কৌশিকরঞ্জন খাঁ
‘তনু, দরজাটা খোলা থাকলো’ বলে তার বর টোটোর অ্যাক্সেলেটরে মোচর দিল। কুড়ি লিটারের জলের জার ভর্তি টোটোটা আস্তে আস্তে গতি নিয়ে সামনের কংক্রিটের রাস্তাতে গড়াতে শুরু করলো। বাড়ির রাস্তার উল্টো দিকের ট্যাপকলে বাসন মাজা সারা হয়ে গিয়েছিল তার। বাসনগুলো বড়ো থেকে ছোট পর পর সাজিয়ে নিতে নিতে বলে — “থাক।”
এভাবেই গৌতম জেনে ফেলেছিল তার নাম তনু। তনু নামটা তার সাথে মানিয়ে যায়। একহারা ফর্সা চেহারার ছোটখাটো শরীর ‘তনু’ তো বটেই। বরং তনুদের বাড়ি থেকে দুশো মিটার পাশে একটা গোরুর খড়কাটা মেশিনওয়ালা বাড়ির সামনে এক ষাটোর্ধ মহিলা কাঠের ছোট টুল পেতে বসে থাকে। তার শরীরকে ‘বপু’ বলা চলে।
বস্তিটার মধ্যে দিয়ে গৌতম অতটাও যাতায়াত করতো না আগে। তবে পথ সংক্ষিপ্ত হয় বটেই। তাছাড়া রাস্তাটা তুলনামূলক নিরিবিলি হওয়ায় বাইক চালিয়েও মজা। শুধু রাস্তাটাতে চলতে গেলে কোনও বাড়ির দরজা দিয়ে বাচ্চাকাচ্চা দৌড়ে বেরিয়ে আসে কিনা সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। বস্তির জীবনে কি আর ডিসিপ্লিনের ব্যাপার থাকে!
যেদিন থেকে তনুকে হঠাৎ গৌতমের চোখে লেগে যায় সেদিন থেকে রাস্তাটা বেশি ব্যবহার করা শুরু করে দিয়েছে সে। নানা কাজে সকাল বিকেল মিলে বার চারেক যাতায়াত করলে অন্তত তিনবার তনুকে দেখে ফেলে গৌতম। এখন তনুর টার্গেটেই রাস্তাটা ব্যবহার করে। তবে এটুকু পরিষ্কার তার কাছে —তনু একটা টার্গেট, গোল নয়। গোল কেন হতে যাবে! তার গোল তো রিমা। রিমা ছাড়া আর দ্বিতীয় কেউ নয়। পঞ্চায়েত অফিসের ক্লার্কের মেয়ে–বউ, বাজারঘাট, ডাক্তার, ওষুধ, সংসারের টুকিটাকি আবদার, স্বপ্নপূরণের দৃঢ মজবুত ডিউটি থাকলে আলাদা করে কারো প্রয়োজন হয়না। কাজেই তনু রাস্তার একটা দ্রষ্টব্য এবং হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়া খেয়াল ছাড়া আর কিছু নয়।
এখন বস্তিটার রাস্তার মুখে এসে বাইকের হ্যান্ডেল ঘোরাতেই আগে থেকে মনে প্রশ্ন আসে — “ তনু থাকবে তো!”
গৌতমের এই চিন্তা একধরনের এনগেজমেন্ট দেয়। জীবনে এই ধরনের ব্যস্ত থাকারও প্রয়োজন থাকে। সামান্য সময়ের জন্য অন্যদিকে মন থাকলে নিজেকে ‘ছাপোষা’ মনে হয়না অন্তত। সংসার তো সামরিক দপ্তর নয় যে অনুশাসনই শেষ কথা! তার কাছে সংসার একটা হাট যা খুশি দেখো, যা খুশি বেঁচো, যা খুশি কেন। তবেই না পাঁকাল মাছের মতো বাঁচা।
একটু ভাবুক টাইপের গৌতম যেকোনও মনের মতো বিষয় পেলেই ভাবা শুরু করে। যেদিন ‘তনু’ নামটা প্রথম জেনেছিল সেদিন থেকে একটা ভাবনা চলে এসেছিল — তনুই কী নাম! নাকি নামের সংক্ষিপ্ত অংশ!
সেক্ষেত্রে সম্পূর্ন নাম হতে পারে তনিমা, তনুশ্রী বা তনুজা। কিন্তু ছোটখাটো মিষ্টি অল্পবয়সী বউটাকে তো বস্তির কাউকেই ডাকতে শোনেনি। ওই একবারই কোন ভাগ্যে তার বরের ডাক শুনে ফেলেছিল! না হলে হয়তো নামটাই জানতে পারতো না।
সংক্ষিপ্ত ‘তনু’ ধীরে ধীরে গৌতমের মনে বিস্তার লাভ করছিল। তনু বাসন মাজে, তনু দাঁত মাজে। তনুর একটি ছেলে আছে, মুখের ঢঙ তনুরই মতো। তনুর গলার স্বরটাও কি ভালো। তনু বস্তির অন্যান্যদের মতো রঙচটা নাইটি পরে না। তনু শাড়ি পড়লে আরও ভালো দেখায়। কোমরটা অহংকারী। তনুর শখ আহ্লাদ আছে। পুজোর আগে চুলে লকস বের করেছিল। সেটা আবার স্প্রিংয়ের মতো প্যাঁচানো। তনু মৃদু মাথা দোলালেও সেটি দোলে।
এত কিছু দেখতে দেখতে তনু যখন সম্পূর্ণ পরিচিত হয়ে যাচ্ছিল গৌতমের কাছে সেসময় সে হঠাৎ আবিষ্কার করে তনুর কাছেও সে পরিচিত। গৌতমের বাইক তনুদের গলিতে ঢুকলেই তনু সচেতন হয়। হয় তাকায়, নয়তো একেবারেই তাকায় না। না তাকানোর মধ্যে যে জোর করে নিয়ন্ত্রণ থাকে, তা–ই স্পষ্ট করে দেয় গৌতমের প্রতি তার মনোযোগ। যেদিন আশেপাশে কাছেপিঠে কেউ থাকেনা সেদিন কি অদ্ভুত ভাবে চোখে চোখ রেখে তাকিয়েই থাকে। গৌতম বোঝে তনুও তাকাতে ভালোবাসে, তনুর দিকে কারও তাকিয়ে থাকাটাও ও ভালোবাসে। কেউ না থাকলে তাই গৌতম অনেকক্ষন ধরে তাকিয়ে থাকে। কে আগে চোখ নামাবে সেই কম্পিটিশনে চলে কখনো কখনো। কতদিন হয়েছে গৌতম হেরে গেছে। মেয়েটার বুকে মেঘের মতো একটা সাহস আছে। সমাজ সংসার সংস্কারকে সূর্যের মতো আড়াল করে দিতে জানে। সেই কারনে গৌতমও সাহসী হতে পারে। এই সাহসেই গৌতম এখন অফিস থেকে ফেরার পথেও হেঁটে হেঁটে ফেরে, অনেকটা ঘুর পথ হলেও তনুর সামনে দিয়েই ফেরাটা একটা নেশা হয়ে গেছে।
গাঢ সবুজপাতায় ছাওয়া একটা বিরাট বড়ো সজনেগাছের নীচে বাঁধানো চাতালে বসে থাকে তনু। অনেকদূরে গৌতমকে দেখে ফেললে টেনশনে পড়ে যায়। সারা শরীরের রক্ত মুখে জমা হয়ে যায়। যার সাথে বসে কথা বলে তার সামনে অকারণে ছটফট করতে থাকে। বেশি কথা বলায় কথার খেই হারিয়ে ফেলে। গৌতম সেটা ধরে ফেলে। তার হাসি পায়। বাড়ি ফিরেও তনুর আচরণ অনেকক্ষন অনুরণন তোলে তার মনে।
তারপর একদিন তনুকে একটু বদলে যেতে দেখা গেল। ওর বরই সম্ভবত পরিবারের একমাত্র আয় করা মানুষ। বস্তির অন্যদের চেয়ে তারা একটু আলাদাই। নিজের মতো থাকতো। কারো সাতেপাঁচে থাকতো না। অন্যেরা গৃহপরিচারিকার কাজ করলেও তনুর অবস্থা অতটাও খারাপ ছিল না। দেখতে সুন্দর তনুকে তোলা তোলা করে রেখে তার বরই সারাদিন খাটাখাটুনি করে যেত। তনু ছিল পুরোদস্তুর তার বরের অহংকার।
একদিন দেখা গেল তাদের বাড়ির টিনের একটা ঘর মুদিখানার দোকানে বদলে যাচ্ছে। গলিটা দিয়ে মানুষের যাতায়াত বাড়ছিল। সুযোগ থাকলেই বাড়িতে দোকান দিয়ে দিচ্ছিল সবাই। মুদিখানা, সেলুন, পানের দোকান, দর্জির দোকান, চায়ের দোকান, বাইকের স্টিকার, জলের দোকান।
তনুদের দোকানে বসল তনু নিজেই। গৌতম ভেবেছিল তনুর বরই দোকানে বসবে। তনুর মতো একটা মেয়ে দোকানে বসবে এ ছিল তার ভাবনার অতীত। তনু চাল ডাল মাপছে, তনু সিগারেট বের করে দিচ্ছে – এই দৃশ্যগুলো মেনে নেওয়াই তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু হলো তাই।
গৌতমের খুব মন খারাপ হল। তনু তাদের বস্তির অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সবার মতো সহজে তার কাছে পৌঁছনোর উপায় ছিল না। সে দোকানে বসা শুরু করলে দোকানে ভীড় ক্রমশ বাড়ছিল। তনুর চোখ তুলে তাকানোর সময় ছিল না আর। গৌতমের বাইকের শব্দে হয়তো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, তাই ব্যস্ততার মধ্যেও চকিতে চোখ তুলে তাকাত। গৌতম মনোযোগ হারাচ্ছিল তার কাছে। এইরকম দায়সারা চাউনি তার তো প্রয়োজন নেই। সে চেয়েছিল তনু তার জন্যই অপেক্ষা করে থাকবে। তনুর চোখে তাকিয়ে থাকার অধিকার যেন আর কারো থাকারই কথা নয়।
যে তনুর কন্ঠস্বর গৌতমের কাছে অপরিচিত ছিল তা হাটে নেমে এলো। নীরবতার মধ্যে তাকে পেতে চেয়েছিল। দোকানে বসতে গিয়ে সে প্রগলভ হয়ে পড়লো। অনেক দূর থেকে তার কথা শোনা যেতে লাগলো। সারাদিন কত অজস্র অবান্তর কথা বলে চলল। সমস্ত দূরত্ব সে নিজে হাতে মিশিয়ে দিতে লাগলো। গৌতমের কাছে তার চোখের কথা নীরবতার কাব্য ছিল। গৌতম ইচ্ছে মতো ভাষা ব্যবহার করে সাজিয়ে নিত। অনেক দূর থেকে শুনে ফেলা কথাগুলো তাকে বেআব্রু করে দিচ্ছিল।
আগে গৌতমের পক্ষে তনুর কাছাকাছি যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। এখন দোকানে কিছু কেনার ছুতোয় অনায়াসেই যেতে পারে। গৌতম তনুর এই অনায়াসসিদ্ধ হয়ে ওঠা কোনওদিন চায় নি।
দোকানটার সামনে বস্তির ছেলেরা, নাকি তার বর একটা বাঁশের মাচা বানিয়ে তুললো সজনেগাছের তলায়। প্রচন্ড রোদেও সেখানে একটা সবুজ অন্ধকার ছেয়ে থাকতো। কত রকম ছেলের দঙ্গল জুটে গেল। সবসময় সকাল থেকে রাত অবধি সেখানে আড্ডা চলতে লাগলো।
তনু দোকানে বসে থাকে। তার বর টোটো করে জল দিয়ে আসে, আবার খালি ড্রাম রেখে ভর্তি ড্রাম দিতে বের হয়। বহুত খাটাখাটুনি করে তনুর বর। এরই মাঝে সামনের মাচার কাছে গিয়ে একটু আড্ডাও দিয়ে নেয়। তনুর বর টোটো নিয়ে চলে যায়, তবুও ছেলেগুলোর আড্ডা ফুরোয় না। গৌতম কখনো খেয়াল করেনি সারাদিন রাত ধরে একই ছেলেরা আড্ডা মারে নাকি বদলে যায় মুখগুলো! তবে আড্ডা মারা সব ছেলেকেই এক মনে হয় যেমন গ্রামগঞ্জের সব মহিষকে এক মনে হয়।
তনুর জীবন কেমন বদলে গেল গৌতমেরই সামনে। তনুদের দোকান ঘিরে অত ছেলের আড্ডা। তাদের সামনেই দোকান ছেড়ে এঁটো বাসন মাজতে বসে, তাদের সামনেই কাপড়চোপড় কাচাকাচি৷ আগে সজনে গাছ থেকে একটা বাঁশ পর্যন্ত দড়ি টাঙানো থাকতো। গৌতম লক্ষ্য করে দেখেছে তাতে তনুর জামাকাপড়, তার ছেলের, বরের জামাকাপড় শুকোতে দেওয়া থাকতো। পরিচিত কাপড়ের ফাঁকে আর যা থাকতো তা তনুদের পরিবারের সকলের অন্তর্বাস। তনুরও থাকতো। এখন তনু নিজের অন্তর্বাস আর মেলে না সেখানে।
এখন আর প্রতিক্ষা থাকেনা তনুর জন্য। রাস্তাটায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাই গৌতম এখনও ব্যবহার করছে। নইলে না ব্যবহার করলেও চলে। কতদিন গেছে জায়গাটা পেরিয়ে এসে মনে হয়েছে — তনু দোকানে ছিল কিনা দেখা হলো না।
টিনের বাড়িটার আড়ালে একদিন হঠাৎ লক্ষ্য করলো ইটের গাঁথনি, লিন্টন উঁকি মারছে সেদিন গৌতমের কেন জানি আনন্দ হয়েছিল। তনুকে আর রোদ বৃষ্টি গরমে কষ্ট করতে হবে না। তনুরা সবাই মিলে ভালো থাকবে। ছাদে নষ্ট প্লাস্টিক জারে অনেক নয়নতারা ফুটে থাকবে। অপরাজিতার ফুলসহ লতাগুলো নেমে এসে ঝুলবে। সামনে একটা বারান্দা রাখা হয়েছিল। এ বারান্দা হয়ে উঠবে তনুর বসে থাকার বারান্দা। সন্ধ্যায় একটা পাঁচ ওয়াটের এল ই ডি জ্বলতে থাকবে একা একা। ঘর থেকে ভেসে আসবে টিভি সেটে চলতে থাকা বাংলা সিরিয়ালের টাইটেল সঙ।
এরপর থেকে ওই রাস্তায় যেতে আসতে গৌতমের নজর চলে যেত নির্মীয়মান বাড়িটার দিকে। বাড়িটা কতটা ড়ঠলো! ছাদঢালাই, প্লাস্টার, জানালা দরজা বসা, বারান্দায় গ্রীল বসা। সবকিছুকে পর পর সাজিয়ে নিতে থাকে গৌতম। আর সেই মুদিখানার দোকান, ছেলেদের অপ্রয়োজনীয় জটলার সাথে তনু বেমানান কি মানান সেই প্রশ্নে নিজের সাথে কোনও বিতর্কে যেত না।
চোখে চোখে তৈরি হওয়া সম্পর্কটা কবেকার এক পুরনো অভ্যাস বলে মনে হলো গৌতমের। ওই রাস্তায় বাইকের পেছনে রিমাকে বসিয়ে নিয়ে যাতায়াতও খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠলো তার কাছে। তনু রিমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। তাদের মাঝে বসে থাকা পটাইকেও দেখতো। তনুর কাছে গৌতমের পরিবারও পরিচিত হয়ে উঠলো।
এরই মাঝে গৌতম লক্ষ্য করে তনুর তলপেট ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে। শরীর ভারি হচ্ছে। বাড়ি কিংবা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে তনুর স্ফীত পেটটা একটা ঘৃণার বস্তু হয়ে উঠতে থাকলো গৌতমের কাছে। বরের সাথে নিবিড় হওয়া সময়গুলো যেন গৌতমকে উপহাস করতে লাগলো। তলপেট যত ঠেলে বেরিয়ে আসে গৌতমের প্রতি উপহাস যেন তত গুনে বাড়তে থাকে। গৌতমের মনে হতে থাকলো – আগের যা কিছু সবই মিথ্যা, কেবল সত্য তনুর গর্ভের প্রাণটি। তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, আর গৌতমের অস্তিত্ব অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তনুর চোখে এই জিজ্ঞাসা স্থাপন করে অনেক কিছু জানার ছিল।
সে সুযোগ কেন যেন আর পায়নি গৌতম। তনু যেমন জড়িয়ে যাচ্ছিল প্রাণের এক নিবিড় আলিঙ্গনে। গৌতমকেও জড়িয়ে নিচ্ছিল রিমা, পটাই। একদিন তনুদের বাড়ির সামনে জটলা দেখে তাকে বাইকের গতি কমিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। জটলার মধ্যে দেখে বরের টোটো থেকে একটা ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা কোলে নিয়ে তনু নামছে। বহু লোকজন দেখেছিল তার মুখের তৃপ্তির হাসি। জটলা থেকে এক বুড়ির কথা ভেসে এসেছিল “ছুড়ির বহুদিনের মেয়ের শখ। মেয়েই হলো। নে এখন পুতুলের মতো সাজা।”
গৌতম একবার শিশুটির দিকে তাকায়। চোখ পিটপিট করছে। অত মানুষের মধ্যেও যেন তাকেই দেখছে। একটা কপট অভিমান ছিল সেই ঘন কালো নতুন চোখদুটিতে। গৌতম চোখ ফেরাতে পারছিল না।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
