তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। )
অধ্যায় : বাইশ
রিক্ত বলল,
‘জগৎকে তুই যেভাবে দেখছিস সবাই যে সেভাবেই দেখছে তার গ্যারান্টি কোথায়?’
আমি খানিকটা ভেবে বললাম,
‘সেটা নয় কেন? আমি যেটাকে আম বলে দেখছি আর খাচ্ছি আমার পাশের কোন লোক তো তাকে অন্য কিছু ভাবছে দেখি না। আমি যাকে আম বলে দেখি সেও তো তাকে তাই দেখে। নয় কি?’
‘কিন্তু তোর সমস্ত দেখা, বিশেষ করে গুণবাচক যেগুলি, অন্য লোকের দেখার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তোর কাছে যেটা দুঃখ, আরেকজনের চোখে সেটা সুখও হতে পারে। আবার তুই যেটাকে আম বলে দেখছিস সেটাকে অনেকেই আম বলে দেখবে সত্যিকথা, কিন্তু এটা হবে সাধারণের দেখা। কিছু লোক অবশ্যই আছে যারা আমটাকে কেবল আম হিসেবে দেখবে না, তার মধ্যে তরমুজকেও দেখতে পাবে। আবার এমনও কিছু লোক আছে যে বেল, জাম, লিচু, কলা ইত্যাদি বেশ কিছু ফলকে দেখবে আমের মধ্যে। অল্প হলেও এমন লোকও আছে যারা ওই এক আমের মধ্যে জগতের সমস্ত ফল বিরাজমান দেখবে। তেমন ব্যক্তি আম পেলেই সন্তুষ্ট, আমার বা তোর মত আম-জাম-কাঁঠাল ইত্যাদি সব ফল আলাদা করে পেতে চাইবে না। খুব কম হলেও এমন লোকও এক বা একাধিক আছে এই ধরাধামে যে এক আমের মধ্যে সমস্ত ফলই কেবল নয়, জাগতিক সমস্ত বস্তু, বাড়ি-গাড়ি-খাবারদাবার-বিলাসব্যাসন-টাকাপয়সা সমস্তকিছু খুঁজে পাবে। সে ব্যক্তি আম পেলে জগতের আর কিছু পেতে চাইবে না, এক আমের মধ্যে সে দেখবে বিশ্বসংসার অবস্থিত, আমের মধ্যে সে দেখবে অনন্ত ব্রহ্মের উপস্থিতি।’
রিক্ত থামল। আমি একটু সময় বাক্যহারা থেকে সন্দিগ্দ্ধ গলায় প্রশ্ন তুললাম,
‘এদেরই কি ঠিক মানুষ বলা যাবে?’
রিক্ত আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে জানাল,
‘এরাই ঠিক মানুষ। যারা আমকে কেবল আম হিসেবেই দেখে তারা আমি-তুই জাতীয় সাধারণ জনতা, যে আমের মধ্যে অন্য ফলকেও খুঁজে পায় সে আরেকটু উন্নত, যে এক আমে আরও পঞ্চাশটা ফল দেখবে সে আরও উন্নত এবং এমন করে করে উন্নত হওয়ার মাত্রা বাড়তে থাকবে, তারপর একজনকে পাওয়া যাবে যে সমস্ত ফলকে দেখবে এক আমের মধ্যে। তার চেয়েও উন্নত যেজন সে আমের মধ্যে সব ফল ছাড়াও অন্য অনেক কিছুর অবস্থান দেখতে পাবে আর এভাবেই আংশিক ঠিক মানুষের উন্নতি ঘটতে থাকবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সে যখন পুরোপুরি ঠিক মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাবে তখন তার কাছে ওই এক আম হয়ে যাবে জগতের সমস্ত বিষয়বস্তুর আধার।’
এবার আমি বুঝতে পারলাম, ঠিক মানুষকে খুঁজে পাওয়া কেন এত কঠিন কাজ। কোটি কোটি লোকের মধ্যে এক-আধজন ঠিক মানুষ কোথায় লুকিয়ে আছে তার সন্ধান পাওয়া খড়ের গাদায় সুঁচ খুঁজে পাওয়ার মতোই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এটা ওই কার্ল সাগানের তত্ত্বের মত। এত খোঁজাখুঁজি করেও কেন মহাকাশে এতদিনেও অন্য কোন প্রাণিসভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেল না, এই প্রশ্নের উত্তরে সাগান যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হল এই যে বহু বহু আলোকবর্ষ ব্যবধানে অবস্থিত হাজার হাজার কোটি তারাদের মাত্র কয়েকটিকে খুঁজে দেখতেও লেগে যাবে লক্ষ লক্ষ বছর আর সেই হিসেবে সম্ভাব্য কোন প্রাণিসভ্যতার সন্ধান পেতে কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি বছরও কেটে যাওয়া বিচিত্র নয়, অথচ মানুষের গোটা সভ্যতার বয়স বড়জোর দশ হাজার বছর আর ভিনগ্রহীদের অনুসন্ধান মানুষ শুরু করেছে দু’-তিনশ বছরেরও কম সময় ধরে। সন্ধান পাওয়া কি এতই সহজ? ঠিক মানুষের ক্ষেত্রেও এমনই তত্ত্ব প্রযোজ্য।
তাহলে কী করব, ঠিক মানুষ যদি সারাজীবনেও খুঁজে না পাই? রিক্ত বলল,
‘তাতেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আপাতত আংশিক ঠিক মানুষদের খুঁজে পেলেও চলবে, তারাও হতে পারে জীবনে প্রেরণার প্রতীক। খুঁজতে খুঁজতে এদের মধ্যে তুই তাদের পেয়ে যাবি যারা ক্রমাগত ঠিক মানুষের কাছাকাছি হতে থাকবে এবং এমন করে করে কোন একদিন তোর জীবদ্দশাতেই তুই হয়তো পুরোপুরি ঠিক মানুষটাকে পেয়েও যেতে পারিস। তাহলে তুই এখন দেখতে থাক সেই মানুষগুলিকে যাদের দেখলে তোর অন্তরে সুবাতাস বইবে, মনে হবে যে এই লোকগুলি কিছুটা হলেও এই নির্বান্ধব পুরীতে আমার দোসর। তুই ইতিমধ্যেই তাদের কিছু কিছু দেখতে পেয়েছিস এবং আমাকে বলেছিসও তাদের কথা। সেই যে হারা আর মিশাকে তুই আবিষ্কার করেছিস, খুঁজলে তুই এমন আরও অনেককে খুঁজে পাবি যাদের জন্য তোর মনে হবে পৃথিবীটাতে বেঁচে থাকার কিছু না কিছু মানে আছে।’
রিক্তর কথা শুনতে শুনতে আমি বুঝলাম আমার মধ্যে অন্যরকম একটা চোখ খুলে যাচ্ছে। কর্মসূত্রে ও অন্যান্যভাবে দক্ষিণবঙ্গের লোকেদের সঙ্গে আমার অন্তত চল্লিশ বছরের মেলামেশা। তাদের অধিকাংশই নানা কারণে আমার মধ্যে বিরক্তিই জাগিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে আমি দেখেছি লোভ, কুঁড়েমি, ফাঁকিবাজি, চরিত্রহীনতা, মিথ্যাচার, বিশ্বাসঘাতকতা, অপদার্থতা এবং আরও আরও ঘৃণ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন যে চোখ নতুন করে খুলে গেল তার আলোয় আমি এইসব অবাঞ্ছিত লোকগুলির মধ্যেও দেখতে পেলাম, দেখা যাচ্ছে প্রদীপ্ত কিছু শোভা। ক্রমশ আমার মনে হতে লাগল, জগতের কোন লোকই বর্জ্যনীয় নয়, প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু দীপ্তি অবশ্যই আছে। আর এই দক্ষিণবঙ্গীয় লোকগুলির অনেকের মধ্যেই আমি খুঁজে পেলাম এমন এমন আলোকিত অঞ্চল ও দীপ্ত প্রতিফলন যা আমাকে প্রাণিত করতে পারে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কটির নাম জীবন সর্দার।
তার বয়স এখন প্রায় আশি। প্রায় চল্লিশ বছর আগে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ছোটখাট, বেঁটে আকৃতির চেহারা, মোটা নয়, স্বাস্থ্য খুব ভাল না হলেও শক্তসমর্থ মজবুত গড়ন। মাথায় চুল খুব বেশি না হলেও খুব কম নয়, এই বয়সেও ঋজুদেহ, অফুরন্ত কর্মোদ্যম। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গেছে প্রায় কুড়ি বছর আগে, তবুও কর্তৃপক্ষ তাকে ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে এখনও চাকরিতে বহাল রেখেছে যেহেতু সে যেসব কাজ করে যে দক্ষতার সঙ্গে তার বিকল্প কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, খুঁজে পাওয়া যায়নি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন একজন নিবেদিত-প্রাণ কাউকে। সে এখন আমার প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে প্রাচীন, এক বটবৃক্ষ। সে এমন এক বটবৃক্ষ যার অজস্র ঝুড়ি অথচ কোনোটিকেই দেখা যায় না। যেমন দেখেছিলাম তাকে প্রথম প্রায় চল্লিশ বছর আগে প্রায় তেমনই সে দেখতে এখনও চেহারায়, স্বভাবে ও চরিত্রে।
দক্ষিণবঙ্গের মফস্বল এলাকার এই কলেজটিতে চাকরি পেয়ে আমি একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলাম না, আমার ইচ্ছে ছিল কলকাতার কোন এক কলেজ। সেই কারণেই চাকরি পেয়েও যোগ দিই নি এবং এই নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। শেষপর্যন্ত মায়ের পীড়াপীড়িতে কাজে যোগ দিলাম। কিন্তু প্রিন্সিপাল মল্লিকবাবুর কেন জানি না প্রথম থেকেই আমি অ্যাল্যার্জি হয়ে গেলাম। সেসময় ওই কলেজ ছিল ওই অঞ্চলের সেরা অশান্তির আখড়া। কলেজ তখন এমনিতেই সংখ্যায় বেশ কম, যে ক’টি কলেজ ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ওই কলেজ যেহেতু সেখানে অধ্যক্ষ ও টিচার এবং অফিস স্টাফদের মধ্যে বিচিত্র সব অশান্তি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা।
টিচারদের একদল প্রিন্সিপালের অনুগত, আরেকদল সাউবাবুর নেতৃত্বে প্রিন্সিপালকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। অন্যরা দু’পক্ষেরই মন রাখার চেষ্টায় থাকে, নিজেদের গা বাঁচাতে জেরবার হয়। অফিস স্টাফেদের মধ্যেও অনেক খেয়োখেয়ি, কিন্তু তারা প্রিন্সিপালেরই প্রিয়পাত্র আর টিচারদের বিরুদ্ধে সবসময় এককাট্টা। মল্লিকবাবু সব টিচারকেই বিদ্বেষের চোখে দেখেন, হাতে গোনা দু’-একজন ছাড়া। এই দু’-একজন সবসময় জো-হুজুর এবং টিচারদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তির কাজে নিযুক্ত। অফিস স্টাফদেরও প্রিন্সিপাল সদাসর্বদা টিচারদের পিছনে লাগিয়ে দেয়, উস্কে দেয় আর এতে তাদের অফুরন্ত উৎসাহ। প্রিন্সিপাল মল্লিকের মূল লক্ষ্য, ছলে-বলে-কৌশলে টিচারদের অপদস্থ করা ও দমিয়ে রাখা এবং তাঁর বিশ্বাস যে সব টিচারই ফাঁকিবাজ আর এই কারণেই টিচারগুলিকে সবসময় চাপে রাখতে হবে। এভাবেই মল্লিকবাবু তাঁর কলেজসম্রাজ্য চালাতে অভ্যস্ত ছিলেন। আক্ষরিক অর্থেই কলেজটাকে তিনি মনে করতেন তাঁর জমিদারি এবং কলেজের শিক্ষক ও অফিস স্টাফরা সব তাঁর প্রজা বা অধীনস্থ কর্মচারী। মুশকিল ছিল এই যে কলেজটা প্রতিষ্ঠা করেছিল তাঁর শ্বশুরমশাই এবং তিনি ছিলেন ফাউন্ডার প্রিন্সিপাল। প্রথমদিকের শিক্ষকদের চাকরি হয়েছিল কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এবং সাউবাবুও এভাবেই কলেজে ঢুকে মল্লিকবাবুর মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে ওঠেন। কলেজগুলোকে তারপর সরকার অধিগ্রহণ করে আর কলেজ সার্ভিস কমিশন শিক্ষকদের চাকরি দেওয়ার দায়িত্ব পায়, এ ব্যাপারটা কোনোদিনই মল্লিকবাবু মেনে নিতে বা বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি চাকরির শেষদিন পর্যন্ত কলেজটাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবতে অভ্যস্ত ছিলেন।
মল্লিকবাবু আর সাউবাবুর গুঁতোগুঁতিতে নিরপেক্ষ থাকার উপায় ছিল না করোও, না টিচারদের না অফিস স্টাফদের। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল অফিস স্টাফদের ভূমিকা, মল্লিকবাবু তাদের সবসময় টিচারদের পিছনে লাগিয়ে রাখতেন এবং এসব কাজে তারাও খুব আনন্দ পেত। তাদের অনেককেই আবার সাউবাবু নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং কখনও তারা সবাই তাঁর পক্ষে চলে যেত। আসলে সাউবাবুর অনেক চেনাশোনা, ক্ষমতা এবং সাহসও যথেষ্ট। মল্লিকবাবু তাঁর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে হামেশাই পিছু হটতে বাধ্য হতেন। অফিস স্টাফরা সুবিধেমত এদিক-ওদিক করত, একমাত্র টিচারদের নিন্দে করা বা টাইট দেওয়ার ক্ষেত্রে সব বিভেদ ভুলে তারা মল্লিকবাবুর ছাতার তলায় চলে যেত। এদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল জীবন সর্দার।
তার চাকরি কলেজের পিওন হিসেবে, কিন্তু কাজটা হয়ে গেছে একেবারেই অন্যরকম।কলেজে তাকে প্রায় দেখাই যায় না বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া। যদি গভর্নিং বডির সভা হয় তো তাকে দেখা যাবে সর্বক্ষণ ঘুর ঘুর করছে সভাস্থলের কাছে, মাননীয় সদস্যদের চা-টা বানিয়ে দিচ্ছে একটু পর পর, তাদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ও পরিবেশন করছে। এমন আরও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে অতিথি-অভ্যাগতদের আদর-আপ্যায়নের দায়িত্ব থাকে তার ওপর, তখন সে কলেজে উপস্থিত সর্বক্ষণ। আর অন্যান্য দিনে সকালে বাড়ি থেকে স্নান-খাওয়া সেরে সে চলে যায় কলকাতায় বা অন্যত্র, কলেজের কাজে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। কোথায় না যায় সে? বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপিআই অফিস, মহাকরণ, ট্রেজারি, ইউজিসি, ব্যাংক থেকে শুরু করে সর্বত্র, বাইরে কাঁহা কাঁহা মুল্লুকে কলেজ-সংক্রান্ত যত কাজ সব সামলাবার দায় তার। কলেজে তার আগমন ঘটে বাইরের কাজ বুঝে নিয়ে যাওয়ার জন্য বা কলেজে বাইরের কোন কাজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সেসব কাজের বৈচিত্র্য মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত। মাইনের বিল, টিচার বা অন্য স্টাফদের প্রোমোশন বা এরিয়ার সংক্রান্ত বিষয়, ছাত্রদের রেজিস্ট্রেশন বা অ্যাডমিট কার্ড বা রেজাল্ট ইত্যাদি ইত্যাদি।ডিপিআই অফিসের গলিঘুঁজি তার মুখস্থ, সে চেনে যেকোন বিভাগের যেকোন অফিসার বা ডিলিং স্টাফদের। তাদের খুশি রাখার জন্য সে বাড়ির ফলটা-সব্জিটা ভেট হিসেবে নিয়ে যায়, কলেজে একে বলে তাকে বলে নতুন বছরের ডায়েরি বা ক্যালেন্ডার কেনায় তাদের জন্য, কারণ সে জানে তাদের খুশি রাখতে পারলে কলেজ-সংক্রান্ত কাজগুলি সহজে হাসিল করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফদের ক্ষেত্রেও তাই করে। টিচাররা অনেকে আবার অভিযোগ জানিয়ে বলে যে সে ডেকে ডেকে কলেজে পরীক্ষাকেন্দ্র ও খাতা দেখার দায় নিয়ে আসে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে তাকে বকাবকিও করে। সে নীরবে শোনে, প্রতিবাদ করে না। তার সদাসর্বদা হাসিমুখ, কাউকে কটু কথা বলে না। কেউ তাকে ঝগড়া করতেও দেখে নি কখনও। যে তাকে যাই বলুক না কেন সে চুপ করে শোনে, মন্তব্য করে না। কারোও নিন্দেমন্দ করে না কখনো পিছনে, কারও সম্পর্কে তার কোন অভিযোগ নেই।
কলেজে কেউ তাকে বলে জীবন, কেউ জীবনবাবু , কেউবা জীবনদা। সে অফিস স্টাফদের নাম ধরে বা দাদা-টাদা বলে ডাকলেও টিচারদের ‘স্যার’ ছাড়া অন্য কিছু বলে না, সে তার ছেলে বা নাতির বয়সী হোক না কেন। টিচাররা বা অন্য স্টাফরা তাকে নিজেদের নানা কাজ সম্পর্কে বলে, ফিক্সেশন বা এরিয়ার বা প্রোমোশন বা পেনশন ইত্যাদি, বলে যাতে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বিষয়গুলি তাড়াতাড়ি মিটিয়ে আনা হয়। সে সবাইকে আশ্বাস দেয়, কারও অনুরোধই অগ্রাহ্য করে না এবং চেষ্টাও করে সেইমত যথাযথ জায়গায় আর এইসব তদবির-তদারকির আপডেটও দেয় সংশ্লিষ্ট টিচার বা অফিস স্টাফকে। সবচেয়ে বড়কথা, কাজগুলি সে সত্যিই হাসিল করে আনে। মল্লিকবাবু বা সাউবাবুর ঝগড়া-ঝাটি কলেজের সব্বাইকে জড়াতে পারলেও তাকে ছুঁতে পারে না, সে এই দু’জনের কাউকেই অমান্য না করলেও একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনকে কখনও কিছু বলে না, যতই প্ররোচনা থাকুক না কেন। প্রিন্সিপালের ঘরে সে সবসময় অবনতমস্তক, সটান দাঁড়িয়ে থাকে। টিচারদের ঘরে গেলেও সে কোনদিন চেয়ারে বসে না।অফিসে যদিওবা বসে, কোন টিচার গেলেই সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়।
কী যে দুর্ভাগ্য, মল্লিকবাবু প্রথম থেকেই ধরে নিলেন আমি সাউবাবুর দলভুক্ত। কেবলই মুখিয়ে থাকেন আমার খুঁত বার করার জন্য। টিচাররা সপ্তাহে একদিন অফ ডে নেয়। আমি নতুন বলে আমাকে সেই সুযোগ দিতে আপত্তি ছিল তাঁর। আমি প্রাপ্য ছুটি নিলেও তাঁর রাগ। তাঁর আবদার অনুযায়ী, সিএল নেওয়া আমার অনুচিত কাজ। একবার পরীক্ষা চলাকালীন আমার বেশ প্রিয় এক মাসি হঠাৎ মারা গেলে কিছুদিন অনুপস্থিত ছিলাম। দেখা হতে মল্লিকবাবু কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘মাসি মারা গিয়েছিল আমার।’ তাঁর সপাটে মন্তব্য, ‘মাসি মারা গেছে তো কী, তুমি তো মারা যাও নি? না জানিয়ে আসবেনা কেন?’ আমার মা যখন খুবই অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী তখন তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘তোমার মা অনেক পাপ করেছিল। তাই এই ফল।’
মল্লিকবাবু যত আমাকে দমাতে চাইতেন আমি তত তাঁর অবাধ্য হতাম, রাগে এবং ইচ্ছে করে। তখন আমি তরুণ, রক্ত টগবগ করে ফুটছে। যত পারতাম তাঁকে অগ্রাহ্য করতে চাইতাম, দেখি লোকটার কত দৌড়। আর এই কারণেই মাসে অন্তত একটা করে শোকজ লেটার সে পাঠাত আমাকে। জীবন সর্দারের হাত দিয়ে, আমার বাড়িতে। এই চিঠিগুলি দিত সে আমাকে অপরাধীর মত মুখ করে, আমার দিকে মুখ তুলে তাকাত না আর কোনক্রমে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পালিয়ে বাঁচত। একবার চিঠি দেওয়ার সময় সে আমাকে বিনীতভাবে বলেছিল, ‘কিছু মনে করবেন না স্যার। আমার দোষ নেবেন না। আমার উপায় নেই।’
মল্লিকবাবু অবসর নেওয়ার পর কলেজের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। সাউবাবু টিচার-ইন-চার্জ ওরফে প্রিন্সিপাল হয়ে বসলেন, তাঁর বিরুদ্ধপক্ষীয়রা মোহনবাবুকে প্রিন্সিপাল করে দিল। কলেজে দু’টো প্রিন্সিপাল, দু’টো অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার, আমাদের শ্যাম রাখি না কুল রাখি দশা। এমনই চরম পরিস্থিতি যে মাইনে বন্ধ হয়-হয়। কলেজে যাই চলুক না কেন, জীবন কিন্তু তার নিয়মিত কাজ বজায় রেখে গেল। ডিপিআই অফিস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিতে যাওয়া চলল তার যেমন চলত, দেখে মনে হত যেন অভ্যেসের বশে। কলেজে থাকলেও সে কোন পক্ষকে নিন্দেও করত না সমর্থনও করত না।
সাউবাবু তারপর রিটায়ার করে গেলেন। কলেজে প্রিন্সিপাল হয়ে এলেন পরেশবাবু। প্রশাসনিক কাজকর্ম একেবারেই বুঝতেন না তিনি, একদল পারিষদ জুটিয়ে নিলেন তাঁর হয়ে সবকিছু সামলাবার জন্য। পারিষদরা যা বলে তিনি তাই করেন। কখনো কোন এক বা একাধিক টিচারের ওপর অকারণে ক্ষুব্ধ হয়ে যান, একটু তোষামোদ করে কেউ কারো বিরুদ্ধে কিছু বললে কান পেতে শোনেন। টিচারে টিচারে, টিচার ও অফিস স্টাফদের মধ্যে নিত্য অশান্তি। একমাত্র জীবন সমস্তকিছুর বাইরে থেকে যেতে পারে, সে জড়ায় না কোনকিছুতে। কারো বিরুদ্ধে কিছু বলে না কাউকে, কারো পক্ষেও নয়। যেমন ছিল তেমনই থেকে যায়। প্রিন্সিপালের ঘরে গিয়ে একটানা দাঁড়িয়ে থাকে হুকুম শোনার জন্য, টিচার্স রুমে গিয়ে সব টিচারের সঙ্গেই যার যা দরকার তাকে তা জানায় এবং বসে না কখনও কোন চেয়ারে। আগেরই মত কলেজের চেয়ে বেশি সময় কাটায় সে কলকাতায় ও অন্যত্র কলেজের কাজ নিয়ে ঘোরাঘুরি করে।
এসব কিছুর বাইরেও জীবনের একটা অন্য পরিচয় আছে। সে তার বাড়ির কাছে বেশ কিছু লোককে নিয়ে একটা সমিতি তৈরি করেছে যাকে ভিত্তি করে চলে নানারকম সমাজকল্যাণমূলক কাজকর্ম। প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজো করে তারা আর সেই পুজোতে দরিদ্রদের জন্য কম্বল বিতরণ করা হয়। পুজোর আগে চাঁদার বই নিয়ে সে হাজির হয় কলেজে। ভক্তিতে বা বিরক্তিতে সবাই কিছু না কিছু দিতে বাধ্য হয়। জীবন দাবি করে না কিছু, যে যা দেয় হাসিমুখে নিয়ে নেয়। সে এমনিতেও খুব ভক্তিপ্রাণ ব্যক্তি। সারাবছরই নানা উৎসব ও নামগানের অনুষ্ঠান সে চালিয়েই যায় এবং তার জন্য মাইনের টাকা ছাড়াও কলেজ থেকে টাকা ধার করে। তার আরেকটি প্রধান উৎসব হয় জন্মাষ্টমীর সময়, মালসাভোগের আয়োজন করে সে। কলেজ থেকে যে যা দেয় তাই গ্রহণ করে বিগলিতভাবে। কোন অভিযোগ নেই তার। সদাখুশি সদাহাসি সে। একসময় খুব ভাল ফুটবল খেলত। আর এখন আছে এইসব পূজাপার্বণ আর কলেজের কাজকর্ম নিয়ে। বসে থাকে না একদণ্ড, সারাদিন চরকিপাক খেয়ে একটানা কাজ করে যাওয়াতেই তার আনন্দ। শত দুঃখকষ্টেও তার মুখের হাসি মুছে যায় না, শত প্ররোচনাতেও সে কারোর বিরুদ্ধে কাউকে কিছু বলে না। বাধ্য হলে শোনে চুপ করে, বলে না কিছুই। নিন্দুকরা হতাশ হয়ে পড়ে।
পরেশবাবুর আমলেই কলেজে রাজনৈতিক উৎপাত চরম রূপ নেয়। বহিরাগতরা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন দখল করে বসে, তাদের বাইরে থেকে চালায় এলাকার রাজনৈতিক দাদা। টিচারদের ওপর তাদের যত আক্রোশ। তারা নিয়মিত কলেজে আসে কিনা, ঠিকমত ক্লাসে যায় কিনা, পরীক্ষার ডিউটি যথাযথ পালন করে কিনা ইত্যাদি সবই তারা খবরদারি করে। টিচারদের কী করতে হবে বা হবে না সেই কোড অফ কন্ডাক্ট তারাই বানিয়ে দেয়। আর এসব কাজে অফিস স্টাফরা মনের আনন্দে তাদের তথ্য বিতরণ ও সহায়তা করতে থাকে। নিয়মিত প্রিন্সিপাল ও টিচারদের ঘেরাও করা, মূল গেটে তালা মেরে রাত পর্যন্ত আটকে রাখার সংস্কৃতি চালু হয়। কিন্তু অফিস স্টাফদের তারা কিছু বলে না, তাদের ঘেরাও-ও করে না। তাদের দেখি প্রকাশ্যেই সেই বহিরাগত দুর্বৃত্তদের পক্ষে কথা বলছে, তাদের হয়ে কাজ করছে। এদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম জীবন সর্দার। তার কোন যোগাযোগ বা মাখামাখি কোনোদিনও দেখতে পাওয়া যায়নি এসব দুষ্কৃতীদের সঙ্গে। সে কলেজেই থাকে না, বাইরে ঘুরে বেড়ায় কলেজের কাজ নিয়ে, আর কলেজে থাকলেও ওইসব দুর্বৃত্তদের ধারেকাছে যায় না। সে নিজেকে এমনই অকিঞ্চিৎকর করে রাখে যে তাকে কেউ পাত্তা দেয় না বা দেখতেই পায় না।
এই সময়েই পরেশবাবু অবসর নিলে প্রবাস থেকে প্রিয়নাথবাবু আসেন অধ্যক্ষ হয়ে। রাজনীতির উৎপাত চলতেই থাকে, অশান্তি ও বিরোধ কখনও মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। প্রিয়নাথ আমার সমবয়সী, একই রাজ্যে ছিল একসময়, আর এসব কারণে সে আমার বন্ধু হয়ে যায়। তার উৎসাহে হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও কলেজ ন্যাক অ্যাক্রিডেইটেড হয়। আমাকে সেখানে একটা ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল যেহেতু তার কথা ফেলার উপায় ছিল না আমার। পিয়ার টিমের পরিদর্শনের সময় জীবন তার স্বভাবমত পিছন থেকে নিজস্ব ভূমিকা পালন করে যায়। সে যে কী করছে বড় করে দেখা না গেলেও দেখি কিছু কিছু তুচ্ছ অথচ অপরিহার্য কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে, কারণ সেসব কাজের দায়িত্বে থাকে জীবন সর্দার। জীবনকে দেখতে পাওয়া যায় না, তাকে বোঝা যায় তার কাজ দিয়ে। কলেজের মাইনে ঠিক ঠিক পাওয়া যায়, কারোও পদোন্নতি বা বকেয়া টাকা আটকে থাকে না, ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট ও অ্যাডমিট কার্ড সময়মত কলেজে এসে যায়, নানা প্রকারের রেজিস্টার ও বিলবই বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার খাতা প্রয়োজনে উপস্থিত থাকে, পরিচালন সমিতির বাইরের ও ঘরের সদস্যরা মিটিং-এ হাজির হয়ে জানান যে যথাসময়ে চিঠি পেয়েছিলেন—- এসব দেখে সবাই বুঝি জীবন সর্দার কাজ করে চলেছে।
প্রিয়নাথবাবু অল্পদিন থেকেই তাঁর আগের জায়গায় ফিরে যান। শেষদিকে শস্ত্রুভাবাপন্ন ওই স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নির্বাচনে হেরে যায়, তাদের বহিরাগত কিছু নেতা নানা মামলায় ফেঁসে যায়, ইউনিয়নে আসে বন্ধুভাবাপন্ন দল। এবার টিআইসি হয়ে বসেন মুহুরীবাবু, তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কর্মদক্ষতা লেশমাত্র নেই। স্বভাবতই তিনি হয়ে যান কলের পুতুল, তাঁকে ঘিরে রাখে একদল পারিষদ। টিচারদের মধ্যে প্রবল খেয়োখেয়ি শুরু হয়ে যায়, দু’টো-তিনটে ক্লাসরুটিন চালু হয়, নিত্য হাঙ্গামা চলতেই থাকে। অফিস স্টাফদের সঙ্গে কিছু স্বার্থান্বেষী টিচারের অশুভ আঁতাত হয়, মুহুরীবাবু তাদের কথাতেই চলেন। অফিস স্টাফরা সুযোগ পেয়ে টিচারদের তাদের নিয়মে চালাতে চায়। এক দুঃসহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কিন্তু জীবন যেমন ছিল তেমনই থেকে যায়, সে তার নিয়মিত কাজ নিয়ে কলেজের বাইরেই পড়ে থাকে। তাকে কাজ দেওয়ার গরজ থাকে না মুহুরীবাবু ও তাঁর চালনাকারীদের, সে নিজের গরজে কাজ খুঁজে নিয়ে হাসিল করে আনার চেষ্টা চালায়। আমি তখন কলেজের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি, প্রিয়নাথবাবু আমাকে এই দায়িত্বগুলিতে অভিষিক্ত করে গিয়েছিলেন। কলেজের বড় একটা টাকা ইউজিসি-র কাছে পাওনা আছে, কারো কোন গরজ না থাকায় সে টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। জীবন ও অন্য দু’-একজন আমাকে তাড়া দিতে থাকে, যদি সে টাকা উদ্ধার করা যায়। জীবনের তাড়াতেই আমি উদ্বুদ্ধ হই, তারই উৎসাহে আমি ইউজিসি অফিসে যাই, অন্য কাজে অন্যান্য অফিসেও সে আমাকে নিয়ে যেতে থাকে। আমার গাড়িতেই যেতাম তাকে সঙ্গী করে। অনেক কথা হত তখন তার সঙ্গে আমার। কলেজের জন্য তার ভাবনা দেখে আমি অবাক হতাম। তার নিষ্ঠা, তার আন্তরিকতার পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে উঠত তার কথায়। মুহুরীবাবু ও তাঁর চালনাকারীদের বা অন্যান্য স্বার্থান্বেষী স্টাফদের কীর্তিকলাপগুলি উল্লেখ করে আমি যখন তাদের নিন্দে করছিলাম সে তাতে একবারও অংশগ্রহণ করেনি, চুপচাপ শুনেছিল আর বলেছিল, ‘যেতে দিন স্যার। যে যেমন ভাল বোঝে করুক। আমাদের যা কাজ আমরা করতে পারলেই হল।’
তারপর যে প্রিন্সিপাল হয়ে এল কলেজে সে আমার সহপাঠী, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঁচ বছরে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু সে পরিচয় বলেকয়ে গোপন রাখা হয়েছে কাজের সুবিধের জন্য, প্রকাশ্যে আমরা পরস্পরকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করি। জীবন সর্দার তার আমলে আরও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, রিটায়ার করার পরেও প্রিন্সিপাল তাকে ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে পুনর্বহাল করেছে। জীবনের কাজ আজকাল আরও বেড়ে গেছে। সে অন্যান্য কাজের সঙ্গে এখন বছরে কয়েকবার বিভিন্ন কলেজে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখা খাতা জমা দিয়ে আসে। কোভিডের সময় আমরা সব বাড়িতে বসে থেকেছি, জীবন ওই সময় এই বয়সেও নিয়মিত নানা অফিস ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করেছে। তার ছেলে সমরকে কয়েক বছর হল টিচারদের কাজের জন্য রাখা হয়েছে ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে। টিচার্স রুমেই তার থাকার কথা, কিন্তু সেই সমর অফিস থেকে প্রিন্সিপালের ঘরে যাবতীয় কাজ করে বেড়ায়। যেকোন কাজেই ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সেই সমর—- পরীক্ষার ডিউটি, খাতার বান্ডিল বানানো, জেরক্স করা, চা বানানো সব সব করবে ওই একমাত্র সমর। অন্যরা যে কী করে বা এত কাজ কেন কেবল সমরের জন্যই পড়ে থাকে সেই রহস্য কিছুতেই বুঝিনা।
প্রিন্সিপাল অবশ্য আমার সঙ্গে একান্ত আলোচনায় আজকাল প্রায়ই জানায়, ‘জীবনটা আর আগের মত নেই, জানিস। এঁড়ে হয়ে গেছে। নিজের ইচ্ছেমত চলে।’ আমি বলি, ‘তবুও ও অন্য অনেকের তুলনায় এখনও লয়্যাল, ডেডিকেটেড।’ প্রিন্সিপাল কিছুটা বিরক্তির গলায় বলে, ‘ওটা তুই ওপরে-ওপরে দেখছিস বলে মনে হচ্ছে। আমি তো কাজ করাই, আমি বুঝি। একটা কাজ করতে বললে অন্যটা করে বসে।’ আমি তবুও জীবনের পক্ষ নেওয়ার চেষ্টা চালাই, ‘আসলে বয়সও তো হয়ে গেছে অনেকটাই।’ প্রিন্সিপাল উত্তর দেয়, ‘না রে, বয়স না। আসলে আজকাল অন্যের কথা শুনে চলে।’ আমি বলি, ‘কিছুটা বাধ্যও হয়। পলিটিক্যাল একটা চাপ আছে, গ্রামাঞ্চলে যেটা প্রবল। কী করবে?’ প্রিন্সিপাল এবার অনিচ্ছাসত্বেও আমার কথাটা মেনে নেয়, ‘সেটা অবশ্য ঠিক।’
সেদিন অনেকদিন পর জীবন সর্দারের সঙ্গে দেখা হল। প্রিন্সিপাল তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল বলে এই আসা। বেশ কিছু টিচারের প্রোমোশনের ফাইল তৈরি হয়েছে। অবসর নেবেন এক টিচার, তাঁর সার্ভিস বুক ও পেনশন পেপার নিয়ে যেতে হবে। কিছু ফিক্সেশন পেপারের শুদ্ধিকরণ দরকার। এসব কাগজপত্র ও ফাইল নিয়ে জীবন যাবে কলকাতার অফিসে। তাকে সেসব বুঝিয়ে হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই ডেকে পাঠানো। আমরা অনেকেই আছি উপস্থিত, প্রিন্সিপাল তাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছিল। প্রিন্সিপালের টেবিলের পশে সটান দাঁড়িয়ে জীবন সব বুঝে নিল। সবকিছু মিটে যাওয়ার পর জীবন ঘরে থেকে গেল আরও কিছুক্ষণ। নানাজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল, এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল, ওই ঘরের মধ্যেই। আমি একসময় তাকে ধরে বললাম, ‘জীবনদা বসুন।’ বসলোনা কিছুতেই। আমারও জেদ চেপে গেল, বসাতেই হবে। তার ছেলে সমর পর্যন্ত দূরের টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে টানা জেরক্স করার সময়, সে কেন বসবে না? কিন্তু আমার সব জোরাজোরিই বিফল হল, জীবনকে বসাতে পারলাম না প্রিন্সিপালের ঘরের কোন চেয়ারে। একসময় সে আমাকে বেশ সিরিয়াস গলায় বলল, ‘এমন কাজ করতে বলবেন না স্যার। যেটা মেনে এসেছি চিরকাল আমাকে স্যার সেটাই মানতে দিন।’
আমার মুখে সমস্ত গল্পটা শুনল রিক্ত। আমরা বসেছিলাম অপরাহ্নবেলায় নির্জন একটি ঝিলের ধারে। হয়তো এখনকার মানুষ বলতে পারে তাকে ভেরি, বলুক, আমি ঝিলই বলব। ঝিল বললে প্রাণে যে পুলক ভাসে ভেরি বললে তার পুরোটাই বাষ্প হয়ে শুকিয়ে যায়। সারাজীবনে বুঝেছি শব্দের অসীম ক্ষমতা, তাই বৈদিক মুনি-ঋষিরা ‘শব্দব্রহ্ম’ কথাটি বলেছিলেন। কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণে মারামারি-খুনোখুনি হয়ে যায়, কিছু কিছু শব্দ নিশ্চিত মৃত্যুকে সরিয়ে দেয়। দেশ-বিদেশের কূটনীতিকদের সাফল্য-অসাফল্য নির্ভর করে শব্দের মারপ্যাঁচের ওপর। সাহিত্যিক বা কবিকে শব্দ ও তার ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া একেবারে অবশ্য পালনীয় কাজ। আমার কাছে ‘ভেরি’ তাই ‘ঝিল’। বিকেলকে ‘বিকেল’ বললেও চলত, তবে ‘অপরাহ্ন’ বললে আমার চোখে দেখছি তার গাম্ভীর্য বেশি হয়ে গেল। যাই হোক, পাহাড়টা খুঁজে পেলে ভাল হত, নেই তো কী করা যাবে! বহুতল বাড়িগুলি দেখছি পটভূমিকায়, কিন্তু কল্পনাশক্তি একশ শতাংশ উন্নীত করেও তাদের আকার-আকৃতি পাহাড় করা গেল না। আর খোলা প্রান্তর বা উপত্যকা? থাক, চাহিদা সীমাবদ্ধ রাখারই উপদেশ দিয়ে গেছেন বিজ্ঞজনেরা, সেটা মেনেই চলা উচিত, নাহলে অশান্তি বাড়বে।
রিক্ত বলল,
‘তাহলে তুই কী বলবি, এই জীবন সর্দারকে দেখে?’
‘বলব যে তাকে দেখে আমি খানিকটা হলেও অবাক হতে পারি আর এই অবাক হওয়াটা ইতিবাচক।’
আমি অকপটে উত্তর দিলাম। রিক্ত গাঢ় গলায় জানাল,
‘তাহলে এটাকেই তুই বলতে পারিস, উদ্বুদ্ধ হওয়া।’
‘হ্যাঁ, তা বলা যেতে পারে।’
‘তাহলে এখন থেকে এভাবেই দেখতে থাকবি লোকজনকে, দেখবি কার মধ্যে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মত কী কী উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। এমন দেখাটা যদি নিয়মিত অভ্যেসে পরিণত করে নিতে পারিস, একবারও যদি তার থেকে তোর বিচ্যুতি না ঘটে তো তোকে আর ঠিক মানুষ খুঁজে বেড়াতে হবে না। তুই নিজেই ঠিক মানুষ হয়ে যাবি।’
রিক্তর কথাটা আমার মাথার মধ্যে আলোড়ন তুলে দিল। আমি কেমন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
