অনেক কাজে লাগবে।’ এমন প্রশংসাসূচক বাক্য অনুপ্রেরণা যোগায় বই কি। গ্ৰামের পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই বারুইপাড়ার বাজারে গিয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে পড়লাম এক স্যাকরার দোকানে। নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, নবকুমার সুবর্ণ বণিক। বললাম, এত এত ডিজাইনের কাজ তুমি শিখলে ক্যামন করে। বলল, সাহেব বাবা, কত পুরুষ ধরে এই কাজ করে আসছি আমরা। বাপ, দাদা, পরদাদারা হলেন বঙ্কুবিহারী, কৃষ্ণকান্ত, রামধন। বাপ মরলো ওলাওঠায়, দাদা পরদাদারা কলেরায়, ধনুষ্টংকার-এ, এইবার আমার যাবার পালা।’ এই বলে কপালে হাত ঠেকাল। আহা! কত সহজ সাদাসিধে মানুষ এরা। মনের কথা গড়গড় করে বলে ফেলেন। এক গ্লাস জল দিতে পারো। বলল, শুধু জল খাবেন, বয়ামে বাতাসা আছে, খান, শরীর জুড়োবে। হাতে কাজ, মুখে কথা চালিয়েই গেল। এই মানুষগুলোকেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি। বলল, কোন কাজে এসেছেন বুঝি।  বললাম, তোমাদের দেশ দেখতে বেড়িয়েছি। হেসে বলল, গরীব-গুরবোর দেশ, দেখার মতো এই দেশে আর কী এমন আছে, গাছ-গাছালি, জলা জমিন, কুঁড়েঘর, এই তো আর বিলেত নয়, কলকাতাও নয়, শুনেছি, বড় বড় দালানকোঠা, জুরি-গাড়ি, পেল্লাই রাস্তাঘাট, সাহেব মেম আর বাবুরা মিলে গমগম করছে। বললাম, তুমি এত খবর রাখ এই ছোট্ট দোকানে বসে। বলল, গরীব মানুষদের শোনাই তো কাজ, দেখা আর হলো কই।

আজ বিরামহীন যাত্রাপথের শরীক হতে মন চাইছে। পথ কেন এরকম করে টানে আমি বুঝতেই পারি না। কত কিছুরই তো খোরাক যেন আমি গিলতে গিলতে যাই। কত যন্ত্রণা বিষাদ আমাকে ছুঁয়ে যায়, আমার চিন্তায় এসে হাঁকপাক করে, কোনটা যে জড়িয়ে ধরব, আর কোনটা যে ছাড়ব, আবার ছেড়ে দিলেই ওরা ঘুড়ির মতো পতপত করে আকাশে গোত্তা খেয়ে একসময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।  সে তো কতদিনের কথা, বাংলার মাটি ছুঁয়েছি, প্রায় দেড় দশক ছুঁয়ে ফেলেছি, উডের শিক্ষানীতির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু বহু কাল ধরে চলে আসা শিক্ষাক্রম মুছে তো যায় নি। আমার নৌকা এসে ভিড়েছে নদীর কিনারে। সংস্কৃত স্রোত্র আওড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা চতুষ্পাঠীতে। গুরু মশাই বেত নিয়ে চেয়ারে বসে। খড়ের ছাউনিতে মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি ঘরে চলছে পঠন পাঠন। আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম ছেলেগুলোর শুকিয়ে যাওয়া মুখ। এরা চাষা, কামার, কুমোর, তাঁতি, তাঁতি ঘর থেকে আসা। বংশে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালাবে বলে এই কাঠফাটা রোদে এসেছে শ্লেট পেন্সিল নিয়ে। কারও কাছেই নেই কোন বই, শুধু গুরুর কাছে দু-একখানা পুঁথি ছড়ানো ছিটানো। নাম জিজ্ঞেস করাতে কাঁচুমাচু হয়ে উঠে দাঁড়ালো। চতুষ্পাঠী থেকে অদূরেই এক মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। পুরোহিত মশাই ঘন্টা নাড়িয়ে পুজো অর্চনা সারছেন। ফল ফলাদি দিয়ে নৈবেদ্য সাজানো, পিতলের প্রদীপ আর ধুনুচিতে নারকেলের ছোবড়া থেকে অনর্গল ধোঁয়াতে মিশে আছে ধূপের