তাপস সরকার

লেখক পরিচিতি 

সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর  বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক।

বিষয় পরিচিতি

(জন্মসূত্রে প্রত্যেকেই একটি দ্বীপের অধিকার পায়। সেটি একান্তভাবে তার নিজেরই দ্বীপ। শৈশবে সেই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে ওঠে বহুবর্ণ বৈচিত্র্যময় অজস্র সমস্ত আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন। তারপর সে এগিয়ে চলতে থাকে তার জীবনের পথ ধরে। ক্রমশ সেই দ্বীপে হানাদারদের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তার অজ্ঞাতসারে, হিতাকাংখীরূপে। যত সে কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের স্তরগুলি অতিক্রম করে চলে হানাদারদের আগমন ও আক্রমণের তীব্রতা বাড়তেই থাকে। এভাবে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সে দেখে সে তার জন্মসূত্রে পাওয়া দ্বীপটি হারিয়ে ফেলেছে, দ্বীপ চলে গেছে হানাদারদের অধিকারে। হারিয়ে গেছে তার শৈশবের সব আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন। সে নিজেকে আবিষ্কার করে বিপন্ন, বিদ্ধস্ত, বিষণ্ণ, হতাশ, সর্বহারা, একাকী নির্বাসিত এক সত্ত্বা হিসেবে। অনিবার্য মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে সে কি আবার তার শৈশবের দ্বীপটি হানাদারদের কবল থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে?)

অধ্যায় : ২

আমার দ্বীপ আমার আমি হল একমাত্র স্থান যেখানে আমি আমার জীবনরক্ষণ ব্যবস্থার সমস্ত প্রয়োজনীয় উপাদান পেয়ে যাই। যদিও জন্ম থেকেই আমি এই স্থানের অধিকারী তবুও জীবনের শুরুতে আমি এখানকার অভিনবত্ব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না। আমার মা আমাকে জীবন শুরুর দিনগুলোর গল্প শুনিয়েছিল। সে আমাকেহাসির নদীতে ভাসতে দেখে দু’হাতে বুকে তুলে নিয়েছিল আর দেখিয়েছিল কিভাবে অন্য নদী ভালোবাসা তার শাখানদী স্নেহকে নিয়ে বয়ে চলে যায়। আমি তার কাছেই জানতে পেরেছিলাম আমার আমি দ্বীপের জ্যোৎস্না এবং তুষারপাত কেমন চরিত্রের, যারা আসলে যথাক্রমে কোমলতা ও সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই নয়। মা আমাকে দুটি ভিন্ন ধরনের বৃষ্টিকেও চিনিয়ে দিয়েছিল, যাদের বলা হয় উদারতা ও খুশি।

তা সত্ত্বেও আমার মা যে সমস্ত বস্তুগুলির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আমি হয়তো সেগুলির প্রকৃত অর্থ ঠিক ঠিক বুঝতে পারতাম না। অবিরাম প্রবাহিত ভালোবাসার কী উপযোগিতা এবং কিভাবে স্নেহ পৃথিবীর বুকে মনোমুগ্ধকর প্রভাব ফেলে? কী ক্ষতি হবে জগতের যদি সহানুভূতি তুষারপাত হিসেবে না উপস্থিত থাকে? কোমলতা হিসেবে আমরা পাই যে জোৎস্নাকে তাকে ছাড়া কি বাঁচতে পারতাম না? খুশি বা পুলক হিসেবে বৃষ্টি যদি না থাকত তাহলে আমাদের জীবনে কী পার্থক্য দেখা যেত? কেন জীবনে প্রায়ই দয়া বা উদারতার বর্ষণ এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? আমার ওই ছোট্ট বয়সেই এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বোঝা সত্যিই অসম্ভব ছিল।

কিন্তু আমার মা সবকিছু আমার কাছে স্পষ্ট ও পরিস্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। তার এই শেখাবার পদ্ধতি ছিল সরল ও সাদাসিধে, যদিও অনেকক্ষেত্রে বিচার করে দেখতে গেলে মনে হবে অভাবনীয়। তার ছিল বাগান করার শখ এবং বাগানের প্রত্যেকটি গাছের জন্য সে আলাদাভাবে যত্ন নিত। সে গাছগুলির পাতা, বৃন্ত ও ডালপালাগুলিকে এমনভাবে স্পর্শ করত যে মনে হত সে যেন তাদের আদর করছে। পত্রপুষ্প ও ফল যখন ডালপালাকে সাজিয়ে তুলত তখন তার আনন্দ না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। সে কখনো কাউকে পাতা ছেঁড়ার বা ফুল তোলার অনুমতি দিত না। মা আমাকে শিখিয়েছিল কিভাবে গাছেদের ভালবাসতে হয়।

দাড়ি, কমা, সেমিকোলনের ব্যবহার আমি জানতাম না— আমি বুঝতাম না কেন আমি অন্যের কথা শুনব ধৈর্য ধরে। মা আমাকে শিখিয়েছিল কেন এবং কিভাবে অন্যকে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশাধিকার দেব। যে লোকগুলোকে আমি রোজ দেখছি তাদের সম্পর্কে আমার মনোভাব কেমন হওয়া উচিত এবং দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কী হবে আমার আচরণ বা প্রতিক্রিয়া। এসব শিক্ষা কখনোই বিরক্তিকর মৌখিক উপদেশ হিসেবে দেওয়া হত না, পরিবর্তে আমার মা আমাকে সমস্তকিছু শেখাত প্রাত্যহিক জীবনের চলাফেরার মধ্য দিয়ে। মুখে না বলে আমিও বরং বিষয়টি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি।

ছোট্ট বয়সে আমি ফড়ি্ংদের সঙ্গে খেলে বেড়াতে ভালবাসতাম। তারা যখন ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াত আমি তাদের পিছনে ছুটোছুটি করে যেতাম। আমার মা দেখে খুব খুশি হত কারণ সে ভাবত এভাবেই আমার মধ্যে প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা জন্ম নেবে। কিন্তু সে জানত না আমার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। উড়ন্ত ফড়িংরা আমার নাগালের বাইরে থাকত বলে আমি তাদের আমার অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইতাম। এক সাম্রাজ্যলোভী বিজেতার মত মানসিকতা গড়ে উঠছিল আমার মধ্যে। হাজার চেষ্টা করেও আমি তাদের ধরতে পারতাম না বলে আমার বেশ রাগ হত। শেষে একদিন আমার চেষ্টা সফল হল, আমি একটি ফড়িং ধরতে পারলাম। আমি এটিকে অন্যান্য সমস্ত ফড়িংদের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে এমনভাবে শাস্তি দিতে চাইলাম যাতে এটি কোনভাবে আমার কাছ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। আমি এর ডানাগুলি ছিঁড়ে ফেললাম। পতঙ্গটির যন্ত্রণাকাতরতা আমাকে বেশ খুশি ও পরিতৃপ্ত করল। কিন্তু এমন একটি অনৈতিক কাজ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। সে খুবই মর্মাহত ও বিপর্যস্ত হল এবং প্রাণপণ চেষ্টা করল পতঙ্গটিকে বাঁচাতে। ফড়িংটি কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে গেল। আমার মা কিন্তু আমাকে খুব বেশি বকাবকি করল না, শুধু আমার দিকে কঠিন ভাবে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘তুই এমন নিষ্ঠুর!’ তার মুখে যে যন্ত্রণা দেখেছিলাম তা বিবেকবোধ জাগিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সে সারাদিনে আর কোন কাজ করল না এবং একা এক জায়গায় বাকি দিন নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। আমি আড়াল থেকে তার চোখে জল দেখতে পেয়েছিলাম। আর সে সারাদিন কিছুই খেল না। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর শিক্ষা কিভাবে পৃথিবীর সমস্ত জীবিত প্রাণীদের ভালবাসতে হয় এ বিষয়টি শেখাবার জন্য যথেষ্ট ছিল।

তার ওপর, আমার মা আমাকে গান শিখিয়েছিল। সে কিন্তু পেশাদার গায়িকা ছিল না, গান সে শেখেওনি কারো কাছে। কিন্তু হাজার গান তার জানা ছিল। গান গাইতে গাইতে সে সারাদিনের কাজ করত। তার কাছেই আমি শিখেছিলাম কিভাবে গানকে জীবনের সঙ্গী বানাতে হয়। কেবল মানুষের জন্য নয়, প্রকৃতির অন্য সবার জন্য কিভাবে গাইতে হয় তা মা-ই আমাকে শিখিয়েছিল।

ছোট্টবেলার একটি বিশেষ দিনের কথা আমার মনে আছে যেদিন মা আমাকে এক পাহাড়ের তলায় ছায়াচ্ছন্ন মনোরম পরিবেশে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে সে তারপর পাহাড়ে উঠতে শুরু করল। কোথাও কোথাও দুর্গম হলেও সেই আঁকাবাঁকা চড়াই ছিল অপরূপ। চলতে চলতে মা আমাকে সেই চূড়াটির গল্প শোনাচ্ছিল। জীবনে সেই প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে চূড়াটির নাম সুখশান্তি। চূড়ায় পৌঁছে মা আমাকে আঙ্গুল তুলে দ্বীপকে ঘিরে থাকা দূরের সমুদ্র দেখাল আর বলল, ‘দেখো, ওই হচ্ছে শান্তিসমুদ্র।’ সেটি ছিল এক অবিস্মরণীয় দিন।

এভাবেই আমার মা আমার দ্বীপটির সৌন্দর্য ও অভিনবত্ব আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। এই কাজটি সে করেছিল তার সমস্ত জীবন ধরে। কেন আমার দ্বীপটি কেবলমাত্র আমারই দ্বীপ মাত্রাধিক যত্ন নিয়ে সে এই ব্যাপারটি আমাকে বুঝিয়েছিল। এই বিষয়ে আমার বাবার ভূমিকাও কোন অংশে কম ছিল না।

দিনের পর দিন সমস্ত দ্বীপ আমরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। বিশ্বাস নামে রাস্তাটি ধরে ভ্রমণ আমাকে যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করত। একটি বিশেষ দিনের স্মৃতি এখনো আমার মনে টাটকা হয়ে আছে। সেদিন আমরা বিস্তৃত বন্য প্রকৃতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম যার একটি প্রান্তে ছিল দিগন্ত। দিনটি তখন চোখ বোজার জন্য প্রস্তুত আর আকাশ সারা গায়ে নয়নাভিরাম বর্ণবৈচিত্র্য মেখে ছিল শান্ত সমাহিত। বাবা আমাকে বলল, ‘দেখো, দ্বীপটি কত সুন্দর আর একেই বলে প্রশান্তি।’

আমাদের চলার পথ যে সবসময় মসৃণ হত এমন নয়। পথটির আঁকাবাঁকা ব্যাপ্তি দ্বীপের সমস্ত অঞ্চলে প্রসারিত ছিল। বাবা তার জীবনে সমস্তটা পথ অতিক্রম করে গিয়েছিল। এখন সে আমাকে তার সঙ্গী করে নিল। এই পথ ও তার চারপাশের বৈচিত্র ছিল অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয়। চলতে চলতে আমাদের পেরিয়ে যেতে হত পাহাড়-পর্বত, বনভূমি, হ্রদ, রুক্ষ প্রান্তর, নদী-নালা, ঘাসবন, উপত্যকা, গিরিখাত ইত্যাদি কত কী। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বাবা ব্যাখ্যা করত কিভাবে আত্মসম্মান, প্রেরণা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সততা, স্বপ্ন, মহানুভবতা, জ্ঞান, মর্যাদাবোধ ইত্যাদি এই সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া যায়। একবার আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই পথ থেকে বিশ্বাস কিভাবে জন্ম নেয়?’ বাবা আমাকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিল, ‘বিশ্বাস হল এক ধরনের বন্ধন আর তুমি একে পাবে যদি সবসময় এই রাস্তা ধরে চলতে থাক।’ তারপর বাবা আমাকে অনুত্তম বলে একজনের গল্প শুনিয়েছিল যে এই রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করেছিল। কিন্তু সে কোন কারণে বিভ্রান্ত হয়ে মাঝপথেই চলা বন্ধ করে দেয়। সেদিন থেকেই সে সবকিছু হারিয়ে ফেলে আর জীবনে কাউকে বন্ধু হিসেবে পায় না। নিজের মত অবিশ্বাসী লোকদের সঙ্গে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হয়। এইসব লোকেদের আস্থাভাজন হওয়ার যোগ্যতা ছিল না আর তারা পরস্পরকে অবিশ্বাস করে দিন কাটাত। একবার কেউ এই রাস্তা ছেড়ে গেলে আবার একে ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমার সময় আমরা একবার সাহস নামে এক মালভূমিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি বাবার কাছে জানতে চেয়েছিলাম এই মালভূমির চরিত্র। বাবা আমাকে আকাশে উড়ন্ত ঈগলদের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। সে বলেছিল, ‘ওই পাখিগুলিকে দেখো। তারা স্বাধীনতা উপভোগ করছে। তা কিভাবে সম্ভব? এটা সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে ওদের সাহস আছে। তার মানে সাহস থাকলে তুমি স্বাধীনতা পাবে।’

একদিন আমরা এক গভীর জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলাম। সেদিনই প্রথম আমি এই জঙ্গলের নাম ও চরিত্র জানতে পেরেছিলাম। এটি হচ্ছে সেই স্থান যেখানে স্বপ্নেরা বাসা বানিয়ে থাকে। আমার বাবা আমাকে জানিয়েছিল, ‘স্বপ্ন ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না। তাই তোমাকে এই বনে আসতেই হবে।’ তাই আমরা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছিলাম। অঞ্চলটির স্নিগ্ধ-শীতল ছায়া আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিয়েছিল। পাখিরা গান গাইছিল। তাদের কমনীয় কন্ঠের আওয়াজ প্রাণের খুশি ঘোষণা করেছিল। তাদের গান কী বার্তা নিয়ে আসছে বোঝার চেষ্টা করে আমি খুঁজে পেলাম মুক্তির আনন্দ। হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল স্বপ্নেরা। বাবা আমাকে এক এক করে বিভিন্ন পশুপাখি আর গাছপালা চিনিয়ে দিল। তারপর সে আমাকে দেখাল জ্ঞান নামের সেই গাছটিকে। আমি এর বিস্তার দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এটা কত বিশাল হতে পারে তার ধারণাই করতে পারলাম না। আর তার বয়স কল্পনাতীত। সেই সময়ে আমি তার পুরোটা দেখতেই পেলাম না। কেবলমাত্র সেই গাছের ক্ষুদ্র একটি অংশ আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম। বাবা বলেছিল, ‘একদিন তুমি এই গাছে চড়তে পারবে আর সেদিনই তুমি সম্পূর্ণ মানুষ হবে।’

আমাদের অভিযান কিছু গুহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল। স্থানটি ছিল মূলত খনিজ এলাকা। আমার বাবা ওইসব অন্ধকার ও  রহস্যজনক গুহাগুলিতে আমাকে নিয়ে যাবে শুনে আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত আমি আমার সমস্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলাম এবং সম্পদের সন্ধানে মাটির তলায় অভিযান চালাবার জন্য যথেষ্ট মনোবল ও সাহস খুঁজে পেলাম। আমার হাত ধরে বাবা আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার সাহায্য ছাড়া এসব খুঁজে পাওয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। সূচিভেদ্য অন্ধকার ভূপৃষ্ঠের তলদেশে এই ভ্রমণ খুব বিপজ্জনক করে তুলেছিল। আমরা পরস্পরকে দেখতে পর্যন্ত পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বাবা যেহেতু আমার হাত সবসময় শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছিল আমি তাই নির্ভয় ছিলাম। উদারতা, মানসম্মান, শালীনতা, মহানুভবতা ও সততা ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ দ্রব্যগুলি আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। বাবা আমাকে এইসব গুণাবলীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল কেন এসব সম্পদ আমার অর্জন করা উচিত। এগুলি সংগ্রহ করা সত্যিই খুব কঠিন কিন্তু একবার অর্জন করতে পারলে সারা জীবন আর হারাবার ভয় থাকবে না। বাবা আমাকে উপদেশ দিয়ে জানিয়েছিল, ‘তোমাকে অনবরত চেষ্টা ও অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে আর তাহলেই তুমি এসব মূল্যবান সম্পদ অর্জন করে নিজেকে সম্পদশালী করে তুলতে পারবে।’

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *