দীপান্বিতা

জে আর আর টোলকিয়েন

সময়টা গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বার্ড অ্যান্ড বেবি পাবকে ঘিরে আড্ডা জমে উঠেছিল একদল সাহিত্যপ্রেমীর। দা ইনক্লিংকস্ নামে সুপরিচিত এই সাহিত্য গোষ্ঠীর সদস্যরা আড্ডায় নিজেদের লেখা গল্প চিৎকার করে অন্যদের পড়ে শোনাতেন। বার্ড অ্যান্ড বেবি পাবে তাঁদের শনিবারের মধ্যাহ্ন ভোজের আসর অক্সফোর্ডের সামাজিক জীবনের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। অনেকটা যেন আমাদের কলেজস্ট্রিট কফি হাউসের আড্ডা। 

দ্য ইনক্লিংকস্-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জন রোনাল্ড রিউয়েল টোলকিয়েন। বিশ্ব বিখ্যাত ফ্যান্টাসি উপন্যাস দ্য লর্ড অফ দা রিংস এবং দ্য হব্বিট তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। এই আড্ডার অন্য সদস্য সিএস লুইস খ্যাতি পেয়েছিলেন নার্নিয়া সিরিজ লিখে। 

১৯৬০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দা লর্ড অফ দা রিংস অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই কাহিনী আসলে দা হব্বিট উপন্যাস বিরোচিত আশ্চর্য ফ্যান্টাসি জগতের উত্তরসূরী। লেখক তাঁর ছেলেমেয়েদের জন্য দা হব্বিট লিখেছিলেন। খুব সরল এর বিষয়বস্তু। সওরন হচ্ছে অন্ধকার জগতের প্রভু, মরগথের সেবক। তার হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে চায় এক তরুণ হব্বিট ফ্রোডো। তাহলে তাকে পৌরাণিক সেই আংটি ফেরত পাঠাতে হবে মাউন্ট ডুমে। এই আংটি হচ্ছে পৃথিবী ও দুষ্টের মধ্যে এক বৈবাহিক আংটির মত। হব্বিটরা বাস করে মাটির মধ্যে গর্তে। অদ্ভুত এই ফ্যান্টাসি জগতের নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস, সমাজ ও রীতিনীতি লেখক তৈরি করেছেন ইংরেজদের পুরাণ কাহিনী ও লোক কথা অনুসরণ করে। আছে এন্টদের ইতিহাস যারা আধা মানুষ ও আধা গাছ। তারা জঙ্গলের গাছপালা ভালবাসে। তাদের স্ত্রী এন্টওয়াইভরা ভালোবাসে খোলা জমি যেখানে তারা ফলগাছ, ফুল ও ঘাস লাগাতে পারে। তাদের দুনিয়ার অন্য কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র গ্যানডাল্ফ নামে এক ভ্রাম্যমান যাদুকর, সাহসী হব্বিট বিলবো, কৃশকায় ক্ষুদ্র আজব প্রাণী গোলুম যে গোবলিনের মাংস খেতে ভালোবাসে।

সমালোচকরা বলেন যে দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রূপক ধর্মী এক পরোক্ষ উল্লেখ। লেখক নিজে ব্যাপারটির প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন যে বরং এটি সচেতন ভাবে ক্যাথলিক ধর্মভিত্তিক রচনা হতে পারে। হিটলারের উত্থান ও পতনের চেয়েও এই কাহিনীর সঙ্গে বেশি মিলে যায় মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট। দুষ্ট প্রভু সওরন সৃষ্টি করেছে রিংস অফ পাওয়ার যা অন্য রিংদের প্রভুত্ব করে। তাই তাকে বলা হয় লর্ড অফ রিংস। 

সাউথ আফ্রিকার ব্লুমফনটেইনে ১৮৯২ সালে এক ব্রিটিশ দম্পতির ঘরে জন্ম নেন তিনি। তিন বছর বয়সের সময় মা ম্যাবেল তাঁকে নিয়ে ইংল্যান্ড চলে আসেন। খুব ছোট্ট বয়সে তিনি বাবাকে হারান। মা মারা যান ১০ বছর বয়সে। ভাই হিটারীকে নিয়ে লেখক বার্মিংহামে মাসির বাড়িতে চলে আসেন। ২৩ বছর বয়সে অক্সফোর্ড থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম বিভাগের সাম্মানিক ডিগ্রী পান। পরের বছর বিয়ে করেন পূর্ব পরিচিত এডিথ ব্র্যাটকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈন্য দলে নাম লেখান ও কামানের গোলার আঘাত নিয়ে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ডে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন দীর্ঘদিন। চসার ও বিউলফের ওপর তার উল্লেখযোগ্য কাজ আছে। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৭৩ সালে।

টোলকিয়েন নিজেকেও ভাবতেন হব্বিট। বাগান, প্রাকৃতিক শস্য ক্ষেত্র, সাদাসিধে ভালো খাবার ও পাইপ ছিল তাঁর প্রিয় পছন্দ। রিয়েলিস্টিক ফিগার ভালো আঁকতে না পারলেও ছবি আঁকা ছিল প্রিয় বিষয়।। তাঁর মা ছিলেন ভালো শিল্পী, ছেলেকে তিনি আঁকা শিখিয়েছিলেন। তিনি কদাচিৎ সিনেমা দেখতেন। ভালোবাসতেন সনাতন ভাষা ও অন্য অধ্যাপকদের সঙ্গ। তাঁর সৃষ্ট জগতের চরিত্র ও তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্রকে ভিত্তি করে পৃথিবী জুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিরাট নির্মাণ শিল্প।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *