তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। )
অধ্যায় : একুশ
একে দেখি, তাকে দেখি, মানুষ দেখে বেড়াই। আমি আর রিক্ত। রাস্তায়, বাজারে, অফিসে-আদালতে কাঁহা কাঁহা মুল্লুকে। ঠিক মানুষের সন্ধানে ব্যস্ত আমরা। এবার খোঁজায় যুক্ত হয়েছে প্রায় ঠিক মানুষ বা ঠিক মানুষ হওয়ার যাত্রাপথে আছে যারা। একদিন গিয়ে হাজির হলাম এক ব্যাংকে। সেটি এক বেসরকারি প্রাইভেট ব্যাংক। অচেনা নয়, চেনা, কারণ আমার সেখানে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ব্যাংকের ম্যানেজারের নাম মিশা। খুব একটা বয়স নয় তার। ভালই আলাপ আছে তার সঙ্গে। আমার সঙ্গে সরাসরি আলাপ যে এক্সেকিউটিভের সেও এক মহিলা, মিশারই সমবয়সী এবং তারা দু’জনে পরস্পরের বন্ধুও বটে। তুই-তোকারির সম্পর্ক। তার নাম অঞ্চলা। তারা দু’জনে মিলে গত বছরেই তাদের ব্যাংকে বিশেষ একটা সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলিয়েছে। গিয়েছিলাম সাধারণ একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে, অঞ্চলার সঙ্গে তেমনই কথা হয়েছিল, কিন্তু ম্যানেজার মিশা তার কথার কারুকাজে এমনই প্রভাবিত করল যে ওই বিশেষ অ্যাকাউন্টটাই খুলে ফেললাম যাতে অনেক বেশি টাকা মিনিমাম ব্যালেন্স হিসেবে রাখতে হয়। শুধু তাই নয়, তারা দু’জনে মিলে আমার ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে আমি চার-চারটি ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্টও খুলে ফেললাম। ব্যাংক থেকে ফিরে বাড়ি এসে ধাতস্থ হওয়ার পর বুঝলাম, প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংকের এক্সিকিউটিভরা কতটা ক্ষমতা রাখে। না হলে আমার মতো অনিচ্ছুক এক ব্যক্তিকে তার আজন্মলালিত অভ্যেস এবং সিদ্ধান্ত এমনভাবে পাল্টে দিতে পারে ! প্রতিজ্ঞা করলাম, যা করেছি তা করেছি, আর ওই ব্যাংকের ধার মারাবো না। আবার ওই মিশা আর অঞ্চলার মুখোমুখি হলে ওরা যে আমাকে দিয়ে কী করিয়ে দেবে কে জানে! আমি বাবা ছাপোষা মানুষ, যেমন আছি তেমন থাকাই ভালো। অসুখ-বিসুখ ইত্যাদি হাজারটা সমস্যা নিয়ে আছি আমার মত, রিক্তর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখে বেড়াচ্ছি। ভবিষ্যৎ কেমন হবে ভেবে উদ্বিগ্ন হতে চাই না বলেই বীমা কোম্পানির এজেন্ট আর জ্যোতিষীদের সযত্নে এড়িয়ে চলি। আর এই মিশা ও অঞ্চলা দেখছি তাদের চেয়েও ওস্তাদ। আমার ভবিষ্যতের চিন্তা ভবিষ্যতের অন্ধকারে না রেখে বর্তমানে এনে আমার গা শিউরে দিল। পাগল, ন্যাড়া আবার যাবে বেলতলাতে? পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে যাক, আমি আর ওদের নাগালে যাচ্ছি না।
কিন্তু ঠিক মানুষ হওয়ার যাত্রাপথে কিছু মানুষ আছে যারা ঠিক মানুষ না হলেও কাছাকাছি এমন কিছু যাদের সান্নিধ্যে থাকতে ভালোবাসে ঠিক মানুষরা। এই তথ্যটা জানিয়ে রিক্ত আমাকে এমন উৎসাহিত করে দিল যে নিজের অন্যান্য বিপদ-আপদের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। এই কাছাকাছি ঠিক মানুষ খুঁজে বার করার নেশায় মেতে হিতাহিত মাথায় থাকল না। রিক্ত যেমন আমার উপকার করে তেমনি বিস্তর বিপদেও ফেলে। ওর পাল্লায় পড়েই আমি মানুষ দেখে বেড়াবার বদভ্যাস গড়ে তুলেছি আর ঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়ার নেশায় ভুগছি। এতে কী বিপদ হয়েছে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কোন মানুষকেই আর এখন মানুষ মনে হয় না, নিজেকেও নয়। প্রত্যেকটি