দীপান্বিতা

সল বেলো

১৯২০ সাল। কানাডার মন্ট্রিয়াল শহরের কাছেই কুইবেক নামে মফস্বল অঞ্চল। সেখানকার ল্যাচিন সিটি হলে লাগল ভয়ানক আগুন। আরো অনেক কিছুর সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেল এমন একজনের জন্ম বৃত্তান্ত পরবর্তীকালে যে ব্যক্তির হাত ধরে নবজন্ম ঘটবে ইহুদী মার্কিন সাহিত্যের। কে জানত, জন্মপঞ্জি বিহীন এই অজ্ঞাত মানুষটির কলম থেকেই একদিন জন্ম নেবে অজি মার্চ, মোজেস ই হারজগ, চার্লি সাইট্রিন বা আর্থার ম্যামলার ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্র মাতানো কালজয়ী সাহিত্যের চরিত্রগুলি। এই মানুষটির নাম সলোমন বেলোস বা সংক্ষেপে সল বেলো।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন সাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। 

জন্ম ১৯১৫ সালে ল্যাচিনে। তিনি বড় হতে থাকেন মনট্রিয়লের নোংরা হতদরিদ্র পাড়ায়। অঞ্চলটিতে ছিল মূলত নানা দেশীয় গরিব মানুষের ভিড়। রাশিয়ান, পোলিশ, গ্রীক ইত্যাদি। ১৯২৪ সালে লেখকেরর পরিবার চলে আসে শিকাগো শহরে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ড্যাংলিং ম্যানে দেখা যায় কানাডাতে বসবাসের ছায়া।

লেখকের শৈশব ও কৈশোরে তাঁর মা লিজার ভূমিকা অপরিসীম। মাত্র ১৭ বছর বয়সে মাকে হারানো ছিল এক বড় ধাক্কা। এ কথা তিনি নিজেই পরে বলেছেন। 

১৯৩৩ সালে ভর্তি হয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৭ সালে নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। উচ্চশিক্ষার জন্য উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে শুরু করেন সাহিত্যচর্চা। এই সময়ে তিনি কলেজে শিক্ষকতা এবং পরে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছিলেন। 

শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তিনি সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে চাইলেও শারীরিক অসুস্থতার জন্য প্রত্যাখ্যাত হন। নাছোড়বান্দা হয়ে শেষ পর্যন্ত মার্কিন সৈন্যবাহিনীতে কাজ করার সুযোগ পান। বিশ্বযুদ্ধের পর আবার ফিরে যান শিক্ষকতার জগতে। বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি নিয়েই প্রথম উপন্যাস ড্যাংলিং ম্যান যেখানে বলা হয়েছে মার্কিন সৈন্যবাহিনীতে যোগদানকারী এক তরুণের কাহিনী। 

এরপর একে একে প্রকাশ পেতে থাকে অন্য উপন্যাসগুলি। শিকাগো শহর এইসব উপন্যাসের মূল উপজীব্য। অজি মার্চ এক বিখ্যাত সৃষ্টি। মার্কিন অর্থনীতির টালমাটাল সময়ে শিকাগোর এক ইহুদী পরিবারে জন্ম এই চরিত্রের। রুটিরুজির জন্য নানা রকম কাজ করতে হয় তাকে। মুখোমুখি হতে হয় অদ্ভুত সব চরিত্রের। এসবের মধ্য দিয়েই সে খুঁজে পায় নিজেকে। এমনই আরেকটি চরিত্র হারজগ। জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে সে আত্মহত্যা করতে চায়। সে লম্বা লম্বা চিঠি লেখে নীৎশে, তার প্রাক্তন প্রেমিকা, এমনকি ভগবানকেও। এইসব চিঠি লিখতে লিখতেই একদিন সে খুঁজে পায় তার বেঁচে থাকার কারণ। এমনই ঘরানার আরেকটি উপন্যাস হামবোল্টস গিফট লিখে তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। এই উপন্যাসের নায়কও জীবনযুদ্ধে হারতে থাকা এক মানুষ। মজার বিষয় এই যে লেখকের তৈরি এসব বিষাদগ্রস্ত চরিত্রের মধ্যেও পাঠক খুঁজে পাবে হালকা কৌতুকের ছোঁয়া। 

উপন্যাস ছাড়াও কিছু নাটক, ছোট গল্প ও অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেছেন। দ্য লাস্ট এনালাইসিস নাটকে তিনি আক্রমণ করেছেন সনাতন ফ্রয়েডিও ধ্যান ধারণাকে। পরবর্তী সময়ে লেখকের রক্ষণশীল মনোভাব পাল্টে যায় যার প্রতিফলন দেখা যায় ছোটগল্প সংকলনে। এমনই মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় রেভেলস্টাইন উপন্যাসে যা হয়ে ওঠে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭৬ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। 

১৯৯৩ সালে তিনি বোস্টন শহরে এসে বসবাস শুরু করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন। ব্যক্তিগত জীবন খুব একটা শান্তির ছিল না। পাঁচবার বিয়ে করেছিলেন। ২০০৫ সালে ব্রুকলিন শহরে নিজস্ব বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *