আশিস ভৌমিক

লেখক পরিচিতি

 (জন্ম 5 ই এপ্রিল 1974, গ্রাম -বৃন্দাবনচক , পাঁশকুড়া , পূর্ব মেদিনীপুর ।প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামে ।উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় ।সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ।গৃহ শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য চর্চা । বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন ।  প্রথম কাব্যগ্রন্থ “”হিরণ্ময়ী ” । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” কালবেলা “।

তৃতীয় পর্ব

এবার আমরা প্রবেশ করব ‘পপোল ভুহ্’ বইটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে যেখানে হিরো টুইন্স অর্থাৎ যমজ ভাতৃদ্বয় তাদের বাবা কাকার প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল পাতালে, তার প্রতিশোধ নিতে তারা পাতাল রাজ্যে যাবে এবং মৃত্যুপুরী থেকে তাদের বাবা কাকাকে পুনরায় জীবিত করবে যা এই কাহিনীটি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড জুড়ে আছে। আমি ঘটনা পরম্পরা বজায় রাখতে আগে তাদের বাবা কাকার কাহিনী আগে শোনাবো পরে যমজ ভাইদের কাহিনীতে আসবো যদিও আসল বইটির শুরু হিরো টুইন্সের পাতাল গমন দিয়ে।

তবে সবার আগে মায়ানদের প্রিয় একটি খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) সম্বন্ধে কিছু না বললেই নয়, যা এই কাহিনীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

মায়ানদের প্রিয় খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok)

হ্যারি পটার এবং চেম্বার অফ সিক্রেটস মুভির কুইডিচ ম্যাচ এর কথা মনে আছে? সেই  উত্তেজনাপূর্ণ খেলাটা ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। কিন্তু মায়া সভ্যতার পোক-তা-পোক খেলার সঙ্গে এর অনেক মিল আছে! যদিও এখানে জাদুর ঝাড়ু ছিল না, তবুও খেলাটি ছিল ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং আর রোমাঞ্চকর। এই খেলা হয়ে উঠেছিল একটি পুরো সভ্যতার জয় পরাজয়ের রাজনৈতিক নির্ধারক।

পোক-তা-পোক খেলার উৎপত্তি

পোক-তা-পোক (Pok-Ta-Pok) ছিল মেসোআমেরিকার অন্যতম প্রাচীন বল খেলা। এই খেলার শিকড় প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ওলমেক সভ্যতার সময়ে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেখানেই প্রথম এই ধরনের বল খেলার উদ্ভূত হয়েছিল। যদিও ওলমেকরা এই খেলার সূচনা করেছিল, তবে এটি মায়া সভ্যতায় সর্বাধিক বিকাশ লাভ করে। মূলত, সেই সময়েই এই খেলা বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে। 

খেলোয়াড়দের সংখ্যা ও দল

পোক-তা-পোক খেলা সাধারণত দু’টি দলের মধ্যে খেলা হত। প্রতিটি দলে থাকত ২ থেকে ৫ জন। তবে কখনো কখনো আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়েও খেলা হতো।

বল ও খেলার কোর্ট

এই খেলাটি মূলত বিশেষভাবে নির্মিত “বল কোর্ট” বা পেলোটে ড্রোম (Pelote Drome)-এ খেলা হত। কোর্টগুলো ছিল আয়তাকার আকৃতির এবং এর দুপাশে ছিল উঁচু দেওয়াল, যা বলকে মাঠের বাইরে যাওয়া থেকে রোধ করত। অন্য দুই দিকে উঁচু প্রাচীরের ওপর থাকতো মন্দির। কিছু কোর্টে পাথরের গায়ে ধাতুর তৈরি রিং (হুপ) থাকত। যেটার মধ্যে দিয়ে বল ফেলা হতো। চিচেন ইৎজা, কোপান, টিকালসহ অনেক মায়া নগরে বিশাল আকারের বল কোর্ট পাওয়া গেছে, যা মায়াদের স্থাপত্যশৈলী আর নগর পরিকল্পনার নৈপূন্যতা প্রদর্শন করে। এই কোর্টগুলো শুধু খেলার জন্যই ছিল না, বরং এক ধরনের সামাজিক আর ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত।

খেলায় ব্যবহৃত বলটি ছিল রাবারের তৈরি, যার ওজন ছিল প্রায় ৩-৪ কেজি। বুঝাই যাচ্ছে, বলটি বেশ ভারী ও শক্ত হত। তাই খেলোয়াড়দের জন্য এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না।

খেলার নিয়ম 

এই বল খেলার নিয়মগুলিকে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে, চিত্রিত উপস্থাপনা এবং পাথরের স্মৃতিস্তম্ভের জন্য। খেলার শুরুতে বলটি হাতে কোর্টে ছুঁড়ে ফেলা হত এবং সেই মুহূর্ত কাঁধ, কোমর, হাঁটু আর কনুই দিয়ে বলটিকে আঘাত করতে হতো। ভাবতে পারছেন, কতটা কঠিন? তার ওপর, বলটির ওজনের কারণে এটিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করাও বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। খেলার মূল ব্যাপার ছিল বলটাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা আর প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো। কেউ যদি বল মাটিতে ফেলে দিত, তাহলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পেত। অর্থাৎ পয়েন্ট কাটা যেত। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বলটাকে দেয়ালের পাথরের রিংয়ের ভেতর দিয়ে পাঠানো। যেটা করতে পারলেই, খেলা শেষ—সরাসরি জয়! তবে পয়েন্টের ভিত্তিতে সাধারণত নিষ্পত্তি ঘটতো। তবে স্কোরিং সিস্টেম বা বিজয়ী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ঠিক জানা যায় না।  Popol Vuh-এর তথ্য অনুসারে আমরা অনুমান করতে পারি যে খেলাটি একের পর এক, জোড়ায় বা দলে খেলা যেতে পারে। চিত্রগুলিতে, খেলোয়াড়রা বিভিন্ন মনোভাব নিয়ে উপস্থিত হয়।

মজার ব্যাপার হলো, খেলাটি সাধারণত রাজা পুরোহিত এদের সঙ্গে বন্দী বা কয়েদির খেলা হোত। সেখানে নানান ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাকে হারানো হোত এবং খেলা শেষে তাকে বলি দেওয়া হোত। যদি কোনক্রমে সে রিং এর ভেতর বল গলিয়ে জিতে যায় তাহলে রাজা পুরোহিতের মাথাকাটা পড়ত। আসলে এই খেলার সঙ্গে পোপোল ভুহের যমজ ভাইদের কাহিনি জড়িত, যেখানে তারা ভূগর্ভস্থ দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। মায়ারা বিশ্বাস করতেন যে, এই খেলার মাধ্যমে আলো এবং অন্ধকারের শক্তির লড়াই প্রকাশ পায় এবং এটি জীবনের চক্র—যেমন জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের প্রতীকও বটে!

একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মায়া সভ্যতা ছিল মধ্য আমেরিকায় রাবার ব্যবহার করা প্রথম জাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পোক-তা-পোক খেলার বল ছিল রাবার দিয়ে তৈরি। আর এই রাবার ছিল মায়া সভ্যতার একটি বড় আবিষ্কার। মায়ারা এক ধরনের বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে রাবার তৈরি করত।

-: হিরো টুইন্স’- এর গল্প :-

পাতাল লোকে ফুটবল ম্যাচ 

তখনও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়নি। সবুজ পালকের আবরণধারী প্রভু সমুদ্রের দেবতা গুকুমাটজ এবং স্বর্গের দেবতা হুরাকান সৃষ্টির নেশায় সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাহাড় পর্বত নদী ঝর্না তথা স্থলভাগকে ওপরে আনেন এবং সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলেন। পশু পাখি সাপ ইত্যাদিতে ভরে দিলেন চারণভূমি। তবে প্রত্যেকের জন্য ছিল নির্দিষ্ট নিজস্ব চারণভূমি। কিন্তু তারা এতে সন্তুষ্ট থাকলেন না। তারা চাইলেন আরও উন্নত প্রানী। যারা তাদের সৃষ্টিকর্তাদের স্মরণ করবে, তাদের মহান কীর্তি প্রচার করবে। আচার অনুষ্ঠান বলিদানের মাধ্যমে পূজার্চনা করবে। তাই বানাল মাটির মানুষ পরে আরও উন্নত মানুষ বানানোর অভিপ্রায়ে বানানো হলো কাঠের মানুষ। এরজন্য ডাক পড়েছিল দুই দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের। কিন্তু এই মানুষগুলো ছিল নৃশংস। তাই তাদেরও ধ্বংস করা হয়। কিছু কাঠ মানুষকে বাঁদরে পরিনত করা হলো। এই মর্তভূমিতে দেবতারা প্রায়ই আমোদ প্রমোদের জন্য আসতেন। মর্তভূমি তখন ছিল দেবভূমি। 

দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের দুই যমজ পুত্র ছিল। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপু। এরা ছিল দুর্ধর্ষ  “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) যা একপ্রকার মেসোআমেরিকান ফুটবল – এই খেলায় পারদর্শী। তারা দিনরাত এই খেলায় মেতে থাকতো। এই খেলায় মুখরিত হোত পৃথিবী। 

তারা খুব প্রতিভাবান ছিল, সবসময়েই এই খেলায় তারাই জিতত। জিতলে কী হয়, তারা খেলবার সময়ে বড্ড জোরে জোরে চিৎকার করত। পাথরের বল কোর্টটি জিবালবার প্রবেশপথের ঠিক উপরে অবস্থিত ছিল। তাদের ক্রমাগত চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তথাকথিত মায়া নরক দেবতা এক্সিবালবার। এইরকম চিৎকারে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে তিনি নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে যমজ দেবতাকে সমন দিলেন। এই এক্সিবালবা অত্যন্ত বদরাগী এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের দেবতা ছিলেন।আকাশের দেবতারাও তাদের এড়িয়ে চলতো। মায়ারা সচরাচর এর নাম মুখে আনতে চাইত না। কেননা মায়াদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি ভুল করেও এর নাম মুখে আনে তবে তার আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।

সে যাই হোক,স্বর্গের দেবতাদের বারন সত্ত্বেও খেলার প্রতি ভালোবাসা আর আত্মসম্মান রক্ষার্থে তারা পাতালে যায়। হুন হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু দেবতাদের প্রায় ঠেলে দিয়ে অনায়াসে পাতালের নয়টি স্তরই অতিক্রম করতে পেরেছিল। এরপর তারা পাতালে প্রবেশ করলে হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে জিবালবার প্রভুরা(১২ জন দেবতা) তাদের ব্যবহারিক রসিকতার মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানালেন। তখন নরক দেবতা তাদের বেশ কয়েকটা কঠিন পরীক্ষার সামনে ফেললেন। প্রথমে তাদের বলা হল যে তারা যেন যেভাবেই হোক কাঁটার সেতু পেরোয়। এই সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নদী। তারা সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে নরকের দেবতার কাছে পৌঁছালেন। সেখানে নরক দেবতা একটা কাঠের ছড়ি কাঁধে ঠেকিয়ে অভিবাদন করলেন। তারপর দুজনকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে এই দেবতাদ্বয়কে কি তারা চিনতে পারেন! দেবতাদ্বয়কে তারা চিনতেন না। ফলে এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলেন। তখন এক্সিবালবা তাদের শয়তানি করে একটা নিরীহ কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। দুই ভাই তার চক্রান্ত ধরতে না পেরে সরল বিশ্বাসে সেই বেঞ্চিতে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন সে বেঞ্চিতে আগুন ধরে গেল। তারা আগুনে বেঞ্চি থেকে বেরুতে না পেরে পুড়ে মারা গেলেন। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে মারার পর  হুন-হুনাহপুর মাথা পাতালের একটি ক্যালাবাস নামের গাছে কাঁটার সাহায্যে স্থাপন করা হয়। আর তার দেহ তার ভাইয়ের সাথে গাছের পাদদেশে সমাহিত করা হয়।

শিবালবার রাজাদের অবাক করে দিয়ে, গাছটি সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে এবং তারপর থেকে এই গাছটি পবিত্র হয়ে ওঠে।একদিন জিবালবার রাজকুমারী এক্সকুইক, (যাকে ব্লাড মুন দেবীও বলা হয়), যখন বাগানে বেড়াচ্ছিল তখন সে এই মাথাটি দ্বারা আকৃষ্ট হন, যদিও তাকে এটি থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। তিনি গাছের আসেন এবং একটি ফল কুড়োতে গেলে মাথাটি তার হাতে থুতু দেয়। এরফলে সে অলৌকিকভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এরপর তাকে পাতাল থেকে বহিস্কার করা হয়। সে তখন পাতাল ছেড়ে পৃথিবীর উপরের রাজ্যে তার শাশুড়ি এক্সমুকেনের(জুমুকেন) সাথে দেখা করেন এবং ঘটে যাওয়া সমস্ত কাহিনী বিবৃত করেন।

 এক্সমুকেন তার ছেলেদের উপর ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির কারণে, এক্সকুইককে অবিশ্বাস করে এবং নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তাকে বেশ কয়েকটি কাজ দেয়। এক্সকুইক একে একে পরীক্ষাগুলি উত্তীর্ণ হন এবং কিছুটা বিশ্বাস অর্জন করে। এদিকে নির্ধারিত সময়ে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। অথচ তাদের দিদার মনে তাদের প্রতি অবিশ্বাস রয়েই যায়। তখন তাদেরও দেখাতে হয় যে তারা যোগ্য পিতার সন্তান। তারপর সে তাদের কাছে টেনে নেয়। দুই যমজ নাতি বড় হয়ে ওঠে।

জুমুকেন বা এক্সমুকেন তার ছেলেদের খেলার বল ও সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখত কারণ সে চায় না যে তার নাতিরা তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছে তা জানুক এবং তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করুক। কিন্তু ভবিতব্য খন্ডাবে কে? যমজরা সরঞ্জামটি খুঁজে পায় এবং তারা দুর্ধর্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া তারা দুর্দান্ত শিকারী এবং জাদুকরী ক্ষমতাও অর্জন করে। একদিন শিকার করতে গিয়ে তারা একটি ইঁদুর ধরে এবং ইঁদুরটি তাদের বলে, পাতালে তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছিল। তারা তখন মনেমনে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *