দীপান্বিতা

গুন্টার গ্রাস

গুন্টার গ্রাস মনে করতেন যে লেখকরা মুখ থেকে কানে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখে। বিখ্যাত উপন্যাস টিন ড্রাম-এর স্রষ্টা এই জার্মান লেখক ১৯৯৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান সাহিত্যে অসাধারণ কীর্তির জন্য। তিনি নিজেকে মনে করতেন যুক্তিজীর্ণ যুগের দেরিতে আসা আলোর দূত। মুদির দোকানের মালিকের ছেলে ছিলেন তিনি। পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করে সেখানেই শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে হিটলার ইউথে যোগ দিয়ে ১৬ বছর বয়সে সৈন্যবাহিনীতে ঢুকেছিলেন। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হন। ২০০৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন কুখ্যাত এই বাহিনীতে কাজ তাঁকে চিরকাল কলঙ্কিত করেছে। জেলে বন্দি ছিলেন কিছুকাল, ১৯৪৬ সালে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি অঙ্কনশৈলী ও স্থাপত্যবিদ্যার প্রশিক্ষণ নেন। সেই সূত্রে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ভ্রমণ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি আনা মার্গারেটাকে বিয়ে করলেও ১৯৭৮ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের পর ১৯৭৯ সালে অন্য এক মহিলার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। 

১৯৫৬ সালে প্যারিসে থাকার সময় প্রথম উপন্যাস টিন ড্রাম লিখতে শুরু করেন। নাৎসিদের কাহিনী বলার জন্য এই উপন্যাস জার্মানিতে বিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। জার্মান ইতিহাসের নিষ্ঠুরতায় এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র ঠিক করে যে সে আর বড় হবে না, তার টিন ড্রামের মধ্যেই নিজেকে মগ্ন রাখবে। গ্রাসের জন্মস্থান ডানজিগ বিভিন্ন লেখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এই উপন্যাসটি ১৯৭৯ সালে চিত্রায়িত হয়েছিল। গুন্টার গ্রাসের ডানজিগ ট্রিলোজির প্রথমভাগ টিন ড্রাম, দ্বিতীয়টি ছিল বিড়াল ও ইঁদুর। এই উপন্যাসে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪ সালের পটভূমিকায় স্থানীয় নিম্ন মধ্যবিত্ত যুবকদের কথা উঠে এসেছে। তৃতীয় ভাগটির নাম ডগ ইয়ার্স। এখানে নাৎসিদের অপরাধ ও তাদের যুদ্ধোত্তর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এরপর লেখক পটভূমি হিসেবে বার্লিন শহরকে বাছাই করেন। লেখক হিসেবে খাতি লাভের পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭৫ সালে তিনি প্রথম ভারত সফরে আসেন এবং ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে কলকাতায় কয়েক মাস থাকেন। এই অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেন ডায়েরি জাতীয় লেখায় যার নাম জীভ কাটো লজ্জায়।

বিভিন্ন বইতে তিনি নামকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন্তুদের যেমন, বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, শামুক, কাঁকড়া ইত্যাদির নাম ব্যবহার করেছেন। এগুলোর মধ্যে একটাই মিল যে এরা সবাই সাধারণ। এরকম একটি বইয়ের নাম ইঁদুর যেখানে বলা হয়েছে যে একদিন ইঁদুরেরাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও অন্য অনেক সম্মান তিনি পেয়েছিলেন। তিনটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করেছিল সাম্মানিক ডিগ্রি। 

১৯৮৯-৯২ সালে জার্মানির সংযুক্তিকরণে তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখকের বিচরণ কবিতা, উপন্যাস, নাটক, স্থাপত্যবিদ্যা ইত্যাদি সর্বত্র। হাস্যরস ও আজগুবি রচনার মিশেল দিয়ে জার্মান সাহিত্যে এক অনন্য স্থান দখল করেছিলেন। কবিতায় পরাবাস্তববাদের ছায়ায় সাধারণ চিন্তাভাবনা ও যুক্তির বাইরে গিয়ে স্বপ্ন ও অবচেতনার মধ্যে ঘোরাফেরা করেছেন।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *