সুকান্ত পাল

বর্ষা কাল। আষাঢ় মাস শেষ হয়ে শ্রাবনের প্রথম দিক। যখন তখন আকাশ ঘনকালো মেঘে ঢেকে যায়। কখনো কখনো অবিশ্রান্ত ভাবে বারিধারা ঝড়ে পড়তেই থাকে। থামার বিন্দুমাত্র লক্ষন দেখা যায় না। কখনো কখনো হঠাৎ গভীর কালো মেঘের পেট থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে নিমিষেই পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন নীল আকাশের পর্দায় সূর্যের রুপোলি আলোয় ঝকমকিয়ে ওঠে চারিদিক । তখন এই গভীর অরণ্যের গাছগাছালি পাখ- পাখালির কল কাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। তাদের আনন্দ ধ্বনিতে সাড়া দিয়ে গাছের পাতারাও হাসিতে একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে দোল খেতে থাকে হালকা ভাবে বয়ে চলা বাতাসে বাতাসে। গাছেদের শাখাপ্রশাখা,পাতাদের চোখমুখ ঝিকিয়ে ওঠে সূর্যের উজ্জ্বল আলোয়। 

এতোক্ষণ বৃষ্টিতে ঝিম মেরে বড় গাছের তলায় বা ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে চিরকালীন অসহায় আশ্রয় নেওয়া পশুদের দল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তারাও বেরিয়ে পড়ে খাদ্যের সন্ধানে অথবা জৈবিক তাড়নায় সঙ্গী অথবা সঙ্গীনীর খোঁজে। এককথায় জীবনের প্রবাহ ধারায় অংশ নিতে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত জুড়ে বিরাট রামধনু তার সাত রঙের বাহার নিয়ে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে। যাজ্ঞসেনী যেন দেখতে পাচ্ছে ঐ রামধনুর রঙের ভিতর দিয়ে এক অসাধারণ সুন্দর যুবা তার রথ ছুটিয়ে দিগন্তকে ছিন্নভিন্ন করে এদিক থেকে ওদিকে ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে। তার সেই গতির মধ্যে রয়েছে না পাওয়ার, অপমানিত হওয়ার এক মর্মান্তিক মনোবেদনার উন্মত্ততা। সেই দৃশ্য যাজ্ঞসেনীকে বধির করে দিয়েছে। এক প্রবল হাহাকার বুকের শূন্যতাকে নিয়ে কেবল বিদ্রুপ করে চলেছে। 

আজ না হচ্ছে বৃষ্টি , না সূর্যের উদয়। প্রকৃতিতে কোনো উত্তাপ নেই। আছে এক দম চাপা অস্বস্তিকর পরিবেশ। চারিদিকে ঘোলাটে অন্ধকার। অবশ্য একে অন্ধকার বললে ভুল হবে। বরং বলা যায় অন্ধকারের প্রাক মূহুর্তের এক মন- কেমন করা পরিবেশ। যেন কেউ একটা ছেঁড়া নোংরা কাঁথা দিয়ে আকাশটাকে ঢেকে দিয়ে সূর্যের আলোকে আড়াল করে দিয়েছে। তার ফলেই সূর্যের আলোহীন দিন ভীষণভাবে মনকে যাচ্ছেতাই ভাবে অবশ ও অসাড় করে দেয়। 

প্রকৃতির প্রাভাব মনের উপর পড়েই। সেই আদিকাল থেকে এর বাইরে মানুষ বের হতে পারে নি। কারণ মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর থেকে নিস্তার নেই। মানুষ তো প্রকৃতির কোলেই লালিত পালিত হয়! 

আজকের এমন প্রাকৃতিক অবস্থায় গভীর অরণ্যের পর্ণ কুটিরের মাটির দাওয়ায় বসে সত্যভামা তার সখী দ্রৌপদীকে বলল,

— গালে হাত দিয়ে কী ভাবছ যাজ্ঞসেনী ?

সত্যভামার প্রশ্নে দুই ঠোঁটের কোণায় দু চার কনা হালকা হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল,

— না, কিছু না। 

কিন্তু এই দুটি কথা বলতে গিয়েই তার বুকের ভিতর থেকে এক গভীর শ্বাসবায়ু বেরিয়ে এসে বর্ষার স্যাঁতসেঁতে বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। 

— সই, কিছু তো বটেই। প্রিয়তম তৃতীয় পান্ডবের কথা মনে পড়ছে বুঝি!

সত্যভামার হালকা রসিকতা যেন তার মনকে আরো ভারাক্রান্ত করে তুলল। আবারও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— পৃথিবীতে কোনোদিন কি কোনো নারী তার পছন্দের প্রিয়তমকে অন্তর থেকে চেয়ে পেয়েছে সই? 

যাজ্ঞসেনীর মুখে এই কথা শুনে সত্যভামা আকাশ থেকে পড়ল। এ কী কথা বলছে যাজ্ঞসেনী! তবে কি সে অন্য কাউকে তার জীবনে চেয়েছিল? তৃতীয় পান্ডব কি তাহলে তার আকাঙ্খিত পুরুষ নয়! সত্যভামা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। 

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সত্যভামা জিজ্ঞাসা করল,

— এ কথা বলছ কেন ? 

— না, এমনিই বললাম। 

— উঁহু, তা হতে পারে না। এ গভীর কথার উৎস তো নিশ্চয়ই কিছু আছে।

— উৎস ছাড়া কি ভূমিকম্প হয়!

সত্যভামা বুঝতে পারে তার সখীর অন্তরের অদৃশ্য গহীনে এক প্রবল উথালপাথাল চলছে। কিন্তু তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করতেও সঙ্কোচ হচ্ছে। অথচ সে তো তার সই, সে যদি জিজ্ঞাসা না করতে পারে তবে কে আর করবে? অনেক ভেবেচিন্তে সত্যভামা অত্যন্ত সতর্কভাবে কথা এগিয়ে নিতে চায়। তাই সে বলে ,

— তা তুমি ঠিকই বলেছ। এযুগে কোন নারী আর তার মনের মানুষকে নিজের করতে পেরেছে। সবই তো পুরুষদের তৈরি নিয়মকে মান্যতা দিতে গিয়ে নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিতে হয়। আমার পিতা সত্রাজিত  শমন্ত্যক মনির জন্যই কৃষ্ণের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য আমার আপত্তি না থাকলেও একক সিদ্ধান্ত ছিল পিতার নিজের। 

সত্যভামার মুখে এই কথা শুনে দ্রৌপদীর অন্তরের অবরুদ্ধ যন্ত্রণা যেন ঐ দূরে বয়ে যাওয়া গঙ্গানদীর জলস্রোতের মতো হু হু করে বেরিয়ে এসে সমস্ত কিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। দ্রৌপদী ধীর কন্ঠে বলল,

— পুরুষের বংশ রক্ষার জন্য নারীর প্রয়োজন হলেও এই পুরুষ সমাজ কখনোই তো কন্যা সন্তান আকাঙ্খা করে না সই।

— তা ঠিক। কিন্তু আকাঙ্খা করুক আর নাই করুক জীবজগতের ভারসাম্য প্রকৃতি ঠিক বজায় রাখে। কিন্তু এ কথা বলছ কেন সই?

— তুমি আমাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করছ ! তুমি জানো তো আমার জন্মের ইতিহাস ! আমার পিতা যাজ্ঞসেন পুত্রের জন্যই তো যজ্ঞ করেছিল, যে পুত্র প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে দ্রোণকে হত্যা করবে, কন্যার জন্য নয়। তবুও আমি জন্মালাম অনাকাঙ্খিতভাবে।

— তা ঠিক। কিন্তু তিনি তো তোমাকে অন্তর থেকে ভালোবেসেছেন!

— না, তা অস্বীকার করব না। কিন্তু….

— কিন্তু কী ? 

— আমার স্বাধীনতাকে দুমরে মুচড়ে দিয়েছে আমার পিতা ও ভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্ন। 

— কী ভাবে?

এই প্রশ্নে যাজ্ঞসেনীর চোখ আর দুই ঠোঁট কেঁপে উঠল গভীর রাগ আর বিরক্তিতে। অনেক কষ্টে সেই রাগ সামলে নিয়ে সে বলল,

— আমি তো একজনকেই মন দিয়েছিলাম। একজনের প্রতিই আমার হৃদয় একনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল। কিন্তু তা হলো না। হতে দেওয়া হলো না। অথচ এখন প্রতি রাতে এক একদিন একেক জনের বিছানায় সঙ্গ দিতে দিতে আমি ক্লান্ত। শুধু তাই নয়, আমি ছাড়া তারা আরো নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত। 

— তুমি কি জানো সেইসব নারীরা কে ?

— অবশ্যই জানি। তোমাদের পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শিবিরাজ গোবাসনের কন্যা দেবিকাকে বিয়ে করে বেশ ভালোই আছে। ভীমের কথা আর কী বলব? হিড়িম্বা এবং কাশী রাজের কন্যা বলোন্ধরাকে নিয়ে তো বেশ মাখামাখি করল। আর তোমাদের পরম বীর তৃতীয় পান্ডব….

— থাক ।

— কেন সই, তোমার ননদিনী সুভদ্রার জন্য থামতে বলছ? এছাড়াও তো উলুপী, চিত্রাঙ্গদা আছে সেকথা কিন্তু ভুলে যেও না। নকুল চেদীরাজ শিশুপালের বোন করেণুমতীর নামে দু গ্রাস ভাত বেশি খায়। অন্যদিকে সহদেব পর্যন্ত মদ্ররাজ দ্যুতিমানের মেয়ে বিজয়া বলতে মূর্ছা যায়। তুমিই বলো সই এ লজ্জা কী শুধু আমার? নাকি সমগ্র নারী জাতির? এই প্রশ্নটা কেউ কোনদিন করল না ! 

— সই তুমি যাকে চেয়েছিলে তার কন্ঠে কেন সয়ম্বর সভায় মালা পরিয়ে দিলে না ? 

— ইচ্ছা তো ছিল।

— তাহলে বাধা কোথায়? তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে তাকে….

সত্যভামার কথা শেষ হওয়ার আগেই যাজ্ঞসেনীর চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলে উঠল। তীব্র কন্ঠে চিৎকার করে উঠল।

— ভুল। একদম ভুল। এটাই প্রচার করা হয়। কিন্তু..

— কিন্তু কী ? 

— পুরুষ ধৃষ্টদ্যুম্ন সয়ম্বর সভার আগেই গন্ডী বেঁধে দিয়েছিল। 

— কী রকম?

— সয়ম্বর সভায় তিরন্দাজির সূচনাকালেই ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রবল পৌরুষের আস্ফালনে ঘোষণা করল উচ্চবংশজাত, রূপবান, সুদর্শন ও বলবান যিনিই এই দুষ্কর কার্য অর্থাৎ তিরন্দাজিতে মৎসচক্ষুর লক্ষ্যভেদ করতে পারবে তাকেই বরণমালা পরিয়ে দেবে তার বোন দ্রৌপদী। 

— ঠিকই তো অসুবিধা কোথায় ছিল ?

— ছিল। আমার চারপাশে গন্ডী টেনে দেওয়া হয়েছিল ”উচ্চবংশজাত” শব্দের ব্যবহার করে। অথচ এই উচ্চবংশজাত পুরুষরা যখন নিম্নবর্ণীয়,অন্ত্যজ নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় তখন সমাজের গন্ডীটা তাদের ক্ষেত্রে যে শিথিল এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ে সেদিকে কারুর খেয়ালই থাকে না। এটাও যে নিম্নবর্ণীয়দের সামাজিক শোষণ সেদিকে রাজদণ্ড অন্ধ হয়ে নির্বিকার থেকেছে চিরকাল। 

— ধৃষ্টদ্যুম্নের এই নির্দেশের পর কী হলো ? 

— কী আর হবে! এই নির্দেশের জন্যই তো সে সেদিন মাথা নিচু করে সেই সভা ছেড়ে চলে গিয়েছে। 

— কে সেই অপমানিত, লাঞ্ছিত পুরুষ?

অনেক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে যাজ্ঞসেনী ধীরে অথচ অকম্পিত স্বরে বলল,

— আমার প্রিয়তম সূতপুত্র কর্ণ।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *