তপোপ্রিয়

বিপন্ন বিচরণভূমি

কোন কোন দিন টেলিফোন তুললে কিছু বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে, যেমন সেদিন। সেদিনটা আমার জন্য অন্যরকম করে দিল ঘরে স্থির বসে থাকা ইদানিং অবহেলিত টেলিফোন। 

সকাল বেলার কথা। ছুটির দিন নয়, তাই বেরিয়ে পড়ার উচাটনতা। রোজী সকাল থেকে পরিচিত ছকে যেমন আয়োজন চলতে থাকে তেমনি চলছিল। এমনই সময় ফোন বেজে উঠলো। 

এই সময় ফোন তো বিরক্তি আনেই, ফোন যে করেছে নিশ্চয় তারই ওপর। তবে তাকে হাতের কাছে পাইনা বলে যাকে পাই সেই টেলিফোনের উপরি রাজ্যের রাগ দেখিয়ে ভাবি, আপদ টাকে দেবো ঠিক একদিন বিদেয় করে।

ফোন তুলতেই এক অপরিচিত গলা। একটু ভারি ভারি পুরুষকন্ঠে আমারই নাম জিজ্ঞাসা, আর ওই নাম বলে এই ফোন বা এই বাড়ি সেই নামালংকৃতের অধিকৃত কিনা অনুসন্ধান। আমি জানালাম যে আমারই ওই নাম। আর তার পরই একরাশ উড়ে যাওয়া পাখি বা বন্ধক কপাট খুলে দেওয়া স্রোতের মতো দমকা হাওয়া! 

ও প্রান্তের কণ্ঠ জানালো তার নাম আর অসম্ভব দ্রুত কয়েক লাইনে পরিচিতি। আমি তাকে চিনে গেছি ততক্ষণে। আমার সেই কয়েক দল বন্ধুদের একজন, যারা আমার জীবন প্রসঙ্গ থেকে উহ্য হয়ে গেছে, যাদের আমি হারিয়ে রেখেছি আমার শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ত্রিপুরাতে। যতই প্রিয় হোক না কেন ওই স্থান এখন আমার জন্য শোকের অধ্যায়, কেন তা ব্যাখ্যা করেছি কোন একবার। মাকে কেন্দ্র করেই ত্রিপুরায় আমার সব চলাফেরা। মা চলে যাওয়ার পর ত্রিপুরা কেউ জীবন থেকে হারিয়ে রেখেছি। যতই সরিয়ে রাখতে চাই না কেন তবুও আমার স্বাভাবিক বিচরণভূমি দেখেছি বার বার জীবনে প্রসঙ্গ হয়ে ঢুকতে চায়, কারন আমি আর দশজন শহুরে মানুষেরই মতো বিপন্ন প্রজাতি, আমাদের স্বাভাবিক বাসভূমি থেকে উৎখাত আমরা বাধ্য হয়েছি এই নির্মম বাস্তবে ঘরবাড়ি বানিয়ে উদ্বাস্তু হতে। এই বিভীষিকাময় কালাহারিতে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি এই আগমন, প্রসঙ্গান্তরে হারিয়ে রাখার কয়েক যুগ পরে যে বন্ধু আবার নিজেরই উদ্যোগে প্রসঙ্গ হয়ে এলো। 

এমনি করেই স্বপ্নরা সব কলকাকলি হয়ে ওঠে, বহু যুগ পর ছোটবেলার হারিয়ে থাকা কোনো বন্ধু আচমকা কোনদিন মুখোমুখি হয়ে গেলে। আমিও বিবশ হয়ে যাচ্ছিলাম। ইচ্ছে থাক বা না থাক, কোন চমক কোন আবেগ এখনও তুলসীমঞ্চের ধারে কাছে মায়ের হাতে ধুনোর ধোঁয়ার ঘোরাফেরা, সন্ধেলাগা ঘোরকে আচ্ছন্ন করে দিতে পারে। তেমনই মনে হচ্ছিল বন্ধুটি যখন সোনার ছিল তার দীর্ঘ অনুসন্ধান পর্বের রোমাঞ্চকর বিবরণ। 

কেউ একজন আমাকে তার অন্তরে সাজিয়ে রেখেছিল বিগত প্রায় ত্রিশটি বছর এই বাসনায় যে জাগতিক উপলব্ধি থেকে অগোচর হয়ে যাওয়ার আগে অন্তত কোন একদিন আমরা দুজন আবার মুখোমুখি হবো, এতগুলি বছর এই আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাকে জীবন্ত করে রাখা এবং তার আনুষঙ্গিক অবসাদ জনিত দুর্ভোগ, তার কারণ তো আমিই। এই যে একাগ্রতা, বন্ধুত্বের এই যে সংজ্ঞা এ তো কেবল একদিন দেখতাম গল্পকথায়। আমার জীবনে যে সেই অলীক স্বাদ নিয়ে এলো তার জন্য আমি কী করবো? কেবল আনন্দ প্রকাশ নয়, বন্ধুত্বের কল্পকাহিনীকে যে এমন সত্যি করে তুলল আমার আকাশে তার কাছে কি চিরকৃতজ্ঞ হব? কেনই বা নয়, এই ঘটনার পর থেকে আমি তো আবার আমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারছি। যদিও সেই একই বিপন্ন বিচরণভূমিতে আমার বসবাস। আমি তো দেখছি আমার চারপাশে মানুষগুলি সবাই সুন্দর হয়ে উঠলো, কাউকে তো আর মনে হচ্ছে না জটিল বা কুটিল বা কুচক্রী। 

মানসিকতার এই পুনর্নবীকরণ বড়ই দরকার ছিল, কারণ ক্রমশ বিপন্ন হতে থাকা জীবন যাপন প্রণালী ভুলিয়ে দিচ্ছিল কৈশরে আমি কেমন স্বপ্ন দেখতে পারতাম। আর একই সঙ্গে নিদ্রালুপ্ত ফেলে আসা অধ্যায়গুলির বর্ণমালার বিন্যাস ঘুম ভেঙ্গে আবার চোখ মেলে তাকালো। টেলিফোনে আমার হারিয়ে রাখা বন্ধুর গলা হঠাৎ আবির্ভাব ঘটিয়ে আমার কাছে যেন আমার মাকেও ফিরিয়ে নিয়ে এলো অন্যরকম ভাবে। এতগুলি বছর দূরে ফেলে আসা দিনগুলিকে সে হঠাৎ এনে হাজির করল আমার সামনে এক লহমায়। আর সেই দিনগুলিতে আমার মা বর্তমান, সুস্থ-সমর্থ, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। হারিয়ে রাখা বন্ধুটি খুজে খুজে যেন আমার ঠিকানায় জানলো না, সঙ্গে করে নিয়ে এলো আমার মাকেও। 

আমাকে মনে হতে লাগলো বুঝি আমি এক অনন্তকালের যাত্রী। বিরামহীন আমার পরিভ্রমণ। উদ্দেশ্যহীন পরিক্রমার মধ্যে মধ্যে আমার অল্প অল্প বিশ্রাম, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জগুলির কোন না কোন একটিতে। এখন আমি এসে থেমেছি ছায়াপথের কোন এক অবলম্বনে। হয়তো আমার আগামী বিশ্রাম হবে অ্যান্ড্রোমিডাতে কিংবা হাইড্রাতে। হতে পারে আমার বিগত বিশ্রামভূমি ছিল ক্যাসিওপিয়া, আর নয় তো সার্পেন্স কনস্টেলেশন। এত এত পরিক্রমা আর এত এত বিশ্রাম যে ভুলে যাই কোথায় ছিলাম কোথায় আছি। 

বিগত বিচরণ ভূমিকে মনে করিয়ে দিল টেলিফোনে আগত বন্ধুর কন্ঠস্বর। মনে পড়লো, ওহো, এই ছায়াপথে তো আমি সব সময় ছিলাম না। আমি এক সময় থাকতাম ক্যাসিওপিয়াতে। সেখানে একটা স্কুল ছিল একটা বিশাল বড় দীঘির পাশে, স্কুলের নাম কিরীটি বিক্রম ইনস্টিটিউশন। শুনতাম সেই দীঘির চার ধার একবার ঘুরে এলেই দু কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়। হাঁটতাম আমরা রোজ বিকেল থেকে সন্ধে, আর গল্পের কোন শেষ থাকতো না। পাশেই ছিল মধ্যপাড়া বলে একটা অঞ্চল। সেখানে এক ভাড়ার ঘরে মা থাকতো আমাকে নিয়ে। মায়ের সারা দিন কাটতো রান্নাবান্না, বাজার হাট, বই পড়া আর নতুন চেনা কয়েকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করে। আবার বন্ধুদের দু একজনকে নিয়ে ঘরে এলে মায়ের সঙ্গে তাদেরও কথাবার্তা হতো। ওই জীবনে অভাব ছিল অনেকটাই, প্রতিবন্ধকতাও, কিন্তু সর্বগ্রাসী এমন উদ্বেগ তো ছিল না!

হেডমাস্টার মশাই হরিপদ ভৌমিক একটু কি অন্য চোখে দেখতেন আমাকে? একদিন তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে আমাকে একটা বই দিয়েছিলেন পড়তে। বইটা দ্য গ্রোথ অব দ্য সয়েল, লেখিকা পার্ল এস বাক। বইটা আমাকে দেওয়ার সময় তাঁর মুখের উৎসাহ এখনোও চোখে ভাসে।

আমরা স্কুলে একটা দেয়াল পত্রিকা বার করেছিলাম। এমনিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যে দেয়াল পত্রিকা হত সেখানে ভারপ্রাপ্ত কয়েকজনের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল আমাদের। আমরা একদল বিক্ষুব্ধ বন্ধু মিলে নিজেদের মতো করে একটা দেয়াল পত্রিকা বার করব ঠিক করলাম। সেই পত্রিকার নাম দিয়েছিলাম বিহগকাকলি। নানারকম পাখির ছবি এঁকে নানা রঙ্গে অঙ্গসজ্জা করেছিলাম তার। দলে ছিল আমার এই বন্ধু চিন্ময় আর বলাই সাহা। বলাই একটা এত বড় গল্প লিখেছিল যে সেটা পত্রিকায় তুলতে প্রাণান্ত হয়ে গিয়েছিল আমাদের। কাজটা হয়েছিল গোপনে। কী উত্তেজনা ছিল সেই কাজে! এখন আর কোন কাজেই তেমন উৎসাহ পাই না, সব উৎসাহ এখন মার্চ মাইনে বা বকেয়া টাকা পাওয়ার চিন্তায় সীমাবদ্ধ। সেই সময়ের আনন্দ গুলি কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল? তারা কেন যে আবার দেখা দেয় না!

সেই দেয়াল পত্রিকা উদ্বোধন করেছিলেন হেডমাস্টারমশাই, হরিপদ ভৌমিক। প্যান্ট-শার্ট পরা সপ্রতিভ এক মধ্যবয়সী মানুষ। উদ্বোধন হয়েছিল স্কুল শুরুর একটু পর, ছাত্র-ছাত্রী গমগম করছে তখন। কাপড়ের ঢাকনা সরিয়ে আনার পর সেই পত্রিকার শরীর দেখা গেল। এখনো মনে আছে হেডমাস্টার মশাইয়ের সেই সপ্রশংস বক্তৃতা, দেয়াল পত্রিকার অবয়ব ও অভিনবত্ব তাঁকে এতটাই আনন্দ দিয়েছিল। আর মনে পড়ছে বাংলার স্যার অনাদিবাবুর স্বীকারোক্তি। আমরা পত্রিকায় তাঁর নাম রেখেছিলাম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে, যদিও কোন উপদেশই দিতে হয়নি তাঁকে। আর এই সত্যি কথাটা উনি স্বীকার করেছিলেন সবার সামনে নির্দ্বিধায়। অযাচিত বাহবা পাওয়ার সুযোগটা তো অনায়াসেই পেতে পারতেন, কিছু না বললেই হত। এই অনাদি স্যার বাংলা পড়াতেন অনবদ্য ভঙ্গিমায়, তাঁর ক্লাসের আকর্ষণ কেউ এড়াতে পারত না। হাসি আর গল্পে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে, একেকটি ক্লাস যেন খনি থেকে তুলে আনা এক এক টুকরো হীরে। শুনলাম সেই অনাদি স্যার নাকি আর নেই। 

বেঁচে থাকলে জীবন কেবলই অজান্তে এগিয়ে যেতে থাকে। একদিন সবাই দেখে যেখানে এসেছি সেখানে কবে এলাম, কেনই বা এলাম। আমার সেই প্রিয় বিচরণ ভূমি থেকে এই যে নির্বাসন সেখানে সেই বন্ধুরাও নেই, মাও নেই। কোন্ মন্ত্র উচ্চারণে আবার ওই দিনগুলিতে আমাকে স্থাপন করা সম্ভব?

যেতে পারি আবার ত্রিপুরাতে, আবার খুঁজে পেতে পারি ফেলে আসা ভুলে থাকা বন্ধুদের অনেককেই। আবার না হয় মধ্যপাড়া তেই থাকলাম একটা ঘর ভাড়া নিয়ে। কিন্তু সেই ঘরে কি মা থাকবে আমার সঙ্গে? মৃত্যু মানুষের পরিক্রমা থামিয়ে দেয়। মৃত্যু মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। মৃত জনকে নিয়ে নতুন আর চলাচল গড়ে ওঠে না। মাকে নিয়ে আর কোন নতুন কথা তো তৈরি হবে না কোনদিন। হারিয়ে রাখা পুরনো বন্ধুরা ফিরে এলেই কি দিনগুলি ফিরে পাবো? ওই স্কুলে কি আবার পড়তে পারব? সেই সোনালী জ্যোতি তো অধরা হয়ে গেছে বরাবরের মতো। 

বেঁচে থাকাটা এখন যেন দায় হয়ে গেছে। আমার স্বাচ্ছন্দ্য আর নেই, যা আমাকে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিত না। জীবন সংকটের এই বেলায় মাকে বড়ই প্রয়োজন ছিল। দায়িত্ব আবার যদি মায়ের হাতেই চলে যেতো! যদি আমি আবার মায়ের অধীনস্থ হতে পারতাম! 

এই জীবন আমাকে কেবলই ব্যতিব্যস্ত করে। কোথায় লুকিয়ে আছো আমার মা? হারিয়ে রাখা বন্ধু যদি আমাকে খুঁজে পেল আমি কেন তোমাকে খুঁজে পাই না? চলনা আবার মা তোমাকে নিয়ে থাকি উদয়পুর শহরের মধ্যপাড়াতে। তুমি যেও সন্ধেবেলা আবার এটা আনতে ওটা আনতে। আমি তো আছিই, নিই হয়ে থাকা বন্ধুও দেখো আবার ফিরে এলো। তুমি কেন ফিরে আসছ না? তোমাকে আমি কোথায় গিয়ে খুঁজবো? কোন্ সপ্তর্ষিমণ্ডলে, কোন্ গ্যালাক্সি ক্লাসটারে? বলি ত দিন রাত অনেককেই। একজনও কি তুমি কোথায় আছো বলতে পারবে? চলমান জীবনে না হয় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছো। তাই বলে কি কোন ঠিকানা থাকতে নেই?

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine test

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *