কুন্তল দাশগুপ্ত
প্রথম পর্ব
১.
শোনো বীতশোক, তুমি অনাহুত তা জানি, জানি তোমার অনিবার্য গতায়াত, কিন্তু তুমি ভুলেও আমার ঘরে এসো না। তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। আমি দু’হাতে আপন-পোড়া ছাই মেখে পাঁকাল-বাজার ধরতে চাইছি, যাতে নিজের মাংস কেটে বিক্রি করতে পারি। তোমার আশ্চর্য মলমের কারবার ফেঁদে বসলে না কোনোদিন! সবাইকে ইচ্ছেমতো মলম লাগিয়ে বেড়াও, অথচ…
যাগ্গে, আমার-ছাই মাখা হাতে বাজার ধরতে পারছি না বটে তবে নাছোড় চেষ্টায় ছুটে চলেছি। আমার ফুসফুস ফেটে পড়ছে, হৃৎপিণ্ড তুমুলতার শীর্ষ ছুঁয়েছে, অস্থিসন্ধিগুলো গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে, শিরদাঁড়া ঋজুতা হারিয়ে অনুভূমিক— হাঁটু ভেঙে প’ড়ে জান্তব হামাগুড়ি দিতে দিতে হাঁটু খুইয়ে হয়ে উঠছি ক্রমশ সরীসৃপ।
আমার চোখের সামনে রুমালগুলো সব বিড়াল হয়ে গেল। তাদের কপিশ চোখ থেকে লালা ঝরতে ঝরতে চিটচিটে সমুদ্দুর। আমি বুকে হেঁটে হেঁটে যত ওপরে উঠছি তত বেড়ে চলেছে পতন সম্ভাবনা। আমার আকাশ ছোঁয়ার নেশা লেগেছে। আমি জানছি কিন্তু কিছুতেই স্বীকার করছি না আমার নিরালম্বতা। চোখের সামনে পুকুর, বন, পাহাড় সব চুরি যাচ্ছে। আমি বহুতলের সোনা বাঁধানো টয়লেটে বুক ঘসছি। সবাই অপরূপ হতে হুড়োহুড়ি করছে। বর্ণমালা লোপাট হয়ে বিবর্ণে ধ্বনিমালা গাঁথার অসুখ মহামারী হয়ে দখল নিচ্ছে মগজ। আমি টয়লেটের মার্বেল মেঝে খুঁড়ে মাটি তুলে আনতে গিয়ে রক্তাক্ত হচ্ছিলুম।
জানো বীতশোক, আমার রক্ত-ভেজা চোখে ভেসে উঠল সেই মা-টির বাসন্তী বাহার যার হাসি-রোদ আমার ছুট-আকাশ ধুয়ে দিত। এই গতায়মান এপ্রিলে পাচ্ছি সেই চাহনি, যা না পড়লে কথাফুল ফুটতো না ভিতরের বাগানে। এখন তাকে তাই চোখে চোখে রাখি। দেখতে পাচ্ছি— তার শ্রীমণ্ডিত গ্রীবা, সবজে রঙা জংলা ছাপ শাড়ি, আশ্রয় মুদ্রা কিন্তু না ফেরার নৌকায় চলে যেতে যেতে আমার জন্যে শুধু রেখে গেল লবণ-জল… এই গতায়মান এপ্রিল আমাকে ব’লে যাচ্ছে মা-টি কাঁদছে: কিন্তু স্বীকার করছে না। আমি তার দুঃখ বুকে ক’রে পেরোতে চাই বাঁধের রাস্তা। তার অদৃশ্য অশ্রু আমার মরুঠোঁটে শুষে নিতে চাই। আমি বেশ বুঝতে পারছি তুমি তার কাছে গিয়েছিলে। তোমার আশ্চর্য মলম তাকে দিয়েছো। দয়া করো বীতশোক— তুমি ভুলে যাও আমাকে। আমাকে ভোর হতে দাও…
চলে যাও বীতশোক… চলে যাও… যাও।
.
২.
অ্যায়…যাসনি সাপ আচে।
এমনিতেই সবকটা কেঁচো তার ওপরে পাড়াটে ধমকিতে কেন্নো হয়ে গেল মুহূর্তে। আট চোরা চোখে চোখে কথা খেলে যেতেই ধমকদারের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি কান ছুঁয়ে গেল— যাক বিটলে চারটে ভয়ে দৌড় দিয়েছে। টিপিনবেলা ইস্কুলের মাটে যত পারিস লাপাগে কারো কিচু বলার নেই। তা নয় ঝোপ হাঁটকানো। কবে কোনটাকে সাপে কাটে এইটেই ভয়।
ধমকদার পিছু পিছু এলে দেখতে পেত চার জোড়া খালি পা বাঁধের রাস্তা থেকে নেমে পড়েছে ধান ক্ষেতে। চার জোড়া জুতো বাঁধের রাস্তার ধুলো মেখে টিফিন-টাইম শেষের ঘন্টা শোনার প্রতীক্ষায় পড়ে থাকে।
ঐ আল ধরে চ। সব থেকে সামনে থাকা সাড়ে তিন ফুটির কথা মান্য করে সকলে।
মাটির দুধ খেইচিস বুবু? এই বুবুকে আশ্চর্য করতে সকলেই ভারি মজা পায়। বুবু আসলে বুবুন। ভর্তি হবার দিনেই সহপাঠিরা ‘ন’ বাদ দিয়ে বুবু ক’রে নিয়েছে। ও খুব সরল, সোজা কথায় বোকাসোকা। পালের গোদাটি মিহির। সেও ‘র’ বাদ দিয়ে মিহি হয়ে সর্বাগ্রে বিরাজ করছেন।
ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ নাচিয়ে মিহির বলল— কী রে খাসনি তো? বুবুন ঘাড় নেড়ে না জানাতেই সকলে হি হি ক’রে হেসে উঠল। খুব লজ্জা করছিল বুবুনের। তার সহপাঠিরা যার স্বাদ নিয়েছে সে বিষয়ে সে জানেই না! নিজের অজ্ঞানতায় নিজের ওপর বিরক্ত হল বুবুন।
আজ তোকে মাটির দুধ খাওয়াতেই নে এলুম— মিহিরের মুখে এমন একটা ভাব যেন বুবুনকে ও একটা রূপকথার দেশে নিয়ে চলেছে। মাটির দুধ! কেমন স্বাদ তার? কারা কীভাবে দোয়? তার বাড়িতে গরু আছে। মাসী দোয়। কারা মাটি দোয়? কৌতুহল চাপতে না পেরে বুবুন জিজ্ঞেস ক’রে ফেলে— মাটির দুধ কে দোয় রে? আবার হেসে ওঠে সবাই। বুবুন বোঝে তার বোকামিতে হাসছে ওরা। মিহির আঙুল দেখিয়ে বলে— ঐ ওরা। মিহিরের আঙুল নির্দেশ করছে মাঠে নিড়োচ্ছে যে চাষীরা তাদের দিকে দেখে বুবুনের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। পেছন থেকে বিভু বলে— ঐ মিহি, ক্যানো বুবুকে ওরম কচ্চিস। চ ক্ষেতে নামি। ও গুপীকাকা আমরা কজনে দুদ খেতে এইচি গো।
লুঙ্গি গুড়িয়ে প্রায় কুঁচকি অব্দি তোলা, মাথায় গামছা জড়ানো গুপি কাকা যেন ভুস করে সবুজ সমুদ্দুর থেকে মাথা তুলল বলে মনে হল বুবুনের। জলা। সবুজ সাগর মনে মনে নাম দিয়েছে বুবুন। রোজ বাঁধের রাস্তা ধরে স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় রাস্তার দু-পাশারি এই জলা বুবুনের হাতছানি দেয়। ডুব দিতে ডাকে সবুজের ভিতর। আবার সবুজের হাতছানি ক্রমে সোনালী হয়ে যেন দুহাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। খুব খুব ইচ্ছে করে বুবুনের ছুটে যেতে, সারা গায়ে মেখে নিতে জলার আমেজ। জন্ম ভীতু সে। কানে বাজতে থাকে বড়মার স্বর— জলার তালগাছে একানড়ে থাকে। সে ছোট ছেলেদের কান কেটে নেয়। খবদ্দার জলায় নাববি না।
সেই জলায় আজ সে এসেছে। সামনে মিহি, পেছনে শাবন, শাবনের পেছনে বিভু। নাঃ ভয় করছে না। অনেকদিনের সাধ পুরণের আনন্দে ভরপুর বুবুনের কানে কই বেজে ওঠেনি তো বড়মার গলা!
বুজে খেয়ো বাবারা। গলায় ঝ্যানো খোসা আটকায়নি। গুপি কাকার কথায় চটকা ভাঙে বুবুনের। খোসা! দুধে খোসা! ব্যাপারটা কী? ততক্ষণে চারজনের দলটা নেমে পড়েছে ভুরভুরে কাদা মাটির ক্ষেতে। বুবুনের পা পুঁতে গেল গোছ অব্দি। শাবন পেছন থেকে না জড়িয়ে ধরলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত।
ঐ মিহি বুবু ক্ষেত ঠেলতে পারবে না রে। ওব্যেস নেই তো। ও পুঁতে গেচে।
পিছন থেকে বিভু বলে ওঠে — তুই ওকে জইরে ধত্থাক আমি এগ্গে যাই। তোদের দুজনের জন্যে দুমুটো নেসচি। চুক্করে ডাঁরা। কাদা ঠেলে এগোয় বিভু।
ছড়া বাঁচচে তুলো বাবারা— চেয়ে কথাটুকু বলে গুপী কাকা ডুব দেয় সবুজ সাগরে। বুবুনের খুব ইচ্ছে করে গুপী কাকার সঙ্গে ঐরম ডুবে ডুবে নিড়োবে। আপাতত তা হচ্ছে না। শাবন চেপে ধ’রে আছে তাকে।
একবেরে নড়বিনি। চুক্করে দাঁড়া। শাবন ধমকায়।
এদিকে বুবুনের বুক ফেটে যাচ্ছে কৌতুহলে। মুঠো ভরে দুধ আনবে বিভু আর মিহি? সামনে ওদের দেখাও তো যাচ্ছে না। পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে ওরা।
আচ্ছা বুবু বলতো বাপ কাক গুনোর সবচেয়ে দুক্খু কী?
জানি না। একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দেয় বুবুন। এটা ইয়ার্কি মারার সময়? বলে— ছাড় দেখি। এতো চেপে ধরেছিস দম নিতে পারছি না। হেসে গড়িয়ে পড়ে শাবন। ছেড়ে দেয়। বলে— আমি তাইলে হাওয়া ধত্তে পারি বল?
কথাটা আর এগোয় না কারণ মিহির আর বিভুকে দুহাত মুঠো করে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।
নে তোরা হাত পাত, বিভুর কথায় হাত পাতে বুবুন শাবনও। মিহির বুবুনের হাতে মুঠো উপুর করলে বুবুন হতবাক। দুধ কই? এতো ধান, একদম কচি— সবুজ। মাটির দুধ কই? জিজ্ঞেস করে বুবুন।
ওর মোদ্দে আচে। মুকে ফেলে চিবো। কথাটা শুনে ঘাড় ঘুড়িয়ে শাবনের দিকে চায় বুবুন। চোখ বুজে শাবন ততক্ষণে চিবোতে শুরু করেছে। ওর দুই কষে দুধের দাগ। মুখে কী সুখ কী সুখ!
নে বুবু মুকে পুরে চিবো— মিহিরের কথা শেষ হবার আগেই বুবুন মুখে পুরে ফেলেছে মুঠো ভর কচি সবুজ ধান। আ-আ-আ-আঃ কী মিষ্টি! মুখ ভরে উঠল মিষ্টি রসে। কচি ধানের সাদা মিষ্টি রস দুধের বাড়া।
কি রে বুবু কেমন লাগছে মাটির দুদের টেস। শাবনের কথার উত্তর দিল না বুবুন। সে প্রাণ ভরে শুষে নিচ্ছিল মাটিদুধের স্বাদ।
ছিবড়েটা ফেলে দিবি বুবু। এখন চ ইস্কুলে। ঘন্টা পড়ার আগে হাত-ধুয়ে নে গেলে উঁমম্। শাবন ঘুঁসি দেখায়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর ক’রে রাস্তায় উঠে চারজনে জুতো হাতে দৌড় দেয়…
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
দ্বিতীয় পর্ব
৩. লুকোচুরি
– ও মা… কে বলে মলিন! নতমুখী কাজরী মাথা নামিয়ে রেখেই চোখ তুলল। প্রৌঢ়া। মাথায় নুন-মরিচ কদম-ছাঁট। পাকা চাঁপা কলার মত সোনালী-ফর্সা। মুখ তুলল কাজরী। ততক্ষণে প্রৌঢ়ার কথায় হাসির ঢেউ উঠেছে ঘরে। চোখাচোখি হতেই ‘মম’-এর ‘সালভাদর’-এ পড়া কেয়ারফ্রি-আইজ-এর খোঁজ এতদিনে পেয়ে গেল সে। মনে মনে বলল সুন্দরী।
ও ঠাগমা… চিকন স্বর, সুরেলা… গান শেখে? যদি শেখে তবে… মনের আন্দোলন চাপা পড়ে যায়… ডে লাইটের আলোয় তোমার চোকে ধাঁদা নেগেছে কাল দিনের আলোয় দেকো বুজতে পারবে… দপ করে নিভে গেল মগজে জ্বলে ওঠা ক্ষীণ শিখাটি… এ কী অমার্জিত ভাষা-ভঙ্গি! আবাল্য শহর-বাসে অভ্যস্ত শ্রবণ অযুত ঝিঁঝিঁ ডাকে রূদ্ধ হয়ে পড়ল কাজরীর, জলে ভরে এল চোখ
কতবার বলেছি এগুলো পেট্রোম্যাক্স তাও সেই ডে-লাইট বললি? ভিড় থেকে ব্যারিটোন। কেমন শিহর জাগল। বুজে এল চোখ। মরা ক্যানভাসে 1950-এর আমহার্স্ট স্ট্রিট। বাদুর ঝোলা অন্ধকার ঘর ক্লান্ত ব্যারিটোন প্রত্যাশী। দাদা। অকূলের কূল। শরীরটা কেমন অস্থির লাগে কাজরীর।
তোরা থাম বাপু। এই মেয়ে জোরে জোরে হাওয়া কর। ভির পাতলা কর তো একটু… নতুন বৌ কেমন ঘামছে দেখেছিস। তোদের রঙ্গ পরে করিস বাপু। প্রৌঢ়ার অভিজ্ঞ অনুভূতির পায়ে অদৃশ্য প্রণাম জানিয়ে চোখে এক পৃথিবী কৃতজ্ঞতা ভরে মুখ তুলে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল কাজরী। হ্যাঁ চাইলই— বাৎসল্য। কেয়ার ফ্রি আই যুগলে ঝিকমিক করছে হাসি। পাশে রাখা রেকাবি থেকে ধান-দূর্বা নিয়ে আশির্বাদ করে কাজরির হাতে ছোট্ট একটা বাক্স দিয়ে বললেন— নাক বিঁধিয়ে নিও বৌমা। কাজরী জবাব লুকোলো শরীরী মুদ্রায়। সে বুঝে গেছে এমন লুকোচুরি খেলে যেতে হবে তাকে পরবর্তী কত বছর কে জানে।
প্রথার নির্মন গণ-মান্যতা থেকে রেহাই পেতে পেতে সাত-সন্ধে। ঘর পেল কাজরী, পেল পোশাক পাল্টানো পরিসর। দ্রুত দ্রষ্টব্যের কর্কশতা থেকে নিজেকে কেড়ে এনে নগ্ন তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে একটা পিতলের জগ, পাশে উপুর ক’রে রাখা কাঁসার গ্লাস। এই হ্যারিকেন আলো-ছায়াতেও ঝকঝক করছে। পরপর দু’গ্লাস জল মরুভূমির মত শুষে নিয়ে নিজেকে বিছিয়ে দিল সে তক্তপোষের বিছানায়। ঘাম প্রতিটি রোম-কূপ থেকে বার করে আনছিল দেহ-মনের তপ্ততার প্রতিষেধক। বেশ কিছুক্ষণ গলগল করে ঘামার পর কাজরীর শরীর ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে শুরু করল। গুরুজীর কণ্ঠস্বর অধিকার করে নিল শ্রবণ— শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই-ই সয়…
কাজু কী খেয়ে এসেছ? কী হল মুখে কথা নেই কেন?
আর কেন! কাজু মানে কাজরী তখন মনে মনে বলছে— হে ধরণী দ্বিধা হও।
স্কুলে টিফিন করোনি? দু’বিনুনীর কাজু আখড়া মুখর হাসির রোল শুনতে না পেয়ে এবার মুখ তুলল। গুরুজীর দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে না জানাল।
কেন?
মা-র শরীর খারাপ রান্না করতে পারেনি।
সে কী! তার মানে সকাল থেকে এই বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তুমি এম্টি স্টম্যাক! হাউ হরিবল! ঐ জন্যই তোমার পেটে চাপ পড়তে অমন সশব্দে উইন্ড পাস। বুঝেছি। অশেষ… প্র্যাকটিস পরে হবে আগে যাও রুটি-সবজি আর একটা করে ডিম সিদ্ধ ব্যবস্থা করো। রেজিস্টার কার কাছে? দাও তো। হুঁ। অশেষ তুমি একশোটা লাল আটার রুটি, পরিমান মতো সবজী আর তিরিশ টা ফুল বয়েল্ড ডিমের অর্ডার দিয়ে এসো গবার হোটেলে। আর কাজু তুমি ম্যাট পেতে পবনমুক্তাসন করো। খাবার খেয়ে আজ ছুটি করবে দাদাকে দেখা করতে বলবে। সকলে প্র্যাকটিসে শুরু করো…
কাজরীর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। গুরুজী। আচার্য বিষ্ণু চরণ ঘোষ। আপনা-আপনি দু’হাতের ঝিনুক মুদ্রা চন্দন-আঁকা কপাল ছুঁল। তক্তোপোষ থেকে নেমে এতক্ষণে আড়ষ্ট শরীরটাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার জন্য কয়েকটা ফ্রি-হ্যান্ড করে আর্চ করতে দু’পায়ে ভর রেখে শরীরটা পিছনে বেঁকিয়ে মাটি ছোঁওয়ার আগেই স্প্রিং-এর মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কাজরী। বসে পড়ে তক্তপোষে। মাথা নীচু। প্রতিটি দেহ-রেখায় ফুটে উঠতে থাকে প্রার্থিত ক্ষমা।
ও বৌদি… বৌদি…
ছোট ননদের গলা। বেশিক্ষণ এই ব্যস্ত-বাড়ি তাকে নিজের সঙ্গে থাকতে দেবে না জানে কাজরী। হ্যারিকেন-আঁধারির নম্রতা তাকে আরামে রেখেছিল। কৃষ্ণতা তাপশোষী। জেনেছে সে। স্কুলে পড়িয়েছিলেন শ্যামবাবু স্যার কিন্তু নাঃ অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, ডাক পড়েছে পেট্রোম্যাক্সের অবাঞ্ছিত ঔজ্জ্বল্যে লুকোচুরির বেলায়। শ্বশুর-বাড়ি বুঝি সেই ঝোপ-ঝাড় যেখানে নিজেকে লুকোতে লুকোতে কবে যেন চুরি হয়ে যায় মেয়ে-মানুষের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ। হ্যারিকেনের অকম্প অথচ ম্রিয়মান আলোর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ানো কাজরী দেওয়ালে গড়ে ওঠা নিজের বিপুল ছায়ার মুখোমুখি অবস্থান থেকে ক্লান্ত স্বরে সাড়া দিল— যাই।
তাড়াতাড়ি নাও। কতক্ষণ লাগে তোমার চেঞ্জ করতে?
স্পষ্ট বিরক্তি ছোট ননদের গলায়। প্রতিটি মানুষই কি “আমাকে দেখুন” শ্রেণির? মাথায় এই চিন্তাটা ভর করতেই হেসে ফেলে কাজরী। সেও কি তাই-ই নয়। নিজের ক্লান্তি, অপরিচয়ের অস্বাচ্ছন্দ্য কে সে যেমন প্রাধান্য দিচ্ছে তেমন-ই ছোট ননদও তাকে ডাকতে আসার বিরক্তিকে…
সঙ্গে আসা ট্রাঙ্ক থেকে পছন্দ ক’রে আটপৌরের নরমে নিজেকে দ্রুত জড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে এল কাজরী। নাঃ, তার জন্য কেউ অপেক্ষা ক’রে নেই। দুহাতে তোয়ালের নরমটুকু আঁকড়ে অচেনা কাঠিন্যে আঁচড় কাটতে চাইছিল কাজরী। চন্দন চর্চা ঘোচাতে তার জল আর আড়াল চাই এখন কিন্তু…
এটা বাড়ির পিছন দিক। পশ্চিম মুখো বাড়ি। পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা ঢুকে তবে উঠোন। পালকি ক’রে বড়রাস্তা থেকে তাকে আনা হয়েছে। গ্রাম ঝেঁটিয়ে বউ-ঝিরা তাকে দেখতে কাঁচা রাস্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। পালকি থেকে নামতে নামতেই সে দেখেছিল ডুবন্ত সূর্যের মুখোমুখি বাড়ির সদর। এ তবে পূব, টানা বারান্দায় দুটো পেট্রোম্যাক্স একলা। তার জন্য বরাদ্দ ঘর বারান্দার উত্তর প্রান্তে। এই ঘরের দেয়াল সংলগ্ন আরেকটা ঘর রয়েছে কিন্তু বাড়ির মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। ভেতরে বোধয় কুপি জ্বলছে। কাঁপছে আলোটা জানলার ফাঁকে। বাড়ির এই অংশ নির্জন। সময় পেরচ্ছে নীরবে নাকি অরবে অনুভব করতে চেষ্টা করে কাজরী। পায়ে পায়ে এগোয় বারান্দা থেকে নীচু কেমন যেন দুঃখী মতোন টালি ছাওয়া ঘরটার ডাকে। দরজা জাত কাঠের নয়। দরজার প্রসাধন বাহারের সুর-সাধন থেকে বহু দূরে। ব্ল্যাকজাপান নাকি আলকাতরা বুঝতে পারল না সে তবে মনটা ভারি কেমন কেমন ক’রে উঠল যেমন ক’রে উঠত পথে পড়ে থাকা আহত কুকুর ছানা দেখে, উঁচু ভেন্টিলেটার থেকে ক্লাস রুমের মেঝেতে আছড়ে পড়া কাঠবিড়লীর ছানা দেখে… ভারি সন্তর্পণে বন্ধ কালো দরজার গায়ে গাল ঠেকিয়ে রাখল কাজরী। যেন অনুমতি চাইছিল প্রবেশের। তার বোধ ছুঁয়ে দিল ঘর। আলতো ভাবে চাপ দিল সে দরজায় যেভাবে সদ্যোজাত সন্তানকে বুকে জড়ান জননী। একটু খানি মুখ দেখাল ঘর তার কালো ঘোমটা সরিয়ে। এই এই-ই তার যৌবনের উপবন… বার্ধক্যের বারানসী… ঘোমটা ফেলে সেই যজ্ঞ-গৃহ বুকে জড়িয়ে নিল কাজরীকে। বেশ কিছুক্ষণ এই ঘরের সঙ্গে অরবে কথা বলে যেতে লাগল কাজরী।
ও নতুন বৌ তুমি ভয় পাচ্ছ?
না তো।
তবে চুপটি করে এক কোণে জড়োসড়ো কেন?
কই, এই তো তোমার বুকের ওপর মুখ রেখেছি… পাশাপাশি দুটো উনুন। একটা কয়লার একটা কাঠের জ্বালের। সুন্দর ক’রে নিকোনো। উনুন দুটিকে কোনো ভরন্ত নারীর দুধে ভরা স্তনের মত মনে হয়েছে কাজরীর। চোখ বুজে এক উনুনের গায়ে গাল ঠেকিয়ে শিশু যেমন মায়ের অপর স্তনে হাত রাখে তেমন ক’রে হাত বোলাতে বোলাতে কাজরী বিড়বিড় করছিল মা… মা… মা… মাও যেন সন্তানের এই সমর্পণে ভারি খুশি হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে…
কাজরীর একটু সময় লাগল বুঝতে যে এ হাসি নিতান্তই পার্থিব সত্য। হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ভাসুরঝি কে দেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় কাজরী।
ও কী কচ্ছিলে কাকিমণি? আমি তোমার ঘরে গিয়ে তোমায় না দেকতে পেয়ে সারা বাড়ি চক্কর কেটে এলুম। শেষে রান্নাঘরে তুমি!চল চল মা ডাকচে
আমায় একটু বাথরুমে যেতে হবে— এই বলে নিজের মুখমণ্ডলের দিকে নির্দেশ ক’রে তর্জনী ঘোরাল কাজরী।
হ্যাঁ তাই তো! ছোটোপিসিকে মা যে পাঠাল তোমাকে বাথরুম নিয়ে যেতে! আসেনি?
এসেছিলেন… তবে দরজা খুলে তাঁকে দেখতে পাইনি
রোসো হচ্ছে।
না না কিছু বোলো না। অশান্তি কোরো না।
সে দেখা যাবে। এখন চলো তো। ঐ দিকে কলপাড়ে বাথরুম।
যে দিক নির্দিষ্ট হল সে দিকে অন্ধকার। অন্ধকার তাপশোষী।
কুপি হাতে পথ দেখানিয়ার পিছু পিছু যেতে যেতে অরবে সুর ভাঁজছিল কাজরী— ওগো পথ-দেখানিয়া তোমায় গান শোনাব…
মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে…
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
তৃতীয় পর্ব
৪. কালিন্দির-ই ঘাটে আইস
দুর্গা-দালানের দু’ধারে নারকেল গাছের সারি। গুনে দেখেছে সুকান্তি। মুখুজ্জে ভিটেতে পা রাখার প্রথম দিনেই গুনেছিল। মোট ষোলোটা। কেমন ভেতর থেকে নাড়া খেয়েছিল সে।
তাহলে এলে।
বাতাস ফিসফিসিয়েছিল।
এদেশে আসার ষোলতম বছরে এই ষোলোটা নারকেল গাছ এক সঙ্গে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করেছিল হঠাৎ ওঠা একটা হাওয়ায়।
সামনে নোনা ধরা ইঁটের প্রত্ন-প্রাচীন দুর্গা-দালান। সাধন-পীঠ, দুর্গাদাস ঠাকুরের। একজন উদ্বাস্তু মানুষ এই ভিটেতে এলে এত মন ভালো করা রোদ্দুর ওঠে! মায়াগ্রামে তারা সপ্তকে বাজতে থাকে তীব্র ঝালা! ঘুলঘুলিতে পায়রা-বাসা কেঁপে কেঁপে ওঠে! কেন এই বিভ্রম? সুকান্তি খুঁজে ফেরে নিজের মনন-ঘুঁজির অন্ধকার। এত থোপা থোপা অন্ধকার জমে আছে! এত কথা বলায় সে নিজের সঙ্গে অনর্গল! অনর্গল? না তো সুকান্তি বেশ জানে সে নিজের কাছ থেকে নিজেকে লুকোয় প্রতিটি নির্জনতায়। বিষম হৈচৈ আর মেকি ব্যস্ততার আগুনে নিজেকে পোড়াতে থাকে অগ্নিশুদ্ধ হতে চেয়ে। পঁয়তাল্লিশ সালের অগ্নিপথ দিয়েই তাদের অগ্নিদগ্ধ দৌড় দেখছিল যশোর রোডের দুপাশের বিপুল বৃক্ষ-শ্রেণী…
তাইলে সোনাদা শুরু করি?
সম্বিৎ ফেরে সুকান্তির। পুষ্কর। কাঁধে পাটের মোটা দড়ি গোল করে গুটিয়ে ঝোলানো। হাতে ধারাল হেঁসো। মাথায় আর কোমরে গামছা বাঁধা। পরণে লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে পরা এমন ভাবে যে পাছা প্রায় দৃশ্যমান।
হ্যাঁ। সবকটা গাছ ছাড়াতে পারবি? এতটা দেরি করলি কেন?
তুমি না এলে গাছে চড়তে না কল্লে তো বৌদি।
বৌদি… মধুজা। নামটা অরবে উচ্চারিত হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফুসফুস নিংড়ে বেরিয়ে এল। প্রতিবর্ত ক্রিয়া। মগজ জানে না তবু… কত কিছু যে ঘটে যায় এভাবে… মানুষের কৃত তবু মানুষের নয়। সৃষ্টির গাঢ় আঁতুরে মগজ কি কাজ করে? মগজ কী কাজ করে? তবে কেন অতৃপ্তির অসহ্য আঁধি স্রষ্টাকে গ্রাস করে? অপারগতার যন্ত্রণা অশেষ হয়? মানুষ আবার… আবার… আবারও খুঁড়তে থাকে… ভাঙতে থাকে নিজেকে। আপনাকে জানা মানুষের কখনো ফুরোয় না… আকাশের দিকে চোখ বুঁজে তাকিয়ে এই সব ভাবনার সঙ্গে মানসাঙ্ক কষতে কষতে নিতান্ত অবহেলায় চোখ মেলল সুকান্তি। গাছ বাইছে পুষ্কর। এই ছবিটা দেখেই হাসি লুকোতে জিভ কামড়ে ধরল সে… সমতট… বাপরে, কী ডানপিটে ছেলে… আরেঃ কত্ত ডাব খাবি? মোর মামাগো বাগান আসে না! তোগো লয়া যামুআনে।
হেই… তাইলে তো দ্যাশ ছাইড়া যাতি অয়।
ক্যান?
হেই দিন যে সাররে কলি মামাবাড়ি যাইসিলি হের লগে কামাই করছস। আর মুই জিগাইতে কলি বিদ্যাশ। তাইলে তর মামাবাড়ি বিদ্যাশে হইল কিনা?
আইরে বোহা পোলা… বাড়ি লয়া তো যামু না, যামু তো বাগানে। হেইডা তো আমাগো শঙ্খ জলায়…
শঙ্খ জলার বুক এতদিনে নির্ঘাৎ নরম নেই আর। কী বিপুল শরের জঙ্গল। কত যে দুপুর কেটেছে ঐ জলার ধারে… সেভেন প্যারাডাইস… অম্বুরি তামাকের সুগন্ধ… ভাবছিল সুকান্তি— উই ওয়্যার সেভেন, চোখ বুজে গভীর শ্বাস টানল সে… বাতাস ভাগ করা যায় না, যায়ওনি… ভূতবায়ু তার সবটুকু গন্ধনিয়ে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের দখল নেয়… মুখশ্রী জ্বলে ওঠে অপার্থিব আলোয়…
হাই আল্লা এ যে নিয়ামত চাচার বাগান! নিয়ামত চাচায় তর মামা অয় ক্যামনে?
আরেঃ জানস না? মোর বাপে অয় সম্বুন্ধি ডাহে তয় মুই ভাগনা অই কি না অই? তরা গাস-তলে বস। মুই গাস বাই গা…
পুষ্করে সমতট দেখে প্রতিবার সুকান্তি আর পাহারাদারের হাতে ধরা পড়ে কীভাবে অনর্গল ভুলভাল ইংরাজির ফোয়ারা ছুটিয়ে উদ্ধার পেয়েছিল তার স্মরণে হাসতে থাকে…
কাঁদি গুনো দুগ্গা দালানের ভিতরে রাকচি গো।
পুষ্করের বৌ। কালিন্দি। কাটা কাটা মুখ-চোখ। তোলপার যৌবন। রীতিমতো ব্লাউজ-বাহুল্য গৌরাঙ্গে গাছ কোমর করা লাল ডুরে। একবস্ত্র। তীব্র। শরীরি। ভাপ এসে লাগছে এতটা দূর থেকেও। নিজের কৈশোর-ভূত থেকে খর-যৌবনে সুকান্তি মুহূর্তেই… মাথা নেড়ে সায় দেয় সম্বোধন-হীন ছোঁড়া কথার অভিমুখ বুঝেই।
পাতাগুনো নে যাই।
তেরছা চোখের ঘাড় হেলানো প্রশ্নকত্রী সম্মতির অপেক্ষা না করেই পাতা টেনে নিজের উঠোনে নিয়ে যেতে শুরু করে। পাতা চেঁছে কাঠি বার করবে সে। বাজার দর ভালো এই নারকেল কাঠির। খ্যাংড়া বলে এখানে। আবাল্য নারকেল কাঠি বলে জেনে এসেছে সুকান্তি। ওর চোখ ছুঁয়ে যায় গৌরাঙ্গীর অসংস্কৃত বাহুমূলের কৃষ্ণাভা। অসহ্য অথচ কাম্য। অস্পৃশ্য স্বপ্ন। অন্তরাল-বিলাসী। ভয়ংকর। ব্যক্তিগত। অপরেশ স্যারকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় সে। মুখ ভাবলেশহীন রাখার কৌশল শিখিয়েছিলেন থিয়েটার-ওয়ার্কশপে। তীব্র অনুভূতির মাথায় চড়ার পরিশ্রম ভারি ক্লান্তিকর। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পেশা-কাঁটা বিক্ষত বর্তমান পদাধিকারের দায়বাহী।
এক কাঁদি ডাব নাব্বিচি মাসাই, তুমি বৌদি কে বলে ম্যানেজ কোদ্দিও। এ ন্যাও অ্যাট্টা খাও। বেশ মালাই দেকে দিইচি।
সামনে বাড়িয়ে ধরা মুখ-কাটা ডাবটার দিকে এক পলক দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ওঠে সুকান্তির।
ঘুষ দিচ্ছিস! নিজের অপকর্মের সঙ্গী করতে চাইছিস আমাকে!
গলাটা চড়ে যায় সুকান্তির। পাতা টানা থামিয়ে ছুটে আসে কালিন্দি। দুচোখে কৌতুহল। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ঝংকার দেয়—
ফের… ফের চুরি কল্লি! ঐ ঝন্যি তোর ঘর কত্তে ঘেন্না লাগে
আরো অপভাষা বেরোনোর মুখ হাত তুলে বন্ধ করে সুকান্তি। নীচু-গম্ভীর গলায় বলে—
সন্ধের আগে নিজের কাজটুকু গুছিয়ে নাও কালিন্দি আর পুষ্কর তুমি ডাবের কাঁদি আর মুখ-কাটা ডাবটা নিয়ে আমার সঙ্গে এসো।
কথা কটা বলেই হনহন করে অন্দরমহলের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। এই সোনা-মাস্টারের রকম এ গাঁয়ে সকলে চেনে। খুব রাগলে সে তুমি বা আপনি বলে সম্বোধন করে ছোট-বড় সবাইকে। মনে মনে প্রমাদ গুনল পুষ্কর। নির্ঘাৎ মার গেল মজুরীটা। অন্দরমহলের দরজা পেরতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সুকান্তি। দুবার গলা খাঁকরে কারো সাড়া না পেয়ে ঈষৎ উঁচু গলায় ডাকল—
মালতী… তোমাদের বৌদিকে বলো পুষ্করকে নিয়ে এসেছি কিছু কথা আছে। মালতীর সাড়া না পেলেও সুকান্তি জানে তার আগমন বার্তা জায়গা মতো পৌঁছে যাবে।
#
আপনার বিচারে পুষ্করের কী শাস্তি বিধান করেছেন? বেতস লতার মত হিলহিলে শ্যামাঙ্গী নীলাম্বরা মধুজার স্বরে সম্ভ্রম।
হয় মজুরী নয় ডাবের কাঁদি। ব্যারিটোনে সুকান্তি। এই টোন হেজিমনিক। গলে যায় মধুজা। অভিভাবকহীন নিরালম্বতা আলম্বন বিন্দু অভিসারী হতে প্রাণপণ করে।
আপনি কোনটা দেবেন ঠিক করেছেন? অর্ধনমিত মুখে প্রশ্ন রাখে মধুজা সাবধানে।
ডাবের কাঁদি। জানতে চাও কেন? সুকান্তির কথা-প্রান্তে মুখ তোলে সুনেত্রা মধুজা। পূর্ণ দৃষ্টিতে চায়… চেয়ে ব’সে থাকে…
পুষ্কর রোজ ভ্যান রিকশায় ঘুরে ঘুরে ডাব বিক্রী করে। কাঁদিটা বিক্রী করে সে মজুরী থেকে বেশিই পাবে কিন্তু নগদ মজুরী হাতে দিলে… কথা শেষ না করে অবাক হয় সুকান্তি চেয়ারে বসা মধুজাকে মুখ চাপা দিয়ে প্রবল হাসতে দেখে।
এতে হাসির কী হল? বিরক্তি ছলকে ওঠে সুকান্তির স্বরে! পুষ্করের হাত থেকে মুখ কাটা ডাবটা ছিনিয়ে নিয়ে বলে— এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? যা কাঁদিটা নিয়ে বিদায় হ। পুষ্কর চলে যায়। আরও কিছুটা সময় নিয়ে হাসি সামলে উঠে দাঁড়ায় মধুজা সুকান্তির মুখোমুখি। হঠাৎ সুকান্তির হাত টেনে নিয়ে একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলে—
এবারে অন্তত তোমার পকেটটা বাঁচালুম। যথাস্থানে পৌঁছে দিও।
উত্তরের অপেক্ষা না রেখেই ভিতরমহলে মিলিয়ে গেল মধুজা অকস্মাৎ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত সুকান্তির ধীরে অতি ধীরে যখন বোধজন্ম হল তখন সে কালিন্দির অন্ধকার উঠোনে প্রেতের মত দাঁড়িয়ে…
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
