রম্যরচনা

অধ্যায় : ১৭

মেলায় গিয়েছিল হাচিয়া ফাল। এক জায়গায় দেখে, ইনস্ট্যান্ট লটারির একটা স্টল। তো সেই তাৎক্ষণিক লটারির স্টলের সামনে গিয়ে সে জানতে পারলো যে একশ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলে তখনই লটারি খেলা যাবে এবং কেউ তাতে হারবে না। লটারির প্রাইজ মানি এক টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। স্টলের লোকরা তাকে লটারির টিকিট কাটার জন্য উৎসাহিত করছিল, কিন্তু একশ টাকা ফালতু খরচ করার কোন ইচ্ছে ছিল না তার, যদিও বলছে যে লটারি পাওয়াটা সুনিশ্চিত। তবে লটারি যদি সে একশ টাকার কম পায়? যদি প্রাইজ মানি একশ টাকা থেকে শুরু করে এক লক্ষ টাকা হতো তাহলেও কথা ছিল।  

স্টলের উদ্যোক্তা লোকটা তাকে ক্রমাগত লোভ দেখাচ্ছিল, পীড়াপীড়ি করছিল। সে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না দেখে তাদের একজন বলল,

‘এক্ষুনি টিকেট কাটবে লোকেরা। তারা কত টাকা লটারি পাবে দেখবেন।’

তারপর সত্যিই তিন তিনজন লোক একশ টাকা দিয়ে টিকিট কিনল। তাদের প্রথমজন পেল দশ হাজার টাকা, দ্বিতীয় জন কুড়ি হাজার আর তৃতীয়জন অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সে পেল পঞ্চাশ হাজার টাকা। হাচিয়া ফালের চোখ গোল গোল হয়ে গেল। সেই উদ্যোক্তা লোকটা তাকে আবার বলল, 

‘লটারিতে টাকা পাওয়ার পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। বলা যায় না, পরের টিকেটে হয়তো এক লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে। এই বেলা টিকেট কেটে নিন মশাই। হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হারাবেন না।’

হাচিয়া ফাল আর লোভ সামলাতে পারল না। সে একশ টাকা দিয়ে লটারির টিকেট কিনে বসল। লটারি খেলা হলো। সে তাতে প্রাইজ মানিও জিতল, কিন্তু মাত্র এক টাকা। 

সে যে লটারি পেয়েছে ব্যাপারটা যেভাবেই হোক লোক জানাজানি হয়ে গেল। সবাই জানলো সে লটারি পেয়েছে। কত টাকা কী বৃত্তান্ত সেসব আর জানতে চাইলো না কেউ। শত্রুরা সর্বদা চতুর্দিকে ওঁৎ পেতে থাকে। পাড়ায় বেপাড়ায় সর্বত্র। তারা খবরটাকে লুফে নিল। সবারই ধারণা, সে লটারিতে প্রচুর টাকা পেয়েছে। জনে জনে ব্যাপারটা রটে যেতে লাগলো পরিধি বাড়িয়ে। যার সঙ্গে দেখা হয় সেই তাকে বলে, 

‘কিহে, তুমি নাকি প্রচুর টাকা লটারি পেয়েছ?’ 

রাস্তায় বেরোলেই নানা চেনা মুখ। তারা সবাই তাকে ছেঁকে ধরে। সব কটাকেই তার শত্রু বলে মনে করে সে। তার গতিবিধির ওপর এসব শত্রুদের তীক্ষ্ণ নজর। এই গাদাগুচ্ছের শত্রুদের দৃষ্টি এড়িয়ে বাইরে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করবে কার বাবার সাধ্যি? সে বাড়ির বার হলেই শত্রুরা তাকে ঠিক দেখে ফেলে। আসলে নির্ঘাত তক্কে তক্কে থাকে সবাই, শকুনের দৃষ্টি ফেলে রাখে তার ওপর। শত্রুদের ব্যবহার এমনই হয়ে থাকে সে জানে। জানলেও সে তাদের এড়াতে পারে না। তারা তাকে ঠিক ধরে ফেলে আর রীতিমত ঘেরাও করে বলে, 

‘শুনলাম লটারির টাকা পেয়েছ। অনেক টাকা, তাই না? সত্যি, কপাল বটে তোমার।’

ক্রমশ হাচিয়া ফাল আবিষ্কার করল, সে জন্মে চেনে না এমন লোকরাও তাকে রাস্তায় পেয়ে যেচে কথা বলছে, 

‘লটারিতে তো প্রচুর টাকা পাওয়া হল। কী হবে এত টাকা দিয়ে?’ 

কেউ কেউ আবার তাকে ধরে উপদেশ দিতে লাগলো, 

‘এত এত টাকা যখন লটারিতে পাওয়া হল কিছু সমাজ কল্যাণমূলক কাজ করা উচিত। গরিব দুঃখীকে দুবেলা খাওয়ানো, শীতবস্ত্র বিতরণ এমন কত ভালো ভালো কাজ রয়েছে জগতে। স্বার্থপরের মত নিজের সব টাকা ভোগ করা ঠিক হবে না।’

বাইরে গেলে চেনা-অচেনা প্রত্যেকটি লোক তাকে ধরে ধরে এইসব কথা বলতে লাগলো। রাতারাতি দুনিয়ার আবালবৃদ্ধবণিতা কিভাবে সবাই তাকে চিনে ফেলল বা তার শত্রু হয়ে গেল সে বুঝলো না। জগতের সবাই তার শত্রু সে জানত, কিন্তু সেই সংখ্যাটা যে এমন বিপুল তার আন্দাজ ছিল না। শত্রুদের বহর দেখে তার ভিড়মি খাওয়ার অবস্থা।

শত্রুদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে হাচিয়া ফাল ঠিক করল, সাত দিন সে আর বাড়ির বাইরে যাবে না। সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়িতে বসে থেকেও সে দেখলো রেহাই নেই। শত্রুরা দলে দলে তার বাড়িতে এসে তাকে আক্রমণ করতে লাগলো নানা আবদার নিয়ে। একজন বলল, 

‘আগামী মাসে আমার ছেলের বিয়ে, অনেক খরচ। প্রচুর লোক খাওয়াতে হবে। লটারিতে তো বিপুল টাকা পেয়েছ, কিছু টাকা ধার দাও না। ছেলের বিয়েতে তোমাকেও নেমন্তন্ন করব।’ 

আরেকজন এসে বলল, 

‘বাড়িতে দোতলা তুলব, টাকা কম পড়েছে। লটারিতে তুমি অনেক টাকা তো পেয়েছ। কিছু টাকা ধার দাও এবার। লোকের উপকার করো, পুন্য হবে।’

হাচিয়া ফাল লোকগুলিকে পত্রপাঠ বিদায় করতে লাগল এবং তাকে তারা বকেঝকে চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে আরো বেশি শত্রু হয়ে গেল। 

নিজের লোক এবং আত্মীয়-স্বজনরাও তার কাছে আসতে লাগলো নানান আবদার নিয়ে। তার মা নাচিয়া ঝাল এসে ধরল তাকে একদিন।  

‘হ্যাঁরে হাচিয়া, লটারিতে তো প্রচুর টাকা পেয়েছিস। এবার আমাকে তীর্থদর্শন করাতে নিয়ে যাবি কবে বল্? বহুদিনের শখ আমার। টাকা সব ফুরোবার আগে মায়ের ইচ্ছেটা পূরণ কর্।’ 

হাচিয়া ফাল মাকে বোঝাতেই পারল না যে সব মিথ্যে রটনা। সে ছেলের কথা শুনে মহা খাপ্পা হয়ে তাকে শাপ-শাপান্ত করতে করতে বলল, 

‘কী কুলাঙ্গার ছেলে রে তুই! এত টাকার লটারি পেয়েও পাইনি বলছিস? মায়ের জন্য এতটুকুও করবি না? সব টাকা নিজে খাবি? তোর নরকেও ঠাঁই হবে না।’

তার বাবা ভাগিয়া ছাল সবসময় পালিয়ে বেড়ায়। জন্মের পর তাকে জীবনে মাত্র কয়েকবার দেখা পেয়েছে। সেও একদিন হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হয়ে বলল, 

‘তুই তো অনেক টাকার লটারি পেয়েছিস। আমাকে একটু ইউরোপে বেরিয়ে নিয়ে আয়। অনেক দিনের শখ আমার।’ 

হাচিয়া ফাল তাকেও বিমুখ করতে বাধ্য হল এবং বাবা ভাগিয়া ছালও তার ওপর খাপ্পা হয়ে বলল, 

‘মহা স্বার্থপর ছেলে তুই। তোকে জন্ম দেওয়াটাই ভুল হয়েছে। এমন হবি জানলে তোর জন্মই দিতাম না। আমার ছেলে এমন হবে কোনদিন ভাবিনি। যা তোকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম।’ 

হাচিয়া ফালও রেগেমেগে বাবাকে বলল, 

‘জন্মে তোমার দেখা পাই না। আজ মুখে বললে, কার্যত জন্মের পরই তুমি আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করে রেখেছো। আমিও তোমাকে ত্যাজ্যবাবা করলাম।’

শত্রুদের উৎপীড়নে হাচিয়া ফাল যখন দেশান্তরী হওয়ার কথা ভাবছিল তখন তার কাছে একদিন এলো লন্ডভন্ড বিখন্ড। সে ওই মেলার এক আয়োজক যেখানে গিয়ে হাচিয়া ফাল লটারির টিকিট কেটেছিল। সে বলল, 

‘কিহে, আমাদের মেলায় গিয়ে লটারিতে তো প্রচুর টাকা পেলে। কিছু টাকা দাও, আবার আরেকটা মেলা করি।’

হাচিয়া ফাল রেগে আগুন হয়ে বলল, 

‘ভাগো, জোচ্চোড়ের দল সব!’ 

দেখা গেল লন্ডভন্ড বিখন্ড তাতে একেবারেই ক্ষুদ্ধ হল না, বরং খেঁকশিয়ালের মতো হাসতে হাসতে বলল, 

‘শোনো, শুনলে আনন্দ পাবে। ওই লটারির উদ্যোক্তারা নিজেদের লোককে দিয়ে টিকিট কাটায় আর নিজেদের লোককে বড় বড় প্রাইজ মানি দেয় যাতে সবাই একশ টাকা দিয়ে টিকিট কেনে। তোমার মত লোভী লোকরা তাই দেখে ঝপাঝপ টিকেট কেনে আর তোমার মতই একটাকা-দু’টাকা পায়। উচিত শিক্ষা হয়েছে তোমার। একশ টাকা দিয়ে পেয়েছো এক টাকা। তোমার মত লোভী আর কিপটে লোকের এমনই হওয়া উচিত।’

কথাগুলি জানিয়েই লণ্ডভণ্ড বিখন্ড ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে চলে গেল এতদিন শত্রুদের বহর দেখে অবাক হয়েছিল হাচিয়া ফাল। এবার শত্রুতার বহর দেখে তার হতবাক অবস্থা।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *