পাঠক মিত্র

জলবায়ু পরিবর্তন ও সুন্দরবন 

পরিবেশ শব্দের সাথে প্রকৃতি শব্দের নিবিড় সম্পর্ক। তাই পরিবেশ বাঁচানোর কথায় প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা প্রথমেই আসে। আর পরিবেশ রক্ষা করার প্রশ্নে প্রথমেই যে কথাটা আসে তা হল বৃক্ষ রক্ষা করার কথা, বৃক্ষরোপণের কথা। এই কথাগুলো এখন আবার বিশেষ বিশেষ দিনে উচ্চারিত হয় সবথেকে বেশি। পরিবেশ বাঁচানোর বিষয় মনে করিয়ে দিতে এই বিশেষ বিশেষ দিনের চর্চা আজ আর নতুন কোন বিষয় নয়। যেমন ‘পৃথিবী দিবস বা ধরিত্রী দিবস’ যা পালিত হয় প্রতি বছর এপ্রিলের 22 তারিখ। আর ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ প্রতি বছর জুনের 5 তারিখ পালিত হয়। এই দুটি দিনে পরিবেশ বাঁচানোর তাগিদে বৃক্ষ বাঁচানোর কথা সবথেকে বেশি উচ্চারিত হয়। বন সংরক্ষণের গুরত্ব বেশি করে উপলব্ধ হয়। তখন ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’, ‘গাছ বাঁচান প্রাণ বাঁচান’ শ্লোগান দুটি যেন বেশি করে ভাবায়। গাছ আমাদের প্রাণ কারণ গাছ আমাদের প্রাণ বাঁচানোর অক্সিজেন দেয়। শুধু এই একটি বিষয়ে গাছ আমাদের প্রাণ তা কিন্তু নয়। অক্সিজেন যেমন দেয়, তেমন পরিবেশ থেকে খারাপ জিনিস শোষণ করে নেয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড সহ নানা দূষিত পদার্থ কে শোষণ করে বাতাসকে শুদ্ধ করে। গাছ হল প্রাকৃতিক ‘বায়ু পরিশোধক’। 

গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় বা বায়ু পরিশোধন করে তাই নয়। গাছ ছায়া দেয়, আশ্রয় দেয়, খাদ্য দেয়, ওষুধও দেয়। গাছ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, জল সংরক্ষণে সাহায্য করে। এমনকি জলদূষণ রোধ করতে পারে। গাছের সবুজ পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে যা মনকে শান্ত করে তোলে। মন শান্ত থাকলে মানুষের সম্পর্ক মজবুত থাকে। তাছাড়া অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টিতে গাছের অবদান কম নয়। ফলের বাগান যার একটি উদাহরণ।   

বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করলেন গাছের প্রাণ আছে। কিন্তু গাছ পরিবেশের প্রকৃত ধারক তা কিন্তু এ দেশে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। তিনিই প্রথম ‘বৃক্ষরোপণ’ উৎসবের সূচনা করেন। পৃথিবীকে দাবদাহের হাত থেকে বৃক্ষই বাঁচাতে পারে বলে তিনি প্রথম বলেছেন এ দেশে, যখন ‘উষ্ণায়ণ’ শব্দের ব্যাখ্যা আজকের মত উপলব্ধ হয়নি।

যথেচ্ছভাবে বৃক্ষছেদন করে বনরাজি ধ্বংস আর উন্নত সভ্যতার শিল্প দূষণের আক্রমণে ‘উষ্ণায়ণ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আজ। ফলত জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনে আজ ভুগছে মানুষ, ভুগছে পৃথিবী। জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যে বিশ্বসম্মেলনের আয়োজন থাকলেও কাজের গতি প্রায় স্থির। তবে গাছই জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন অনেকটাই রুখে দিতে পারে, আজ তা পরিষ্কার। গাছের বায়ু পরিশোধন করার ক্ষমতাই হল তার চাবিকাঠি। পাশাপাশি আবার শিল্পের দূষণ কমানোর চেষ্টায় সততা থাকতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশ সচেতনতায় গাছের উপকারিতা নিয়ে বৃক্ষরোপণ উৎসব আজ আর কেবল উৎসব নয়। এই উৎসব এখন পরিবেশ সচেতনতার এক উৎসব, পরিবেশ বাঁচানোর এক উৎসব, বৃক্ষ সংরক্ষণের এক উৎসব।

বৃক্ষ সংরক্ষণের প্রশ্নে অরণ্য সংরক্ষণ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যদিও সড়ক নির্মাণ, খনি খনন কার্য থেকে পর্যটন শিল্প অরণ্য ধ্বংসকে আজ একেবারে এড়িয়ে যেতে পারছে না। 

উষ্ণায়ণের কবল থেকে অরণ্য সংরক্ষণের প্রশ্নে পৃথিবীজুড়ে একটি অরণ্য সংরক্ষণের কথা আজ অপরিহার্যভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। তা হল ম্যানগ্রোভ অরণ্য । আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলের এই অরণ্য পৃথিবীখ্যাত তার বাসিন্দা বাঘের কারণে। শুধু তাই নয়, সুন্দরবন এক বৈচিত্র্যময় জীবের বাসস্থান। 

সুন্দরবনের বিস্তৃতি ভারত ও বাংলাদেশে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের দুই চব্বিশ পরগনার জুড়ে রয়েছে এই সুন্দরবন। দুই দেশে সুন্দরবনের মোট আয়তন ১৯,২৮৮ বর্গ কিমি । বাংলাদেশ সুন্দরবন ৯,৬৫৮ বর্গকিমি আর ভারতের সুন্দরবন ৯,৬৩০ বর্গকিমি । যার মধ্যে বনভূমি বাংলাদেশে ৬,০১৭ বর্গকিমি এবং ভারতে ৪,২৬৫ বর্গকিমি । দ্বীপের সংখ্যা ২৫১ টি’র মধ্যে ভারতে ১০২ টি । ভারতের ৪৮ টি দ্বীপে রয়েছে জনবসতি। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারত তথা বাংলার এই দ্বীপে প্রায় সাতচল্লিশ লক্ষ বাস করে।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সৌন্দর্য আজ প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আকর্ষণ প্রকৃতিপ্রেমী এবং পরিবেশবিদদের কাছে ভিন্ন । একটি পূর্ণ বয়স্ক ম্যানগ্রোভ গাছ কম করে চার জন মানুষের জন্য অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে । এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য পৃথিবীর এক ফুসফুস হিসেবে কাজ করে । দূষিত কার্বন গ্রহণ ক্ষমতা অন্য যেকোন স্থলজ অরণ্যের থেকে অনেক বেশি । শুধু তাই নয় এই কার্বন ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ নিজদেহে এবং মূলের সংস্পর্শে থাকা পলির মধ্যে বহুদিন সঞ্চয় করতে পারে । সারা পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ অরণ্য। সামুদ্রিক বাস্ত্ততন্ত্রের সামগ্রিক কার্বন সঞ্চয়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ। আমাদের দেশের অরণ্যের কার্বন সঞ্চয়ের প্রায় ০.৪১ শতাংশ এই বাংলার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অবদান। এই অরণ্যকে রক্ষা করতে না পারলে শুধু সুন্দরবন ও সুন্দরবনবাসীর বিপর্যয় নয়, তা সারা দেশবাসী তথা পৃথিবীবাসীর বিপর্যয়। 

উষ্ণায়ণের ফলস্বরূপ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি, দারুণভাবে বাস্ত্ততন্ত্রের ক্ষতিসাধনের প্রকপে শীর্ষস্থানে আছে সুন্দরবন এবং দ্বীপ রাজ্যগুলি । আইপিসিসি  র রিপোর্ট অনুযায়ী সুন্দরবনই আগামীদিনে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে । গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সুন্দরবনের প্রকৃত উচ্চতা ০.৯০ মি থেকে ২.১১ মিটার । প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে গড়ে ৩.১৪ মিমি থেকে ৪ মিমি যা সর্বভারতীয় গড়ের থেকে এক মিমি র উপর বেশি । ইউনেস্কোর এক রিপোর্ট বলছে একবিংশ শতাব্দীর শেষে সমুদ্রতল বাড়বে ৪৫ সেমি আর সুন্দরবনের পঁচাত্তর শতাংশ চলে যাবে জলের তলায় । সুন্দরবনে জলের তাপমাত্রা বিগত তিন দশকে ছয় শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে । প্রতি বছর গড়ে প্রায় ০.০৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে । এই শতাব্দীর প্রথম দশকে সুন্দরবনের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে গড়ে ০.১০৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । কেবল সমুদ্রতলের তাপমাত্রা বাড়ছে তা তো নয় । পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে । পৃথিবীর তাপমাত্রা এই সময়ের নিরিখে বাড়তে থাকলে এই শতকের শেষে বাড়বে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা লক্ষ্যমাত্রার থেকে প্রায় দ্বিগুণ। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবের মতে এভাবে চললে আমরা অতলে তলিয়ে যাওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছি । ২০৩০-এ দেশের উপকূলবর্তী কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই সহ বারোটা শহরে ঢুকে পড়বে সমুদ্রের নোনা জল।

আজও উপকূল অঞ্চলের প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানগ্রোভ অরণ্য উপকূলবর্তী অঞ্চলকে যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অত্যাধিক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে এবং বাঁচিয়ে চলছে। এই বনাঞ্চল তার পশ্চাতভূমিকে রক্ষা করেছে আয়লা, সিডার থেকে ইয়াস, আমফানসহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব থেকে । এখনও জলবায়ু পরিবর্তনকে রুখে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অবদান অনস্বীকার্য । শুধু তাই নয় সুন্দরবন তার আশেপাশের জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের একটি মূল্যবান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে । বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলস্বরূপ জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবনের জল ও ভূমির লবণাক্তের মাত্রা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী মাত্রাবৃদ্ধির থেকে বেশি, ফলে সুন্দরবনবাসীদের কর্মসংস্থান আজ সংকটের মুখে। তাই এর গুরুত্ব অবহেলা করা মানেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আহ্বান করা আর সুন্দরবনবাসীকে জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত করা। 

আধুনিক শিল্প সভ্যতার গ্রাসে এই অরণ্যের পরিসর পঞ্চাশ বছর আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। পরিসংখ্যান বলছে আটশো কুড়ি বর্গ কিলোমিটার-এর বেশি সুন্দরবনের ভূমি ক্ষয় হয়েছে । বিগত কয়েক দশকে অরণ্যের বারো শতাংশ কমেছে। পৃথিবীজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দ্বীপ ছোট হয়ে যাচ্ছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস-হুমকির মুখে । হুমকির এই মুখ থেকে অরণ্য বাঁচাতে অরণ্যের পরিসর বাড়াতে পৃথিবীজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা নানাভাবে কাজ শুরু করেছে । কিন্তু সেই কাজ সুন্দরবনকে ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে কতটা রক্ষা করতে পারবে তা সময় বলবে। তবে বছর বছর জলবায়ু সম্মেলনে তার প্রকৃত রূপরেখা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কেউই তাদের প্রতিশ্রুতি রাখার কথা মনেই করে না। উষ্ণায়ণের কারণ উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণের জন্য যেমন দায়ী, তেমন ধনী মানুষরাও দায়ী। বিশ্বের ৯ শতাংশ ধনী মানুষ বাহান্ন শতাংশ,  আর পঞ্চান্ন শতাংশ গরিব মানুষ সাত শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী।  

একটা কথা, অরণ্য বাঁচাতে, জলাভূমি বাঁচাতে মানুষের সচেতনতা যেমন প্রয়োজন তেমনই অরণ্য রক্ষা করতে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার প্রয়োজন। এই দুই পক্ষের সচেতনতা এবং সদিচ্ছার মেলবন্ধনই পৃথিবী কে অতি দ্রুত উত্তপ্ত থেকে রক্ষা করতে পারে, সুন্দরবন কে রক্ষা করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবনের ভবিষ্যত সম্পর্কে এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবন’ সংকলন গ্রন্থে । কুড়িটি প্রবন্ধের সমন্বয়ের এই সংকলনে উঠে এসেছে সুন্দরবনের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যত। এমনকি সুন্দরবন বাঁচানোর ক্ষীণ প্রচেষ্টার প্রতিফলন রয়েছে । সুন্দরবনবাসীর জীবিকা সংকট থেকে নারীর স্বাস্থ্য সংকটের বর্ণনা শুধু লিপিবদ্ধ হয়নি, জলবায়ু পরিবর্তনে তার তীব্রতার প্রভাব সম্পর্কে আলোকিত হয়েছে । প্রবন্ধগুলি গবেষক, অধ্যাপক, শিক্ষক, সমাজকর্মীর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় পুষ্ট এই প্রবন্ধ সংকলন সুন্দরবনের এক দলিল যা আগামীদিনে গবেষণার কাজকে আরো সমৃদ্ধ করবে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবন 

সম্পাদনা–রাকেশ শাসমল/প্রলয় কুমার হালদার

গাঙচিল, কলকাতা-১১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *