প্রীতন্বিতা
মহাকাশে মহাশব্দ বিস্ময়
মহাকাশ বলতে আমরা জানি এক হিমশীতল মহানিঃশব্দ পরিবেশ। শব্দতরঙ্গ কোন মাধ্যম ছাড়া এগোতে পারে না এবং যেহেতু মহাকাশের গ্যালাক্সিগুলির মধ্যবর্তী অঞ্চল একেবারেই ফাঁকা তাই যত বড় বিস্ফোরণ ঘটুক না কেন মহাশূন্যে তার প্রকৃতি কেমন জানার কোন উপায় নেই।
২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে আরকেড নামে বেলুনস্থিত যন্ত্রপাতি সম্বলিত একটি মিশন ঊর্ধ্বাকাশে পাঠানো হয়েছিল বিশেষ গবেষণার উদ্দেশ্যে। বেলুনটি এক লক্ষ কুড়ি হাজার ফিট উচ্চতায় গিয়ে কাজ করতে শুরু করে। ওই উচ্চতায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল খুবই ক্ষীণ, জায়গাটা চরিত্রে মহাশূন্যের মতো। মিশনের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব সৃষ্টির আদি পর্বে যেসব তারা প্রথম জন্ম নিয়েছিল প্রথম প্রজন্মের সেই সব তারাদের প্রায় মুছে যাওয়া উত্তাপের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা। কিন্তু পরিবর্তে আরকেডের অত্তুনত যন্ত্রপাতিতে ধরা দিল এক অভূতপূর্ব বিস্ময়। বেলুনটির যান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধরা পড়লো মহাকাশের সুদুরতম প্রান্ত থেকে আগত এক মহা গর্জনধ্বনি। এই রহস্যময় নিনাদ মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো শব্দপুঞ্জের তুলনায় অন্তত ৬ গুণ তীব্র ও অকল্পনীয়। কী তার উৎস কেউ জানে না।

শব্দতরঙ্গ শূন্য মাধ্যম ধরে এগোতে পারে না। তাহলে মহাকাশে এই রহস্যময় চিৎকারের শব্দ ধরা পড়লো কোন্ কায়দায়? আলোক তরঙ্গ ছাড়া বেতার তরঙ্গ কিন্তু শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে। দূরবর্তী মহাকাশ থেকে আসা ওই মহাগর্জন জানা গেল বেতার তরঙ্গ থেকে। প্রকৃতপক্ষে শব্দ তরঙ্গ না হলেও বেতার তরঙ্গ আসলে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ এবং তা বর্ণালী বীক্ষণের নিম্নতরঙ্গ দৈর্ঘ্যের প্রান্তে অবস্থান করে। মহাবিশ্বের অনেক বস্তু থেকেই শব্দ তরঙ্গ, বিশেষ করে বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। বেশ কিছু তারকা ছাড়াও রেডিও ওয়েভ নিক্ষেপকারীদের ভালো দৃষ্টান্ত হলো কোয়াসার। আমাদের গ্যালাক্সি ছায়াপথ থেকেও এক ধরনের হিস হিস গর্জন নির্গত হয়। ব্যাপারটা ১৯৩১ সালে প্রথম শনাক্ত করেছিলেন মহাকাশ বিজ্ঞানী কার্ল জানস্কি। অন্য সব গ্যালাক্সি থেকেও এরকম হিস হিস বেতার তরঙ্গ ভেসে আসে। কিন্তু আরকেড মিশনের সদ্য আবিষ্কৃত মহাগর্জন এতদিন ধরে জানা যাবতীয় বেতার গর্জনের চেয়ে অনেক অনেক প্রবল। প্রাথমিক গবেষণায় আদিম তারকা বা অন্য কোন বেতার উৎস এই মহানিনাদের জন্মদাতা নয় বোঝা গেছে। এমনকি সমস্ত কোয়াসারগুলিকে একসঙ্গে নিলেও এত গর্জন কিছুতেই পাওয়া যাবে না। মহাবিশ্বের জানা সমস্ত গর্জনকারী বস্তুপিণ্ডগুলির সম্মিলিত ধ্বনিতর্জনের তুলনায় এই মহানিনাদ ৬ গুণ বেশি।
এই মহাগর্জন মহাকাশের এক অজানা বিস্ময়। এমন ধারণা করা হয় যে এই বেতার তরঙ্গ যেহেতু মহাকাশের সুদুরতম প্রান্ত থেকে আলোর গতিবেগে ধেয়ে আসছে তাই এই মহাশব্দ অবশ্যই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর প্রাথমিক অবস্থার কোন ঘটনার ছবি তুলে ধরছে। সেই ঘটনা কী তা অজানা।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
