শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
আর কতকাল বইবে ওই আঁধার নদী
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুশাসনের ঢক্কানিনাদ হৈ হৈ রৈ রৈ করে চারপাশ আলোচিত ও মুখরিত তখনই ভেসে আসছিল কেমন দূর্গন্ধ, অসহ্যকর অপ্রত্যাশিত। লোকে ভাবছিল কোম্পানির শাসনে সকলে কেমন সুখে শান্তিতে বেঁচেবর্তে আছে। মিশনারীরা কেমন মনের সুখে ধর্মপ্রচারের বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছিল গ্ৰামে গঞ্জে, অনেক ঘরে খ্রীষ্টের ভজনা যে শুরু হয় নি এমনও নয়। সময়টাকে মনে হচ্ছিল বড়ই চেনা চেনা অনুকূল। হবে নাই বা কেন। দেবতার ভজনায় অনুরক্ত নবজীবনের কাণ্ডারীরা যে ঘোড়ায় চেপে সওয়ারি হয়েছে তার লাগাম যে আলগা হচ্ছে কেউ টের পায়নি। আহ্লাদে আমি যে আটখানা হইনি তাই বা বলি কি করে। আবার অতৃপ্তি যে বাসা বাঁধেনি এমনও তো নয়, বাসাটা তো খড়কুটো দিয়ে বাঁধলেও কোথায় যেন বটবৃক্ষের শক্ত ডালপালা ছড়ানো বিরাট এক মেঘমুক্ত আকাশের নীচে নিশ্চিন্তে দিনযাপন। জীবন মৃত্যুর ছায়াও যেন ছোঁয়ার আগে দু’পা এগোয়, পেছানো তো ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে মানা। বাঁধ সাধে যেন ইংরেজি সংবাদপত্র গুলির টুকিটাকি খবর। এমন তো কত খবর জ্যান্ত হয়ে উঠে, আবার আপনার আপনিই প্রাণ ধুকধুক করে। কোন দিকে এগোলে সত্যি কথাটা অকপটে স্বীকার করা যাবে, বোঝা দায়। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি বার বার, কোনো উত্তরই যথেষ্ঠ নয়। সংবাদগুলো তীরের ফলার মতো বুকে এসে বিঁধছে। ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ সরকারপক্ষ নিয়ে তীব্রভাবে ‘সাঁওতাল হুল’ এর মুণ্ডুপাত করছে খুবই স্বাভাবিক কিন্তু নিতান্ত অস্বাভাবিক লাগছে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর এমন অবিবেচকের মতো জঙ্গলের মানুষের পাশে না দাঁড়ানোয়, দেশী সংবাদপত্রের এমন ভূমিকা, আর সরকারের তোষামোদ করা কি নিছক ভয়ে, নাকি অন্য কোনো অভিসন্ধি আছে, সবটাই অবিশ্বাস্য। আমি নিজের কাছেই যে ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছি – এমন স্ফুলিঙ্গের যে জন্ম হবে একদিন তার জমি যে তৈরি হচ্ছিল তোড়জোড় করে, না বোঝার তো কোনো জায়গা ছিল না। সাবধানবাণী যে শোনাই নি এমন তো নয়, আমার স্বজাতিরা তো তাই গ্ৰাহ্যের মধ্যেই নেয় নি, উল্টো কেউ কেউ সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করছে বলে লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে নানা অপ্রীতিকর কথা। আমার দেশ আমাকে যে অনেক কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়। আমাকে ভুলতে দেয় না আমি আইরিশ। অস্কার ওয়াইল্ড, বার্ণাড শ, জেমস্ জয়েস আমাদের পূর্বপুরুষ, কী করে একথা ভুলতে পারি এই ইংরেজরা আমাদের ভূমি-সন্তানদের জমি দখল করে, ধন সম্পত্তি লুটে নিয়ে আমাদের পরাধীন করে রেখেছে, নিজেকে যুক্ত করবো না বিযুক্ত করবো এই টানাপোড়েন আমাকে অতিষ্ঠ করে রাখে। এই ভারতের মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। এই দ্বন্দ্ব আমার মাঝে মাঝেই সিদ্ধান্তের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আমি তো একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি ভারতীয়দের মঙ্গলের মধ্যেই ব্রিটিশ শাসনের সার্থকতার বীজ রয়েছে। গ্ৰেটব্রিটেন, ভারতের বহু ইউরোপীয় ও ভারতীয়রাও আমার বিশ্বাসের সঙ্গে একমত।
আগরপাড়ার এক ছাত্র আচমকাই আমার কাছে জানতে চাইল আমি কোন পথে হাঁটবো। আমার জীবনদর্শন আমাকে দিকনির্দেশ করছে, মানুষের কথা বলো, একবিন্দু ডানেও নয়, বামেও নয়, ধর্মীয় পরিচয়কে উপেক্ষা কর, পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের মুখগুলো কিন্তু একই পঙক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে আমি উপেক্ষা করি কী করে, খ্রিষ্ট শব্দের মোড়কে মুড়িয়ে ফেলতে হবে, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয় নি অথচ আমি কিনা আইরিশ-ইংলিশ, এই পরিচয় আমি কোথায় লুকাবো, ধর্মপ্রচারক সত্তাকে কোনোভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়! ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসক প্রতিদিন আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার গণ্ডি। মন বলছে গণ্ডি ভেঙে না বেরতে পারলে মুক্তি নেই। আলেকজান্ডার ডাফ যে পথ অবলম্বন করে ব্রাক্ষণ বৈদ্য কায়স্থ দের বেছে বেছে ধর্মান্তরিত করার কাজ শুরু করেছিলেন এবং জেনারেল এসেম্বলি ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বলতেন ‘এক হাজার নিম্নশ্রেণীর লোককে দীক্ষা দেবার চেয়ে একজন উচ্চশ্রেণীর হিন্দুকে শিক্ষা দিলে কাজের কাজ হবে।’ এই নীতিতে বিশ্বাসী হওয়ার অর্থ সামগ্ৰিক কল্যাণ থেকে দূরে সরে আসা। মেকলে সাহেবের শুধুমাত্র ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারেও আম মানুষের কোনো উপকার হবে না। বরঞ্চ অ্যাডাম স্মিথ- এর প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সোসাইটি আমাকে আমার মিশন সোসাইটির উদ্দেশ্য ও চিন্তার মধ্যে সমন্বয় সাধনের সাহায্য করে। সাহিত্য ইতিহাস ভূগোল দর্শন ধর্ম ও বিজ্ঞানকে একই সূত্রে গেঁথে সমাজকে নিরীক্ষণ না করলে গোটা সমাজকে চেনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমি বিশ্বাস করি ধর্মের উদারতা, আদর্শের দ্ধারাই রাজনৈতিক শুদ্ধি হওয়া সম্ভব। শান্তির অতন্দ্রপ্রহরা একজন মিশনারীর পবিত্র কর্ম। আমি এও বিশ্বাস করি জমিতে কৃষকের রায়তি সত্ত্ব দিতে হবে, তা না-দিলে রায়তদের মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি আসবে না। ছাব্বিশ বছরের যুবক হয়ে এদেশে এসেছিলাম, কতগুলো বছর পার হয়ে গেল, পারলাম কী এদেশের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে? তাহলে এত বিদ্রোহের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলে উঠছে কেন। কেন পত্রপত্রিকায় শব্দে শব্দে ভেসে উঠছে ইংরেজ শাসনের প্রতি এত ঘৃণা, স্বদেশীয়রা আমাকে শত্রুর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ওরা কী তবে চাইছে না সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক, জীবনের অর্থ খুঁজে পাক। ওরা ভাবছে এদেশীয়রা জেগে গেলে ওদের শোষণ ও অত্যাচার চালাতে অসুবিধা হবে, অথচ এই বণিকরাই নিজের দেশে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শ্লোগান তোলে, কী অদ্ভুত দ্বিচারিতা! এরা একই দোষে দুষ্ট হয়ে আমার দেশ আয়ারল্যান্ডকে পরাধীন করে রেখেছে, কবে আমরা মুক্তি পাবো কেউ জানে না। ভারত আমার স্বদেশ না হতে পারে, স্বদেশের প্রতিবিম্ব তো বটে।
সাঁওতাল হুল শুরু হয়েছে, আঁচ এসে পড়ছে এই শহরে। আমি কি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারি, না রাখা উচিত। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলেন অনেক কিছুই, আমি কি বুঝতে চাইলাম না, জানতে চাইলাম না কেমন করে এই সমস্যাকে দেখব। কৈশোরে তো আমি দেখেছি ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্টদের লড়াই, রাশিয়ায় জারের শোষণ, কৃষক ও ভূমিদাস আন্দোলন, ঘৃণা জন্মেছিল মনে, তাহলে আমি কেমন করে চুপ থাকতে পারি। ইউরোপীয় বন্ধুরা কেউ কেউ সাবধান করে দিচ্ছে যেন একটা বাক্যও ব্যবহার না করি। ইউরোপীয়দের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে জনজাতিদের উষ্মা আর প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে যাবো? ওরা কেউ কেউ বোঝাবার চেষ্টা করে যেতে লাগলো ক্রমাগত – বৃথা সময় নষ্ট করছ লঙ, এরা আসলে বিদ্রোহের আড়ালে কোম্পানির শাসনে চিড় ধরাতে চায়। ওদের কথা চালাচালিতে অন্য গন্ধ পাই। শিশু বয়সে দেখা মাতৃভূমিতে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের চরিত্র আমি কী করে ভুলতে পারি। আয়ারল্যান্ডের আওয়াজ যে আমার কানে ভেসে আসছে – জুলুমবাজী বন্ধ কর, শোষণ করা চলবে না, আইনের শাসন কায়েম কর। এশিয়াটিক সোসাইটির এক সদস্য বললেন, পাদ্রী সাহেব, সাঁওতালদের শোষনের ইতিবৃত্ত নিয়ে এই শহরের মানুষরা বড় উদাসীন, কিন্তু এই বিদ্রোহের চরিত্র সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কথা স্মরণ করায়, মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানীরা পুরোভাগে ছিলেন, ইংরেজ শাসন শোষণ ও অত্যাচারী নবাবরা কেঁপে উঠেছিল। কৃষ্ণমোহন বললেন, আপনি বরঞ্চ “দ্য হিন্দু ইন্টিলিজেন্সার’-এর সম্পাদক কাশীপ্রসাদ ঘোষের সঙ্গে গিয়ে দেখা করুন। মানুষটার কথা ফেলতে পারলাম না। হেদুয়া অঞ্চলটা আমাকে অদ্ভুতভাবে টানে, অন্যরকম গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতি ঘরের দরজা জানালার ফাঁকে ফাঁকে এমন সুবাতাস বইছে, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে যেন নিজেরও শুদ্ধি হয়। নবজাগরণের জোয়ার ধুয়ে মুছে দিয়েছিল তস্করদের এই জঙ্গল ও জলাভূমিকে, শিক্ষা সংস্কৃতির কেন্দ্র হ্রদ থেকে হেদুয়া, একসময়ের কর্ণওয়ালিশ স্কোয়ার কখন যে হেদুয়া পার্ক হয়ে গেছে লোকমুখে কে তার খবর রাখে।
এই মানুষটিকে নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। থাকবে নাই বা কেন। ‘দ্য শায়ের এন্ড আদার পয়েমস’ ইংরেজি কাব্যগ্ৰন্থের রচয়িতার দেশে বিদেশে অনেকেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ‘হিন্দু ফেস্টিভ্যালস’, ‘সঙ অব দ্য বোটমেন টু গঙ্গা’ তাঁর স্বদেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছেন তাঁর সৃষ্টির মাধুর্য্যে। এ হেন মানুষের সঙ্গে কথা চালাচালি তাও একজন অ্যাংলো-আইরিশ যাজক যে কিনা ধর্মপ্রচারক হিসেবে তকমা পেয়েছে, অন্তত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকদের কাছে তো বটেই। এটা ঠিক মনের অন্তঃস্থলে ঝাঁকিয়ে দেখলে মনে হবে এমন মানুষের দর্শন কোথায় আর মিলবে। ইংরেজি কবিতা লিখে নাম কুড়োলেও গানও লিখেছেন। শুনেছি ইংরেজি বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে স্বদেশী কবিদের তালিকায় উচ্চস্থানে রাখলেও, বণিক ইংরেজদের নিয়ে তাঁর ক্ষোভের অন্ত নেই। প্রশ্ন আমি করবো, না উনিই রাগতস্বরে উচ্চারণ করলেন, ‘কী লঙ সাহেব আপনাদের শাসকদের স্বভাব চরিত্র দিন দিন এত নীচে নেমে যাচ্ছে কেন, কারণ কী বলতে পারেন? আমি তো জানতাম, ইংরেজরা সভ্য শিক্ষিত, আবার উন্নত জাতি হিসেবে গর্ববোধও করে, এত নিম্নরুচির পরিচয় দিচ্ছে কেন? শুধরাতে বলুন, না হলে আমার দেশবাসী কিন্তু বেশিদিন চুপ করে থাকবে না, আমি দিব্যচক্ষে দেখছি। শুনে তো আমি থ। বললাম, আপনি অভয় দিলে একটা কথা বলতাম। বললেন, নিঃসংকোচে বলুন, আমি কিন্তু ভালো শ্রোতা। বললাম, আপনি অন্যের কথা বোঝার চেষ্টা করেন ঠিক আছে, কিন্তু সমালোচনা সাহিত্যে আপনার জুড়ি মেলা ভার। বাংলা কবিতা ও কবিদের সমালোচনার প্রবন্ধ ’অন বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ ও ‘অন বেঙ্গলি ওয়ার্কস এণ্ড রাইটিংস’ আমি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছি। তবে বলি শুনুন, ভারতবর্ষ হলো দেবদেবীদের দেশ, অনেক বীরদের জন্মস্থান, বেশিদিন এই দেশকে সাহেবরা দখলে রাখতে পারবে না, ভারতমাতা শিকলমুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে। ওঁর মুখ থেকে কথাগুলো শুনছি, আর নিজের দেশ কীভাবে পরাধীনতার শেকল পরে আছে, সেই অত্যাচারের ছবিগুলো ভেসে উঠছে। এবার আমি সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। বুঝতে পেরে নিজেই বললেন, বলুন, বলুন, আপনার মনের কথা খুলে বলুন, গুমড়ে মরে যন্ত্রণা পুষে রেখে লাভ কী। বলার ভঙ্গিতে ওঁর কাব্যিক চেতনা যেন বিবেক হয়ে ওঁর কাছে ধরা দিল। মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম, এরাই ভারতের সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন রূপে জানান দিচ্ছে। অবধারিত ভাবেই ‘সাঁওতাল হুল’ প্রসঙ্গ বেরিয়ে এলো।
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম ওঁর দেশাত্মবোধক গান মানুষের অন্তরাত্মাকে কেন এমন করে জাগিয়ে তোলে, বললেন, আমি পলে পলে যন্ত্রণাবিদ্ধ হচ্ছি, আমি গান লিখি না, কবিতা আমি রচনা করি না, মা সরস্বতী, আমার দেশের ঈশ্বরী আমাকে যেন ডেকে ডেকে বলে, ‘তোমার দেশের তোমাকে প্রয়োজন, তুমি কলম ধরো, গভীর ঘুমে অচৈতন্য যে জাতি, তাদের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমার দেশের দেবদেবীরা শুধুই প্রতীক নয়, আমি তাঁদের অস্তিত্ব অনুভব করি শীরায় শীরায়, ওদের নিঃশ্বাসের দ্রুত ওঠানামা এই দেশের বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরে বেড়ায়, আমি নিজেকে আলাদা করতে পারি না, একাত্ম হয়ে যাই। ওদের রূপ রস পলে পলে ধরা পড়ে, কল্পনার উচ্ছলতায় ভাসতে থাকে, দেবদেবী আর দেশের প্রকৃতিতে সকল ভিন্নতা উবে যায় নিমেষে। আমি পাদ্রী লঙ ওঁর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, না ভাবছি নিজেকে অভিন্ন এক পরাধীন দেশের মানুষ যাদের স্বত্তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত শোষকরা, অপরিচিত করে তুলছে দীর্ঘলালিত সংস্কৃতিকে, আমি কি ঘৃণা করবো, না ওদের অঙ্গুলিহেলনে কর্মপন্থা নির্ধারণ করবো, চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করে উঠলো, উনি বক্তা নন, আমি শ্রোতা নই, একই আসনে বসে আছি। তা হবে কেমন করে, কবি হলেন শঙ্কর জাতের মানুষ, আমি হলাম ভিন্ন কাঠামোর মানুষ, দুজনে মিল খাবে কেমন করে! তবুও যেন এক আত্মিক টান আমাকে চৌম্বকীয় আকর্ষণে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, বলিয়ে নিচ্ছে নানা কথা নানা ঢঙে। তিনিও স্তব্ধ হয়ে রইলেন, আর আমিও স্তব্ধ হয়ে রইলাম। এই অদ্ভুত অবস্থা তিনি তো অস্বীকার করেন নি, তাহলে আমি কীভাবে অস্বীকার করি। ভাবলাম এখনও যদি আমার স্বদেশীয়রা নাড়ীর টান অনুভব না করে বিশ্বমানবতার টানে, তবে বড্ড দেরি হয়ে যাবে, ফিরে পাওয়ার উপায় থাকবে না।
কথা প্রসঙ্গে এমন এক সংকটের কারণ দর্শাতে গিয়ে জঙ্গলের আদিবাসীদের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে এক ছায়াময় আবছা ছবিই আঁকছিলেন যখন কবি তখন আমার বলার কিছু ছিল না। যে নিষ্কর জমির অধিকার নিয়ে ওরা বেঁচেবর্তে আসছিল, তার প্রতি জমিদার ইজারাদার ও ইংরেজ কর্মচারীদের আঘাত নামিয়ে আনা এবং রক্তচক্ষু দেখানো নিয়ে খানিকটা দোটানা প্রকাশ পেল যেন। দ্যা হিন্দু ইন্টেলিজেন্সার সাপ্তাহিকেতে তাঁর ছুঁয়ে যাওয়া বাক্যবন্ধ উত্তাপ কেন ছড়াতে অসমর্থ হলো তার পেছনে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা আমার অন্তত জানা নেই। নাকি যে সংজ্ঞায় নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমির মানুষজনের জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠে তা বীরভূম বাঁকুড়া মানভূম ছোটনাগপুর থেকে রাজমহলের পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য সমান্তরাল ভাবনায় উঠে আসে না। আমি প্রশ্ন করাতে হতভম্ব হয়ে তিনি কি ইংরেজ শাসকদের কোলে ঝোল টানলেন। নিজের কাছে আমি নিজেই জানতে চাইলাম, আমিও কি ব্যতিক্রম কিছু। সংবাদটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই এলো, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। হাজারে হাজারে সাঁওতালরা দূর্বার গতিতে লাঠিসোটা, কাঁচি, বল্লম, কুরুল, খন্তা ও তীর ধনুক তাক করে কলকাতা শহরের দিকে ছুটে যে আসছে তাদের ঠেকাবে কেমন করে। কবি খানিকটা রুষ্ট হয়ে বললেন, থানার দারোগাকে হত্যা করে, বাঙালি মহাজনদের গঙ্গা পার করে দিয়ে, রাজা-মহারাজাদের খতম করে সব হিসেব নিকেশ গোলমাল করে দিচ্ছে না নাকি। আমার অনুমান এই বিদ্রোহের আগুন যেমন অন্যকেও পোড়াবে, নিজেরাও পুড়ে মরবে। কবির কাছে জানতে চাইলাম, তাহলে আমাদের কী করা উচিত, অনেক পাদ্রীরা এই অস্থিরতা সৃষ্টির হেতু খুঁজতে আরম্ভ করেছে, কোনো এক অজানা আশু বিপদের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে। এই মুহূর্তে কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা উচিত, ভবিতব্য কিন্তু অনেক কিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এখনই শাসকের দৃষ্টিভঙ্গি না পাল্টাতে পারলে সমূহ বিপদ। আপনি কি মনে করেন এই বিদ্রোহের বীজ নিহিত আছে ১৭৮০ সালে সাঁওতাল জননেতা তিলক মূর্মূর নেতৃত্বে শোষকের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের গণসংগ্ৰাম? একটু ভেবে বললেন, অত সহজ করে বললে সাহেব সবকিছু বোঝা যাবে না, আর একটু তলিয়ে ভাবতে হবে। বহু বছরের অত্যাচার বঞ্চনা আর শোষণ আর পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখার যন্ত্রণা মানুষগুলোর মাজা ভেঙে দিয়েছে। আপনি কি মনে করেন না মনুর দর্শন উচ্চবর্ণের মানুষদের শিখিয়েছে এদের কলুর বলদের মতো ব্যবহার করতে হবে তবে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না? আলবাৎ মনে করি এদের দীর্ঘ সময়ের ঘৃণা আর বিদ্বেষ আজকের শোষণে ঘি ঢেলেছে। ওদের বাঁচার অধিকার কেড়ে নেওয়ায় ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে বাঁচার প্রয়োজনে এই পথ বেঁচে নিয়েছে। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি আপনার অনুভবে এদের প্রাত্যহিক কষ্টের কথা ধরা দিল কেমন করে! উত্তরে কবিকে একটা কথাই বলতে ইচ্ছে হলো গোটা পৃথিবীটা আসলে একটাই দেশ, কিন্তু সোচ্চারে উচ্চারণ করতে পারলাম না মনের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসা কথাগুলো। কিন্তু কীসের বাঁধায় আমি জনতার সামনে বলতে পারছি না, আমার লেখনীতে প্রকাশ করতে পারছি না। তবে কি প্রবল জাত্যাভিমান আমার গলা টিপে ধরছে। আমি জানি বিলেতের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ইংরেজরা এই নিয়ে সুধী মহলে সোচ্চার হচ্ছে, বিভিন্ন সেমিনারের বিষয় হয়ে উঠছে এই খবর আসছে সাগর পেরিয়ে। তাহলে আমি পারছি না কেন বলতে পারেন? ইংরেজদের আসন টলমল হলে আপনাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, আপনাদের ধর্মান্তরিত করনের উদ্দেশ্যেই মাঠে মারা যাবে। আপনাদের বণিক সমাজ চায় আমাদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে ছিবড়ে করে দিতে, আর আপনারা চান খ্রিস্টানদের আখড়া বানাতে। আমাদের শ্রেণীর লোকদের পেরেছেন জ্ঞানের বাণী ছড়িয়ে আর ছাপোষা গরীব গুরবোদের অর্থ ধর্ম দুটোকেই দু’পাল্লায় ওজন করে হিসেব কষছেন।
বীর সিং, কালো প্রামাণিক, ডোমেন মাঝিরা জেগে উঠেছে – এখন উপায়! আমি কী কোনো পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলবো না! কাশীপ্রসাদ মহাশয় আমার অস্বস্তিকর অবস্থা টের পেয়ে বললেন, লঙ সাহেব আপনি আমাদের দেশের যন্ত্রণাকে যেভাবে আত্মস্থ করছেন তাতে তো আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা। এই দেশের জমিদার ইজারাদার মহাজন মধ্যস্বত্বভোগীরা এই জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে রেখেছে, শোষণ করে চলেছে, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় নি আর ইংরেজ কর্মচারীরা সেই আগুনে ঘি ঢালছে, কতদিন ওরা মানবে বলুন তো। ক্ষমতাধর লোকেরা ওদের ঋণের জালে জড়াচ্ছে, জমির অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, মা বোনদের ইজ্জত নিয়ে লোফালুফি খেলছে, গরু ছাগল হাঁস মুরগি নিয়ে নিচ্ছে দিনদুপুরে তাহলে ওদের বিদ্রোহ করা কি অপরাধ? বললাম, ভাগনডিহির মাঠে সিধু বক্তৃতায় যে দামিন-ই-কোহির কথা বলছে, হাজার হাজার মানুষ ওর কথায় জ্বলে উঠছে এর ফল কী হতে পারে তা আপনার পত্রিকায় জোরালো ভাবে তুলে ধরছেন না কেন? ইংরেজ শাসক সমস্যার মূল না জেনে, যতদূর শুনেছি গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছেন। কথাটা আপনি ঠিকই বলেছেন সাহেব, আমার দায়িত্ব সম্পর্কে আমাকে সচেতন করছেন, কিন্তু একটা কথা বলুন তো, মিশনারীরাও কি ঠিক কাজ করছেন? ওদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার আচরণ পরিবর্তন করে ছলে বলে কৌশলে ধর্মান্তরিত করে চলেছেন দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে, এটা কি অন্যায় নয়? ঘোষ মহাশয়ের ক্রোধ সম্ভবত আমার দিকেই ধেয়ে এলো। বলুন তো আপনি কি মনে করেন ওদেরকে অন্য সংস্কৃতিতে মুড়িয়ে ফেললেই মুক্তি ঘটবে, নাকি ওদের বিশ্বাস ও রীতিনীতিকে গুরুত্ব দিলেই নতুন এক রাস্তা খুলে যাবে, ওরা স্বচ্ছন্দে সেখানে হেঁটে চলে বেড়াবে, নিজেদের মনের কথাগুলো খুলে বলবে, যা না করে আপনাদের মত চাপিয়ে দিচ্ছেন কৌশলে, এর জবাব আছে আপনার কাছে। কথাগুলো শূলের মতো বিঁধলো, সত্যিই আমার কাছে এর স্বচ্ছ কোনোও জবাব নেই, জবাব যেটুকু আছে যা একেবারেই আমাদের মিশনের পরিপন্থী, যা সম্পাদক মহাশয়কে আমি খুলে বলি কী করে! ভারতীয় জনজীবন আর মিশনারীদের উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যের সঙ্গে কোথাও কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি করছে না তো, এটাও ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমাদের শাসকরা এইদেশের জমিদার ইজারাদার মহাজনদের চেয়ে আরও বড় শোষক হয়ে উঠছে না তো। ইংরেজ বণিক আর শিক্ষিত সমাজের অন্তরটা খোলসা না করলে এর উত্তর পাওয়া যাবে না।
ক্লাসরুমে বসে ছাত্রদের প্রশ্নোত্তরের ফাঁকে ফাঁকে আমি একটু অন্যমনস্ক হওয়াতে ছাত্রদলের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাওয়ার ফাঁকে ওই কথাগুলোই মনের মধ্যে পাক খেতে লাগলো যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে তো, এর ফল হবে না তো সুদূরপ্রসারী। সিদু কানু চাঁদ ভৈরবদের ডাকে হাজার হাজার সাঁওতালরা তীর, ধনুক, কুড়ুল, দা বল্লম, বটি, খন্তা, তীর নিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছে, জমিদারের বাড়ি পোড়াচ্ছে, মহাজনদের খুন করছে, নীলকরদের হত্যা করছে, পুলিশ মারছে, থানাগুলোকে যে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, রেললাইন উপড়াচ্ছে কিনা স্বতন্ত্র সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে – এই তো এক অশনি সংকেত। সরকার বাহাদুর কি আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে ব্যর্থ হচ্ছে? ছাত্রদেরকেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম। ওরা আমতা আমতা করে কী যে বললো আমি বিন্দুবিসর্গ বুঝলাম না। একজন ছাত্র সমুচিত জবাব দিল – সাহেব বাবা, প্রশাসকের উচিত দেখা যাতে দিকুরা ওদের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে। কৃষ্ণমোহনের মুখে খবরটা শুনে মনে হলো এবার মিশনারীদের পাততাড়ি গোটাতে হবে, সাধারণ মানুষ এবার আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে, শত্রু ভাবতে আরম্ভ করবে, তবে প্রান্তিক মানুষগুলোর গতি কি হবে, পাশ্চাত্য শিক্ষার আলো না পেলে যে কিছুতেই অন্ধকার দূর হবে না। কৃষ্ণ মোহনকে শুধালাম, আপনি ঠিক শুনেছেন তো মেজর জেনারেল জি.ডব্লিউ লয়েড পাঁচটি স্থানীয় পদাতিক রেজিমেন্ট, হিল রেঞ্জার্স ও ইউরোপীয় সৈন্য নিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে যাত্রা করেছে! শুধু কী তাই লঙ, ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার ভাগলপুর অঞ্চলে, ক্যাপ্টেন কোপি বীরভূমের পালারপুরে সাঁওতালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। কৃষ্ণমোহন আপনি বলুন তো কী উপায়? লঙ, অবস্থা এখন হাতের বাইরে। ইংরেজরা মূর্শিদাবাদের নবাবদের সাহায্য নিয়ে কত যে গ্ৰাম হাতির পায়ের নিচে তছনছ করে দিয়েছে তার কি হিসেব আছে। কৃষ্ণমোহন, ইংরেজদের এর ফল ভুগতে হবে, ইংরেজ শাসককে আরও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা মোকাবেলা করা উচিত ছিল। হাজার হাজার সাঁওতালদের বনের মধ্যে বাঁশ টাঙিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ হয়েছে। এমন কাজ হয়েছে আমরা না পারবো মুখ দেখাতে, না পারবো প্রতিবাদ করতে। লঙ আপনি বলুন, আপনাদের স্বজাতিরা নিজেদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্যজাতি বলে দাবি করে, এটাই তার প্রদর্শন, কামান দাগানো! কৃষ্ণমোহন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন বোধ হয় পররাষ্ট্র দখল, সম্পদ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে ও নিষ্ঠুরতায় ইংল্যান্ডের প্রশাসনের চেয়ে কয়েক কদম বেশিই এগিয়ে গেছে। আয়ারল্যান্ডের মানুষও শাষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পারছে না।
আঁধার ক্রমশ জাল বুনছে তার নিজস্ব ঢঙে, নিজের অস্তিত্বকে যাচাই করা দিনে দিনে কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে উঠছে। ঘরের চারপাশের জলা জঙ্গল মনে করিয়ে দিচ্ছে সাঁওতালদের রক্তস্নান। হন্তারক আর নিহতদের মধ্যকার অন্তর জানান দিচ্ছে এই অসভ্য সভ্যতার অমানুষিকতা কী বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে না-মানুষদের অসময়ের ত্রাহি ত্রাহি ডাক মনে করিয়ে দিচ্ছে ওরা ভালো নেই, ভালো না থাকার শর্তগুলোকে স্বেচ্ছাচারিতার দোষে দুষ্ট হয়ে চাপিয়ে দিচ্ছে ওদের ফালাফালা করে দমিয়ে দেবে বলে। ফুলমণিকে ওরা হত্যা করেছে । মানছি চাঁদ ভৈরব পাকুর রাজবাড়ি লুট করেছে। আমি কি বলব ওরা পথভ্রষ্ট হয়েছে? কৃষ্ণমোহন বলছে, বঞ্চিতের আগ্ৰাসন, শাসকের উল্লম্ফন আর তান্ডব কখনও একই সরলরেখায় অবস্থান করে না লঙ, তার অগ্ৰপশ্চাৎ নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে হয়, কোম্পানির শাসন তাকে তোয়াক্কা করে নি, সাঁওতাল হুল এর বদলায় বর্বরতার হুল ফুটিয়েছে। কৃষ্ণমোহনের কথাগুলো এই ঘুটঘুটে আঁধারে তীরের ফলার মতো বিঁধছে আমার চেতনায়। হ্যাঁ এই প্রশ্ন আমি ইংল্যান্ডের সুশীল সমাজে রাখতে পারি, তারা তাঁদের পত্রিকার কলামে এই সংবাদকে লজ্জায় জায়গা করে দেবে কিন্তু এমন সহৃদয় ব্যক্তি কয়জন আছেন জেনেশুনে নিজেদের গায়ে থুথু ছিঁটাবেন! কৃষ্ণমোহন বলে ওরা নাকি চোখে পট্টি পরে আছে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো। এই প্রশ্ন কি লর্ড ডালহৌসি নিজেকে করবেন কেন সাঁওতালরা ছোট নাগপুর মালভূমি থেকে রাজমহল পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে এসে বাসা বেঁধেছে? কেন ইংরেজ শাসকদের বাৎসরিক ট্যাক্স পাঠাতে গিয়ে জমিদারদের কৃষিজীবী আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপর পঞ্চাশ শতাংশ থেকে পাঁচশ শতাংশ ট্যাক্স চাপাতে হয়, কেনারাম বেচারাম বাটখারার গোপন খেলা খেলতে হয়, বেগার খাটতে হয় পুরুষানুক্রমে? এই উত্তরগুলো বন্দুকের নল আর কামানের গোলা দিয়ে হিসেব কী হয়! সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের চরিত্রের কি কোনো পরিবর্তন হবে না? লর্ড ডালহৌসি কি লর্ড কর্ণওয়ালিশের ব্যবস্থাপনায় আর একবার অন্তত চর্চা করবেন না? আগামীর গর্ভে কত কী হিসেব লেখা হবে, কেই-বা জানে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
