অমিতাভ সরকার
কে যেন ডাকে নিশিভোরে
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
তিনি নিজেই ছিলেন চলমান এক সঙ্গীত। অনুভূতিকে সুরে ফুটিয়ে সরগমের নিখাদ জড়ানো মীড় গলায় নিয়ে একটা গানকে যে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়- সতীনাথ মুখোপাধ্যায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ। শ্রোতারা ভালোবেসে ’মরমি’ শিল্পী আখ্যায়িত করলেও রাগপ্রধান গানে ওঁর দাপট ছাপিয়ে যেত জোয়াড়ির অদ্ভুত অনুপমেয়তায়। তালিম, স্বরক্ষেপণ, আকুতি – সব মিলিয়ে যেন সাক্ষাৎ ইষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ।

আর সুরকার হিসাবে ইচ্ছেমতো স্বর নিয়ে শাসন করেছেন – রাগ-রাগিণীর ব্যবহার করেছেন- পারফেকশনের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে বাণী আর কণ্ঠ পরস্পর যেন একই দেহে অর্ধ্ব-নারীশ্বর হয়ে উঠেছে। যা গেয়েছেন বা যা সুর করেছেন -কোনো ভূমিকায় যেন ন্যূনতম খাদটুকু নেই। আত্মভোলা এই সাধক- যেন সময়কে সামনে বসিয়ে গান শোনান, শেখানও। কিন্তু সময় তাঁকে ওঁর প্রাপ্য মর্যাদা। কিন্তু স্মৃতির বালুকাবেলায় ঝিনুক কুড়াতে গিয়ে বারবার ভাবতে বসতে হয়- বাঁধা পড়তে হয় ‘রাধিকা বিহনে কাঁদে’, ’কেন জানি না বাজে’, ‘কে পিয়া বলে ডাকে রে’-র পাশাপাশি ‘আমি চলে গেলে’, ’জানি একদিন আমার জীবনী লেখা’-র বেদনাবিধুর কিংবা ‘এ জীবনে আমি যারে চেয়েছি’, ‘এলো বরষা যে সহসা’, ’আকাশ এত মেঘলা’-র মতো নিটোল প্রেমের গানে।
রাগপ্রধান গানে সুরারোপ করলেও অকারণ তানকর্তব দেখাননি, নিজের সুরের মধ্যে সংযম রেখেছেন। বেশি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা পছন্দ করতেন না। ধ্রুপদী, গজল, ঠুংরি, ভজন, রম্যগীতি, -নজরুলগীতি তো আছেই -এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গানের মধ্যে যথেষ্ট বিশুদ্ধ এবং সঠিকভাবে গাইলেও উনি রবীন্দ্রসংগীত কেন যে গাননি, সেটা প্রশ্ন রয়ে যায়। শ্যামল গুপ্তের লেখাতেই তাঁর বেশি গান গাওয়া। আবার সলিল চৌধুরীর গানে তাঁর কণ্ঠ অদ্ভুতভাবে অনুপস্থিত -এটাও গবেষণার বিষয়। সুরকার হিসাবে লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে প্রথম বাংলা গান গাওয়ানো ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে’ এবং ‘কত নিশি গেছে নিদহারা’, আবার মহম্মদ রফিও সতীনাথের সুরে গেয়েছেন ‘এখনই বিদায় বলো না’, ’এবার তাহলে আমি যাই।’ শোনা যায়, রফিসাহাব সুরকার হিসাবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য ওঁকে বোম্বে যেতে বলেছিলেন। তবে কোনো বিশেষ বাণিজ্যিক গতে নিজের সৃষ্টি বা কণ্ঠকে বিক্রি করার বাসনা তাঁর ছিল না। হয়তো সেজন্যই ‘তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর’(শ্যামল মিত্র),’ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়’(উৎপলা সেন),’আর কত রহিব শুধু’(হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘আমার হৃদয় নিয়ে আর কত কাল’(মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়), ‘শূন্য ঘরে ফিরে এলাম’(ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য) -র মতো গানের সুরস্রষ্টা গভীর আত্মপ্রত্যয়ে নিজের সাধনাতেই আঁকড়ে থেকেছেন- ব্যর্থ প্রচারের বায়নাক্কায় অযথা পীড়িত হননি।
লেখাপড়ায় প্রথম না হলে গান শেখা যাবে না -এই শর্ত নিয়ে গান শিখতে আসা। একবার তা ভঙ্গ হলে সে বছর তাঁকে ‘গানহীন’ থাকতে হয়। অবশ্য লেখাপড়ায় অমনোযোগী কোনোদিন ছিলেন না। পড়াশোনা, গান দুটোই চলেছে সমান তালে। কিশোর বয়সেই গ্রামোফোনে রেকর্ড ‘মাষ্টার বাদল’ নামে। কয়েকটা রেকর্ডের পর ব্রেক থ্রু এলো শ্যামল গুপ্তের লেখা, আর তাঁর নিজেরই সুরে ‘পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’।
দশ দশবার অডিশনে ফেল করানো হয়েছিল তাঁর মতো শিল্পীকে।( কারণ পরীক্ষকদের বিচারে ওঁর গলা নাকি মাউক্রোফোনের উপযোগী ছিল না।) তারপর বেতারে গাওয়া শুরু। ইন্টারমিডিয়েট, বিএ পরীক্ষায় ডিস্টিংশনে উত্তীর্ণ হয়ে এজি বেঙ্গলে তখন চাকরি করছেন।
নজরুলগীতিতে অদ্বিতীয় ছিলেন সতীনাথ। ‘তুমি সুন্দর তাই’, ’আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’-সুপারহিট। ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’,’শাওন রাতে যদি’, ‘হে মাধব’, ‘আমায় নহে গো’- তাঁর কণ্ঠসম্পদে যুগোত্তীর্ণ।
বড়ে গোলাম আলি, বেগম আখতারের মতো কিংবদন্তীর স্নেহধন্য সতীনাথ নিজেই হয়ে উঠলেন রাগের যথার্থ রূপ-ধর্ম সংস্থাপক। নন্দকোষ রাগে নির্মিত ‘কোথা তুমি ঘনশ্যাম’, মাঝ খাম্বাজে ‘তোমারে ভুলিতে ওগো বলো না’, চন্দ্রকোষে ‘বোঝো না কেন আমি যে কত একা’, কিংবা নিজের সৃষ্ট মাধব টোড়িতে আধারিত ‘কে যেন ডাকে নিশিভোরে’ -র মতো সৃষ্টির প্রাণপ্রতিষ্ঠা চিন্ময় লাহিড়ীর ছাত্র সতীনাথের নির্মাণেই সম্ভব। উচ্চাঙ্গ সংগীতের ছাত্র ছিলেন বরাবরই।
ক্লাস থ্রি থেকে সংগীতজ্ঞ প্রবোধ ঘোষালের কাছে তিনবছর শিক্ষার পর গুরুর প্রয়াণ হলে ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের কাছে দীর্ঘ দশ বছর কাল টপ্পা, ধামার, ধ্রুপদ শেখা চলেছিল।
গানে বিভোর হয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁর জীবনে বেশ কিছু গল্প আছে। তবে সব গল্পকে ছাড়িয়ে দারুণ উর্দু বলতে পারা রন্ধনপটু দিলখোলা অতিথি-বৎসল আন্তরিক মানুষটিকে বিচার করলেও পুরোটা হয় না।
কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রেও সুরকার হিসাবে কাজ করেছেন। যেমন – মর্যাদা(রামচন্দ্র পালের সঙ্গে যৌথভাবে), অনুরাগ, অতিথি, বনপলাশীর পদাবলি(একাধিক সুরকারের সঙ্গে), ভাগ্যচক্র। ‘মাঝে নদী বহে রে’, ’ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরছে’- স্ত্রী উৎপলা সেনের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়।
‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমায় ‘জীবন নদীর জোয়ার ভাটায়’ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। কমল দাশগুপ্ত, অনুপম ঘটক, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, কালীপদ সেনের সুরে হিন্দি চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন।
এছাড়া বেশকিছু ভজন, গজল ইত্যাদিও গেয়েছেন। যেমন-‘বিত গ্যায়া দিন’, ’উমিদ এ বসল মে’, ’সুনায়ে যা ও প্যারে’, ‘সিয়ারাম’ ইত্যাদি। জীবনের শুরুর স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে লাহোরে সতীনাথ গোলাম মোস্তাফা নাম নিয়ে গজল গাইতেন।
১৯২৩ থেকে ১৯৯২, স্বল্প আয়ুকালের পরিধিতে তাঁর কীর্তিকে বিচার করা অসমীচীন। ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন’, ’মাধবী গো মধুরাতে’, ’বাজে না বাঁশি কেন’, ‘যদি সহেলী আমার কানে কানে’, ’সূর্যমুখী আর সূর্য দেখবে না’-র মতো গান যেমন আর হবে না, তেমনি নিজের সুর বাদ দিয়েও সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষদের সৃষ্টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণ ভাবে। তাঁর মতো সাধকই পারেন অনেক না-পাওয়া, অনেক মতবিরোধের কষ্টকে মনে ধরে রেখেও সততা, নীতিবোধ, ভালোবাসাকে সবকিছুর আগে স্থান দিতে। দীপক মৈত্র, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো ছাত্রদের সবটুকু দিয়ে সহজেই নিঃস্ব হতে পারেন।
কণ্ঠ বেঁচে থাকে, গান অমর হয়, রয়ে যায় নিষ্ঠা। সাধনার সঙ্গে বারংবার উপেক্ষা, অসম্মান, দূরে সরিয়ে রাখার ইতিহাসের সঙ্গে ওঁর নিজের সুর অন্যের নামে প্রকাশিত হওয়ার দাক্ষিণ্যও। কালের কালোয়াতিতে তবুও বন্ধু অখিলবন্ধু ঘোষ, বন্ধু শ্যামল গুপ্ত কিংবা স্ত্রী উৎপলা সেনের মতো তাঁরও মূল্যায়ন হয় না। এ দায় সংস্কৃতির।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