মানুষ আমার কাছে ভিন্ন আর বিচিত্র রূপ ধারণ করে উপস্থিত হয়ে যাচ্ছে। এখন মানুষ দেখতে পাব একমাত্র ঠিক মানুষেরই সন্ধান পেলে, যে থিওরি মেনে অবস্থান করছে বিশ্বাসে। তাকে চাক্ষুষ দেখতে পাব বলে মনে হয় না। এজন্যই প্রায় ঠিক মানুষের কথা শুনে এত উৎসাহ পেলাম। আর এই গোত্রের মানুষ নিশ্চয় অধরা হবে না যেহেতু ইতিমধ্যেই হারাকে দেখে ফেলেছি । খুঁজলে এমন মানুষের আরও দেখা যে পাবই তাতে কোন সন্দেহ নেই। এদের কিছু অংশ অন্তত মানুষ-মানুষ চেহারার, অন্যদের মতো সর্বাংশে এরা দেখতে বিচিত্র প্রাণি নয়, কিছুটা হলেও মানুষের ধর্ম মেনে চলতে জানে।
কয়েকদিন আগে অঞ্চলা ফোন করে জানিয়েছিল যে নববর্ষে তাদের ব্যাংকের তরফ থেকে আমাকে একটি উপঢৌকন আর ক্যালেন্ডার দেওয়া হবে, যেন আমি তা গিয়ে নিয়ে আসি। নাহলে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবে। তখন সদ্য রিক্ত ঠিক মানুষের যাত্রাপথে যারা তাদের কথা বলেছে এবং দু’জনে মিলে সেই মানুষদের খুঁজতে শুরু করেছি। এর আগে ফোনটা পেলে ব্যাংকমুখো হওয়ার দুঃসাহস দেখাতামই না, কোন না কোন উপায়ে এড়িয়ে যেতাম। ওই ব্যাংকের কেউ বাড়িতে আসবে জানলে না করতাম না হয়তো, তবে মাসখানেকের জন্য অন্তত বাড়ি থেকে পালিয়ে আন্দামানে বা লাক্ষাদ্বীপে চলে যেতাম। এখন সেই ভয়টা প্রাণ থেকে উড়ে গেছে বলেই ব্যাংকে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। আর চলেও গেলাম অনতিবিলম্বে, এতই আমি নতুন নেশায় আপ্লুত।
গিয়ে দেখি ব্যাংকের একতলায় সংস্কার হচ্ছে, এই ব্রাঞ্চকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ চলছে। নিরাপত্তারক্ষী জানালো, অঞ্চলা এখন দোতলায় উঠেই সামনের একটা ঘরে বসছে। কার্পেটে মোড়া সিঁড়ি ধরে উঠে দোতলার সেই ঘরে ঢুকে অঞ্চলা আর ম্যানেজার মিশা দু’জনকেই একসঙ্গে পেয়ে গেলাম। বেশ খাতির করে বসালো। একথা সেকথার পর মিশা জানাতে লাগলো তাদের এক নতুন প্রকল্পের কথা যা অন্য একটি বিখ্যাত প্রাইভেট ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ এবং যেখানে ভবিষ্যতে নিশ্চিত আয় সুরক্ষিত হবে। মিষ্টি মিষ্টি কথায় মিশা মধুর হেসে সেই উদ্যোগে সামিল করিয়ে দিল এবং তার জন্য এ বছরের বিনিয়োগের টাকা নিয়ে এলো দু’টি এফডি প্রকল্প বাতিল করে। রীতিমতো হিপনোটাইজ করে দিল আমাকে, এমন অসহায় মনে হল নিজেকে যে আত্মসমর্পণ করে ওদের কথা শোনাটাই ভাবলাম উত্তম উপায়। জানতাম এমনটাই হবে। ‘সকলি তোমার ইচ্ছে ইচ্ছেময়ী ম্যানেজার তুমি’ জাতীয় গান গাইতে লাগলাম মনে মনে। রিক্তটা আজকাল আমাকে মানুষ দেখার জন্য যত্রতত্র পাঠিয়ে দেয় একা একা, নিজে সঙ্গে প্রায় থাকেই না। আমি মানুষ দেখতে বেরিয়েছি, মিশা আর অঞ্চলাকে দেখছি। অবশ্য ওরা নিজেরাই ওদের দেখিয়ে দিল। দেখলাম, ওরা এমন মানুষ যারা আমার ইচ্ছেকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী আমার মত ব্যক্তিদের চালাতে পারে।
নানারকম কথা হচ্ছিল আমাদের আর তারই ফাঁকে ফাঁকে মিশা তাদের ব্যাংকের দু’টো এফডি থেকে ফান্ড ট্রান্সফার করে নতুন প্রকল্প চালু করার কাগজপত্র তৈরি করছিল। কথায় কথায় একসময় ট্যাটু করার প্রসঙ্গ উঠল যেন কিভাবে। অঞ্চলা দেখালো তার একহাতে কব্জির খানিকটা ওপরে ছেলের নাম খোদাই করে রেখেছে। পার্মানেন্ট ট্যাটু, কোনদিনও উঠবে না। ছেলের জন্য ভালোবাসার প্রকাশ অথবা ছেলেকে সবসময় নিজের কাছে রেখে দেওয়ার এক অদম্য চেষ্টা। এই কর্পোরেট সেক্টরে কাজের জন্য তাকে কাটাতে হয় দিনের প্রায় সমস্তটা সময়। ছেলেকে কতক্ষণ আর নিজের কাছে পায়? সেই পাওয়ার উপায় এই উল্কি।
তখনই মিশা বলল যে সেও তার হাতেই উল্কি করেছে এবং সেটাও পার্মানেন্ট। সে উল্কি করেছে তার মায়ের মুখ। বেশ গর্বের সঙ্গে জানালো সে। তারপর আমাদের উল্কি নিয়ে কথাবার্তা চলল। মিশা তার হাতে উল্কি করা মায়ের মুখ দেখালো, হাতের ওপরাংশে বাহুতে, পোশাকে তা ঢাকা থাকে সর্বসময়। দু’জনেই জানালো যে অফিসে এলে উল্কি দেখানো চলবে না, নিয়ম নেই। সেজন্যই মিশা লম্বাহাতা পোশাক পরে। তো সেই পার্মানেন্ট ট্যাটু করার অনেক হাঙ্গামা, করাটা কোনক্রমেই জলভাত ব্যাপার নয়। কোন্ ব্যক্তি করে দেবে, তার মুন্সিয়ানা একটা ধর্তব্য ব্যাপার অবশ্যই। যাকে-তাকে দিয়ে করালে যেমন চাওয়া তেমন পাওয়া নাও হতে পারে। সুঁচ ফুটিয়ে ফুটিয়ে করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা, ধৈর্য ধরে প্রক্রিয়াটা অতিক্রম করে যাওয়া মুখের কথা নয়। যাকে করা হবে ও যে করে দেবে তাদের দু’জনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এই বিষয়টা। মিশা জানালো যে তার সৌভাগ্যক্রমে সে সাউথ সিটি মলের কাছে সমীরকে পেয়ে গিয়েছিল। সে একেবারে জাত শিল্পী। মিশা যেমনটা চেয়েছিল তেমনটাই পেয়ে গেল, নিখুঁতভাবে অবিকল তার মাকে সমীর অমর করে দিয়েছিল বাহুতে। সদ্য মাতৃহারা মিশার কাছে সেটা ছিল এক পরম প্রাপ্তি, কারণ সে তখন তার মাকে আবার ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল। যে কোন মূল্যে যে কোন উপায়ে তার মাকে সে আবার ফিরে পেতে চাইছিল স্বর্গ-মর্ত-পাতাল যেকোন স্থানে গিয়ে। সে মাকে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল। ধরাধাম ছেড়ে যে চলে যায় তার পরিচিত দেহের আধারটি ফেলে সে কোথায় যায় তার অনুসন্ধান হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছে মানুষ, জ্ঞানী বা সাধারণ সমস্ত ব্যক্তি। কোন উত্তর বা কোন কূলকিনারা আজ পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি কেউ। অসহায় মিশা কী করবে? প্রাণলগ্না তার মাকে সে আবার তার প্রাণের কাছে আনতে চায়, আবার দোসর হিসেবে পেতে চায় তার সারাদিনের স্বাভাবিকতায়, ছবি করে রাখাটা উত্তর মনে হয়নি তার। সে আরও কোন বলিষ্ঠ উপায় পাগলের মত খুঁজতে খুঁজতে তখনকার মত মাকে তার হাতে উল্কিতে অবিনশ্বর করে রাখাটাকেই সমাধান বলে ভেবেছিল। আর এখনো পর্যন্ত মাকে এভাবে তার অঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করে সে অনেকটাই তৃপ্ত। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পেতে পেরেছে অনেকটাই, যদিও মাকে আরও জীবন্ত খুঁজে পাওয়ার অভিযানে তার অন্তরাত্মা এখনও মগ্ন।
‘জানো, আমার বিশ্বাস আমার যে বাচ্চা হবে সে হবে মেয়ে, আর আমার মা সেই মেয়ে হয়ে আবার আমার কাছে ফিরে আসবে। আসতেই হবে। আমাকে ফেলে আমার মা বেশি দিন অন্য কোথাও থাকতে পারেনি কখনো, এবারও পারবে না। আমি কেবল ভাবি, মা আমার কোথাও একটা বেড়াতে গেছে কিছুদিনের জন্য। যায় না বেড়াতে মানুষ কোন বিদেশে? থাকে না সেখানে বছরের পর বছর পর্যন্ত? তেমনই গেছে কোথাও মা। কিছুদিন তাই মাকে ফেলে থাকতে হচ্ছে আমাকে। ঘুরে বেড়াচ্ছে মা কিছুদিন বাইরে অন্য কোথাও। বেড়াক না, আবার একদিন আমার কাছে আসবে আমার মেয়ে হয়ে। আসবে নিশ্চয়ই বলো, আমাকে ছেড়ে কতদিন বাইরে বেড়াতে ভালো লাগবে মায়ের আমার? দেখছে না মা, আমি কী কষ্ট পাচ্ছি মা না থাকায়?’
আবেগমথিত গলায় কথাগুলি বলছিল মিশা। সে থামলে অঞ্চলা অনুরোধের গলায় বলল আমাকে,
‘উইশ কর যাতে মিশার একটা বাচ্চা হয় এবার, আর সে যেন মেয়ে হয়।’
বছর প্রায় চার আগে মিশা তার মাকে হারিয়েছিল। বলতে গেলে, একদমই হঠাৎ। কোনো অসুখ-বিসুখ ছিল না কিছুই। সিরোসিস অফ লিভার হয়ে গিয়েছিল। বুঝতেই পারা যায়নি।
‘সিরোসিস অফ লিভার হলে বুঝতেই পারবে না, সাধারণ অ্যাসিডিটি বা গ্যাস হবে। সিম্পটমস্ বুঝবে তখনই যখন পেশেন্ট ক্রিটিক্যাল। কিছু করার থাকবে না, একেবারে লাস্ট স্টেজ। মায়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-এ ছিল যখন মা তখন বুঝিনি আর সুস্থ হয়ে আসবে না। তবে একটা সান্ত্বনা কী জানো, মাকে তেমন ভুগতে হয়নি। সিরোসিস অব লিভার নিয়ে যারা বেঁচে থাকে তাদের খুব ভোগান্তি।’
মিশা বলছিল যখন অঞ্চলা তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল,
‘আর যখন লিভার বার্স্ট করে তখন যা হয় ভাবলেও আতঙ্ক।’
‘কী হয় বলতো?’ মিশা যোগ করল, ‘লিভার বার্স্ট করলে নাক-মুখ-চোখ-কান দিয়ে ভয়ংকর ব্লিডিং শুরু হবে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। যা কষ্ট হবে পেশেন্টের কল্পনা করা যাবে না। থ্যাংক গড, মাকে অন্তত সেই যন্ত্রণা পেতে হয়নি।’
আমরা আমাদের মায়ের গল্প করছিলাম। মিশা শোনাচ্ছিল তার মায়ের কথা, আমি আমার মায়ের। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কুড়ি বছর আগে আমার মাকে হারাবার পর আমি যেভাবে উদভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম তার কারণ বোঝাতে পারতাম না কাউকে। বন্ধুরা-স্বজনরা সবাই আমার পাগলের মত দশা দেখে হাসাহাসি করত, কারণ বুঝত না কেন আমার অতটা দৈন্যদশা। আমার ওই আত্মবিলাপ বোঝাতে পারিনি আমি কোনদিন কাউকে। মা না থাকা মানে যে আমার জগত না থাকা এটা বুঝতে পারত না স্বাভাবিক পৃথিবী আর কাউকে মনের জ্বালা বোঝাতে না পেরে আমি অবুঝের মত আন্তরিক দাপাদাপি করে মরতাম লোকচক্ষুর অন্তরালে, আর আমার ওই যন্ত্রণা বুঝতে চাইত না বলে জগতকে এবং জগৎবাসীকে অভিশাপ দিতাম। আর জীবনে এই প্রথম এতদিন পর একজন দোসর খুঁজে পেলাম যে আমার মাকে হারাবার কষ্টটা অনুভব করতে পারবে। কোন জগতের কোন মানুষই একা থাকতে ভালোবাসে না। তার বড় উদাহরণ, মানুষ হন্যে হয়ে মহাকাশে খুঁজে চলেছে অন্য এক প্রাণিসভ্যতা। আমিও আমার মা-হারানো জগতের দুঃখ বুঝতে পারবে তেমন এক দোসর পাওয়ার প্রতীক্ষায় ছিলাম যে আমারই মতো তার মাকে অক্লান্ত খুঁজে বেড়াবে স্বর্গে, মর্তে, পাতালে, আকাশে-বাতাসে, অনুভবে, জানা-অজানায়। যেমন আমি মাকে হারিয়ে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছি তখন একের পর এক নানা গল্প লিখে, উপন্যাসে চেষ্টা করে চলেছি আজও। মাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় বা তাকে চিরকাল জীবন্ত রাখার প্রয়াসে তেমনি মিশা তার হাতে প্রতিষ্ঠা করেছে উল্কি। আমি আর মিশা, আমাদের একই অনুসন্ধান, আমাদের হারিয়ে যাওয়া মা।
মাকে আমার এই অনুসন্ধান মা চলে যাওয়ার আগে থেকেই কেন জানিনা শুরু করেছিলাম এবং তারই ফল আমার ছেপে প্রকাশ করা একমাত্র উপন্যাস ‘অন্তরালোকে,’ আর মিশাকে সে কথা জানাতে সে চাইল তা পেতে এবং তাকে দেব জানালাম এই বলে যে সেখানে আমি আমার মাকে অবিরাম আবিষ্কারের চেষ্টা করে গেছি চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে করে জীবনের নানান উপত্যকায় বা পাহাড়ে-কন্দরে আর সে যদি আমার সহযাত্রী হয় তো ওই উপন্যাসের কোথাও না কোথাও হয়তো তার মাকেও খুঁজে পেয়ে যাবে। যেটা বললাম না তা হল, অনেকদিন আগে আমি আরেকটি সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলাম ‘মায়ের খোঁজে’ নামে যেখানে অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা ক্রোমি নামের এক বিজ্ঞানী তার মাকে হারিয়ে খুঁজে পাওয়ার এক অভিনব উপায় আবিষ্কার করেছিল। সেই অন্য পৃথিবীর বাসিন্দারাও সবাই মানুষের মতোই দেখতে এবং কেন তা বুঝিয়েছিলাম নিজস্ব যুক্তির মাধ্যমে। সেখানে তাদের পৃথিবী শাসন করে জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীরা, রাজনীতিকদের কোন অস্তিত্ব নেই। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার বাড়িতে কাজ করার জন্য ভুল করে এক চোরকে রেখেছিলাম, সে আমার কয়েকশো গল্প ও উপন্যাস ইত্যাদি হাতে লেখা ছিল যেসব খাতাতে সেগুলি লুকিয়ে এক ফাঁকে কিলো দরে বিক্রি করে দিয়েছিল পুরনো কাগজ কেনার দোকানে। জীবনে ওই আমার আরেকটি বড় হাহাকার এবং তা অন্য গল্প যা এখানে অবান্তর। প্রাসঙ্গিক হলো সেই ক্রোমির কথা যার কাহিনী আমি লিখেছিলাম মা বেঁচে থাকতেই। কেন কে জানে! সেই গল্পটি ছিল এখানে বড়ই মানানসই এবং মিশাকে তা পড়াতে পারলে সে অনেকটাই সান্ত্বনা খুঁজে পেত, আমিও পেতাম যদি তা হাতে থাকত। কিন্তু সে হারিয়ে গিয়েছিল মা বেঁচে থাকার শেষ পর্বে।
অঞ্চলা জানালো যে মিশা তার মায়ের প্রসঙ্গে কোন কথা বলতে গেলে কখনো অতীতকালের শব্দ ব্যবহার করে না। মা কী করেছিল বা বলেছিল সব সে প্রকাশ করে বর্তমান কাল দিয়ে আর এভাবে সে বোঝায় যে তার মা এখনও বর্তমান। মিশা বলতে লাগল,
‘আমি তো ভেবেছিলাম মাকে পিস হেভেনে রেখে দেব। মায়ের শরীরটাকে নষ্ট হতে দেব না কোনভাবেই। কিন্তু সবাই আমাকে বোঝালো আর আমিও ভেবে দেখলাম যে ওভাবে মাকে চিরকাল তো রেখে দেওয়া যাবে না। এক মাস, দু’-মাস বড়জোর। কেওড়াতলাতে মাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওখানে গঙ্গা আছে জানো তো, ওই যাকে টালি নালা বলা হয়? সেখানে ভাটার সময় জল শুকিয়ে যায়। মায়ের নাভি বিসর্জন দেওয়া হল ওখানে। ওইসময় জল ছিল না, নাভি তাই ডুবে না গিয়ে রিভার বেডে পলি-কাদায় পড়ে রইল দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার মনে হল, মা আমাকে ছেড়ে যেতে চায় না বলেই গঙ্গাতে জল ছিল না আর তাই মায়ের নাভি জলে ডুবে হারিয়ে গেল না।’
মা চলে যাওয়ার পর এখনও তার কাছে কত জীবন্ত হয়ে রয়েছে সেই কথা আমাকে একজন দোসর পেয়ে প্রাণ খুলে বলে যাচ্ছিল মিশা আর পাশ থেকে খেই ধরিয়ে দিচ্ছিল তার সহকর্মী ও বন্ধু অঞ্চলা। বাইরে গ্রাহকরা অপেক্ষা করছে। মিশা তাদের কথা ভুলে গেছে।
আমি কেবলই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এই কঠিন ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্রের প্রাত্যহিকতায় এতটা অনুভূতি কেউ সযত্নে এভাবে লালন করে আসছে কোন্ বলিষ্ঠ মানসিক প্রবাহে? বাইরে থেকে মিশাকে দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না তার মধ্যে গোপন রয়েছে কোন্ মানুষ। তার মাকে হারানো প্রসঙ্গে তার প্রত্যেকটি প্রকাশ ছিল অক্ষয় অনুভবের শিহরণ। হাতের অতটা অংশ জুড়ে পার্মানেন্ট ট্যাটু করতে অনেকটা সময় লাগার কথা। দশ ঘন্টা লেগেছিল তার। সকাল ন’টা থেকে একটানা বসে থেকেছিল সে দশ ঘন্টা, সুঁচ ফোটানোর যন্ত্রণা ভোগ করেছিল মুখ বুজে। সে বলল,
‘কী জানো, ওই কষ্টটা আমার তখন কষ্ট বলেই মনে হয়নি। মাকে আবার যেভাবেই হোক ফিরে পাব এই ব্যাপারটা আমাকে সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছিল।’
আমারও তো এমনই দশা হয়েছিল, দশ-বারো বছর স্বাভাবিক পৃথিবী থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলাম। মায়ের স্মৃতিবহ প্রত্যেকটি বিষয়কে আঁকড়ে রাখতাম জীবনে, যেমন মিশা রাখছে তার মায়ের ব্যবহার করা প্রতিটি বস্তু সযত্ন প্রয়াসে সুরক্ষিত।
‘মা কানে যে দুলটা পড়ত তার গায়ে লেগে থাকা একটু ময়লা, তাও আমি রেখে দিই। পরিষ্কার করি না, কারণ ওতো আমার মায়ের গায়ের স্মৃতি।’
মাকে এভাবে আমিও রেখে দিতে চাইতাম এবং এতদিন পরও চাই ঠিক একইরকম। মা তাজমহল দেখতে চেয়েছিল, দেখাতে পারিনি। আগ্রাতে গিয়ে সবাই তাজমহল দেখতে গিয়েছিল, আমি বাইরে দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি কি আর পুরী যেতে পারব কোনদিন? কারণ মাকে একবারই সেখানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম এবং মায়ের অসম্ভব ভালো লেগেছিল আর আবারও যেতে চেয়েছিল। পারিনি নিয়ে যেতে। আমি আর যাব কোন্ টানে? আমার এই বিষাদ শুনে মিশা প্রাণ খুলে সাড়া দিয়ে জানালো,
‘আমিও আর পুরী যেতে পারব না, কারণ মা চলে যাওয়ার ঠিক আগে আগে মাকে নিয়ে পুরী গিয়েছিলাম। সে তো ভোলা সম্ভব নয় কিছুতেই। আমি আবার পুরী যাব কিন্তু মা সঙ্গে থাকবে না তা কি হতে পারে?’
আমরা দুই দোসর মিলে আমাদের মায়ের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা সমস্ত ভালোলাগা বা বিষণ্ণতাগুলি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আমার মায়ের সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল এবং ইনটেনসিভ কেয়ারে ভর্তি ছিল মাসাধিক। মিশার মতো আমিও দিনরাত বসে থাকতাম হাসপাতালের ক্যান্টিনে বা লাউঞ্জে একনিষ্ঠ প্রতীক্ষায়। রাতে যখন ফোনের আওয়াজ বেজে উঠত কী যে বুককাঁপুনি হত! এই অনুভবের সঙ্গে মিশা আর আমি এক হয়ে গেলাম। এমনিভাবে আমরা একাত্ম হয়ে যেতে পারলাম আরও অনেক অনেক জায়গায়। মিশা তার ঘর সাজিয়ে রেখেছে মায়ের ছবির পর ছবি দিয়ে, আমার মায়ের ঘরেও একাধিক ছবি রয়েছে মায়ের। মিশা তার মায়ের ছবিকে চেয়ারে রেখে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পুজোর দিন নতুন কাপড় পরিয়ে সাজায়, আর আমি পুজোতে মায়ের বিছানা ঢাকতে কিনে আনি নতুন চাদর। মিশা অবশ্য তার মায়ের ছবিতে মালা পরায় না, কারণ তাতে মা চলে গেছে বোঝাবে। আমি কিন্তু মাকে মালা পরাতাম, ইদানিং পরাই না, তবে রোজ রাতে মেয়েকে নিয়ে মাকে ঘুম পাড়াই। মায়ের ঘর আমি বানিয়ে দিয়েছি ঠাকুরঘর এবং মাকে সেখানে টেবিলে রেখেছি প্রধান দেবতা হিসেবে। মায়ের সোফাতে রেখেছি কেবল মায়ের ছবি, সেখানে আর কেউ বসে না। মায়ের বিছানা পড়ে থাকে ফাঁকা, কেউ শোয় না। মায়ের ঘরে থাকে ঠাকুরদের নিয়ে মা, সে ঘর অন্য আর কোন কাজে লাগে না। মিশাকে বললাম,
‘কেউ বোঝেনা দোতলাতে অত কম জায়গা থাকা সত্বেও মায়ের ঘরটা কেন আমি অকাজে ফেলে রেখেছি।’
‘না, বুঝবে না কেউ। যেমন বোঝে না মায়ের জন্য আমার আকুলতা।’
গাঢ় গলায় বলল মিশা। সে জানাতে থাকে, অহরহ কিভাবে দৈনন্দিন জীবনে সে তার মাকে অনুভব করে। সে বলে,
‘জানো, আমার কিন্তু একবারও মনে হয় না মা নেই। আমি ফিল করি মা সবসময় আমার সঙ্গে আছে, আমাকে কখন কিভাবে চলব বলে দিচ্ছে।’
আমারও তাই মনে হয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে মা আমার সঙ্গে আছে আর আমার ভালো-মন্দ সববিষয় আমি মাকেই জানাই। অঞ্চলা বলে,
‘জানো, এত কম বয়সে মিশা এই যে ব্যাংকের এত উঁচু পোস্টে চলে যেতে পেরেছে এটা কিন্তু ওর মায়েরই আশীর্বাদ। নাহলে ওর চেয়ে সিনিয়র, অভিজ্ঞ, বেশি যোগ্য অনেকেই কিন্তু আছে।’
আমার ক্ষেত্রেও তো ব্যাপারটা এমনই সত্যি। আমার চাকরি-বাকরি, বাড়িঘর এবং সংসার সবই মা হাতে ধরে গড়ে দিয়ে গেছে। আমার ও মিশাদের জগতে মা তাই এক পঞ্চম মাত্রা দিয়ে তৈরি মহাবিশ্ব যাকে কেবল আমি আর মিশারাই দেখি, অন্য কেউ দেখতে পায় না। আমরা, আমি ও মিশারা ওই অতিরিক্ত ডাইমেনশনে গঠিত অন্য এক মহাবিশ্বের বাসিন্দা যেখানে অন্য আর কেউ প্রবেশাধিকার পায় না।
মিশা তার মাকে জড়িয়ে উপলব্ধিগুলি আমাকে শোনাতে থাকে,
‘জানো, আমি প্রায়ই কেওড়াতলায় যাই। ওখানকার মন্দিরে গঙ্গার ওই ঘাটে গিয়ে বসে থাকি বিশেষ বিশেষ দিনে, যেমন জন্মদিনে। আমার হাজব্যান্ড বুঝতে পারে, সকালেই বলে দেয় আমি কোথায় যাব। সেবার জন্মদিনে কী কান্ড হল জানো? বলতে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমি রাতে ঘাটে বসে আছি, জনপ্রাণি নেই। রাত তখন বারোটা বাজতে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখি একটা ছেলে ঘাট থেকে উঠে এল। কোথায় ছিল কে জানে? সে গিয়ে মন্দিরে ঘন্টা বাজালো ঢং ঢং ঢং। তখন ঘড়িতে দেখি ঠিক বারোটা বেজেছে। আমার মনে হল, মা বোধহয় আমার জন্যই ওই ছেলেটাকে দিয়ে ঘন্টা বাজালো আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। নাহলে ওই ছেলেটা সেদিন কোত্থেকে এল বলো আর কেনই বা সে মন্দিরে গিয়ে ঘন্টা বাজাবে? এমন তো আর হয়নি কোনদিন। নিশ্চয় মা-ই সেদিন আমার জন্য ওই ছেলেটাকে দিয়ে মন্দিরে ঘন্টা বাজিয়েছিল। আমার তাতে কোন সন্দেহ নেই।’
মিশা তার এই উপলব্ধির সমর্থন পাওয়ার আশা করছিল আমার কাছে। মরদেহ চলে যাওয়ার পর বাস্তব পৃথিবী কারও অস্তিত্বে আস্থা রাখে না। চোখে যা দেখা যায় না অথবা যা ইন্দ্রিয়াতীত তাতে বিশ্বাস নেই যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের। কিন্তু এই বিজ্ঞান মানুষের চর্চা, তাতে কি জগতের সব রহস্যের উত্তর আছে? নতুন কোন আবিষ্কার এখানেই শেষ, একথা বলার সাহস থাকে কি মানুষের জানা বিজ্ঞানের সর্বশেষ তত্ত্ব বা নিয়ম? বিজ্ঞান কি মানুষের অনুভূতি বা উপলব্ধির রংরূপ দেখাতে পারে? তা বলে কি ওইসব বিষয় মিথ্যে?
ব্যাংক থেকে বেরিয়ে সেদিন আমার বাহ্যজ্ঞানরহিত অবস্থা। ধাতস্থ হতে আমাকে বোধহয় দু’দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মানুষ দেখার অভিযান আমার এতদিনে মনে হচ্ছে সার্থক হতে চলেছে। এমন মানুষদেরই তো দেখতে চাই আমি যারা ওপরে যেমনই হোক ভিতরে সযত্নে লালন করছে কিছু অন্তত মানবিক ধর্ম। মানুষ কি আকারে হয়, নাকি হয় চেহারায়? রিক্ত তাই বলে, ভিতরে মানুষ হওয়াটাই আসল মানুষ হওয়া। আমার চারপাশে দিনরাত সেই মানুষদের দেখছি যারা ওপরে মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় সামিল। তারা মানুষের চেহারা নিয়ে, বয়স নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে বড় বেশি মাথা ঘামায়। মানুষ হওয়ার জন্য মানুষের চেহারা বা বয়স বা ক্ষমতা অথবা ধর্ম কোন ফ্যাক্টরই নয় এই সত্যিটা কতজন জানে?
দেখা হতে রিক্ত আমাকে বলল,
‘মানুষ হওয়ার প্রথম কথা হল অনুভূতি থাকতে হবে এবং হতে হবে আবেগপ্রবণ। এগুলি বলতে পারিস মানুষ হওয়ার অবশ্য প্রয়োজনীয় শর্ত বা নেসেসারি কন্ডিশনস্। ঠিক মানুষ যারা তাদের মধ্যে আবেগ আর অনুভূতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।’
আমি চুপ করে শুনছিলাম তার কথাগুলি। সে থামলে পর বললাম,
‘সেই ঠিক মানুষকে তো তবুও দেখতে পাচ্ছি না।’
রিক্ত আমাকে বুঝিয়ে দিতে লাগল,
‘তবু তো তুই তোর দোসর খুঁজে পাচ্ছিস, এটা কিসের কম কথা? এই যে অনুভূতিপ্রবণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পন্ন মানুষদের খুঁজে পাচ্ছিস এদের দেখে তোর মধ্যে প্রেরণা জাগছে না ?’
‘জাগছে।’
‘এটাই তোর মূলধন বা জ্বালানি, বেঁচে থাকার ও ঠিক মানুষ খোঁজার। ভেবে দ্যাখ্, এই প্রায় ঠিক মানুষদের দেখেই যদি তুই প্রাণিত হতে পারিস তাহলে ঠিক মানুষকে পেলে তুই কতটা প্রেরণা ও প্রাণ পাবি।’
‘সেই আশাতেই তো বুক বেঁধে আছি।’
‘সে আশা তো এবার বেড়ে গেল রে। তুই দেখছিস তোর চারপাশে এমন অনেকেই আছে যারা সর্বাংশে অমানুষ নয়, প্রায় ঠিক মানুষ এবং তোর দোসর হতে পারে। তুই যাদের দেখে প্রেরণা পাবি তারাই হবে ঠিক মানুষের গোত্রভুক্ত। ঠিক মানুষ দেবে তোকে অফুরন্ত প্রেরণা এবং তোকে আগাপাশতলা শোধন করে মানুষ বানিয়ে ফেলবে। যদি প্রায় ঠিক মানুষকে পাওয়া গেল তো ঠিক মানুষকেও পাওয়া যাবে।’
মিশাকে দেখে আগেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, এখন রিক্তর সঙ্গে কথা বলে আরও চাঙ্গা হয়ে উঠলাম।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
