ভূপাল চক্রবর্তী
অপর্ণার দোনামোনা টান। একটানা বৃষ্টির শেষে চারদিকে থেকে চাপা বোটকা গন্ধের হাওয়া বাজারের লোকারণ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে যখন, তখন নাকে রুমাল চেপে একটা মুদিখানা দোকানের পাশে অপেক্ষাকৃত শুকনো জায়গায় সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে তা প্রায় মিনিট পনের হল। একবার মোবাইলে টাইম দেখে নিয়ে মনে মনে ঠিক করে নেয় আর মিনিট দশেক দেখে বাড়ি চলে যাবে। এক একবার নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাচ্ছে আবার পরের মুহূর্তেই মনে হচ্ছে , ভুল তার হয়নি, ভুল হবার কোনো চান্স নেই। উলটোদিকের ফুটে ডিমের দোকান। ওখান থেকেও একটা আঁশটে গন্ধ ছড়াচ্ছে জোলো হাওয়ায়। মুদিখানার লোকটা অপর্ণার চেনা। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা বারবার তাকাচ্ছে আড়চোখে, চোখে মুখে ঠাসা প্রশ্ন। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াবে কিনা ভাবতে ভাবতেই ডিমের দোকানের সামনে সাইকেল রাখার সেই হুবহু ঝনঝন শব্দটা এল। শব্দটা অদ্ভুত! মনে হবে একটা আস্ত সাইকেল মাঝ রাস্তায় ভেঙে পড়ল। আগের দিন ঠিক এইরকমই, এই ডিমের দোকানের সামনেই আচমকা শব্দ হয়েছিল আর চমকে তাকিয়েছিল অপর্ণা। তারপর থেকেই একটানা একটা মানষিক অস্বস্তি তার পিছু নিয়েছে।
অপর্ণা দেখল লোকটা সাইকেল দাঁড় করিয়ে দোকানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে। সে নিজেকে প্রস্তুত করে। ধীর পায়ে দোকানের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য পা বাড়ায়। বুকের ভেতর একটা অজানা সংশয়। কাজটা ঠিক করছে তো সে? আগুন নিয়ে খেলা করাটা কি ঠিক? এতটা এগিয়ে এসে এখন এসব কথা ভাবার কোনো মানে হয়? তাছাড়া বারবার এই প্রশ্নগুলোর সামনে সে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনার অদৃশ্য রিল বানিয়ে দেখেছে সে বারবার। কোথাও কোনো এডিট করেনি। মনে করলে সে এক লহমায় তার সিধান্ত থেকে সরে আসতেই পারে, কেউ তাকে বাঁধা দেবার নেই, কেউ জানতেও পারবেনা, কাউকে কোনো জবাবদিহি করার দায় নেই তার। তাহলে?
এক কথায় সুখেই আছে অপর্ণা। সরকারি চাকুরে স্বামী, একটি সন্তান, নিজস্ব দক্ষিণ খোলা বাড়ি, আজকের দিনে, এই বাজারে যাকে বলে কেটে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে গোছের একটা নিরাপদ জীবন। অপর্ণার স্বামী বিজনের দিক থেকেও ব্যাপারটা আলাদা কিছু নয়, সেও সুখেই আছে। একটা সুখী পরিবারে যেমন হয়, সকালবেলা উঠে বিজনের অফিস যাওয়া, ছেলের স্কুল যাওয়া, তারপর সব মিটে গেলে অপর্ণার ক্লান্তির ঘাম মুছে মোবাইলে মনোনিবেশ করা, দুপুরে মোবাইল দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়া, এই পর্যন্ত একটা ব্যস্ত অধ্যায়, তারপর আবার বিকেলের পর ছেলের স্কুল থেকে ফেরা, বিজনের অফিস থেকে ফেরা, আবার খানিকটা মোবাইল মোবাইল নীরবতা, ছেলের প্রাইভেট টিউটর পড়িয়ে চলে গেলে তিনজনের খানিক মৃদু কথোপকথন, এরইমধ্যে কোনো কোনো দিন সন্ধেবেলা ছাদের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটানো, ব্যস হয়ে গেল, কেটে গেল একটি স্বচ্ছতোয়া নদীর মতো সাবলীল দিন। পরের দিনটা একই রকম, এবং তারপরেও সব একই রকম।
কিন্তু না, একরকম নয় তবু। ছক বলে কিছু নেই জীবনে।
সেদিন অপর্ণা বাজার গিয়েছিল। ফেরার পথে সে আচমকা দেখতে পেয়েছিল সেই ছেলেটাকে। এখন সে আর ছেলে নেই, একটা লোক, বেঁটে, মোটা, মাথার সামনের দিকে টাক, একটা ভাঙা সাইকেলের পেছনে কেরিয়ারে একটা বাক্স দড়ি দিয়ে বাঁধছে, মনে হল ডিমের পেটি। ছেলেটাও দেখল অপর্ণাকে। দেখে চোখ সরিয়ে নিল।
বাকি রাস্তাটা অপর্ণা পার হয়ে আসছে বাড়ির দিকে। সেই আসাটা নিতান্তই অভ্যাসে, আসলে সে হাঁটছিল তার কুড়ি বছর বয়সের কুয়াশা ভরা শীতের সকালগুলোতে। সোজা অরবিন্দ রোড দিয়ে হেঁটে স্টেশন টপকে সে তখন যেত কলেজে। সাড়ে ছ’টার মর্ণিং কলেজ, রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই হয়, এক’দু হাত দূরের মানুষও দেখা যায়না। হঠাৎ কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে হুশ করে পাশ কাটিয়ে যায় সাইকেল। চমকে ওঠার সাথে সাথেই ঝাপসা অস্পষ্ট শরীরগুলো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। তিননাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সরু গলিটার মুখের কাছ দিয়ে যাবার সময় অপর্ণা দেখতে পেত ধোঁয়ার ভেতর আবছা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে। সত্যি বলতে কি অপর্ণার একটা স্থির অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, প্রতিদিন ছেলেটার দাঁড়িয়ে থাকাটা দেখতে দেখতে যেন একটা নিত্য প্রাকৃতিক ঘটনার মতো স্বাভাবিক মনে হত তার কাছে। যেদিন দেখতে পেতনা সেদিন থমকে দাঁড়িয়ে না গেলেও চলার গতি মন্থর করে এদিক,ওদিক আড় চোখে তাকিয়ে খুঁজত, যেন কি একটা থাকার কথা ছিল এই নির্জন পরিবেশে অথচ নেই। গলির মুখটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগত! এমনও হয়েছে কোনোদিকে তাকাবে না ভেবেও খানিকটা রাস্তা সোজা এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতেই হয়েছে তাকে। তারপর দেখতে পেয়ে একটা হাঁফ ছাড়ার স্বস্তি অনুভব করেছে সে। কলেজের বন্ধুদের সাথে ছেলেটার দাঁড়িয়ে থাকার গল্প নিয়ে ছোট ছোট কৌতুক এক টুকরো বসন্তের বাতাসের মতো দুলিয়ে দিয়ে যেত অপর্ণাকে। খুব চওড়া হাসি ছড়িয়ে পরতো তার মুখে।
বাড়ি ফিরে অপর্ণা অনেকদিন বাদে অনুভব করে তার চারপাশ ঘিরে রয়েছে সেই কুড়ি বছর আগের কুয়াশা জড়ানো পথ, যার ভেতর দিয়ে সে কেবল হাঁটছে আর হাঁটছে।
এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে ওঠার মতো কাজ কি করেছিল ছেলেটা? আর এই ছেলেটাই যদি খুব বড় একটা চাকরি পেয়ে যাবার পর অপর্ণার কাছে আসত, যেমন বিজন এসেছিল, তাহলে? ছেলেটাকে দেখার পর অপর্ণার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। অবশ্য দেখে বোঝাই গেছিল যে তেমন কোন চাকরি জোটাতে পারেনি।
অফিস থেকে বিজন ফিরলে সে তাকে আচমকা জিজ্ঞেস করল, কুয়াশার ভেতর দিয়ে কখনও অনেকটা পথ হেঁটেছ? বিজন আচমকা প্রশ্নে নির্বাক হয়ে তাকায়। আষাঢ় মাসের গুমোট গরমে কুয়াশার ছবিটা সে খুঁজে পায়না চট জলদি, তবু বলে, সে তো অনেকেই হাঁটে, কেন? হঠাৎ এমন প্রশ্ন? অপর্ণা চুপ থেকে বলে , নাহ, এমনিই মনে হল তাই জিজ্ঞেস করলাম।
সাধারণ দিনের মতোই মোবাইলে নীরব হতে চাওয়া অপর্ণা আর বিজন অবান্তর কথোপকথনে দুজনেই মূল্যবান কিছুটা সময় নষ্ট করার আক্ষেপে শেষপর্যন্ত চুপ করে যায়। বিজন যদিও মোবাইলে ফিরে যায় কিছুটা সময় ফালতু নষ্ট করার পর, শুধ অপর্ণাই ফিরতে পারেনা। কুয়াশার ভেতর থেকে সে মুখটাকে ছাড়িয়ে এনে বারবার দেখার চেষ্টা করে। টিকালো নাকের নিচে হালকা গোঁফের রেখা, মোটা ভ্রুর নিচে দুটো শান্ত নিবিড় চোখ, মাজা গায়ের রঙ, কপালে অবিন্যস্ত নেমে আসা চুল। সেই মুখটার সাথে বাজারে দেখা লোকটার মুখচ্ছবি একেবারেই মেলেনা, শুধু কপালের ওপর একটা আড়াআড়ি দাগ অপর্ণাকে নিশ্চিত করে চিনিয়ে দেয় ছেলেটাকে। দাগটা ছিলনা আগে। অতঃপর দাগটার কথা মনে হতেই অপর্ণার মনে পড়ে আরও কিছু ঘটনা।
ঘটনার সবটাই যে কুয়াশার আড়ালে ঘটেছিল তা নয়, যদিও অপর্ণার সামনে আজ সবটাই কুয়াশা সরিয়ে দেখা। যেমন তার মনে পড়ছে কুয়াশা ভেদ করেই ছেলেটি একদিন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। একটু দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাবার আগেই ছেলেটি সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বলেছিল, একটা কথা ছিল, শুনবে? অপ্রস্তুত অপর্ণা ক্ষনিকের জন্য ঘাবড়ে গিয়ে পা চালিয়েছিল দ্রূত। এক নিশ্বাসে অনেকটা হেঁটে এসে পেছন ফিরে দেখে কেউ নেই, যেন একটা স্বপ্ন ছিল। যেন ফেসবুকের একটা শ্বাস রোধকারি রিল দেখার মতো।
দোকানদার ডিমের ট্রে সাজাতে সাজাতে ছেলেটির কাঁধের ওপর দিয়ে গলা উঁচু করে দেখে অপর্ণাকে। অপর্ণা ছেলেটার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। ডিমের আঁশটে গন্ধ ম ম করছে জায়গাটায়। নিজের গায়ের ডিওডেরান্টের গন্ধ উধাও হয়ে গেছে। নাকের কাছে রুমালটা চেপে ধরে অপর্ণা।
বলুন ম্যাডাম, হাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে দোকানের ভেতর থেকে লোকটা অপর্ণাকে দেখে। চারপাশে সাদা ডিমের মাঝখানে কালো মানুষটা জ্বলজ্বল করছে যেন। অপর্ণা পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিম কেনার কথা ভেবেই রেখেছিল, অন্তত গোটা পনের কেনার মতো পয়সা ব্যাগে আছেই। লোকটার কথার উত্তর দেবার জন্য মাথা তুলে তাকাতেই অপর্ণা দেখল ছেলেটা তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে।
কয়েক সেকেন্ড হয়ত বা, অপর্ণার চোখের সামনে অরবিন্দ রোডের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর নেমে এল! দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আড় চোখে পাশে পাশে চলা সম্রাটকে সে নির্দেশ দেওয়া মাত্র ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই, একজনের তীব্র বেগে ঘোরানো নানচাকুর সামনের মাথাটা ছেলেটার কপাল ছুঁয়ে গেল। কুয়াশা চিড়ে অপর্ণার কানে এল ছেলেটির আর্তনাদ। অপর্ণা দুই হাতে মুখ চাপা দিয়ে মাগো বলে চিৎকার করে ওঠে।
অপর্ণার আচমকা চিৎকারে ছেলেটি এগিয়ে আসে, কী হল ম্যাডাম? শরীর খারাপ লাগছে? অপর্ণা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে। ডিমের দোকানের লোকটা ততক্ষণে দোকান থেকে বেড়িয়ে একটা রিক্সা ডেকে এনে অপর্ণাকে বলে ম্যাডাম আপনি বাড়ি চলে যান, আপনার এই অবস্থায় এখানে থাকা উচিৎ নয়, বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিন। নিজেকে লুকোতে চাইছিল অপর্ণা। তাই কথা না বাড়িয়ে সে রিক্সায় উঠে বসে। যেতে যেতে শুনতে পায় ছেলেটা বলছে, ওনাকে চিনি তো, বিজনদার ওয়াইফ। অপর্ণা নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারেনা।

এখন অপর্ণার মনে হচ্ছে কোথাও একটা ঘাপটি হয়ে আছে অপরাধ বোধ, অজানা ভয় অথবা বিপদ। সে নিজেই তাকে খুঁচিয়ে বার করে এনেছে। একটা জটিল আবর্ত টের পাচ্ছে অপর্ণা। ছেলেটি বিজনকে চেনে, অপর্ণাকে চেনে বিজনের বউ হিসেবে। অপর্ণা দুজনকেই চেনে। বিজনও নিশ্চয়ই ছেলেটাকে চেনে। তারমানে সবাই সবাইকে চেনে! কিন্তু ছেলেটা? অপর্ণাকে সে কি শুধু বিজনের স্ত্রী হিসেবেই চেনে, বাকি পরিচয়ের ইতিহাসটা কি তাহলে ইচ্ছে করেই ভুলে থাকতে চাইছে সে? আর বিজন? সেও কি তাহলে সবটাই জানে?
শেষের দিকে ছেলেটা অপর্ণার পেছন পেছন কলেজ পর্যন্ত চলে যেত। সারা রাস্তা অপর্ণাকে নানারকম প্রশ্ন করত। অপর্ণা উত্তর দিতনা। একসময় বিরক্ত হয়ে পাড়ার মস্তান সম্রাটদা’কে জানিয়েছিল ব্যাপারটা। সম্রাট ভোরবেলা দলবল নিয়ে হাজির হয়ে সেদিন অপর্ণায় ইশারায় ছেলেটাকে রাস্তায় ফেলে মারধোর করে। তারপর থেকে ছেলেটা উধাও হয়ে গিয়েছিল।
বিজনের সাথে বিয়ের পর অপর্ণা ভুলেই গেছিল পেছনের কথা। সরকারি চাকুরে বিজনের ঝাঁ চকচকে বাইক, স্মার্ট চেহারা, অপর্ণার জীবনকে অন্য একটা খাতে বইয়ে দিয়েছিল। উজাড় করে দিয়েছিল তারা একে অপরকে। আজ হঠাৎ প্রাচীরের মতো বিজন আর অপর্ণার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা।
নিজেকে ছাড়া কাউকে দোষ দেবার নেই অপর্ণার। এখন বিজনের সাথে তার নিজেরই আগ বাড়িয়ে কথা বলার প্রয়োজন। মনে মনে সংলাপ রচনা করে সে।
অফিস থেকে ফেরা বিজন যখন চায়ে চুমুক দিয়ে একটা স্বস্তির পুরুষালি স্বর নিক্ষেপ করে অপর্ণার দিকে তাকিয়েছে, ঠিক তখনই অপর্ণা ও’হেনরির নায়িকার মতো ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, কাল বাজারে ডিম কিনতে গিয়ে একটা কান্ড হয়েছে জানো!
কী? পনেরশ টাকা চায়ের ঘ্রাণ উড়িয়ে বিজনের সংক্ষীপ্ত প্রশ্ন।
দূর্গন্ধ আর কাদা প্যেচপ্যেচে নোংরায় আমার কেমন গা বমি করছিল মাথা ঝিমঝিম করছিল, ডিমের দোকানের লোকটা ভাগ্যিস তাড়াতাড়ি একটা রিক্সা ডেকে আমায় তুলে দিল, নাহলে বাজারেই একটা অঘটন ঘটাতাম।
তাই! তারপর? বিজনের দুচোখের চাউনি বিস্ফারিত হয়।
তেমন কিছু নয়, গন্ধটা থেকে সরে আসতেই অস্বস্তিটা কেটে গেল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলেকে বলতে শুনলাম, বিজনদার ওয়াইফ। তুমি চেনো?
কে? খানিক বিরক্ত নিয়ে বিজনের প্রশ্ন।একটু ডেসক্রিপশন দাও দেখি?
বেঁটে, মোটা, কালো, মাথার সামনের দিকে টাক, একটা ভাঙা সাইকেল নিয়ে যায়? চিনতে পারছো?
বিজন কৌতুকের চোখে তাকায়, একদিকে বলছ ছেলে, আবার বর্ণণা দিচ্ছ একটা মধ্য বয়সী লোকের! তাজ্জব তো!
অপর্ণা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ওই- ওই একই হল।
ওর নাম টেকো হাইকু। ডিমের ব্যবসা করে। শ্যামরোডে ডিমের দোকান। পড়াশুনোয় ভালই ছিল। বাংলা হাইকু লেখায় ওস্তাদ। একবার প্রেম করতে গিয়ে বেধরক প্যাঁদানি খেয়ে পড়াশুনো, হাইকু সব ছেড়ে বাপের থেকে পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। খুব জেন্যুইন ছেলে। একটা কবিতার বইও বার করেছিল, আমার বইয়ের ডাস্টবিনে হয়ত আছে, নাও থাকতে পারে। কথাগুলো বলে চায়ের কাপ নামিয়ে বিজন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বারান্দায় যেতে যেতে বলে, কাল একবার ডক্টর স্যান্যালকে ফোন করে চেম্বারে গিয়ে গা-বমি আর মাথাঘোরা ব্যাপারটা জানিয়ে একবার চেকাপ করিয়ে নিও।
ফাঁকা বাড়ির চিলেকোঠায় বইয়ের ডাস্টবিন থেকে একফর্মার বিবর্ণ ঝাপসা প্রচ্ছদের গায়ে লেখা ‘কুয়াশাচ্ছন্ন হাইকুরা’ লেখক প্রকাশ গুপ্ত নামাঙ্কিত একটি বই হাতে পায় অপর্ণা।
উৎসর্গ, প্রয়াত মুরগীদের জন্য।
প্রথম হাইকু- কুয়াশা-জঠর ছিঁড়ে আসে / ফের চলে যায় / তাহলে ধরেই নিচ্ছি / তোমার জন্ম বলে কিছু নেই’
আর একটি হাইকু- প্রতিটি ডিমই প্রাক-জন্ম কথা / তুমি রোজ ভেঙে দিচ্ছ তাকে / তাহলে ধরেই নিচ্ছি / তোমার জন্ম বলে কিছু নেই’
পড়তে পড়তে দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে, হয়ত বিজনের কলিং বেল বেজে উঠবে এবার। বইটা যথাস্থানে রেখে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অপর্ণা দেখল তার চারপাশে ঘন কুয়াশা। সিঁড়িটা হারিয়ে গেছে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
