প্রীতন্বিতা
মাল্টিভার্স তত্ত্ব
মাল্টিভার্স তত্ত্বটির ভিত্তি হল, আমাদের নিখিল বিশ্ব আসলে বহু এমন নিখিল বিশ্বের সমন্বয়ের একটি ছোট অংশ মাত্র। এই মালটিভার্স তত্ত্ব অনুযায়ী প্রত্যেকটি নিখিল বিশ্ব নিজস্ব নিয়মে এমনভাবে স্বতন্ত্র যে সমগ্র নিখিল বিশ্বের কল্পনাযোগ্য সমস্ত নীতির মধ্যে তার কিছু প্রতিফলন ঘটেছে। এই বিশ্বাসটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তথাকথিত অ্যানথ্রোপিক তত্ত্বের ওপর। তত্ত্বটির মতে আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ব বিশ্বে আমরা কেমন দেখি তা নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল। নিখিল বিশ্বের যেকোনো অংশ, প্রথমে যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন তখনই পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় যখন আমরা সেটাকে আমাদের অস্তিত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করি। এই অ্যানথ্রোপিক তত্ত্বের ব্যবহার করে দেখানোর চেষ্টা করা হয় কেন বিশ্বনিখিলকে কাটাছেঁড়ার দরকার আপাত অসম্ভব বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধানে।

মাল্টিভার্স তত্ত্বে রয়েছে বহু অসংগতি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা বোধহয় এই যে এমন বহু বিশ্বের অস্তিত্ব না যায় প্রমাণ করা, না যায় অস্বীকার করা। তাই পুরো তত্ত্বটিই কেমন একটা ফন্দি করে করা বলে মনে হয়। তাছাড়া বিশ্বনিখিলের এই প্রাণ সহায়তা যেহেতু কোনমতেই সৃষ্টি রহস্যভেদের পরিপূরক নয়, কোনরকম নির্বাচন প্রক্রিয়া বা সৃষ্টির ক্রমবিকাশ এর থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। যদি এই মাল্টিভার্স তত্ত্ব একটি সম্ভাব্য তত্ত্ব হিসেবে গণ্য করা হয় তাহলে এই বহু বিশ্ব উদ্ভাবনের পদ্ধতিও প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। এই বিশ্বনিখিলের বুদবুদ তত্ত্ব কেবলমাত্র এই ব্যাপারটিকে আরো জটিল করে যেখানে প্রশ্ন ওঠে কে এই সৃষ্টিক্ষেত্রের লটারিটির উদ্ভাবন করলেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার পেনরোজ হিসেব করে দেখিয়েছেন যে আমাদের বিশ্বের চরম তাপমাত্রা অবধি উন্নত তাপমাত্রার অনুপাত হলো ওয়ান ইজটু টেন টু দি পাওয়ার হান্ড্রেড টোয়েন্টি থ্রি। যদি সত্যিই আমাদের বিশ্ব এমন অসংখ্য বিশ্বের একটিমাত্র সদস্য হয়ে থাকে তাহলে এই বিশ্বের অনেক ছোট হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। আমাদের সৌরজগতের এলোমেলো ভাবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা হল ওয়ান ইজটু টেন টু দি পাওয়ার সিক্সটি। এটি যদিও একটি বিরাট সংখ্যা কিন্তু তবু আগের সংখ্যাটির থেকে অনেক ছোট।
বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে যুক্তি ও প্রকৃতির সঙ্গতির ওপর। নিখিল বিশ্বের মধ্যে একটি যুক্তি আছে আর বৈজ্ঞানিকরা বার করার চেষ্টা করছেন এই যুক্তি অবতারণার কারণ। যদি এই নিখিলি বিশ্ব কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই চলে তাহলে অস্বস্তির কোন মানেই থাকে না। এটি তাহলে বিধি বহির্ভূত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা তাহলে এটা ভাবতেই পারি, যে সমগ্র পদ্ধতির ওপর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা নির্ভরশীল তা পুরোটাই হাস্যকর। বিশ্ব জগতের রীতিনীতির তখন কোন মানে থাকে না। সুতরাং মাল্টিভার্স তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলির মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করে। অবশ্য এ সবই বলা হচ্ছে একবারও এই প্রশ্ন না তুলে যে মাল্টিভার্স তত্ত্বকে নিজের অস্বস্তি বাঁচানোর জন্য নিজেরই কিছুটা রদবদল করার প্রয়োজন আছে। নয়তো মনে হবে যে এই তত্ত্ব কোন বিকল্প নকশা দিতে অপারগ।
মাল্টিভার্স তত্ত্ব পরীক্ষা, যাচাই বা নাকচ করে দেওয়ার কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি না থাকায় এই তত্ত্বটি শুধুমাত্র একটি অনুমান হিসেবেই রয়ে গেছে। এটি একটি অর্থহীন বিষয়, কেবলমাত্র আমাদের সৃষ্টির রহস্য অস্বীকার করার জন্য, এছাড়াও এই তত্ত্বে বহু বৈজ্ঞানিক অসুবিধে ও গন্ডগোল রয়েছে যার কিছু নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।
যেমন আমরা জানি একটি বিশ্ব রয়েছে ঠিক, তেমনি আমরা জানি না বা জানার উপায়ও নেই যে একাধিক এমন বিশ্ব রয়েছে কিনা। যখনই কেউ একটি বিশ্বজগতে রয়েছে, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের মতে সেই জগতের স্থান-কালের আচ্ছাদন অন্য আর কোন বিশ্বের স্থান-কালের আচ্ছাদনকে অতিক্রম করতে পারেনা। অর্থাৎ কিনা যদি ভগবান দশটি বিশ্ব সৃষ্টি করেও থাকেন, আমাদের বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতায় নিজেদের বিশ্বের বাইরে আমরা আর কিছুই জানতে পারবো না। নিখিল বিশ্বের সংখ্যা সুতরাং একটিই। তাই যুক্তি বলে একটি বিশ্ব রয়েছে এবং ভগবান সেটি সৃষ্টি করেছেন মনুষ্য সমাজের হিতের জন্যই, যদি না অন্য আর কোন যুগান্তকারী আবিষ্কার ঘটে যায়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
