কুন্তল দাশগুপ্ত
এলে কী যেতেই হবে? গেলে তো আসে না অনেকেই। এই যে আমাকে ঘিরে এসে পড়ে দিন— থাকে না তো, চলে যায়— কই, আর তো ফেরে না! এই যে এসেছি— আছি— যাই নি তো, তবে যেতে হবে সেটা নিশ্চিত। গেলে কী ফিরব আর? এই মেঘ, এই নদী, এইসব গুঁড়ো গুঁড়ো গল্প কথন এমন ভাবেই আর পাব কক্ষোনো? পাব না— জানি— ফেরার রাস্তা মুছে তবে যেতে হয়।
আসবার সমারোহে মুখ ঢেকে অপেক্ষা করে থাকে যাওয়ার প্রহর, যাওয়ার বেলায় আর এমন হয় না— এই সত্যকে আঁকড়ে থেকেই উড়ে আসা মেঘ, ছুটে আসা ঝড় থামাতে পারেনি পথ চলা। জানি ওরা চলে যাবে, আর ফিরবে না। সুতো কেটে উড়ে গেছে কত প্রিয় ঘুড়ি, শূন্য কাটিম হাতে আমি প্রান্তরে। চাঁদিয়াল চলে গেলে— মোমবাতি-বগ্গারা ভরাতে পারে কি আর সেইভাবে কাটিমের বুক? যে যায়— সে যায়, ফেরে না কখনও।
আগত সবাই কী তবে চলে যায়? কেউ কি, কিছু কি থাকে না? শীতের প্রহর জুড়ে থেকে যায় বসন্ত প্রার্থনা। আকাঙ্ক্ষার রেণু ওড়ে পৃথিবীর বাতাসে বাতাসে। আর থাকে অতীত-যাপন। মানুষ তো বেঁচে থাকে প্রধানত অতীতে-আগামীতে। সে যখন যায় সবটুকু নিয়ে যায় আকাঙ্ক্ষা ও স্মৃতি— এটুকুই সম্বল যেতে যেতে পিছু ফিরে চাইবার?
কীই বা চাইতে পারে বিদেহী? আকাঙ্ক্ষা তবে অবহ্ন্যুমান অস্তি? পুনরাগমনের আবাহনে বৃত্ত রচনা করে? তবে কেন্দ্রের ভার কার? আবাহকের? তার স্মৃতি কোশে বিগতের রয়ে যাওয়া কি ফিরে ফিরে আসা নয়? তবে পুনর্জন্ম কাকে বলো? নির্জনে মনন-সমুদ্র তীরে আঁচলের ছায়া, উৎস-মথন-গন্ধ ফিরে ফিরে আসে— এই তো পুনর্জন্ম, বলো…
ওরে কাঁদ, একটু কাঁদ…
দুটো কাঁধ খামচে ধরে প্রবল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মাসিক আকুল কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে মনোলগ থেকে পলিলগে— সে।
অবাক হয়। অতি স্বাভাবিক পরিণতিতে অপরিণত মনস্কতার বাড়াবাড়ি দেখে।
হ্যাঁ, মাত্র তেতাল্লিশ। কিন্তু ক্যান্সার।
শেষ তিন বছরের যুদ্ধ লড়লে এই রোদন বিলাস… ফুঃ
এই নে ধর।
এই-ই তবে অবহ্ন্যুমান অস্তি!
তেতাল্লিশ বছরের বিস্তৃতি এইটুকু মাটির তালে ধরা!
এই, এই-ই তবে মা, মা-টি!
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
