শ্যামলী রক্ষিত
বকুল কাকিমা খুব সাবধানে প্রদীপ্তাকে নিয়ে নামছিল আস্তে আস্তে। ঘাটের মাথায় শেষ সিঁড়িতে বসে একে একে তার শাঁখা-পলা ভেঙে দিল ঝামা দিয়ে ঠুকে ঠুকে। তারপর লোহার নোয়াগুলো খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল গভীর জলে। কাপড় কাচা সোডা দিয়ে মাথার সিঁদুর তুলে দিল ঘষে ঘষে। প্রদীপ্তা শোকে যন্ত্রণায় কেমন নুয়ে পড়েছিল অবলম্বনহীন লতাগাছের মতো। বকুল কাকিমাকে ধরে ধরে জলের মধ্যে নেমে পড়ল সে। টল টল করে টলছে তার সিক্ত শরীর। বকুল কাকিমা খুব শক্ত হাতে ধরেছে তাকে। স্নান করে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যাহোক করে ঘাটের পারে উঠে এল প্রদীপ্তা। বকুল কাকিমা একটা সাদা থান তার হাতে দিয়ে বলল, এটা পরে নে মা। পরনের জামা কাপড় গুলো ছেড়ে দিয়ে দে আমাকে। একটু ওপাশ পানে ফেলে দিয়ে আসি। সমস্ত জামা কাপড় ছেড়ে বকুল কাকিমার হাতে দিয়ে প্রদীপ্তা নিজের দিকে তাকালো জল ভরা চোখ নিয়ে। এখন তার শরীর ঘিরে রঙহীন বিবর্ণতা। লাল টকটকে দুটো চোখ দিয়ে হরহর করে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। প্রদীপ্তাকে ধরে ধরে সমস্ত পথটাই আগলে নিয়ে যাচ্ছে বকুল কাকিমা।

এখন শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুর। জোড়া নারকেল গাছের মাথায় খেলা করছে মায়াবী আলো । প্রদীপ্তা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। শরীরটা ক্রমশ ভারী-অবসন্ন জড় পদার্থের মতো হয়ে উঠছে তার। ক্লান্তি আর অবসন্নতায় চোখের পাতা জুড়ে যাচ্ছে। ঘুমের আচ্ছন্নতায় ঝিম ঝিম করছে শরীর। কিন্তু ঘুম তার হবে না। বিছানায় পিঠ ঠেকালেই কত আঁকি বুকি কাটা চিন্তারা, ভুতুরে অবয়ব নিয়ে এসে খুব দ্রুত তার চারিপাশে ব্যারিকেড দিয়ে দেবে। ঘিরে ফেলবে তাকে। তার সমগ্র চিন্তা-চেতনাকে। কিল বিল করে ভয়ের বীজাণুরা, শরীরটাকে তার কেমন নির্জীব নিথর করে তোলে। তখন ঘুমরা সব কোথায় কোন দেশে ফিরে চলে যায় কে জানে। মনের ভেতরে শুরু হয় সংঘর্ষ। লড়াই। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েও পড়ে প্রদীপ্তা। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে থেকে সেটাও বোধহয় আর সম্ভব হবে না।
প্রদীপ্তাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছিল বকুল কাকিমা। তার নিজেরই গা কাঁপছে থরথর করে। যন্ত্রণায় ব্যথায় বুকের মধ্যে তার কী যে ঘটে চলেছে। সেই সতের বছর বয়েসে বিধবা হয়েছে সে। নিঃসন্তান বিধবা। ভালোবাসার বিয়ে তাদের। খুব সুখি ছিল তারা। কিন্তু বছরও ঘুরল না। ঘরের দেয়াল ফুঁড়ে সাক্ষাৎ যমে এসে ছোবল দিয়েছিল মানুষটাকে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সব শেষ। বিষের জ্বালায় ছটফট করছিল মানুষটা। সর্বশরীর কেমন নীল হয়ে উঠেছিল খুব তাড়াতাড়ি। আত্মীয়স্বজনরা সবাই বলেছিল তাকে আবার বিয়ে করতে। কিন্তু বকুল কাকিমা কিছুতেই রাজি হয়নি। বাকি এতটা পথ শুধু একটা স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে কাটিয়ে দিল বকুল কাকিমা। সুখ বলো, স্বপ্ন বলো ঐ একটা বছর। বাকি জীবনটা শুধু বাঁচার জন্যে বাঁচা। অলোহীন হাওয়াহীন নিথর অন্ধকারময় গুহাবাস। এখন এই একটা কাজে তার কঠিন নৈপুণ্য। পাড়ায় বৌ-ঝিদের কপাল পুড়লে এই নিষ্ঠুর কাজটা তাঁকেই করতে হয়। প্রথম প্রথম কান্নায় ভেঙে পড়তো বকুল কাকিমা নিজেও। এখন কেমন নিরুদ্বেগ নীরবতায় আস্তে আস্তে কর্তব্য কর্মে একাগ্র থাকতে পারে। চোখের পাতায় বাষ্প জমার আগেই তার একান্ত প্রচেষ্টায় কখন নিজের থেকেই তা শুকিয়ে ওঠে।
কিন্তু আজ কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না বকুল কাকিমা। বিনুর মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। অমন ঝক ঝকে ছেলেটা ! যেমনি সুঠাম চেহারা। তেমনি রঙ। সব সময় প্রশান্তির হাসি ভরা মুখ। চাকরি জীবনেও নাকি খুব উন্নতি করেছিল। সারা পাড়া নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কাক-পাখিরাও চুপচাপ বসে আছে গাছের ডালে । একে একে সমস্ত কাজ সারছিল ঠিকই, কিন্তু কঠিন সংযমের বেড়া ভেঙে চৌচির করে দিচ্ছিল তার ভেতরের মাতৃত্বের বোধ। বারবার ভিজে উঠছিল তার চোখের পাতা। গড়িয়ে নামছিল জলধারা। প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিল না কিছুতেই। থরথর করে কেঁপে উঠছিল তার শরীর। প্রদীপ্তাও টের পাচ্ছিল ভেতরের সেই কম্পন-তরঙ্গ। সে নিজের থেকেই বকুল কাকিমার হাতটা চেপে ধরল। এখুনি হয়তো মুখ থুবরে পড়ে যেত নাহলে।
গভীর শোকে প্রদীপ্তা এখন জলহীন রুক্ষ বালি ভর্তি নদীবক্ষের মতো বিষণ্ণ নীরব। দীর্ঘ তিন মাস ধরে সে অনেক দৌড় ঝাঁপ করেছে। কেমন ঘোরের মধ্যে যেন ছিল এই কদিন। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে, না ঘটছে, সে সব কোনোদিকে নজর ছিল না তার। অন্য কিছু ভাবার মতো মনের ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না। ঠিক এই মুহূর্তে নিজেকে কেমন ভীষণ রকমের বেমানান ভাবে মুক্ত লাগছিল তার । যেন কিছুই কাজ নেই আর । মনে হচ্ছে এখন সে কী করবে এরপর থেকে। কি করে বেঁচে থাকবে । বিনম্রকে ছাড়া কি বাঁচা যায় ! কোনোদিন ভাবতেই পারে নি সে কথা । কিন্তু এখন থেকে তো তাকে ভাবতে হবে। অভ্যস্থ হয়ে হতে হবে নিজস্ব শক্তিতে বেঁচে থাকায় । নিজের জন্যে না হলেও, ছেলের কথা ভেবে চেষ্টা করতে হবে তাকে। ছেলেকে তো মানুষ করতে হবে । ওর বাবার মত করে ওকে বড় করে তুলতে হবে । তার জন্যে তো সমস্ত দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হবে । বাকি জীবনটা উৎসবকে কেন্দ্র করেই তাকে বাঁচতে হবে।
পুকুর ঘাট থেকে বাড়ি বেশ খানিকটা দূরে তাদের। বকুল কাকিমা সঙ্গেই ছিল। ভিজে চুল থেকে টুপ টাপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। পিঠের দিকের নতুন সাদা থানটা ভিজে গেছে সেই জলে। নতুন কাপড় ভেজার অদ্ভুত একটা গন্ধ উঠছে তার গা থেকে। বাড়ির চৌকাঠে পা রাখল যখন প্রদীপ্তা, সারা বাড়ি আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল তাকে দেখে। কিন্তু এই মুহূর্তে এতগুলো লোকের কান্নার কলোরোল শুনেও তার চোখে জল এল না। শুকনো লাল চোখ দুটো তার হুহু করে জ্বালা করছিল শুধু। এত লোকজন, ভিড়, ঢেঁচা-মেচি এসব তার ভালো লাগছিল না। এই মুহূর্তে একলা একটা নিরিবিলি ঘরে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছা করছে তার। আলো নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে থাকতে মন চাইছে। খুব ভেতর থেকে, নিঃশব্দে, নীরবে, যন্ত্রণার ভার থেকে মুক্ত হতে চায় সে। কেঁদে কেঁদে কিছুটা হালকা বোধ করতে চায়। যা এ সময়ে সত্যিই তার একান্ত প্রয়োজন।
সূর্যানী তার একমাত্র ননদ এগিয়ে এল কাঁদতে কাঁদতে। ধরতে যাচ্ছিল প্রদীপ্তাকে। বকুল কাকিমা বারণ করল তাকে। তোমাকে ছুঁতে নেই মা। এখন এই অবস্থায় তুমি সধবা মানুষ ছুঁতে হবে না থাক। সূর্যানী থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। বকুল কাকিমাই নিজের থেকেই কি মনে হল বলল, তুমি তোমার ওপরের সরে গিয়ে বসো বৌমা। এখন এখানে আর থাকার সরকার নেই। একটু পরেই আকাণে তারা ফুটবে। তারা দেখে মুখে কিছু দিও। তোমার শরীরের কথাটাও তো এবার ভাবতে হবে মা। এই কদিন তোমার ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে। কত চেষ্টা করলে মা দিনরাত জ্ঞান ছিল না তোমার। আপ্রাণ চেষ্টা করেছ তুমি। জলের মতো টাকা খরচা করেছ। তবুও ছেলেটাকে বাঁচানো গেল না। সবই কপাল মা। কিছুই করার নেই মানুষের !
বকুল কাকিমার সব কথা কানে ঢুকছিল না প্রদীপ্তার। মানে শোনার মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিল না। চোখ-কান অন্য কোনো পাড়ে গিয়ে ভিড়েছিল তখন। অন্য কোনো দৃশ্য, অন্য কোনো শব্দ এসে এসে মনের দুয়ারে চলাচল করছিল তার। বাইরে থেকে দেখেও বকুল কাকিমা ঠিক বুঝতে পারলে। সেটা দেখে থেমে গেল সে। আর কোনা কথা বলল না। এখন তার নিজেরই ভীষণ শরীরটা খারাপ লাগছে। একটু গরম চা না খেলে ভেতরের কাঁপুনিটা যাবে না। কার্তিক মাসের শেষ। বেশ শীত শীত লাগছে। তার ওপর এই অবেলায় ডুব দিয়ে স্নান। ঠাণ্ডা তো লাগবেই। তাই দেরি না করে চলে গেল তাড়াতাড়ি।
এখন একেবারে একলা ঘরে প্রদীপ্তা। কেমন গম্ভীর শূণ্যতায় ভরপুর। আস্তে আস্তে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে সারাটা পাড়া। সূর্য অস্ত গেছে কখন টের পায় নি কিছু। কতদিন যে তার কোনো বাহ্যিক চেতনা ছিল না। পৃথিবীর কোথায় কী হ’ল না হ’ল, কে কোথায় গেল; না গেল। রোদ হ’ল কী মেঘ করল। এসব কিছুর থেকে অনেক অনেক যোজন দূরে একটা অসীম শূন্যতার বোধে সে আচ্ছন্ন ছিল। দীর্ঘদিন পর, আজ এই এখন, সে পৃথিবীর প্রান্তর ছুঁয়ে অন্ধকার নেমে আসতে দেখল। আশা আর নৈরাশ্যের দোলাচল সংকটে সে একটা তাৎপর্যহীন সত্তায় নিমগ্ন ছিল। এখন খুব ধীরে ধীরে সে তার নিজস্ব কেন্দ্রে ফিরে আসতে সক্ষম হচ্ছে। প্রদীপ্তা জীবনের উত্তাপে তাপিত হতে চেষ্টা করল – – – –
ঘর অন্ধকার করেই অনেকক্ষণ সময় একা একা বসে থাকল প্রদীপ্তা। খুব দ্রুত নিবিড় অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছিল পৃথিবী। পশ্চিমের জানলা দিয়ে জ্বলজ্বল করে উঠছে তারাদের মুখ। অসংখ্য তারাদের ভিড় আজ আকাশ জুড়ে। একান্ত মনে কেমন গভীর একাগ্রতায় এসব দেখছিল প্রদীপ্তা। ঠিক এরকম মুহূর্তে কোথা থেকে কী জানি একটা মুখ এসে এসে মনের পর্দায় ছবি হয়ে ফুটছিল। অনেকদিন আর সে মুখ দেখে নি প্রদীপ্তা। আজ হঠাৎ এ সময়ে, এরকম একটা শোকার্ত মুহূর্তে পরমব্রতর মুখ কেন বারবার ভেসে উঠছে। বিয়ের পর বার বছর তাদের দাম্পত্য জীবন। কই কোনোদিন কোনো মুহূর্তেই তো ব্রত-র কথা মনে হয় নি। তার যখন বিয়ের ঠিক হয়ে গেল, ব্রত-র মনটা একটু খারাপই হয়েছিল। কান্নাকাটিও করেছিল। কিন্তু প্রদীপ্তা-র তো তেমন গভীর কোনো কষ্টই হয়নি। কিন্তু আজ। এ সময়ে… প্রদীপ্তার কেমন ভয় ভয় লাগছে। শিউরে উঠছে যেন সে ! বারবার চেষ্টা করছে, মনের পর্দা থেকে ঐ মুখ, ঐ ভাবনা সরিয়ে ফেলতে। কিন্তু যত বেশি সচেষ্ট হচ্ছে। ততই যেন সুস্পষ্ট অবয়ব নিয়ে মনের আকাশ জুড়ে তার অবস্থান দৃঢ় হয়ে উঠছে। কিছুতেই সেখান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে পারছে না। তখন কেমন ঘেন্না জন্মাচ্ছে তার নিজের-ওপর। তার এই ভালোবাসা! এত সেবা সব কী তবে ফাঁকি! কেন তবে এরকম একটা সময়ে বারবার ব্রত-র মুখ ভাসছে। বিনুর নয়।
আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলল প্রদীপ্তা। কিছুতেই সে কোনোভাবেই ঐ জগৎটার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ওর কথা বলার ভঙ্গি, হাসি, দুষ্টুমিপনা, কিশোরবেলার যত খুনসুটিপনা, সব কেমন সুস্পষ্ট অবয়ব নিয়ে মনের খিড়কি দরজায় উকি দিচ্ছে একটানা। এখন এ মুহূর্তে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না প্রদীপ্তা। একসময় ব্রত-র জন্যেই তার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। হুহু করে বয়ে চলেছিল অশ্রুনদী। স্বচ্ছ নোনাজলে সমগ্র অস্তিত্ব তার ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাচ্ছিল, একটানা অনেকক্ষণ সময় ধরে।
একে একে সমস্ত কাজ, আচার বিচার সবকিছু বিধি বিধান মেনেই পালন করেছে এ’কদিন প্রদীপ্তা। বাইরের পৃথিবীর মানুষ, টের-ই পায়নি ভেতরে ভেতরে চুরচুর হয়ে ভেঙে যাওয়া প্রদীপ্তাকে। এসব কাজকর্ম যে শুধু করার জন্যেই করা। নিজের সঙ্গে নিজের লুকোচুরি খেলা তার। সমগ্র মন প্রাণ জুড়ে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ব্রত। অবেলায় রেখে চলে আসা কিশোর প্রেমিক। বিনুর চলে যাওয়া তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে তার পাপ। তার মনে হচ্ছে তার সেই পাপেরই ফল এটা। ব্রত এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? কিছুই জানে না প্রদীপ্তা। তবু তার দিনান্তের সবটুকু বেঁচে থাকা, সব চিন্তা, সব বোধ এখন তাকে ঘিরেই আবর্তিত। সেখান থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না সে। কেমন অদ্ভুত একটা ঘোরলাগা আচ্ছন্নতায় ভেসে যাচ্ছে সময়। হাজার চেষ্টা করেও সে বিনম্রর মুখটা মনে করতে পারছে না। বারবার চোখ বন্ধ করে মাছি তাড়ানোর মত করে ঝাপটা দিচ্ছে। কিন্তু ফিরে ফিরে সেই একই মুখ ভেসে উঠছে তার মনের আকাশে – – –
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