গন্ধ। তাকিয়ে দেখলাম শিশুদের নজর ওদিকেই, কখন পূজা সাঙ্গ হবে, ওরা ছুটে বেরিয়ে গিয়ে প্রসাদ খাবে। হঠাৎই দেখি পাইক বরকন্দাজদের ঠেলাঠেলি, জমিদার মশাই পাল্কি থেকে নেমে গটগট করে এগিয়ে এলেন। ওঁর কী রোষ কষায়িত দৃষ্টি। হয়তো আমাকে দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন। বলেই ফেললেন, সাহেব বাবা, গাঁয়ের মানুষকে খেষ্টান বানানো চলবে না। দেশ ভ্রমণে বেড়িয়েছেন ভালো কথা, আমাদের গাঁয়ের অতিথি, কাঁচারি বাড়িতে আসার আজ্ঞা হোক, যিশু খ্রিস্টের বাণী ছড়াবেন না। কলকাতায় নাকি পাদ্রীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলেপুলেদের ইংরেজি শিক্ষার নামে  মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে, এসব কথা কানে আসছে, আমাদের সমাজটা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। জমিদাররা এমনিতে শাসকের তাবেদারী করে, কিন্তু এনাকে বেসুরো শোনালো। বললাম, সেটা তো পরের কথা, কিন্তু আপনার প্রজারা যে শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে আছে সেটা তো বুঝুন। আমি দেখতে এলাম যদি এদের বাংলা, অংক, বিজ্ঞানের বই দেওয়া যায়, একটা গ্ৰন্থাগার যদি খোলা যায় তাহলে ওরা শিক্ষার আলো পাবে, জ্ঞান লাভ করে গ্ৰামের ছেলেরা এগিয়ে যাক, এটা আপনি চান না, বলুন।  একটু ভেবে বললেন, তা শিখুক কিন্তু আমার জমিদারী লাটে উঠবে যে, তখন কী আর আমার শাসন মানবে, ছোটলোকদের পড়ালেখা শেখালে মাথায় চড়ে বসবে, তার চেয়ে গুরু মশাইয়ের কাছে সংস্কৃত ব্যাকরণ, স্মৃতিশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, পুরাণ এসবই শিখুক, বিলিতি বিদ্যা শিখে কাজ নেই। বুঝলাম এতক্ষণে, কেন এদেশের মানুষ এত পিছিয়ে আছে।

লর্ড টমাস ব্যারিংটন মেকলে সাহেবের মেকলে মিনিটের লক্ষ্যের সঙ্গে আমি কিছুতেই একমত হতে পারি না – এমন একটা শ্রেণী তৈরি করা, যারা রক্তে বর্ণে ভারতীয় হবে কিন্তু রুচি, মত, বুদ্ধি ও চিন্তায় হবে ইংরেজ।  এশিয়াটিক সোসাইটির অন্দরে এই মতামতের গুঞ্জন শোনা যায়। রাজেন্দ্র লাল মিত্র মহাশয় তাঁর চর্চা জারি রেখেছেন নিজের অভিষ্ট লক্ষ্যে, মিল অমিলের ভাষ্য না হয় তোলা থাক আপাতত। মানুষটার সঙ্গে মত বিনিময়ে হয়তো কোনো না কোনো দিশা খুঁজে পাওয়া যাবে। বললেন, আপনার বাংলার বই, পুঁথি-পুস্তক নিয়ে গবেষণার সঙ্গে আমার ধ্যান ধারণার  একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, সেটা কি আপনি জানেন? বললাম, কীরকম! এশিয়াটিক সোসাইটিতে লাইব্রেরিয়ান হয়ে যে কাজটি আমি অগ্ৰাধিকার হিসেবে ভাবছি, এক অদ্ভুত যোগসূত্র আছে। আপনার এই বিষয়ে সদ্য প্রকাশিত কিছু আর্টিকেলও আমার নজরে এসেছে।  বললাম, আমি তো আপনার কাজের-ই অনুসারী। এই যে এতবড় কর্মযজ্ঞ চলছে এশিয়াটিক সোসাইটিকে ঘিরে, আপনিই তো তার সূত্রধর।  ড.এডওয়ার্ড রোয়ার সংস্কৃত ও দর্শন গ্ৰন্থ সম্পাদনা করেছেন, বিবলিওথেকা ইন্ডিয়া সিরিজের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তা তো আপনার নজর এড়িয়ে যায় নি। রেভারেন্ড লঙ, গুণীজনদের কখনও সীমানাতে আটকে রাখা যায়, না রাখা উচিত, এঁদের জ্ঞানের শাখা প্রশাখায় কত যে মহামানবের ধ্বনি শোনা যায়, তা বোঝার জন্য মুক্ত চিন্তা ও দৃষ্টির প্রয়োজন। রেভারেন্ড, এখনও অনেক কাজ বাকি, এই পোড়া দেশে আলো ফোটানোর জন্য সকলে মিলে কাজে লেগে পড়তে হবে, দিনরাত এক করে পরিশ্রম করতে হবে, তবে যদি আমরা পৃথিবীর সঙ্গে পায়ে পা মেলাতে পারি। লক্ষ্য করলাম মিত্র মহাশয় শুধু কোনো নির্দিষ্ট বৃত্তে আবদ্ধ করে রাখতে চান না, নিজেকে মেলে ধরতে চান নানা বৃত্তে, সমাজ তাঁর কাছে কোনো বদ্ধ জলাশয় নয়, বরঞ্চ এমন এক স্রোতস্বিনী যেখানে অনায়াসে মিলে যাবে বাংলা ভাষার মানচিত্র, ভাষার মিলন ক্ষেত্র, চর্চা হবে রাতদিন নানা ভাষা, মানুষ যুক্ত হবে শব্দ বিদ্যায়, রূপতত্ত্বে। আমাকেই প্রশ্ন করলেন, আপনার কী মনে হয় এই দেশ তার পুরণো গৌরব একদিন ফিরে পাবে? আপনি তো এতো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেন, মানুষের প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আপনার সৎ ও সোজা উত্তর আশা করতে পারি কী ?

কী জবাব দেবো, ক্ষণিক স্তম্ভিত হয়ে রইলাম মিত্র মহাশয়ের দূরদৃষ্টির কথা ভেবে। মনে মনে এ-ও চিন্তা করলাম বাঙালি জাতটাকে একই সরলরেখায় ফেলে বিচার করা অনুচিত হবে, এঁদের প্রকৃতিতে এত সুপ্ত চিন্তার আকর আছে যাকে অস্বীকার করে কার সাধ্য। এত মেধা যে জাতির তা একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে রাখলে জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে কোন পথে। জবাবটা না চাইতেই আপনাআপনিই এসে ধরা দিলেন বললেন, ভৌগোলিক পরিভাষাকে সাধারণের বোধগম্য করে তুলতে হলে আমাদেরকে মানুষের ভাষাকে রপ্ত করতে হবে, তাই নয় কি রেভারেন্ড লঙ না হলে বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে কী করে, মানুষের যোগদান বড় বেশি প্রয়োজন, আর এটাই সময়ের দাবি, যেটুকু জানি তো জানি, বাকিটা জেনে নিতে দোষ কোথায়, জ্ঞানের আবার  চ্যুত অচ্যুত আছে নাকি, এর বিস্তার ঘটানোই আসল কাজ। আপনি যেভাবে এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন আমার বিশ্বাস আগামীর পাঠক সমাজ তাকে সাধুবাদ জানাবে। কথা শুনে আত্মতৃপ্তি যতটা না পেলাম, তাড়না বেড়ে গেল কয়েক গুণ। আচ্ছা মিত্র মহাশয় স্থাপত্য নিয়ে কাজ করার আপনার কোন পরিকল্পনা রয়েছে কি?  বুঝলেন লঙ, জ্ঞানের যে কত শাখা প্রশাখা আছে, মনে হয় সব কিছু যদি আত্মস্থ করতে পারতাম। আসলে কি জানেন, জীবন আমাদের সেই সুযোগ দেয় নি, ঈশ্বর যেন সবকিছু এমন করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়েছেন, এর থেকে বেরোনোর কোন উপায় আমাদের জানা নেই, আমরা শুধু সময়টাকে মুঠো করে ভাবনা চিন্তার পরিধিটুকু একটু আধটু বাড়িয়ে নিতে পারি। এই যে নানা প্রকারের মন্দিরের কারুকাজ, নকশা ও নির্মাণের শিল্প ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্ৰ ভারত জুড়ে এই নিয়ে নানা গবেষণা জরুরি, নিজেদের সংস্কৃতির উৎস সম্বন্ধে যদি অজ্ঞ থাকি, তবে অন্যের পৃথিবীতে ডুব দেব কেমন করে, তুলনার প্রশ্ন কেমন করে জন্ম নেবে। প্রাক মুসলিম সাম্রাজ্যর স্থাপত্য আমার মনে হয় গ্ৰীক স্থাপত্যর সঙ্গে মিল রয়েছে, আবার গ্ৰীক ও আর্যদের এই যে জাতিগত সাদৃশ্যে তা প্রমাণ করে এদের মধ্যে সমান বৌদ্ধিক ক্ষমতা ছিল যদিও আরও চর্চার আবশ্যক রয়েছে।

মিত্র মহাশয়ের ঝুলিতে যে কত কল্পনার ভাণ্ডার লুকিয়ে রয়েছে তা অনুমান করা দুঃসাধ্য। বোঝা গেল তখনই যখন দেশের প্রতি ওঁর মমত্ববোধকে আমি অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। কী অসামান্য পাণ্ডিত্য আর দূরদর্শীতা নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন, কাছাকাছি না আসলে বোঝার সুযোগ হতো না। যত কথার বিনিময় করছি, বিশ্ব সংসারকে দেখার ও চেনার বৃত্তটাই যেন পাল্টে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। আমি প্রশ্ন করবো কী,নিজেই আমাকে প্রশ্নের জালে জড়িয়ে ফেলছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বলে আমার প্রচ্ছন্ন গর্বটাই যেন চূর্ণ হতে বসেছে। বললেন, রেভারেন্ড লঙ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আপনার কাজ আমার চোখ এড়ায়নি। ভারতের সামাজিক অবস্থা, জীবনযাত্রা ও রীতিনীতি নিয়ে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ কাজ করা আপনি কি আবশ্যক মনে করেন? বললাম, আপনি  আস্বস্ত হবেন জেনে আমি ইতিমধ্যেই এই নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছি, কিছু প্রশ্নমালা আমার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে, লম্বা সময়ের প্রয়োজন হবে, জীবন সম্বন্ধে অনেক ধাঁধার উত্তরও খুঁজে নিতে হবে, এই দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, চলমান প্রেক্ষাপট আমাকে প্রতিদিন নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আশা করি আপনার এই প্রশ্নের উত্তর আমি আগামীতে দিতে সক্ষম হবো।  তিনি আমার বক্তব্য শুনে আস্বস্ত হলেন কিনা জানিনা, তবে অনেক জিজ্ঞাসার যে জন্ম হয়েছে এটা নিশ্চিত। না হলে বলবেনই-বা কেন, বুঝলেন লঙ, এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে পাশ্চাত্য সভ্যতা কয়েক কদম এগিয়ে গেছে, আমাদের ভূমিকা নেই বললেই চলে, যেমন ধরুন পুরাতত্ত্ব, সমালোচনা সাহিত্য, বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস নিয়ে কত কাজ যে করার বাকি আছে, অথচ দেখুন, এই দেশের সভ্যতা বিশ্বের অনেক সভ্যতার তুলনায় প্রাচীন, কত সম্পদ বিছানো রয়েছে পরতে পরতে, শুধু মানুষের দরবারে হাজির হওয়ার অপেক্ষায়। বললাম, আপনিই তো পারেন এই বিরাট কর্মযজ্ঞে সামিল হতে। বললেন, পারি তো বটে, আমার আত্মবিশ্বাসও আছে কিন্তু সময় ও পরিবেশের মেলবন্ধন না ঘটাতে পারলে এই তরী বেয়ে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু ওঁর উজ্জ্বল চোখ দুটো জানান দিচ্ছিল, যদি কেউ পারে, তবে সেই মানুষটি আর কেউ নয়, ইনিই।

স্যার জন পিটার গ্ৰ্যান্ট-এর পর স্যার জেমস্ উইলিয়াম কোলভিল সভাপতি হয়েছেন সে-তো কিছু সময় পার হয়েছে। মিত্র মহাশয়ের কথা যেন ফুরোয় না, আপনারা টের পাচ্ছেন না লঙ, মানুষটা কত দূরদর্শী, পরিশ্রমী, ওঁর কাজের পদ্ধতিও কত ভিন্ন, না হয় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব সামলে এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতির কাজ চালিয়ে যাওয়া কি সহজ কথা। যত দেখছি অবাক হয়ে যাচ্ছি। ঠিক বলেছেন আপনি, না হলে এই সময়ে দাঁড়িয়ে নির্মোহ হয়ে এমন বৌদ্ধিক চর্চা ও গবেষণা সম্ভব হতো না, সমাজ ও প্রকৃতি বিষয়ক উত্তোরণের জন্য এমন একজন প্রতিভাবান প্রাজ্ঞ ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল। বললাম, আপনার সঙ্গে আমি কোনো দ্বিমত পোষণ করছি না, কিন্তু আপনার উদ্যম ও প্রচেষ্টাকে তো অস্বীকার করা যায় না। শুনলাম সরকার বাহাদুর আপনাকে সোসাইটির সহ-সভাপতির পদে উন্নীত করতে মনস্থির করেছেন। দেখুন, সে আমি জানি না, ওই নিয়ে আমার তেমন বিশেষ আগ্ৰহও নেই। আমি আমার কর্তব্যকর্ম স্থির করে রেখেছি, এই সোসাইটির গবেষণাক্ষেত্রকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেব, যাতে পরবর্তীকালে যাঁরা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, লিপি ও দর্শন নিয়ে কাজ করতে চাইবেন, হাত বাড়ালেই পেয়ে যাবেন দুষ্প্রাপ্য পুঁথি ও ঐতিহাসিক যাবতীয় নিদর্শন। আসলে কথা কি জানেন স্বীকৃতি গবেষককে উৎসাহ দেয় বটে, আবার সময়ের ধুলোয় তা চাপাও পড়ে যায় একদিন, কিন্তু যা স্থায়ী হয়, তা হলো  সভ্যতার নির্মাণের পথ, আর সেটাই জরুরি। আপনি যদি প্রকৃতই এই দেশের মঙ্গল চান, তবে সেই কাজে হাত দিন, মানুষের মনের অন্ধকার তাতেই একদিন ঘুচে যাবে, ভারতবাসীর ঘুমন্ত সম্পদের উন্মোচন তো ঘটবেই, বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হবে। আপনারা কি মনে করেন না, হাজার হাজার বছরের এই প্রাচীন সংস্কৃতি টিকে আছে এমনিই, এর কোনো শক্তপোক্ত ভিত নেই, আছে, শুধু খুঁড়ে খুঁড়ে বের করতে হবে। লেগে পড়ুন, যেমন করে পারেন, শুধু খ্রীষ্টের বাণী প্রচার করে এই দেশের মঙ্গল হবে না রেভারেন্ড লঙ, এখন অনেক কাজ, দেশটাকে ভেঙেচুরে গড়তে হবে, হৃত গৌরব ফিরিয়ে দিতে হবে। আপনি একজন ভারত হিতৈষী, আপনার কাছে অনেক আশা। শুনলাম, আপনি নাকি প্রবাদমালা নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমার শুভেচ্ছা রইল। সাধারণ মানুষের সমাজ মানসের হদিস পেতে হলে এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কিছু হতেই পারে না। ইতিহাস তো তার নির্দিষ্ট গতিতে আপন নিয়মে চলে, যারা সমাজের পুরোভাগে থাকে তারাই জায়গা করে নেয় কিন্তু যারা আসলে মূল স্রোতে থেকে সমাজের ভার কাঁধে তুলে নেয়, তাদের দিগে কেউ কি ফিরে তাকায়, নাকি তাদের মনের কথাকে তুলে আনতে চায়, অথচ তারাই বাবুই পাখির মতো ঘরবাড়িগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে সুরক্ষিত করে রাখে। মিত্র মহাশয়, এই বড় কঠিন কাজ, মাঠময়দান বনজঙ্গল নদীনালা পার করে শব্দগুলো খুঁজে খুঁজে নেওয়া, একবার যদি পিছুটান দেয়, তাকে ফিরে পেতে তীর্থের কাকের মতো গালে হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় আছে কী! তবে মাঠ যখন চষা শুরু করেছি, ফসল ফলিয়ে-ই ছাড়ব। বললেন, বাপ কা বেটা, সিপাহী কা ঘোড়া। বললাম, বেশ শ্রুতিমধুর ও অর্থপূর্ণ। এই তো আমার বিষয়। এই দেশের মানুষের বলা-কওয়ার ঢঙটাই তো আমি জানতে চাই। তিনি এবার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে জানতে চাইলেন, শুনি দু’একটা আপনার সংগ্রহের মণিমুক্তা। সুযোগ পেয়ে গড়গড় করে বলেই ফেললাম, তবে শুনুন – ‘এক হেঁসেলে তিন রাঁধুনি, পুড়ে মরে তার ফেন-গালুনি।’ ‘ আমার নাম যমুনাদাসী, পরের খেতে ভালোবাসি।’ ‘অরাঁধুনির হাতে পড়ে রুই মাছ কাঁদে, না জানি রাঁধুনি আমারে কিভাবে রাঁধে।’ শুনে তো উনি মহা উল্লসিত। আপনি তো আমাদের মানুষগুলোকে বেশ চিনেছেন, আমি যা জানতে পারিনি, আপনি তা আবিষ্কার করেছেন, আজ থেকে কি, এই মুহূর্ত থেকে আপনি আমার আত্মীয় হলেন, একটু আধটু রাগ যদি-বা থাকে, আমি সব ঝেড়ে ফেলে দিলাম। আমার বিশ্বাস প্রবাদমালা নিয়ে এই কাজ বিশ্ববন্দিত হবে।

প্যারীচাঁদ মিত্র একদিন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’-তে। ভাবলাম, কী এমন ঘটলো যে প্যারীচাঁদকে অস্থির দেখাচ্ছে। আমার ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, লঙ, অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আপনি তো সমাজবিজ্ঞান নিয়ে মত্ত হয়ে আছেন, আজকাল তো আপনি ধরাছোঁয়ার বাইরে, অনেকদিন ধরেই ভাবছি এই কাজের দায়িত্ব আপনাকে ছাড়া আর কাকেও তো দেওয়া যাবে না। চেয়ারটা টেনে নিয়ে বললাম, আগে তো বসুন। না, না আপনাকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না। আরে বাপ্‌রে, কাজটাই জানলাম না, আগে তো বুঝতে হবে আমি সেই কাজের জন্য যোগ্য কিনা। আপনি যোগ্য বললেই তো আমি যোগ্য হয়ে যাবো না, নিজের ওজনটা তো বুঝতে হবে। বললেন, আপনি কী বলুন তো, এতকাল বঙ্গদেশের গাছপালার খোঁজে কোনায় কোনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, আপনাকে দিয়েই হবে। দেবদারি, গুলঞ্চ, পদ্ম, বৈঁচ, বেল, চাল্‌তা, কাঁঠাল, নিম, বট, পিপুল আরও কত গাছগাছালির কথা বলবো। এইসব উদ্ভিদের উৎস, গুনাগুন, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আপনার মতো কেউ তো জানার চেষ্টাই করেনি, উদ্ভিদ নিয়ে কত প্রবাদ প্রবচন আছে, এইসব তো আপনার সংগ্ৰহে আছে। সেদিন ইন্ডিয়ান এগ্ৰিকালচারাল সোসাইটির সভার শেষে তো বেশ শোনাচ্ছিলেন কত প্রবাদ, আপনার তো কন্ঠস্থ দেখলাম, আপনি বলেননি অস্বীকার করতে পারেন – ‘যখনকার যেমন আউশ ফুরলে আমন।’, ‘শালুক খেয়ে দাঁত কালা লোকে বলে আছে ভালা’, ‘বাঁশ মরে ফুলে, মানুষ মরে ঘুলে’। ঠিক আছে, ঠিক আছে প্যারীচাঁদ, এবার থামুন, আপনার তো সব মনের মধ্যে গেঁথে আছে। ঠিক বলেছেন, তাই জন্যই তো বলছি, এইসব কিছুকে নিয়ে বড় কাজ করতে হবে, না হয় কারও কাজেই আসবে না। এবার খুলে বলুন, আমার এখানে ভূমিকা কী। বললাম, আমাদের জার্নালে এই জ্ঞানভাণ্ডারকে প্রবন্ধের আকারে পাঠককে জানাতে হবে, আমাদের দেশের মানুষদের আপনার মতো অভিজ্ঞতা নেই, বৈজ্ঞানিক শব্দের পরিভাষা আপনিই তো জানেন, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক নামও আপনিই খুঁজে বের করতে পারবেন। বললাম প্যারীচাঁদ আমি আপনার বন্ধু কিন্তু তাই বলে পাত্র হিসেবে এই বিষয়ে আমি উপযুক্ত নই। আরে না না, আমি কোনো ওজর আপত্তি শুনবো না। প্রবন্ধে যদি উদ্ভিদের সঙ্গে জড়িত লোকজীবন, লোককথা, ধর্মীয় উৎসবের কথাগুলো উঠে আসে কত ভালো কাজ হবে বলুন তো। নাছোড়বান্দা বন্ধুর কাছে ঘাড় নেড়ে সম্মতি তো জানালাম কিন্তু বাস্তবে সম্ভব কী, এই সন্দেহ তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *