দীপান্বিতা
হারমান হেস
হারমান হেসের জন্ম জার্মানিতে ১৮৭৭ সালে। তাঁর পরিবারের সবাই ধর্মনিষ্ঠ ঈশ্বর বিশ্বাসী। বাবা ও মায়ের ধর্মযাজকের প্রেক্ষাপট ছিল। তাঁরা চেয়েছিলেন হারমান তাঁদের মত ঈশ্বরতন্ত্রের শিক্ষা লাভ করুন। তাঁকে একটা প্রোটেস্ট্যান্ট বিদ্যালয়ে ভর্তিও করা হয়। কিন্তু হারমানের প্রথম থেকেই অভিজ্ঞতা খারাপ হতে শুরু করে এবং পরবর্তীকালে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। তিনি অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন পেশায় জড়িত হতে থাকেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তুবিনিজেন শহরে বইয়ের দোকানের কেরানি, মেকানিক ও বই ব্যবসায়ী। শেষে তিনি একটি সাহিত্য সংস্কৃতির কেন্দ্র লে পেটি সেশকল-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে তিনি বড় লেখক হওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি ২২ বছর বয়সী তখন তাঁর প্রথম লেখা রোমান্টিস্ক লিডার এবং এইন স্ট্যান্ডে হিনটার মিটারনাস্ট প্রকাশিত হয়।

১৯০৪ সালে ২৭ বছর বয়সে তিনি ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কলম ধরেন এবং পিটার ক্যামঞ্জিনো তার প্রথম ফলশ্রুতি। মারিয়া বারনৌলি তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রী, বয়সে ৯ বছরের বড় এবং ফটোগ্রাফার। তাঁদের তিনটি ছেলেমেয়ে। শপেনহাওয়ার এবং নিৎসের মতো তিনিও প্রাচ্যের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। যোগাভ্যাস-এর নিয়মাবলী তিনি অভ্যেস করেছিলেন।
১৯১১ সালে তিনি ভারতে আসেন। তাঁর মাও একসময় এদেশে থেকেছিলেন কিছুদিন। প্রাচ্যের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গে এখানেই তাঁর প্রথম পরিচয় এবং সিদ্ধার্থ উপন্যাসের বীজবপন, পরে ১৯২২ সালে যা প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের নায়ক গৌতম বুদ্ধের প্রথম জীবনের কার্যকলাপে প্রভাবিত এবং পরবর্তী জীবনের অন্তিম আলোকপ্রাপ্ত। ১৯৫০ সালে এই বই আমেরিকার সেইসময়ের অনেক বিট পোয়েটসকে প্রভাবিত এবং একটি ব্যক্তিগত ধর্মাদেশে চালিত করে। প্রাচীন হিন্দু এবং চৈনিক সংস্কৃতি তাঁকে খুবই প্রভাবিত ও আচ্ছন্ন করেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মধ্যভাগে তাঁর পরিবার খুবই সংকটপূর্ণ সময়ের ভিতর দিয়ে যায়। তাঁর প্রথমা স্ত্রী মারিয়ার মানসিক বৈকল্য হয় এবং ছোট ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই সময় লেখা তাঁর বই রোনাল্ডোতে তিনি শিল্পীদের বিয়ে করার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেক বোঝাপড়া করেন এবং সবশেষে নেতিবাচক রায় দেন, মনে হয় যেন তাঁর নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
১৯১২ সালে হেস পরিবার সুইজারল্যান্ডে চলে আসে যেখানে তাঁর তৃতীয় সন্তান জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি জার্মান ফৌজে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছে প্রকাশ করলেও শারীরিক দুর্বলতার জন্য তা প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনি জার্মান দূতাবাসের গ্রন্থ বিভাগে জার্মানবন্দীদের পুস্তক সরবরাহের কাজ পান। যুদ্ধকালীন মিলিটারি ও জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করায় তাঁকে দেশদ্রোহী বলে বিবেচনা করা হয়।
১৯১৯ সালে তাঁর বই ডেমিয়ান সমস্ত ধ্যানধারণা ভেঙে অভূতপূর্ব প্রশংসা পায়। টমাস মানের মত সাহিত্যিকরাও এই প্রশংসায় যোগ দেন।
১৯২৪ সালে লেখক দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও তা খুবই স্বল্পস্থায়ী হয়। এই দ্বিতীয় স্ত্রী সুইস লেখক ওয়েননগরের কন্যা। রুথের সঙ্গে ১৯১৯ সালে হেসের সাক্ষাৎ এবং ১৯২২ সালে তাঁর কেয়ারি টেল পিকটরস ভারওয়ার্ল্ডলাজগেইন তাঁর উদ্দেশ্যেই লেখা।
১৯২৭ সালে হেসের লেখা ডার স্টেপেনউল্ফ আধুনিক জীবনযাত্রার আত্মকেন্দ্রিকমুখী মানসিকতার সমালোচনা। ষোড়শ পোপ বেনেডিক্টের এই বইটি বেশ প্রিয় ছিল।
১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত লেখক রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। ১৯২৮ সালে তিনি লেখেন বাটরাশটুনজেন যেটি ব্যক্তি কেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি। ১৯৩০ সালে নারজ্জিস ত্বান্ড গোল্ডমান্ড প্রকাশ পায় যা মধ্যযুগীয় এক মোহন্ত ও তার শিষ্যদের নিয়ে লেখা।
১৯৩১ সালে তিনি তৃতীয়বার বিয়ে করেন। এই স্ত্রী ছিলেন শিল্পী বিএফ ডলরিনের বিবাহ বিচ্ছিন্ন স্ত্রী। হেসের উশৃংখল জীবন কিছুটা শান্তি লাভ করে এই বিবাহে। নাৎসি আমলেও তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিত্তিক লেখা সমানভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৩ সালে নাৎসি প্রশাসন তাঁকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে।
১৯৪৩ সালে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি দাস গ্লাসপারলেনস্পিয়েল প্রকাশ পায়। ১৯৩৬ সালে বার হয় ক্রিগ আন্ড ক্রিডেন। ১৯৪৬ সালে আসে নোবেল পুরস্কার। এর পরবর্তী সময় তিনি আর কোন উল্লেখযোগ্য লেখা প্রকাশ করেননি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত তিনি পঞ্চাশটির ওপর কবিতা ও ত্রিশটির ওপর সমালোচনা প্রকাশ করেন বিভিন্ন সুইস পত্র-পত্রিকায়।
৮৫ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে লেখক মারা যান। ঘুমের ভিতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ছিল মৃত্যুর কারণ।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
