রম্যরচনা

অধ্যায় : ২০

কবি পুলকিত পলায়ন যে কী মাপের শত্রু হওয়ার ক্ষমতা রাখে সেটা তখনও পুরোটা বোঝা সম্ভব হয়নি। আসলে অধিকাংশ শত্রুর ক্ষেত্রেই এটা এক সাধারণ সমস্যা। প্রাথমিক দর্শনে বোঝা যায় না তাদের শত্রুতার বহর কতটা ভয়াবহ ও কী পরিমাণ হতে পারে। শত্রুদের চরিত্র তাদের দেখে আন্দাজ করা যায় না বলেই অশেষ ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কেউ যতই সতর্ক থাকুক আর যতই সাবধান হোক শত্রুদের নাগাল এড়িয়ে নিজেকে বাঁচানোর উপায় নেই কারোও। হাচিয়া ফালের মত ব্যক্তি, যে তার জীবনভর শত্রুদের নিয়ে গবেষণা আর চর্চা চালিয়ে শত্রু ও শত্রুচরিত্র সম্পর্কে এতটাই বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে যে শত্রু বিষয়ক সহস্রাধিক পৃষ্ঠার কতিপয় থিসিস পেপার লিখে অনায়াসে অন্তত পাঁচটি পিএইচডি পেতে পারে, সে পর্যন্ত আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়। যেমন এখানে।

টানা কয়েকদিন ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছিল হাচিয়া ফাল কবি পুলকিত পলায়নের ভয়ে। পরে লোকটা কুকুরের তাড়া খেয়ে পা ভেঙে বাড়িতে শয্যাশায়ী হওয়ার পর তার দুর্ভোগ কাটল। বাইরে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে সে আবার বাড়িতে থাকতে লাগল। তিন দিন নিরাপদে কাটল তার। চতুর্থ দিন সকালের একটু পর বকমার্কা চেহারার জনৈক ব্যক্তি দেখা করতে এলো তার সঙ্গে, হাতে একতারা কাগজ। বিপদের সূত্রপাত সেখানেই। কিন্তু বিপদ যে কতটা তা হাচিয়া ফালের মত অভিজ্ঞ মানুষও নিরীহ বকমার্কা চেহারার ওই লোকটাকে দেখে ধারণাই করতে পারেনি। এমনিতে সে নতুন যে কোন লোককেই সন্দেহের চোখে দেখে, তার সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলতে এলে আরো সতর্ক হয়ে যায়। পুরনো বা চেনাশোনা লোকদের কথা বলা বাহুল্যমাত্র, যেহেতু তারা সবাই তার শত্রু বসেই আছে। এখানে এই বকমার্কা লোকটাকে দেখেও অপ্রসন্ন ও সাবধানী চোখে জরিপ করতে লাগলো যখন সে বিনীত ভঙ্গিতে লোকটা বলছিল হাতজোড় করে, 

‘আজ্ঞে এই নরাধমের নাম কুলকুল কুলচা। লোকমুখে অবগত হয়েছি যে আপনি অতীব সদাশয় ও সজ্জন ব্যক্তি, মহাপুরুষতুল্য। গুণী ব্যক্তিবর্গের নিমিত্ত সদাসর্বদা আপনার অবারিত দ্বার।’

হাচিয়া ফাল বহুবার প্রতিজ্ঞা করেছে যে কেউ অকারণে তার প্রশংসা করতে এলেই তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে, কারণ সে অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে এই জাতীয় লোকরা পরে চূড়ান্ত শত্রু হয়ে যায়। প্রতিজ্ঞা করে ঠিকই, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেটা বারবার ভুলে গিয়ে বিপদ বাঁধিয়ে বসে। আসলে কেউ প্রশংসা করলেই মাথাটা কেমন গোলমাল হয়ে যায়, নিজের সম্পর্কে ভালো ভালো কথা শোনার লোভ দমন করতে পারে না কিছুতেই। প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গিয়ে বিগলিত হয়ে পড়ে। এখানেও তেমনটাই হল। কুলকুল কুলচার মুখে নিজের গুনগান শুনে তার মনে কুলকুল করেই শান্ত নদীপ্রবাহ শুরু হল। ফুরফুরে হাওয়া বইতে লাগল। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে সে বলে বসল, 

‘তা যা শুনেছেন ঠিকই শুনেছেন। আমি সৎ ও চরিত্রবান মানুষ। লোকেরা আমার সঙ্গে অবিরাম শত্রুতা করে। আমি তাদের ক্ষমা করে দিই। কোন লোকের অনিষ্ট করি না। মানুষের মঙ্গল করা আমার ধর্ম।’

নিজের সম্পর্কে ভালো ভালো কথা জানাবার সুযোগ সবসময় পাওয়া যায় না। আজ তা পেয়ে হাচিয়া ফাল সাধ মিটিয়ে নিজের গুণকীর্তন করে গেল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করে কোন্ মূর্খ? বলতে বলতে বুঝতে পারল নিজের সম্পর্কে বহু কথা তার বলার আছে। লোকরা শুনতে চায় না বলে সে জানাতে পারেনা কথাগুলি। জমে থাকে মনের মধ্যে। জমে জমে বদহজম হতে থাকে। আজ সেসব কথা প্রকাশ করতে পেরে সেই অস্বস্তি লাঘব হল। বড়ই আনন্দ পেল সে আর এই হঠাৎ-আসা অচেনা লোকটার ওপর বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠল। আরোও নিজের গুনগান করা উচিত কিনা যখন সে ভাবছিল তখন কুলকুল কুলচা বিনম্র গলায় তারিফ করার ভঙ্গিতে বলল, 

‘আহা আহা, লোকোমুখি যা শুনেছি আপনার সম্পর্কে তা দেখছি একদম ঠিক।’ 

হাচিয়া ফাল রীতিমত অভিভূত হয়ে পড়েছে। সে দাতাকর্ণের মেজাজে বলল, 

‘বলুন, আপনার কী উপকারে লাগতে পারি? আসুন আগে, ঘরে এসে বসুন।’

কুলকুল কুলচা কে সে সমাদরে ঘরে ঢুকে বসিয়ে নিজেও বসলো তার মুখোমুখি। জিজ্ঞেস করল, 

‘আপনার কী দরকার আমাকে? এত সকাল-সকাল না হলে আসবেন কেন?’ 

‘ঠিকই ধরেছেন। খুবই দরকার।’ কুলকুল কুলচা বলতে লাগলো, ‘এমনই দরকার যে সকালে জলখাবার খেয়ে আসার সময় পাইনি। খিদেও পেয়েছে বেশ।’

হাচিয়া ফাল আর কী করে? তার নিজেরও জলখাবার খাওয়া হয়নি। খেতে যাবে যখন তখনই লোকটা এসে হাজির। তা এই লোকটার ওপর এমনই প্রসন্ন ছিল যে নিজের রান্নাঘরে ডেকে নিয়ে গেল। তারপর নিজের জন্য বরাদ্দ পাউরুটি-কলা-কেক ইত্যাদি তার সঙ্গে আধাআধি ভাগ করে খেলো। তৃপ্তির সঙ্গে সেসব খেতে খেতে কুলকুল কুলচা বলতে লাগলো, 

‘এক কাপ চা হলে বেশ ভালো হতো। চা খান কখন আপনি?’ 

হাচিয়া ফাল জানালো যে সে চা খায় না আর তাই চা সে কেনেও না। লোকটা শুনে মুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা এনে বলল, 

‘মহা মুসকিলে ফেললেন তো! চা না হলে যে চলবেই না আমার। কী করি?’ 

বাড়িতে চা না রাখার জন্য নিজেকে অপরাধী বলে মনে হলো হাচিয়া ফালের। লোকটা হঠাৎ কী ভেবে বেশ উৎসাহের গলায় জিজ্ঞেস করল, 

‘আচ্ছা, পাতাজাতীয় কোন দ্রব্য আছে আপনার বাড়িতে? তেজপাতা জাতীয়?’ 

হাচিয়া ফাল বেশ অবাক হলো। বলল, 

‘তেজপাতা নেই। ধনেপাতা আছে।’

‘শুকনো পাতা হলে ভালো হতো। নেই যখন ধনেপাতাতেই হবে। দিন তো মশাই।’

হাচিয়া ফাল এক আটি ধনেপাতা বার করে আনলো। কুলকুল কুলচা একটা সসপ্যান নিয়ে তাতে জল ঢেলে ধনেপাতা, নুন, চিনি আর লঙ্কাগুঁড়ো মিশিয়ে ফুটিয়ে নিল গ্যাস ওভেনে। তারপর ফুটন্ত ওই বিচিত্র জল একটা গ্লাসে ঢেলে আলতো একটু চুমুক দিয়ে পরম তৃপ্তিতে বলল, 

‘আহ্, ফ্যান্টাস্টিক। দারুণ ধনেপাতা চা হয়েছে। খাবেন নাকি?’

হাচিয়া ফাল প্রবলভাবে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো। কুলকুল কুলচা বলল, 

‘চলুন এবার, বসার ঘরে যাই। শান্তিমতো আপনার সঙ্গে যে কারণে আসা তা নিয়ে কথা বলা যাক।’

দুজনে মিলে চলে এলো বসার ঘরে। টেবিলের ওপর ছিল সেই একতারা কাগজ যা হাতে নিয়ে তার বাড়ি এসেছিল কুলকুল কুলচা। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সেই কাগজের বান্ডিল খুলতে খুলতে সে বলল, 

‘আপনার কথা আমাকে বিশেষভাবে বলেছেন কবি পুলকিত পলায়ন। পা ভেঙে বিছানায় পড়ে আছেন বেচারা। দেখা করতে গিয়েছিলাম। উনি জানালেন আপনি অসম্ভব কবিতাপ্রেমী। আমি হলাম জন্মকবি, জন্ম থেকেই কবিতা রচনায় মগ্ন। কবি পুলকিত পলায়নের পরামর্শ অনুযায়ী তাই আপনার কাছে আসা। আমার কিছু নির্বাচিত কবিতা আপনাকে পাঠ করে শোনাবো।’

কবি পুলকিত পলায়নের নাম শুনেই হাচিয়া ফালের চুল খাড়া হয়ে গিয়েছিল। লোকটার পরবর্তী মতলব জেনে সে সবেগে বাধা দেওয়ার আগেই কবিতা পাঠ শুরু হয়ে গেল। সেই যে শুরু হলো চলল একটানা তিন ঘন্টা। মোট সাতাশ খানা কবিতা একের পিঠে আরেক এমন অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে আবৃত্তি করে গেল কুলকুল কুলচা যে হাচিয়া ফাল বাধা দেওয়ার কোন অবকাশই পেল না। অসহায় শ্রোতা হয়ে বসে রইল। ঘন্টা তিনেক পর সাধ মিটিয়ে কবিতা শুনিয়ে লোকটা যখন বিদায় নিল তখন হাচিয়া ফাল প্রায় আধমরা। তা ভাগ্যিস নিজে থেকেই বিদায় নিল সে। যদি না নিত তো হাচিয়া ফাল ফুল-মরা হয়ে যেত।

কুলকুল কুলচা বিদায় নিতে সে উঠে স্নান-টান সেরে দুপুরের খাওয়ার জন্য রান্না-টান্না করে নিল। ঘন্টাখানেক সময় ধরে মনে মনে মুন্ডুপাত করছিল কবি পুলকিত পলায়নের। রান্নাবান্না হলে পর সবে খেতে বসবে তখন হাজির দ্বিতীয় আরেক চরিত্র। এ আরেক কবি, নাম বিলকুল বেলচা। তারও আগমন সেই পুলকিত পলায়নের পরামর্শ মেনে। এই বিলকুল বেলচা এমনই বেপরোয়া চরিত্রের যে হাচিয়া ফাল তাকে বাধা দিতেই সাহস বা ক্ষমতা কোনটাই খুঁজে পেল না। সে প্রবল বিক্রমে তার ঘরে ঢুকে জোর করে জাঁকিয়ে বসলো, একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলো এবং টানা তিন ঘন্টা স্বরচিত কবিতা শুনিয়ে গেল। হাচিয়া ফাল একেবারে অরক্ষণীয়ভাবে কবি বিলকুল বেলচার কবলগ্রস্ত হয়ে থাকলো এবং চলাফেরা করল তারই ইচ্ছে অনুসারে। সন্ধে নাগাদ যাওয়ার আগে সে হুমকি দিয়ে জানিয়ে গেল যে একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে সে শিগগিরই আবার শোনাতে আসবে। 

বিলকুল বেলচা চলে যাওয়ার ঘন্টা খানেক পর আবার আরেক পরাক্রমশালী কবি উদয় হলো। সে হাচিয়া ফালের সঙ্গে ভাগ করে রাতের খাবার খেলো ও ঘন্টা তিনেক কবিতা শুনিয়ে বিদায় হল রাত এগারোটা নাগাদ। তারও আগমনের সূত্র কবি পুলকিত পলায়ন। 

পরদিন একেবারে ভয়াবহ কান্ড। সকাল থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় নানা কবির আগমন ঘটতে লাগলো। বিকেলের দিকে শুরু হলো কবিদের দলবদ্ধ হানা। তৃতীয় দিন হাচিয়া ফালের বাড়ি রাত বারোটা পর্যন্ত কবি-কবলিত হয়ে থাকল সর্বক্ষণ। সব কবিকেই তার কথা জানিয়েছে সেই পুলকিত পলায়ন। 

সেদিনই রাত বারোটা নাগাদ কবিকবলমুক্ত হওয়ার ঘন্টা চারেক পর বাড়ির সদর দরজায় তালা লাগিয়ে ভোর চারটে নাগাদ বাড়ি থেকে কেটে পড়লো হাচিয়া ফাল। তারপর স্টেশনে গিয়ে এক দূরপাল্লার ট্রেনে চেপে বসল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে অন্তত পাঁচশ কিলোমিটার দূরবর্তী কোন এক জায়গায় সে চলে যাবে। যার নাম সে ডায়েরিতেও লিখল না পাছে চরম শত্রু পুলকিত পলায়ন জেনে ফেলে এই ভয়ে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *