সুপন

খলিফায় দ্যাখলেন আন্ধারের মদ্যি কেডা এক কন্যে ঘুমোয় রয়িচে, দ্যাহে সাড় নি, ডাকলিউ সাড়া জাগতেচে না। দ্যাহখান য্যান চান্দের পিদিম, এলায় রয়িচে, ছায়া দিলি য্যান গুড়োয় যাবে সে রুপুসী। তহনে খলিফায় পীরের কতাখান খ্যাল পালেন। কন্যেরে জাগাতি গেলি ছুঁলি চলবে না, রোইদ বওয়ায় আনতি হবে, সে রোইদে তাঁত থাকলি চলবে না, মিহিন রোদেরে রুপুসীর দ্যাহে ঢলায় দিলি তয় গে কন্যে উঠি বসবে। খলিফায় ভাবতেচেন সেরাম রোইদ তিনি ক্যামনে আনবেন। ভাবতেচেন আর কন্যের চারদিকি ঘুরপাক দেচ্চেন। ঘুরপাক দিতি দিতি দিতি খলিফার জোব্বার থে একখান মতি কন্যের শিরে গে পড়িছে তো কন্যের দ্যাহে ভাঙন ধরিচে। খলিফাও কিচু ভাবতি না পেরি আন্ধারের মদ্যি ঘুড়া ছুটোয় দেলেন, পীরেরে কুথায় পাবেন…

থাম বলতিচি বুড়ি…শোনবো না…শোনবো না…মিছা কিস্যা কিছুতিই শোনবো না…একখান হাচা কিস্যা ক…

কস কি? ও মনি! রাজা বাদশা না হলি কিস্যা কেম্বায় হবে! কিস্যা খালি রাজা বাদশা মনতিরিগো, ঘুড়া, পঙ্খিরাজ, শাহজাদা আর শাহজাদী না থাকলি…

আমাগো কিস্যা ক। ও বুড়ি, আমাগো কিস্যা, তোর কিস্যা ক…তালি শোনবো, নালি শোনবো না।

আমাগো কিস্যা কি দে হবে, ও সুনা, আমাগো কিস্যা থাকলিউ সেডা বোনবে কেডা, শোনবেও বা কেডা?

আমাগো কিস্যা নাই? তালি আমাগো কি আচে নানি!

জার আচে, বিশ্বেস আচে। আমাগো নুরুদ্দিশ থাহে, খিদা থাহে সুনা, গোরের সন্ধান আচে…এগুলান দে কিসির কিস্যা হয় মনি! ঘুমায় যাও…রাত পেরোয় যাচ্চে বুধোয়…চোক দুখান চেপি বোজায়ে চুপ মেরি যাও…দ্যাখবা ঘুম এসি পড়বে…

আসতেচে না…ও নানি…খিদা লাগে…

রাইতকালে খিদার কথা কলি আজারাইল ধরবে সুনা…আন্ধারে ও কথা কতি নি, ঘুমায় যাও…সকাল হলি দ্যাখবানে…তুমার আব্বু জিলাবি নে আসবেনে…এ্যই এত্তোডি বড়ো…খাবা মনি, মন ভরায়ে প্যাট পুরি জিলাবি খাবা…এহনে ঘুমায় যাও…আমার ঘুম আসতেচে…

তুই খালি মিছা কস বুড়ি…আব্বু কনে? কবের থে খালি বলি যাচ্চিস জিলাবি নে আসতেচে…আসতেচে…কতগুলান দিন পেরোয় যাচ্চে…আসতেচে না ক্যান…ওই বুড়ি…আব্বু কনে?

আসবেনে সুনা…দ্যাখবা…এসি পড়বে ঠিক…তুমার জন্যি জামা নে আসবে…রাঙা কম্বল আনবেনে…গায় চাপালি ম্যালা ওম পাবা…দ্যাখবা, পুতুল নে আসবে…রুপুবতি পুতুল নে রাঙা জামা গায় দে তুমি খ্যালবা…

মিছা…মিছা…মিছা…তুই খালি মিছা কস…আব্বু কিছুতিই আসতি পারে না…কবের থে বলতি লেগিচিস…আসতেচে…আসতেচে…

তুমি ডাক দেও সুনা…জোর দে ডাক দেবা…মনেরে দে ডাক দেওয়াবা…দ্যাখবা এসি যাবে…

তোর কাছদে শুনি কত্তবার ডাক দিচি…র‍্যালের উদিকে গে গলা ফাটায় চিক্কির দে কত্ত ডেকিচি…তাউ আসতেচে না, মনে হচ্চে…কুনোদিন আসবে না…

তোবা তোবা…ও মনি, কি কও…নিজির আব্বুরে নে ওরাম কতি নি সুনা…বিশ্বেস রাখলি দ্যাখবা এসি পড়িচে… বিশ্বেস রাখলি আসতি তারে হবেই হবে…তুমি…

আমি আর বিশ্বেস রাখতি পারতিচি নে…এই বুড়ি, শুনতিচিস…তুই অন্য কথা ক…আমার আব্বু বুধায় মরি গেচে…

ও সুনা…ও মনি…মনি রে…ওরাম অকথা মুকে তুলতি নি সুনা…বিশ্বেস না রাকলি গুনা হয় বুন…বিশ্বেস হারায় ফেললি আমাগো যে তালি কিচুই থাহে না সুনা…তহনে কুথায় যাবা, কুথায় নিজিরে ঠাই পাওয়াবা মনি…

তুই কুথায় রইচিস বুড়ি…

এহানে রইচি…ছুয়ি দ্যাকো…এহানে রইচি…

কুথার থে এহানে এইচিস বুড়ি, আমারে ক।

পদমডিহির থে এইচি

পদমডিহি কি রে বুড়ি?

একখান গেরাম সুনা

কুথায় আচে সে গেরামখানা?

এহনে নাই মনি, ছেল

কুথায় ছেল?

আমার ছুডোকালে ছেল, আমার মদ্যি এহনো রইচে…দেকতি চালি পাবা না…বুঝতি চালি দ্যাখবা রইচে…

তালি আমারে সেইডা বুঝায় ক, পদমডিহির কিস্যা ক নানি…

কিস্যা শুনি ঘুমায় যাবা তালি? আমার চোক এটি আসতেচে সুনা।

তুই ক, আমি শুনতিচি।

বাপের ঘর ছেল একখান, ছুডো কালে, পদমডিহি…

সেকানে কি ছেল নানি?

গেরামে একখান মস্ত দিঘ ছেল মনি। সাজার দিঘ। গেরামের মদ্যিখানে, সক্কলের জন্যি একখান দিঘ। বচরভোর সেখানার পানি ছেল হদ্দ শেতল, আর কি যে মিডা। সক্কলে দিঘের পানি খাতাম বুন, গোসল করতাম, সাতার দেতাম। আর একখান কিস্যা ছেল সে দিঘের।

কিসির কিস্যা রে নানি?

গেরামের মানষে কত, দিঘের তলে ম্যালা সুনা রূপা প্যাতলের হাড়ি পাতিল সানকি রইচে, তারে এমনিতি খুঁজি পাবা যায় না। তয় সেগুলানের জন্যি এক দ্যাবতা দিঘের তলে দিনমান ঘুমায় থাহেন, রাত্তিরকালে তেনার চ্যাতনা হয়। পান সুপারি ধুপ ধুনা দে সে দ্যাওতারে ন্যাওতা দিলি তিনি বে সাদির আগ রাত্তিরে সেই ডেকচি পাতিল ঘাট চাতালে সাজায় থোন, কাম কাইজ মিটলি আবারে সেগুলান তেনার কাচে ফিরোয় দেওয়া লাগে। ঘাটে থুলি তিনি ডুবোয় নে গুছোয় থোন। তা গরিব গা গেরামে সেরাম জাক দে ম্যালা লোকেরে ন্যাওতা দে বে সাদির ধুম তো হতি পারতো না। তয় মানষের বিশ্বেস ছেল, সেরাম দিন আসলি দ্যাওতায় ডেবো ডেকচির জুগান দেবেন। তেনারে ডাক দিলি সুনা রূপার বাসন ওঠবে – ই কথা গুলান গেরামের মানষে বড় মান্য দেত, দ্যাওতার জন্যি ঘাটচাতালে আমগো পরবের খাবারও থুয়ে আসার রীত ছেল বুন। তা কিসির জন্যি য্যান, এক ইমাম সাহেব হাজির হলেন গেরামে, আলেন তো আর নড়লেন না। আমগো পদ্দা করাতি ঘর ঘর বুঝোতি লাগলেন।

পদ্দা করিলি নানি?

কনথে করবো সুনা, দ্যাহ ঢাকবার জন্যি যাগো কাপড় জুটাতি দম হাফসায়, তাগো কিসির পদ্দা! গেরামের মানষে তেনার নিদান বুঝিও কিচু করতি পারে না, তিনি মানষেরে না বুঝি চেষ্টার কসুর ছাড়েন না। তা বাদে আরেকখান নিদান নেও তিনি ঘুরতি লাগলেন। সক্কলরে ডেকি ডেকি বুঝাতি লাগলেন… দিঘের দ্যাবতাখান ভুয়া। আমাগো বিশ্বেসখান নাপাক, গুনহা। দিঘের তলে কুনো দ্যাবতা নি। পানি উঠোয় নিলিই কিনা তেনার কথাখান পোমান হয়ি যাবে। বুঝোতি বুঝোতি গেরামের পুলাপান চিতোয় ওঠলে, কুথার থে একখান শ্যালো নে লাগায় দেলে পানি ছাঁচতি। আমরাও দুডোদিন শ্যালোর পানিতি গোসল দে আমোদ করলাম ম্যালা। মাচ যে ওঠলে কত, সে আর কারে কব সুনা…বড় গুলানরে চালান দেলেন আফুর চাচায়, সেগুলান নাকি শ্যালোর ভাড়া মিটাতি লাগবে। ছুডোগুলানরে গেরামের সক্কলে মিলি খায়ে নেলে। তা পানি ফুরতি দ্যাখলাম হুজুরির কথাখানই হাচা, দিঘের তলে খালি ন্যাল খালি ন্যাল, মাজ দিঘের তলে মাজা ডুবা ন্যাল। থাল বাসনের সন্ধান পাতি ছলপিলেতে সেই ন্যাল হটকালে সারাডাদিন, কেউ কিচুই পালে না। সক্কলে তহনে কি মেলবে ভাবতেচে, কি গেচে দেখতেচে না। উরির খোলে শানু চাচির পুলায় কহনে নেমিল কেউ খ্যাল পায়নি, একখান দিন বাদ দে খুঁজতি খুঁজতি তারে উই ন্যালের থে যহনে তুলা করলে, উরির চ্যাহরাখান তহন কেরাম ঢাউস। পুয়াটাক ছলডা মরি ছেল ন্যালের তলে। আরু কি হইলো জনবা? সে বচ্চরখানায় আশমানের থে এট্টাফুটাও পানি নামলে না, মাট উটোন শুকোয় শুকোয় হা মেরি গ্যাল, খাল খানও শুকায় কাটকাট। মানষে এট্টুসখান পানির জন্যি হাঙ্গামা বাধায় তোললে, দিঘের পানি তো সক্কলে মিলি আগেই শুকোয় থুইলো, তা বাদে পানি পানি করতি করতি সব পদমডিহি ছেড়ি দে ইদিক উদিক চলি যেতি লাগলে। ওইজন্যি কই, বিশ্বেস হারাবা না মনি, বিশ্বেস হারালি ছ্যারখার হবা। মন মন চাবা, পাও না পাও চাবা, য্যাতসুমায় তুমি চাবা ত্যাতসুমায় সেখানা আচে জানবা সুনা। মানষের বাসডাই যে বিশ্বেসের মদ্যি মনি, বিশ্বেস থাকলি তুম্মো থাকবা।

তালি আমারে ক, আব্বু কনে? কনে আমার আব্বু?

গরমেনের কাচে রইচে সুনা। গরমেন ছাড়ান দিলি চলি আসবে তুমার আব্বু। এহনে ঘুমাও সুনা।

গরমেনের কাচে? কুতায় রেকিচে? গরমেন কুতায় রেকিচে আমার আব্বুরে?

জ্যালে।

জ্যাল কি নানি?

জ্যাল হলগে…হলগে…তুমি ঘুমাও…কাইল বলবানে…

এহনি বলতি হবে…হেই নানি…ক না, জ্যাল কি?

জ্যাল হলগে…দ্যাশের মদ্যি আরেকখান ঘেরা…দ্যাশের গেরোয় ফাঁস আটকালি একডা ভেন্ন জাগায় নে গে মানষেরে আটক করি থোয়…ঘরদোরে আসতি দেয় না।

ওহানে খেতি দেয় নানি?

তা দিতি পারে…না দিলি মানষে বাঁচবে কনদে…

তালি আমারে জ্যালে নে চ…ও নানি, আমিউ জ্যালে যাব…আমারে আব্বুর কাচে নে চ…

ঘুমায় যাওদিনি…তুমার আব্বু ফেরবানে কদিনির মদ্যি। তুমি ওহানে যাবা কিজন্যি, দুষ না করলি গরমেনে কাউরে জ্যালে যেতি দেয় না মনি… চুপ মেরি ঘুমাও… আমার চখ্যু বুজি আসতেচে…

আমার আসতেচে না… ও নানি…নানি রে…ঘুমায় গেলি…

না সুনা…চ্যাতনা রইচি…

আমার আব্বু কি দুষ করিল বলদিনি…

কুনো দুষ না সুনা…খাটতি গিইলো…

তালি গরমেনে জ্যালে নে যায় কিজন্যি?

বাঁন্ধের গা থে মাটি কেটিল সুনা…খুকায় খাটতি গিইলো…মাটির কাইজ…মাটি কেটি নে গাড়িতি বোঝাই দেচ্ছিলো…কাইজ মিটলি ট্যাকা পাত…ট্যাকা পেলি আমাগো ভাত হতো…ভাত হলি তুমি খায়েদায়ে ঘুমায় যেতে…পঞ্চাত মেম্বারের ডাকে খাটতি গিইলো…গরমেন ধরলে…

কি কাইজে গিইলো আব্বু?

বললাম না, মাটি কাটার কাইজ…

কুন মাটি?

বান্ধের মাটি সুনা…

কাগের বান্ধ?

গরমেনের

কেডা কাটতি বলিলো?

সেও গরমেন সুনা…

মাটি কেটি কি করিলো

কলাম তো…গাড়িতি বুঝাই দেচ্ছলো…

গাড়ি কাগো?

গরমেনের

গাড়ি কনে যায় নানি?

রাস্তাদে যায়, যেহানে যাবার…

কাগো রাস্তা?

গরমেনের

ধুস বুড়ি, ফেজুর কচ্ছিস…সক্কলডি যদি কিনা গরমেনের, তালি আব্বুরে ধরি নে যায় কিজন্যি?

খুকার হাতের মদ্যি যে কুদাল ছেল সুনা, দ্যাহে পায়ে মাটি ছেল…

তাতি দুষডা কিসির হচ্চে যে গরমেনে ধরবে?

দ্যাশের আইন সুনা, আইনে ধরবে…

দ্যাশ কি নানি?

দ্যাশ…দ্যাশ…দ্যাশ হলগে তুমার…দ্যাশ হলগে একখান বিশ্বেস…যেখান ভাঙতি নি…হারাতি নি…বিশ্বেস দে বজায় রাখতি লাগে।

তালি আইন কি নানি?

আইন…আইন হলগে একখান ফাঁস…মস্ত একখান ফাঁস…টান মারতি মারতি ছুটো হতি থাহে…উরির খোলে যাগো জুত আচে…ফাঁসের মদ্যির থে ঝটকা দে গলি যায়…যাগো বেজুত গায় জড়ায় গে শেষতক ফাঁসখান আটকা খায়…তারা হলগে দুষি…গরমেন তাগো ধরি নে জ্যালে পুরি থোয়…ছেড়িউ দিতি পারে, যদিকিনা ফাঁসিখানায় না লটকাতি পারে।

ও নানি…ও নানি…দ্যাকনা আমার গায় কেডা পানি দেচ্চে…

উডা পানি না সুনা…নেহের আসতেচে…তেরপলের ছ্যাদা দে নেহের টুপাচ্চে…আমার দিকি সরি আসো মনি…ক্যাতাখান মুড়ি দে নেও…

ক্যাতাখান ছেড়া দিচিস…জার লাগতেচে…

আমারে জড়ায় নেও সুনা…জারখান আমারো লাগতেচে…ইদিক এসি জড়ায় নেও আমারে…ঘুমোয় যেতি পারলি জার কেটি যাবেনে দ্যাখবা…ঘুমোলি সব কেটি যায় মনি…জার কাটে…খিদা কাটে…হাউস কাটে…ডর কাটে…ওইজন্যিতি তুমারে কচ্চি…ঘুমায় যাও…কাইল ক্যাতাখান রোদে দিবানে…কাইল দ্যাখবা, তাত পাবা…

কিস্যা ক নানি…একখান সোন্দর কিস্যা ক…তালি ঘুম আসবেনে।

আর কতি পারতিচি না সুনা…ইদিক আসো…মাতায় হাত বুলোয় দিচ্চি…চুপ মেরি ঘুমায় যাও…

না না না…তুই কিস্যা ক…

কইছি তো…এহনে আবার কিসির কিস্যা শোনবা…

আম্মুর কিস্যা ক নানি…সেই যে বলিলি…আম্মু কেরাম গান শোনায়ে ঘুম পারায় দেত…সেই কতাখান ক…শোনবো…

বড়ো খুবসুরৎ ছেল তুমার আম্মু…আহা গো…কেরাম টুকটুকা…প্যাটের খিদা তার বদনে টসকা দিতি পারিনি…ওরাম সুরৎ আমাগো ঘরে বেমানা সুনা…

তোর সব্ব কতাগুলান হাকুচ মিছা…আমারে খালি ভুলায় দিতি চাস…হাচাগুলান ক কচ্চি…

হাচা কই সুনা…আল্লার কিরে…তুমার আম্মু ম্যালা সোন্দর ছেল… ঘর ছেলনা…সেজন্যিতি চাপা দে থুতি পারিনি মনি…হারায় গেচে…

আম্মু খারাপ ছেল…সক্কলে কয়…খালি তুই মিছা কস…

কেডা কয়? ওগা কথা কানে নেবানা সুনা…

সক্কলে কয়…শাজাহান চাচার পুলা আমারে কয় বেবুশ্যের বেটি, আরু লিয়া চা, বুলি ফুফু সুলে চা আমারে দ্যাখলেই কয় বেবুশ্যের বেটি বেবুশ্যে…বেবুশ্যে কি রে নানি?

শোনবা না, মোট্টে ওগো কথায় কান দেবা না মনি…খালি জেনি থোও…তুমার আম্মায় ম্যালা সোন্দর ছেল, সেজন্যিতি ওগো গায় জ্বালাপুড়া…ওগো পাকা দালানেউ ওরাম সোন্দর বউ বেটি পয়দায় না…সেজন্যিতি ওগো পেরাণ হসকায়…

কলি না, বেবুশ্যে কারে কয়?

ওখানা বড় খারাপ কতা মনি…কাউরে কক্ষুনো কবা না…নিজিউ বলবা না…

আচ্চা বলবো না…কিন্তু কারে কয় নানি?

যেজনার মরণ ফসকায়…মরণ ফসকায়ে ভেন্ন ভেন্ন লোকের হাতে ঠ্যালা গুতোন যন্তনা নে মরণের জন্যি ঘুরতি থাহে…বড় হলি বোঝবা সুনা…

তালি ক, আমার আম্মু কনে গেচে? আমারে দেকতিউ আসতেচে না কিজন্যি?

কাইজ খুঁজতি গেচে সুনা, কাইজ পেলি তুমারেও লগে নে যাবে…

কুতায় কাইজ খুঁজতেচে? আমারে নে চ…

খিদা ঘুচাতি বাইরোলে কি যাওনের নিশেন থাহে সুনা! কমনের থে কমনে ঘুল্লি কাটতেচে, সেজনা নিজিউ ঠাওর পায় না। তুমার আব্বুরে গরমেন নেগ্যালি আর ঘরের দুটোসখান চাউল গেল ফুরোয়…তুমার আম্মুর দিশাটুকখান উবি গেল…

তালি এত্তডা দিনির মদ্যি আসেনা ক্যান? কাইজে গেলি কদ্দুর যেতি হয়, ও নানি?

দূরির কি দিকদিশা আচেরে বুন…কামের মদ্যি গে পথ-খান হারায়ে ফেলিচে কদ্দুর…কেডা জানে…ফেরার দিশা পেলি তুমার কাচে আসবেনে বুন… নাহলি তুমার আব্বুরে বলবো খুঁজি আনতি, তহনে তুমার তালি আর কুনো ব্যাদনা থাকবে না সুনা…এহনে ঘুমাও…আর পারতিচি না, ঘুমাও সুনা…কই কি…এহনি এত্তডা বেড়ি উঠোনা যাতি নিজিরি বুঝ দিতিউ ব্যাদনা ওঠে…ঘুমায় যাও মনি।

খিদা লাগে, নানিরে…

আবারে এক কতা কয়…কহনথে বলতিচি ঘুমা…নাহলি বকবো কলাম…খালি কতা আর কতা…বান্দর মাইয়া…ইরির বাদ আর একখান কতা কলি ঘা-দুই বসায় দেব কলাম।

ও মনি…ঘুমায় পড়িচ…মনি রে…সুনা আমার…ঘুমাও…

ঘুম আসতেচে না…আমি চলি যাব…

কনে যাবা? ও সুনা…কনে যাবা আমারে ছেড়ি…

তোগা কাচদে চলি যাব…আমার খিদা লাগতেচে…যেহানে গেলি খিদা লাগে না সেহানে চলি যাব। তুই বুড়ি, না খাওয়ায়ে থুস…তোর কাচে থকবো না।

গুসা করে না সুনা…আইচ্চা, কাল সক্কাল সক্কাল কিচু দ্যাখবানে…দ্যাখবা, কিচু একখান ব্যওস্থা আল্লায় জুটায় দেবানে…ফরসাটুক হতি দেও…চাইল জুটায় নেবানে ঠিক।

মিছা কসনে বুড়ি…কুথার থে আনবি? তিনদিনের থে বলতিছিস জুটবেনে জুটবেনে…জুটাতি পাচ্চিস কই?

কাইল হবেনে…ঠিক কিচু একখান হয়ি যাবেনে দ্যাখবা।

আচ্চা নানি, গেরামের কতজনা গে চাইল আনতেচে…রশিদ চাচায় সাইক্যালে এনিচে আগের দিনকে…কালকেরে রাকুর আব্বায় ভ্যানে চাপায়ে নে আলো কত্তডি…তুই যেতি পারিস নে ওহানে?

আমাগো কাগজ নি সুনা।

তাতে কি হয়েচে?

গরমেন চাইল দ্যায় কাগজেরে…তুমারে ভাবতি হবে না…কালকেরে আমি জোটায় নেবানে ঠিক…

কিসির কাগজে গরমেন চাইল দেয় রে নানি? তচির কাচদে যদি একখান কাগজ চেয়ি আনতি পারি তালি দেবে? চাইল?

না সুনা…পড়ালিখার কাগজে চাইল দেয় না…সে কাগজ গড়াতি লাগে…আমাগের নি।

আইচ্চা…আমারে ইসকুলি দিসনি কিজন্যি…ওহানে দুপুরি খেতি দেয়…আমি দেকিচি…গেটের মদ্যি আমারে ঢুকতি দেয় না।

দিতি পারিনি সুনা…

তচির বাপে তচিরে সাইকেলে বসায়ে ইসকুলি দে আসে…তুই কিজন্যি আমারে নে যাস না বুড়ি?

তুমার যে আন্ধার কাগজ নি…আমারু নি…সেখান না জুটালি কেউরে ইসকুলি নেয় না মনি।

সেখান আবার কিসির কাগজ নানি?

আচে একখান…তুমি বোঝবা না…গড়ায় নিতি লাগে…যন্তরের মদ্যি দে যন্তরে সম্বাদ আসলি তয়গে গড়াতি পারা যায়…তুমার আব্বু ইবারে ফিরলি বলব্যানে…সে যাহয় করব্যানে। পড়ালিখা দে ইমনিতেও কারু কিচু হচ্চে না শুনি…তারচে ভালো হইচে…তুমি ঘরে রইচো…

ঘরের মদ্যি এত্ত আলো আসতেচে কনদে নানি? দ্যাক দ্যাক…কেরাম সব ফকফকা দেকাচ্চে…ও নানি…মাতার থে ক্যাতাখান নামায় দ্যাক…মনি হচ্চে ফরসা লেগি গেচে…ও নানি, নানিরে…উঠি পড়…রান্ধবি চল…নানি রে…

আঃ…তুমারে কত্ত বলতিচি…চোক বোজায় থাকতি…কানে কতা নেচ্চ না কিজন্যি…

দ্যাক নানি…ফরসা হয়ি গেচে…ও নানি…মাতার থে ক্যাতাখান সড়া না…দ্যাক না…ঘরের মদ্যি কি সব নড়তিচে…নানি রে…

কিচ্চু নড়তেচে না…কচ্চি চোক বুজোয় থোও…ফরসা হতি ম্যালা বাকি…চাইন্দের আলো ফাক পেয়ি ঢুকি এয়েচে…আরু শিত্তিকালের বাতাসডা তেরপলের নিচি কাঁপতেচে…ঘুমায় যাও…মোরগায় ডাক ধরলি আমি ওঠবানে ঠিক…

মোরগার গোস খাবি নানি? রান্ধবি?

হবেনে কলাম তো…তুমার আব্বু এলি বলব্যানে…এনি দেবানে দ্যাখবা…

তালি সুকাল হলি তুই কি রান্ধবি? আবারে মিছা কচ্চিস নাতো…

যা জোটব্যানে…রেন্ধি দেব…একখান কাইজ করলি হয়…মনিরে…পেইচি। কাইল সুকাল টানে হ্যালা ভিটের জঙ্গুলে যাবানে, ওহানের ডুবাটায় কত্ত যে শাইক হতি দেকিচি…সেগুলান খেতিউ ম্যালা মিঠা…উরির খোলে খোলে তিতির বাসা বান্ধে…আমি জানি…দ্যাখবা…দু-চাইরখান তিতিরের আণ্ডা পায়ে যাবানে…গেড়ি তোলবানে খানিক, আরু কত্ত যে কন্দ রহিচে…গে তুলি আনলিই হয়ি যায়…সুকাল টানে যাবানে সুনা…কত্ত গাচ রইচে…কাটও মেলবানে ম্যালা, কাইল পাড় হবানে…

নাই…ও বুড়ি…নাই…কিচ্চু নাই…

কি নাই?

হ্যালা ভিটা নাই, একডাও গাচ নাই, জঙ্গুল নাই বুড়ি…ডুবা নাই…ভরাট দে উরির পরে খাম্বা উঠতেচে…

কি কও মনি? ক্যামনে সম্বাদ এনিচ…অত্যডা দূরির পথ…

আগে ক…চেত্যা যাবিনে…তালি কচ্চি…

গুসা আমারগা মরি গেচে সুনা…আমিউ মরিচি…তুমি কও…

আজকেরে গিইলাম নানি…

খাইল পেরোয়…একা গিইলে?

খাইলে পানি নি নানি…হাওড় শুকোয় যাচ্চে…পেরোয় গিইলাম।

কহনে গিইলি ছেমড়ি?

দুপ্পুরে। খাইলু আর দোচোর মায়ে ওগেরে খেতি ডাক দেলে আর আমারে ভাগায় দে ঘরে যেতি বললে…তহনে গিইলাম। সেথায় কিচ্চুটি নি নানি…তোরে কি কব…পুরা জঙ্গুল খাঁক খাঁক মাট হয়ি গেচে আর ডুবাখান ভরায়ে ইট দে লুহা দে খাম্বা গড়তেচে কজনা…

অত্তখান দূরি একা যেতি তোরে বারন দিছিলাম কিনা ছেমড়ি? আগে ওইডা ক…

দিইলি…গে কিন্তু আমার ম্যালা ভালো হয়েচে বুড়ি…

কিসির ভালো…কি পেইচিস?

সগ্‌গলে তো আমারে খালি খ্যাদায় বুড়ি…বেবুশ্যের বেটি বলি খ্যাদায়…জ্যাল খাটানির প্যায়দা বলি উটোন থে ভাগায়…কেউ দুখান কতা কতি চায় না…ওহানে একজনা চাচা পেইচি…আমারে খ্যাদায় নি… কাচে ডেকিচে…পুচ করিচে…দুকানের থে এত্তডি বড় একখান লজেন এনি দেচে…কি সোয়াদ লজেনখানার…তোরে কি কব নানি…পাশে বসায়ে আরু আদর করিচে…বুকি পিটি খালি হাত ডলে নানি…লজেন দে জামার মদ্যি হাত ঢোকায়ে সুড়সুড়ায়… খুঁচা দেয়…আমার কিরাম ডর লেগিচে নানি…আমার কিরাম কিরাম হচ্চে সারাডাদিন…উরে নানি…সে ব্যাডার মাতায় মস্ত টাক…ভুটভুট্যা গাড়ি রইচে…আমারে চড়ায় নে ঘোরবে বলিচে…

উরি আল্লারে…উরি খুদা…আমারে কি বেপদে ফ্যালালে আল্লা গো…এ ছেমড়িরে নে আমি কনে যাই…কনে লুকোয় থুই…আল্লাগো…হতচ্ছাড়ি বেপদ…কত্তবার না তোরে নিষেধ দিছি…আন-ব্যাটাগো ধারে না যেতি…কত্ত তোরে বুঝোয়চি…আম্মার নাহান বদন পেইচিস…পুড়ামুখি নিজি মরিচে…বদনরে প্যায়দা দে বেপদ বাড়ায় গেচে…কত্ত বলিচি…বেড়ি উঠিসনে…যাগো শইল্যে ত্যানা জোটেনা…তাগো ওরাম ধরফরায়ে বাড়লি বেপদ দুগুনা…ক ছেমড়ি…তোরে নিষেধ দিইলাম কিনা ক?

বকতিচিস কিজন্যি বুড়ি…দোষডা করলাম কনে? ঘর থকলি খেতি দিবিনে…খাবার জুটালি তালি ঝামটা দিস কিজন্যি?

উরে আম্মারে…উরে সুনা…আমি তোরে কেরামকরে বুঝাই…কিভায় বুঝ দেই…আমাগো প্যাট বড় বালাই সুনা…উরির দুদিকি খালি হা হা…একখান হায়ে খিদা ধামসায় আরেকখানে হা খুললি জেবনখান খামচায়ে খামচায়ে দোজকের আগুন দে পুড়ায় সুনা…যেওনি…উদিকপানে আর যেওনি বুন…

কালকেরে গেলি চাচায় আমারে গন্ধ সাবুন দেবে বলিচে…

থাম ছেমড়ি…বলতিচি যাবিনে…

নয়া জামা দেবে বলিচে…

খুলি নিবে…ও সুনা…পরায়ে খোলবে, না পরায়েও খোলবে…যেওনি আম্মা…

ব্যাস ত্যাল নে আসবে আমার জন্যি…

পিছলোয় যাবা সুনারে…ঠাই পাবা না…

আমারে ভুটভুট্যা গাড়িতি নে ঘোরবে কয়েচে…

পড়ি যাবা মনি…আছাড় খেয়ি পড়লি আর উঠতি পারবা না…ও সুনা…

কাইল দুপ্পুরি গেলি আমারে হুটেলে নে গে গোস্ত ভাত খাওয়াবে বলিচে…

ও সুনা…ও মনি…উরে আম্মারে…বড় হোয়েচ…নিষেধ দিইলাম…শোনলে না, না খেয়িউ বেড়ি উঠিচ…তুমার ত্যানাখানায় ম্যালা ফাঁসা‌…দ্যাহ বাড়তি আচে…উঁকি দেচ্চে দশদিকি…ফাঁসা ভরায়ে তুমায় লুকোতি পারতিচি না…তাউ কই…নিজিরে লুকোয় থোও মনি…আমার মরন পয্যন্তি যেওনি…

সারাডাদিন আমার ম্যালা খিদা লাগে নানি…

মরন রে…তাউ কই নিজিরে লুকোয় থোয়া ভেন্ন গরিবিগো আর কিচু পাওনা নি…তাগো জবানে দোজখ, দ্যাহে ফুসকা…যেওনি আম্মুরে…সুনা আমার…

গেলি খেতি পাব…প্যাট ভরায়ে ভাত জোটবে নানি…তোর জন্যিউ নে আসবো…

যেওনি…ও সুনা…মাতা খাও…গেলি আমার মরন দ্যাখবা…যেওনি সুনারে…

আমারে যেতি দে নানি…আমার প্যাট কান্দে…ও নানি…যেতি দে…

সুনা রে… মনি রে আমার…

এই পর্যায়ে এসে সতর্কীকরণ বাবদ জ্ঞাত করা বাঞ্ছনীয়, কথালাপ মিথ্যা, অযৌক্তিক, আবান্তর ও পরিপূর্ণ কাল্পনিক এসব কথা-আয়োজন খদ্যাখাদ্য এবং স্বাদকোরকের অভিনন্দনার্থে অহেতু নির্মিত, কেননা, অভিযোজনার্থে সুষম খাদ্যে লবণ মিষ্টি টক ইত্যাদি স্বাদের প্রয়োজনীয় অংশের পরিমিত উপস্থিতি যেমন রুচি ও আগ্রহকে স্বাদিত করে আনন্দে তেমনই শোক শ্লোক ফূর্তি অভিপ্সা আর স্ব-স্ব ক্ষমতার দ্বারা দ্বার পরিতোষণ ভিন্ন জীবন ফ্যালনা ফ্যালনা। দেশ ও দেশাত্মবোধ খেলনা, আইন ও শাস্ত্র মিছা। আমরা কতিপয়, ক্ষেত্র বিশেষে মনোভূমে ক্ষাত্রজ, ফলত এমনতর কথালাপ থেকে, যা পরিবেশিত পাত্রের পাশে নুন মরিচে সজ্জায়িত, অবস্থান অনুপানে স্ব-রুচিতে মিশিয়ে নিয়ে বা উপেক্ষায় টাক কাকা টিকি কাকা টুপি কাকা বিলিতি কাকা বিখ্যাত কাকা টাকা কাকাদের স্বজনে দাঁড়িয়ে অথবা তাদের উল্টোদিকে সামনাসামনি হয়ে কিংবা পিছন ফিরে নিজেদের আস্বাদ কোরকের দাবি মেটাতে বেছে বেছে বিভিন্ন অংশ ভিন্ন সময়ে মিশিয়ে খেদিয়ে স্বাদু জীবনকে কুসুমকোমলে শোভায়িত করতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং এই বয়ান রাষ্ট্রীয় ও সাংগঠনিকভাবে অমার্জনীয়, পরন্তু অসত্য বলে বিশ্বাস করা শ্রেয়, বিশ্বাসে যা মিলায় তা অপার্থিবে প্রার্থীত এবং অলঙ্ঘনীয়, এই সুখ এই সৌখিনতা এই মর্যাদায় আমরা কাঙ্খিতজন শুরু থেকে এমন সমস্ত গর্হিত জনম তথা মিথ্যাকে অদ্রষ্টব্য অশ্রাব্য বলে প্রতিহত করেছি, করে চলবো অনন্ত আগামী ও অবিশ্রান্ত অনাগামী সম্মুখপর্বে।     

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *