তপোপ্রিয়

মধ্যরাত্রির অভিনয়

মানুষের কাছে দিনগুলি বেশি আকর্ষণীয়, নাকি রাত্রিগুলি? কাজকর্ম বিচার করে বলতে গেলে দিনগুলিকেই আগে রাখতে হয়। কিন্তু রাত্রির একটা বিশেষ আবেদন রয়েছে। রাতের কোন ঘটনা অনেক বেশি গভীরে যেতে পারে। দিনে ঘটা ঘটনা গুলি সামুদ্রিকভাবে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও মনে হয় যেন রাত্রির তুলনায় তাদের গাম্ভীর্য কম। 

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ অবশ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, অন্যের ক্ষেত্রে তা সত্যি নাও হতে পারে। তবে আমার জন্য সব সময় উপলব্ধি করেছি যে রাত্রি এক অন্যরকম মাত্রা নিয়ে হাজির হয়। 

রাতে ঘটা অনেকগুলি ঘটনা আমার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তাদের কোন একটি কেউ মনে করলে ভিতরের সবকিছু অথর্ব হয়ে যায়। সজ্ঞানেও তখন অজ্ঞান হতে থাকি। চারপাশের বাস্তবতা থেকে মনে হয় আমি বিচ্ছিন্ন, নিজের অস্তিত্বকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না। 

সম্ভবত সেটা গ্রীষ্মকাল। একদিন গভীর রাতে মা হঠাৎ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। উঠোন ভর্তি তখন আঁটিবাঁধা ধানের মড়াই আর স্তূপাকার খড়। আঁটি থেকে ধান ছাড়া যেন একটা উৎসব— তার প্রস্তুতি, প্রাথমিক কাজকর্ম মিলিয়ে গোটা প্রক্রিয়াতে উৎসাহের অন্ত থাকত না। ধান ঝাড়াইয়ের দুটি পদ্ধতি চালু ছিল। একটিতে দুহাতে ধান গাছের আঁটি পাকড়ে ক্রমাগত আছাড় মারতে হতো কাঠের পাঠাতনে যতক্ষণ না সব ধান ঝরে যায়। এতে পরিশ্রমও হতো, সময়ও লাগতো বেশি। সেজন্য দ্বিতীয় পদ্ধতিটা ছিল বেশি জনপ্রিয়। এখানে এক পাল গরুকে লাগানো হতো ধান ঝাড়াইয়ের কাজে। উঠোনের মধ্যেখানে পাঁচ-ছ ফুট উঁচু বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার গায়ে লম্বা ও শক্ত একটা দড়ি আটকানো হতো এমন ভাবে যে দড়িটা নিয়ে চক্রাকারে ঘুরলেও সেটা খুঁটিতে জড়িয়ে যেত না। ওই লম্বা দড়ির এক-দেড় ফুট ব্যবধানে আরেক খণ্ড করে দড়ি আটকানো থাকতো। খন্ড ধরি গুলোতে বাঁধা হতো একটি করে গরু। একপাল গরুকে এভাবে লম্বা দড়িটাতে জুড়ে দিয়ে শুরু করত সবাই ধান ঝাড়াইয়ের কাজ, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হত ধানের মাড়া দেওয়া।

তার আগে অন্য কাজ ছিল। কাজগুলিতে দুশ্চিন্তা আর পরিশ্রম থাকতো ঠিকই কিন্তু আনন্দ কম পাওয়া যেত না। ধান কাটার মরসুমে মায়ের দিনগুলি শুরু হতো ভোরবেলা, অন্তত পাঁচটাতে আর শেষ হতো রাত দশটা-এগারটায়। ধানে মাড়া দেওয়া হতো সাধারণত দুপুরের পর, বিকেলের ছায়া উঠোনে ঘনিয়ে আসার উপক্রম হলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কাজটা হতো পরিকল্পনা মাফিক, দু-তিন দিন আগে থেকে প্রস্তুতি চলতে থাকতো। গরু জোগাড় করা ছিল একটা বড় সমস্যা। একটা-দুটো গরু ছিল মায়ের, কিন্তু একটা-দুটো গরু দিয়ে মাড়া দেওয়া যেত না। অন্তত তিনটে গরু লাগবেই। পাঁচটা-ছটা গরু হলেই ভালো। আবার দুধের গরু হলে চলবে না এই কারণে যে তার দুধ নাকি শুকিয়ে যাবে। একটা প্রবচন বলতো সবাই, শুনতাম মায়ের মুখেও। স্থানীয় লোকেদের কাছে শুনেই মা শিখেছিল আর বলতো প্রসঙ্গক্রমে, 

‘মানুষ মরে হাড়ায় আর গরু মরে মাড়ায়।’

স্থানীয়ভাবে হাড়া শব্দটির অর্থ হল হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। ধান ঝাড়াইয়ের মাড়াতে গরুগুলির খুবই পরিশ্রম হতো, কারণ একনাগাড়ে তিন-চার ঘন্টা একটা খুঁটিকে কেন্দ্র করে কেবলই ঘুরতো তারা। বেশি চাপ পড়তো সেই গরুটার ওপর যে থাকতো খুঁটির সবচেয়ে কাছে। 

গরুগুলিকে খুঁটিতে আটকানো দড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়াকে বলতো সবাই জোয়ালে জোড়া। তার আগে ধানের পাঁজা থেকে আঁটি আঁটি ধান নিয়ে খুলে ছড়িয়ে রাখা হতো খুঁটির চারপাশে, ওভাবেই একটা বৃত্ত রচনা করা হতো, যার পরিধিতে থাকতো জলে বাঁধা শেষপ্রান্তের গরুটি। জমি থেকে ধান কেটে আনার পর আঁটি আঁটি ধান একের পর এক রেখে সাজিয়ে তোলা আহত চক্রাকার ধানের পাঁজা। ধান কাটার দিনগুলিতে উঠোনের কোণ আর ধারগুলিতে একাধিক ধানের পাঁজা দাঁড়িয়ে যেত, কোনোটা এক মানুষ উঁচু কোনোটা দু-মানুষ। বেশিদিন ধান পাঁজায় রাখা যেত না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঝাড়াই করে ফেলতে হতো। দশ-বারো দিন জমে থাকা পাঁজা ভাঙ্গা হলে দেখতাম তলার দিকের আঁটিগুলি তুলতে গেলে আগুন আগুন গরম আর ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। এটা আরো প্রবল হত যদি ধানের পাঁজা বৃষ্টিতে ভিজতো। এমনও হতে দেখা যেত যে তলার দিকের আঁটিগুলির ধান গরম ভাঁপে সেদ্ধ হয়ে খোসা ফাটিয়ে ভাত হয়ে বেরিয়ে আসতো।

জমি থেকে ধান কেটে আনার পর মায়ের প্রধান চিন্তা হতো কত তাড়াতাড়ি মাড়া দিয়ে ফেলা যায়। একটি পাঁজার মাড়া দিয়ে ফেলা মানে অপূর্ব শান্তি। যার উঠোনে ধানের পাঁজা জমে থাকতো না তার মত সুখী কে? ধানের মাড়া দেওয়ার বড় সমস্যা ছিল গরু জোগাড় করা। গরু সাধারণত আনা হতো ধার করে এই শর্তে যে তুমি আমাকে একদিন গরু দিয়েছো যার বিনিময়ে আমিও তোমাকে একদিন গরু ধার দেব।

মায়ের আরো সমস্যা ছিল। জোয়ালে বাঁধা গরুগুলিকে অনবরত খেদিয়ে নিয়ে যেতে হতো, একজনকে তাই ছড়ি হাতে সর্বক্ষণ গরুগুলির পিছনে না ঘুরলে চলতো না। এই গরু খেদানোর লোকটি মা জোগাড় করত এক-দু ধামা ধানের বিনিময়ে। ঘুরতে ঘুরতে গরুগুলি আবার মুখ নামিয়ে ধানসুদ্ধ খড় খেতে যেত, তাদের মুখ থেকে তা কেড়ে নিতে হত। বাঁশের বেত থেকে তৈরি একরকম মুখোশ তাই অনেকে পরিয়ে দিত গরুগুলির মুখে। গরুগুলিকে নিয়ে ঘুরে যাওয়া ছাড়াও একটু পরপরই বিছিয়ে দেওয়া ধান গাছ উল্টেপাল্টে দিতে হতো। পাঁজার সব আঁটিগুলি একবারেই বিছিয়ে দেওয়া যেত না, একটু পরপর নতুন আঁটি খুলে বিছিয়ে দিয়ে ধান ঝরে যাওয়া খড় ঝরিয়ে নেওয়া হত। এসব কাজ চলতো একসঙ্গে একটানা। মাকে তাই দু-একটা লোক রাখতেই হতো রোজ হিসেবে মজুরি দিয়ে। এসব ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া যেত বর্গা দিয়ে দিলে। বর্গাদার সব কাজ করে দিত। 

ধান মাড়াইয়ের সেইসব সন্ধ্যে আর রাতগুলি আমার জন্য নিশির ডাক হয়ে আসে। সমুদ্রসমান অকূল অন্ধকারে উঠোনে মলিন আলোর একখণ্ড ক্ষুদ্র দ্বীপ, সেই দ্বীপ রচিত হয়েছে একটা-দুটো হারিকেন বা কুপির আলো দিয়ে। কাজের সঙ্গে সঙ্গে চলতো নানান আলাপ-আলোচনা, গল্পগাছা। পরিশ্রমের মধ্যেও আনন্দ টের পাওয়া যেত ওইসব কথাবার্তায়। আকাশের নিখাদ কালোয় কোটি কোটি নক্ষত্রের মেলা বসে যেত, মনে হতো তারাও বুঝি উৎসুক শ্রোতা। রাত্রির যে কী প্রভাব তার টের পায় সেইসব স্মৃতি নিয়ে ভাবতে গেলে। জ্যোৎস্না থাকলে আলোর অভাব অনেকটাই কেটে যেত ঠিক কথা, কিন্তু সেই গম্ভীর গভীরতা একই রকম বজায় থাকতো। 

মাড়াইয়ের পর ধানের পাঁজা ফুরিয়ে যেত পরিবর্তে উঠোনে জমে উঠতো খড়ের স্তূপ। সেই ঘরের গাদায় চলত নানারকম খেলা। পাহাড়ে চড়ার মত পেয়ে উঠতাম, লুটোপুটি করতাম, গর্ত করে ভিতরে ঢুকে গা ঢাকা দিতাম। মায়ের বকুনি থাকতো, গা কুটকুট করতো প্রচন্ড, খেলা তবুও চলত।

সেই রাত্রির কথায় এবার ফিরে আসি। এমনই ধান কাটার মরশুম তখন, মা আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলেছিল। এখনো মনে হয় বোধ হয় স্বপ্নই দেখেছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন নয়। ঘুম ভাঙার পর দেখি হইহুল্লোড়, উঠোন ভাসছে আলোয়। রাতে এমনিতে জ্বলে হারিকেন আর কপি, সেখানে হ্যাজাক বাতি আলোর বন্যায় মনে হবে। সেই থৈ থৈ আলোয় উঠোন জুড়ে মানুষের ভিড়, সবার মাঝখানে একদল অদ্ভুত দর্শন মানুষ। তারা অদ্ভুত হয়ে উঠেছে তাদের বেশভূষায়। একজনকে সহজেই চিনতে পারলাম। তার পরনে বাঘছাল, সর্বাঙ্গে ছাই, মাথায় জটা আর হাতে ত্রিশূল। তার সঙ্গীসাথীদেরও গায়ে অদ্ভুত পোশাক, অনিয়মিত সাজসজ্জা। তারা সবাই মিলে চেঁচিয়ে চেনা ভাষায় অচেনা কথা বলছিল, অন্তত আমার শুনে তেমনই মনে হয়েছিল। কথাবার্তার সঙ্গে নাচানাচিও চলছিল তাদের। ঘুম ভাঙ্গা মধ্যরাতে সেই অভিজ্ঞতা দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি কোন অন্য জগতে চলে গেছি। আমার অবাক বিস্ময়কে এখনো আমি চোখ না বুজেই অনুভব করতে পারি। 

মধ্যরাত্রির ওই অদ্ভুত অভিনয় নাটকীয় হয়ে উঠেছিল অন্য কারণে। সেই বয়সে সেদিন বুঝতে পারিনি যে তারা আসলে সঙের দল। ফসল কাটার মরশুমে দল বেঁধে তারা বেরিয়ে পড়ে নৈশ অভিযানে। নানারকম পৌরাণিক পালা বা লোক কাহিনীর অভিনয় তাদের মূলধন। গৃহস্থের বাড়িতে মধ্যরাতে হাজির হয়ে নেচে গেয়ে অভিনয় করে দেখায়, বিনিময়ে উপার্জন হয়। সব গৃহস্থ টাকা দিয়ে অভিনয় দেখতে রাজি নাও হতে পারে, যারা রাজি হয় তাদের বাড়িতে, তাদের জন্যই অভিনয়। অবশ্য আশেপাশের সমস্ত লোকই সেখানে এসে যোগ দেয়, কোন বিধিনিষেধ থাকে না। অনুষ্ঠানের আয়োজন একাধিক গৃহস্থ মিলেও করতে পারে। অভিনয় দেখে খুশি হয়ে দর্শকরা  টাকাপয়সাও দেয়, সেসব হল অভিনেতাদের অতিরিক্ত উপার্জন। 

রাত সরগরম করে চলছিল অভিনয়। হঠাৎ দেখা গেল পার্বতী নেই। নেই তো নেই-ই। অভিনয় থেমে গেল, পার্বতীকে খুঁজতে লাগলো সবাই। কোথায় গেল, কোথায় গেল? খুঁজতে খুঁজতে তাকে পাওয়া গেল আমাদের খড়ের গাদায়, যেদিকে আলো নেই, লোক চক্ষুর আড়াল যেদিক। খড়ের গাদায় গা ফেলে পার্বতী ঘুমিয়ে কাদা। তার বেশভূষা অবিন্যস্ত। পার্বতীর সাজসজ্জা আড়ালে সে আসলে একটা ছেলে। পার্বতীকে ছেলে হিসেবে দেখে আমি সেদিন এমন অবাক হয়েছিলাম যে আজও তার রেশ অনুভব করতে পারছি। 

তারপর জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে এলাম। কত ঘটনার সাক্ষী থেকে যেতে হল নিজেরই অজান্তে। পরিবর্তন এমনই প্রকট যে গত দিন গুলির চোখে নিজেকে দেখে নিজেই চিনতে পারিনা। আজ যেখানে আছি সেও তো এক বিস্ময়। কেন এলাম কিভাবে এলাম রহস্যাবৃত। এত এত রহস্যের মাঝখানেও কিছু কিছু অনুভূতি সজাগ থাকে। আমার চেতনা অবিকৃত থেকে যায় তারই প্রভাবে। তাই দিয়েই জগতের নানা বিষয়কে মেলাই, তুলনা করি। কিছু কিছু বিষয়ের সিদ্ধান্ত খুঁজে পাই স্বাধীনভাবে। আবার কোন কোন বিষয়কে বুঝতে পারি না কোন প্রচেষ্টাতেই। ওই জগৎগুলি অধরা থেকে যায় চিরদিনের মত। 

মধ্যরাত্রির সেই ঘুমভাঙ্গা ঘটনার বিস্ময় আজও আমার জগতে অক্ষয় হয়ে আছে। সারা জীবনে তারপর কম অভিনয় দেখিনি, কত সিনেমা কত থিয়েটার কত সিরিজ। তার মধ্যে রয়েছে অনেক দুনিয়াকাঁপানো কলাকীর্তি, যাদের দেখে মুগ্ধ হয়েছি বিস্মিত হয়েছি নানা অবস্থায়। কিন্তু তাদের সবগুলিকেই বড় অনাড়ম্বর মনে হয় যখন মিলিয়ে দেখতে চাই সুদূর অতীতে হারিয়ে থাকা মধ্যরাত্রির ওই অভিজ্ঞতার সঙ্গে। ওই বয়সে মাঝ রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে হর-পার্বতীর সঙনাচ দেখার যে শিহরণ তা আর কোনদিন কোন সিনেমা বা থিয়েটার দেখে অনুভব করতে পারিনি। কোন সাসপেন্স থ্রিলার বা হরর ছবিও আমার মধ্যে এমন স্থায়ী শিহরণ রেখে যায়নি আজ পর্যন্ত। 

তাই তো মনে হয়, নৈশ ঘটনার ভার বোধ হয় অনেক প্রবল। সেইসব অখ্যাত কুশীলবরা সব হারিয়ে গেছে। আধুনিকতার করাল গ্রাসে বোধহয় বিলুপ্ত হয়েছে তাদের শিল্প প্রকরণও। আজ কি মধ্যরাত্রে কোন বালককে ঘুম থেকে তুলে তার মা দেখাতে চায় হর-পার্বতী পালাগান? যুগ হারিয়ে যায়, সঙ্গে হারিয়ে যায় আনুষঙ্গিক অনেক কিছু। হারিয়ে যায় মানুষ। মাও আমার হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সেই বালক যে অবাক চোখে দেখেছিল কোন এক মধ্যরাতের অভিনয়। থেকে গেছি কেবল আমি, অথবা আমার রূপান্তরিত মুখ, অথবা স্মৃতি। কিন্তু আমি কি আর সেই বিষয় নিয়ে কোন রঙ্গমঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকি?

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *