বিশ্বজিৎ মণ্ডল

লিয়াকত মাস্টারের নামে এলাকায় ঢি ঢি পড়ে গেছে।

শিক্ষকতা করলে কী হবে, লিয়াকত সবসময় ধান্দা নিয়ে চলেন—এমনটাই লোকমুখে প্রচলিত। 

বামফ্রন্টের জমানায় স্কুল  কমিটির নেতাদের ধরে, কত কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিটা জোগাড় করেছিলেন। তারপর টানা তিনবার পঞ্চায়েতের সদস্য। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রভাব, আর সেই প্রভাবের আড়ালেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য অভিযোগ।

কারও বিধবা ভাতার ফর্ম আটকে আছে, কারও বাড়ি তৈরির প্রকল্পের নাম তালিকায় ওঠেনি, কারও রাস্তার কাজের বরাদ্দে কাটমানির গুঞ্জন। প্রমাণের অভাব থাকলেও মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ প্রমাণের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল।

লিয়াকতের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি। পঞ্চায়েত সদস্য থাকাকালীন প্রায়ই তার বাড়ির উঠোনে সাহায্যপ্রার্থীদের লম্বা লাইন পড়ত। কেউ বিধবা ভাতার আবেদন নিয়ে এসেছে, কেউ আবাস যোজনার তালিকায় নাম তোলার জন্য, কেউ আবার নলকূপ বসানোর অনুরোধ নিয়ে।

লিয়াকত সব কথা মন দিয়ে শুনতেন বটে, কিন্তু শেষে আস্তে করে বলতেন,

— “দেখুন, কাজ তো হবেই। তবে একটু খরচাপাতি তো থাকেই।”

গরিব মানুষ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করত। কেউ ধার করে টাকা জোগাড় করত, কেউ অপমান সহ্য করে ফিরে যেত। যাদের কাজ হতো না, তাদের ক্ষোভ জমে জমে একসময় পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়।

একদিন বাজারে বৃদ্ধা কমলা তাঁর পথ আটকে বলেছিলেন,

— “মাস্টর, আমার বিধবা ভাতার জন্য তিনবার তোমার কাছে গেছি। শেষে শুনল্যাম আমার নামই কেটি গেছে। কেনে ?”

লিয়াকত উত্তর না দিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু কমলার কথাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত তার কানে বাজতে থাকে।

চায়ের দোকানে বসলেই আলোচনা শুরু হয়।

— “লিয়াকত মাস্টার আবার কেমন মানুষ রে?”

— “মানুষ? মানুষ না, সুযোগসন্ধানী। যে দলে ক্ষমতা, সেদিকেই ওর চোখ।”

— “গিরগিটির মতো রং বদলায়।”

এই শেষ কথাটাই ধীরে ধীরে লিয়াকতের নামের সঙ্গে লেগে যায়—গিরগিটির চোখ।

লিয়াকত অবশ্য এসব শুনেও মুখে হাসি রাখতেন। ভাবতেন, মানুষের মুখ তো বন্ধ করা যায় না।

কিন্তু সময় সবসময় একরকম থাকে না।

রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলের ভেতরেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমতে থাকে। নতুন নেতৃত্ব পুরোনোদের হিসেব কষতে শুরু করে। 

একদিন ব্লক অফিসে ডেকে পাঠানো হলো। সভাপতি গম্ভীর গলায় বললেন,

— “দল আপনার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পেয়েছে। সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আপনার নামে ভুরি ভুরি অভিযোগ জমা পড়েছে পার্টি অফিসে। আগামী ইলেকশনে আপনাকে আর টিকিট দেয়া হচ্ছে না। দলের সিদ্ধান্ত আপাতত তোমাকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এই বছর পঞ্চায়েতে আপনার শেষ  ।”

লিয়াকত যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

— “আমি এত বছর দল করেছি!”

— “দল কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মানুষের বিশ্বাস হারালে দলেরও ক্ষতি হয়।”

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হচ্ছিল, রাস্তার প্রতিটি মানুষ যেন তাকেই দেখছে।

বাড়িতে স্ত্রী রাবেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— “এতদিন বলেছিলাম, মানুষের মন কষ্ট দিয়ে কিছু হয় না। শুনলে না।”

লিয়াকত কোন উত্তর দিলেন না।

বেশ কিছুদিন কেটে গেল। তারপর শুরু হল, এক অন্য জীবন। 

পঞ্চায়েত নেই, দলের পদ নেই, আগের মতো কেউ বাড়িতে আসে না। বাজারে গেলেও মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে ফিসফিস করে।

প্রতিমুহূর্তে নিজেকে নিয়ে অনুশীলন করতে লাগলেন লিয়াকত। কি করে পরিবর্তন করা যাবে এই অপবাদ! অন্ধকারে পথ হাতরাতে হাতরাতে একদিন স্কুলের পুরোনো আলমারি গোছাতে গিয়ে তার হাতে পড়ল কলেজজীবনের কিছু কবিতা। বহু বছর আগে সাহিত্যচর্চার স্বপ্ন ছিল। লেখালেখির হাত খারাপ ছিল না। বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল সমসাময়িক পত্রপত্রিকায়। ক্ষমতার মোহে তা চাপা পড়ে গিয়েছিল।

সেদিন থেকেই আবার লিখতে শুরু করলেন। এবার নিজেকে বদলাতে হবে। শুরু হল জীবনের অন্য অধ্যায়।

গ্রামের মানুষ, কৃষকের দুঃখ, নদীর ভাঙন, বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা—এসব নিয়ে ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কবিতা লিখতে লাগলেন। স্থানীয় পত্রিকায় লেখা ছাপাও হতে লাগল।

কয়েক মাস পর গ্রামের ক্লাবে একটি সাহিত্য আসরের আয়োজন হয়। উদ্যোক্তারা ভেবেছিলেন, লেখক হিসেবে লিয়াকতকে ডাকলে অনুষ্ঠান জমবে।

লিয়াকত নিজের লেখা গল্প পড়ে শোনালেন। গল্পের বিষয় ছিল ক্ষমতার অহংকার এবং একজন মানুষের আত্মসমালোচনা।

পাঠ শেষ হতেই কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর পেছন থেকে একজন বলে উঠল,

— “গল্পে অনুশোচনা দেখানো সহজ। বাস্তবে যাদের কষ্ট দিয়েছেন, তাদের কাছে কখনও ক্ষমা চেয়েছেন?”

মুহূর্তে সভাকক্ষ ভারী হয়ে গেল।

লিয়াকত মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বললেন,

— “সব ভুলের ক্ষমা চাওয়া যায়, কিন্তু সব ভুলের ক্ষমা পাওয়া যায় না। আমি শুধু চেষ্টা করতে পারি।”

কেউ হাততালি দিল, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিল।

এরপর তিনি গ্রামের পাঠাগারকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিলেন। 

প্রতি রবিবার কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ওর সাহিত্যপ্রেমীদের  নিয়ে গল্প পড়তেন, বই নিয়ে আলোচনা করতেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বই কিনে দিতেন। গরিব ছাত্রদের খাতা-কলমও কিনে দিতেন।

একদিন একটি ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করল,

— “স্যার, সবাই আপনাকে এত খারাপ বলে কেন?”

লিয়াকত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— “কারণ মানুষ আমার জীবনের একটা দিক দেখেছে। এখন আমি চাই, তোমরা অন্য দিকটাও দেখো। তবে সেটা বিশ্বাস করবে কি না, সেই অধিকার তোমাদের।”

ছেলেটি মাথা নাড়ল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।

একটি সাহিত্যপত্রিকায় তার গল্প জেলা স্তরের পুরস্কার পেল। স্থানীয় সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হলো। তবু গ্রামের মানুষ সহজ হল না।

হাটের মোড়ে বুড়ো আব্দুস সামাদ বললেন,

— “লেখা ভালো হতেই পারে। কিন্তু মানুষ কি শুধু লেখায় বিচার হয়? আমরা যা ভুগেছি, তা ভুলব কীভাবে?”

পাশে দাঁড়ানো যুবক ইমরান বলল,

— “ক্ষমতা থাকলে অন্যায়, ক্ষমতা গেলে সাহিত্য—এটাও তো এক রকম রাজনীতি!”

লিয়াকত প্রতিবাদ করলেন না।

রাতে অনুশোচনায় লিখতে বসলেন, “মানুষের আদালতে সাজা সবচেয়ে দীর্ঘ। সেখানে আপিল নেই।”

সেই রাতেই নতুন গল্প লিখতে বসে প্রথম লাইনটি লিখলেন—

“গিরগিটি শুধু রং বদলায়; মানুষ বদলাতে চাইলে তাকে নিজের ছায়ার সঙ্গেও প্রতিদিন লড়াই করতে হয়।”

লাইনটি লিখে তিনি অনেকক্ষণ কলমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নিভে গেছে। অথচ তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ভেতর দিয়েই হয়ত একদিন আলো আসে। সেই আলো তার জন্য আসবে কি না, তিনি জানেন না। কিন্তু অপেক্ষা করতে শিখেছেন। কারণ হারানো বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পথ সবচেয়ে দীর্ঘ, আর সেই পথের একমাত্র সঙ্গী হতে পারে নিজের বিবেক।

পরদিন আবার কলম হাতে নিলেন। লেখার নেশায় পেয়েছে তাকে। হয়ত সমাজ তাকে কোনোদিন পুরোপুরি ক্ষমা করবে না। হয়ত তার নামের পাশে আজীবন “গিরগিটির চোখ” তকমাটাই থেকে যাবে। তবু তিনি লিখে যাবেন। কারণ ক্ষমতা মানুষকে ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু সাহিত্য মানুষকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করায়।

লিয়াকত বুঝে গিয়েছিলেন—সম্মান ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না, আবার জোর করেও কেড়ে নেওয়া যায় না। অতীতের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় নিরন্তর সৎ কাজ করে যাওয়া। কিন্তু সমাজের স্মৃতিও বড় অদ্ভুত; সে সহজে ভুলে না। মানুষের চোখে একবার যে গিরগিটির ছাপ পড়ে, তা মুছতে অনেক জীবনও কখনও যথেষ্ট হয় না।

দূরের দেওয়ালে একটি গিরগিটি ধীরে ধীরে রং বদলাচ্ছিল। লিয়াকত তাকিয়ে রইলেন। 

তারপর নীরবে টেবিলের ওপর রাখা সাদা কাগজটি টেনে নিয়ে আবার লিখতে শুরু করলেন। এবার আর মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়—নিজের হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *