কুন্তল দাশগুপ্ত

১.

শোনো বীতশোক, তুমি অনাহুত তা জানি, জানি তোমার অনিবার্য গতায়াত, কিন্তু তুমি ভুলেও আমার ঘরে এসো না। তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। আমি দু’হাতে আপন-পোড়া ছাই মেখে পাঁকাল-বাজার ধরতে চাইছি, যাতে নিজের মাংস কেটে বিক্রি করতে পারি। তোমার আশ্চর্য মলমের কারবার ফেঁদে বসলে না কোনোদিন! সবাইকে ইচ্ছেমতো মলম লাগিয়ে বেড়াও, অথচ… 

যাগ্গে, আমার-ছাই মাখা হাতে বাজার ধরতে পারছি না বটে তবে নাছোড় চেষ্টায় ছুটে চলেছি। আমার ফুসফুস ফেটে পড়ছে, হৃৎপিণ্ড তুমুলতার শীর্ষ ছুঁয়েছে, অস্থিসন্ধিগুলো গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে, শিরদাঁড়া ‌ঋজুতা হারিয়ে অনুভূমিক— হাঁটু ভেঙে প’ড়ে জান্তব হামাগুড়ি দিতে দিতে হাঁটু খুইয়ে হয়ে উঠছি ক্রমশ সরীসৃপ। 

আমার চোখের সামনে রুমালগুলো সব বিড়াল হয়ে গেল। তাদের কপিশ চোখ থেকে লালা ঝরতে ঝরতে চিটচিটে সমুদ্দুর। আমি বুকে হেঁটে হেঁটে যত ওপরে উঠছি তত বেড়ে চলেছে পতন সম্ভাবনা। আমার আকাশ ছোঁয়ার নেশা লেগেছে। আমি জানছি কিন্তু কিছুতেই স্বীকার করছি না আমার নিরালম্বতা। চোখের সামনে পুকুর, বন, পাহাড় সব চুরি যাচ্ছে। আমি বহুতলের সোনা বাঁধানো টয়লেটে বুক ঘসছি। সবাই অপরূপ হতে হুড়োহুড়ি করছে। বর্ণমালা লোপাট হয়ে বিবর্ণে ধ্বনিমালা গাঁথার অসুখ মহামারী হয়ে দখল নিচ্ছে মগজ। আমি টয়লেটের মার্বেল মেঝে খুঁড়ে মাটি তুলে আনতে গিয়ে রক্তাক্ত হচ্ছিলুম। 

জানো বীতশোক, আমার রক্ত-ভেজা চোখে ভেসে উঠল সেই মা-টির বাসন্তী বাহার যার হাসি-রোদ আমার ছুট-আকাশ ধুয়ে দিত। এই গতায়মান এপ্রিলে পাচ্ছি সেই চাহনি, যা না পড়লে কথাফুল ফুটতো না ভিতরের বাগানে। এখন তাকে তাই চোখে চোখে রাখি। দেখতে পাচ্ছি— তার শ্রীমণ্ডিত গ্রীবা, সবজে রঙা জংলা ছাপ শাড়ি, আশ্রয় মুদ্রা কিন্তু না ফেরার নৌকায় চলে যেতে যেতে আমার জন্যে শুধু রেখে গেল লবণ-জল… এই গতায়মান এপ্রিল আমাকে ব’লে যাচ্ছে মা-টি কাঁদছে: কিন্তু স্বীকার করছে না। আমি তার দুঃখ বুকে ক’রে পেরোতে চাই বাঁধের রাস্তা। তার অদৃশ্য অশ্রু আমার মরুঠোঁটে শুষে নিতে চাই। আমি বেশ বুঝতে পারছি তুমি তার কাছে গিয়েছিলে। তোমার আশ্চর্য মলম তাকে দিয়েছো। দয়া করো বীতশোক— তুমি ভুলে যাও আমাকে। আমাকে ভোর হতে দাও… 

চলে যাও বীতশোক… চলে যাও… যাও।

.

২.

অ্যায়…যাসনি সাপ আচে।

এমনিতেই সবকটা কেঁচো তার ওপরে পাড়াটে ধমকিতে কেন্নো হয়ে গেল মুহূর্তে। আট চোরা চোখে চোখে কথা খেলে যেতেই ধমকদারের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি কান ছুঁয়ে গেল— যাক বিটলে চারটে ভয়ে দৌড় দিয়েছে। টিপিনবেলা ইস্কুলের মাটে যত পারিস লাপাগে কারো কিচু বলার নেই। তা নয় ঝোপ হাঁটকানো। কবে কোনটাকে সাপে কাটে এইটেই ভয়। 

ধমকদার পিছু পিছু এলে দেখতে পেত চার জোড়া খালি পা বাঁধের রাস্তা থেকে নেমে পড়েছে ধান ক্ষেতে। চার জোড়া জুতো বাঁধের রাস্তার ধুলো মেখে টিফিন-টাইম শেষের ঘন্টা শোনার প্রতীক্ষায় পড়ে থাকে।

ঐ আল ধরে চ। সব থেকে সামনে থাকা সাড়ে তিন ফুটির কথা মান্য করে সকলে। 

মাটির দুধ খেইচিস বুবু? এই বুবুকে আশ্চর্য করতে সকলেই ভারি মজা পায়। বুবু আসলে বুবুন। ভর্তি হবার দিনেই সহপাঠিরা ‘ন’ বাদ দিয়ে বুবু ক’রে নিয়েছে। ও খুব সরল, সোজা কথায় বোকাসোকা। পালের গোদাটি মিহির। সেও ‘র’ বাদ দিয়ে মিহি হয়ে সর্বাগ্রে বিরাজ করছেন। 

ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ নাচিয়ে মিহির বলল— কী রে খাসনি তো? বুবুন ঘাড় নেড়ে না জানাতেই সকলে হি হি ক’রে হেসে উঠল। খুব লজ্জা করছিল বুবুনের। তার সহপাঠিরা যার স্বাদ নিয়েছে সে বিষয়ে সে জানেই না! নিজের অজ্ঞানতায় নিজের ওপর বিরক্ত হল বুবুন। 

আজ তোকে মাটির দুধ খাওয়াতেই নে এলুম— মিহিরের মুখে এমন একটা ভাব যেন বুবুনকে ও একটা রূপকথার দেশে নিয়ে চলেছে। মাটির দুধ! কেমন স্বাদ তার? কারা কীভাবে দোয়? তার বাড়িতে গরু আছে। মাসী দোয়। কারা মাটি দোয়? কৌতুহল চাপতে না পেরে বুবুন জিজ্ঞেস ক’রে ফেলে— মাটির দুধ কে দোয় রে? আবার হেসে ওঠে সবাই। বুবুন বোঝে তার বোকামিতে হাসছে ওরা। মিহির আঙুল দেখিয়ে বলে— ঐ ওরা। মিহিরের আঙুল নির্দেশ করছে মাঠে নিড়োচ্ছে যে চাষীরা তাদের দিকে দেখে বুবুনের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। পেছন থেকে বিভু বলে— ঐ মিহি, ক্যানো বুবুকে ওরম কচ্চিস। চ ক্ষেতে নামি। ও গুপীকাকা আমরা কজনে দুদ খেতে এইচি গো। 

লুঙ্গি গুড়িয়ে প্রায় কুঁচকি অব্দি তোলা, মাথায় গামছা জড়ানো গুপি কাকা যেন ভুস করে সবুজ সমুদ্দুর থেকে মাথা তুলল বলে মনে হল বুবুনের। জলা। সবুজ সাগর মনে মনে নাম দিয়েছে বুবুন। রোজ বাঁধের রাস্তা ধরে স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় রাস্তার দু-পাশারি এই জলা বুবুনের হাতছানি দেয়। ডুব দিতে ডাকে সবুজের ভিতর। আবার সবুজের হাতছানি ক্রমে সোনালী হয়ে যেন দুহাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। খুব খুব ইচ্ছে করে বুবুনের ছুটে যেতে, সারা গায়ে মেখে নিতে জলার আমেজ। জন্ম ভীতু সে। কানে বাজতে থাকে বড়মার স্বর— জলার তালগাছে একানড়ে থাকে। সে ছোট ছেলেদের কান কেটে নেয়। খবদ্দার জলায় নাববি না। 

সেই জলায় আজ সে এসেছে। সামনে মিহি, পেছনে শাবন, শাবনের পেছনে বিভু। নাঃ ভয় করছে না। অনেকদিনের সাধ পুরণের আনন্দে ভরপুর বুবুনের কানে কই বেজে ওঠেনি তো বড়মার গলা! 

বুজে খেয়ো বাবারা। গলায় ঝ্যানো খোসা আটকায়নি। গুপি কাকার কথায় চটকা ভাঙে বুবুনের। খোসা! দুধে খোসা! ব্যাপারটা কী? ততক্ষণে চারজনের দলটা নেমে পড়েছে ভুরভুরে কাদা মাটির ক্ষেতে। বুবুনের পা পুঁতে গেল গোছ অব্দি। শাবন পেছন থেকে না জড়িয়ে ধরলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত। 

ঐ মিহি বুবু ক্ষেত ঠেলতে পারবে না রে। ওব্যেস নেই তো। ও পুঁতে গেচে। 

পিছন থেকে বিভু বলে ওঠে — তুই ওকে জইরে ধত্থাক আমি এগ্গে যাই। তোদের দুজনের জন্যে দুমুটো নেসচি। চুক্করে ডাঁরা। কাদা ঠেলে এগোয় বিভু। 

ছড়া বাঁচচে তুলো বাবারা— চেয়ে কথাটুকু বলে গুপী কাকা ডুব দেয় সবুজ সাগরে। বুবুনের খুব ইচ্ছে করে গুপী কাকার সঙ্গে ঐরম ডুবে ডুবে নিড়োবে। আপাতত তা হচ্ছে না। শাবন চেপে ধ’রে আছে তাকে।

একবেরে নড়বিনি। চুক্করে দাঁড়া। শাবন ধমকায়। 

এদিকে বুবুনের বুক ফেটে যাচ্ছে কৌতুহলে। মুঠো ভরে দুধ আনবে বিভু আর মিহি? সামনে ওদের দেখাও তো যাচ্ছে না। পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে ওরা।

আচ্ছা বুবু বলতো বাপ কাক গুনোর সবচেয়ে দুক্খু কী?

জানি না। একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দেয় বুবুন। এটা ইয়ার্কি মারার সময়? বলে— ছাড় দেখি। এতো চেপে ধরেছিস দম নিতে পারছি না। হেসে গড়িয়ে পড়ে শাবন। ছেড়ে দেয়। বলে—  আমি তাইলে হাওয়া ধত্তে পারি বল?

কথাটা আর এগোয় না কারণ মিহির আর বিভুকে দুহাত মুঠো করে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।

নে তোরা হাত পাত, বিভুর কথায় হাত পাতে বুবুন শাবনও। মিহির বুবুনের হাতে মুঠো উপুর করলে বুবুন হতবাক। দুধ কই? এতো ধান, একদম কচি— সবুজ। মাটির দুধ কই? জিজ্ঞেস করে বুবুন।

ওর মোদ্দে আচে। মুকে ফেলে চিবো। কথাটা শুনে ঘাড় ঘুড়িয়ে শাবনের দিকে চায় বুবুন। চোখ বুজে শাবন ততক্ষণে চিবোতে শুরু করেছে। ওর দুই কষে দুধের দাগ। মুখে কী সুখ কী সুখ!

নে বুবু মুকে পুরে চিবো— মিহিরের কথা শেষ হবার আগেই বুবুন মুখে পুরে ফেলেছে মুঠো ভর কচি সবুজ ধান। আ-আ-আ-আঃ কী মিষ্টি! মুখ ভরে উঠল মিষ্টি রসে। কচি ধানের সাদা মিষ্টি রস দুধের বাড়া।

কি রে বুবু কেমন লাগছে মাটির দুদের টেস। শাবনের কথার উত্তর দিল না বুবুন। সে প্রাণ ভরে শুষে নিচ্ছিল মাটিদুধের স্বাদ।

ছিবড়েটা ফেলে দিবি বুবু। এখন চ ইস্কুলে। ঘন্টা পড়ার আগে হাত-ধুয়ে নে গেলে উঁমম্। শাবন ঘুঁসি দেখায়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর ক’রে রাস্তায় উঠে চারজনে জুতো হাতে দৌড় দেয়… 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *