তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক।
বিষয় পরিচিতি
(জন্মসূত্রে প্রত্যেকেই একটি দ্বীপের অধিকার পায়। সেটি একান্তভাবে তার নিজেরই দ্বীপ। শৈশবে সেই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে ওঠে বহুবর্ণ বৈচিত্র্যময় অজস্র সমস্ত আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন। তারপর সে এগিয়ে চলতে থাকে তার জীবনের পথ ধরে। ক্রমশ সেই দ্বীপে হানাদারদের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তার অজ্ঞাতসারে, হিতাকাংখীরূপে। যত সে কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের স্তরগুলি অতিক্রম করে চলে হানাদারদের আগমন ও আক্রমণের তীব্রতা বাড়তেই থাকে। এভাবে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সে দেখে সে তার জন্মসূত্রে পাওয়া দ্বীপটি হারিয়ে ফেলেছে, দ্বীপ চলে গেছে হানাদারদের অধিকারে। হারিয়ে গেছে তার শৈশবের সব আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন। সে নিজেকে আবিষ্কার করে বিপন্ন, বিদ্ধস্ত, বিষণ্ণ, হতাশ, সর্বহারা, একাকী নির্বাসিত এক সত্ত্বা হিসেবে। অনিবার্য মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে সে কি আবার তার শৈশবের দ্বীপটি হানাদারদের কবল থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে?)
অধ্যায় : ১
এটাই আমার দ্বীপ। জন্ম থেকেই আমি এর অধিকার পেয়েছি। প্রত্যেকেই এভাবে তার একটি নিজস্ব দ্বীপ পায় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সগর্বে একে নিজের অধিকারে রাখে।
এটাই আমার দ্বীপ। হ্যাঁ, এটা আমারই দ্বীপ। এই সত্যি আবিষ্কার করেছিলাম আমি অনেক বছর আগে আমার ছোট্টবেলায় যখন সবে বুঝতে শিখেছিলাম আর তখন থেকেই আমি এখানে আছি আমার সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে। তখন থেকেই আমি সবকিছুই দিনলিপির আকারে লিখতে শুরু করেছিলাম। কেউ কি জানে আমার কী সব জিনিসপত্র আছে? আসলে আমার দ্বীপে যে সমস্ত জিনিস আছে সেসব রয়েছে আমারই অধিকারে। সে সমস্ত জিনিসের অবশ্যই একটি বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া উচিত। কিন্তু এই বিবরণ এত লম্বা হবে যে এই কাহিনীর সমস্ত পাতা শেষ হলেও বর্ণনা ফুরোবে না। গল্পের বদলে পাওয়া যাবে একটি বিরক্তিকর তালিকা। তাই সমস্ত কিছু জানাবার জন্য অন্য কোন সহজ উপায়ের কথা ভাবতে হবে।
আমার দ্বীপের একটি নাম আছে। আমি একে আবিষ্কার করার আগে পর্যন্ত এর কোন নাম ছিল না। তখন তার কোন নাম থাকার প্রশ্নই ছিলনা যেহেতু আমার আগে কেউ তার অস্তিত্বের কথা জানত না। প্রথমেই আমি বলব কিভাবে আমার দ্বীপ তার নাম পেল। এটা আন্দাজ করা কারো পক্ষে তেমন কঠিন কাজ নয়। আমি এখানে থাকতে শুরু করার পর একটি নাম বাছাই করে নিলাম। এই নাম বাছাই করাটা একটু জটিল। কোন বস্তুর নামকরণ প্রক্রিয়া কিছু নিয়ম মেনে হয়। একটি গরুকে একটি বাড়ির নাম দেওয়া যাবে না, যেমন সূর্যকে একটি রাস্তার নামে ডাকলে তা হবে বেমানান। ঠিক জিনিসের সঠিক নাম হওয়া উচিত, না হলে ঠিক জিনিসকে মনে হবে ভুল জিনিস। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যদি হাতের নাম পা দেওয়া হয় তাহলে একজনের পক্ষে বোঝা মুশকিল হবে সে কিভাবে হাঁটবে, সে হাঁটতে গিয়ে পা ব্যবহার করবে নাকি হাত, আর এভাবেই সমস্ত হাঁটার প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে। তাই সঠিক বস্তুর সঠিক নামকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এজন্যই আমার জন্মসূত্রে পাওয়া দ্বীপটির নাম আমার আমি রাখতে গিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ছিলাম।
হ্যাঁ, আমার দ্বীপটির নাম আমার আমি।
কেন আমার দ্বীপটির নাম এমন দিয়েছিলাম তার পিছনে একটি লম্বা গল্প আছে যা সুযোগ পেলে পরে কখনো বলা যাবে। আগে বরং আমার দ্বীপের কিছু আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যাক। এসব বৈশিষ্ট্য আমার দ্বীপকে আমার কাছে অদ্বিতীয় করে তুলেছে।
সমুদ্রতীর থেকে দূরে দেখা যায় আমার দ্বীপের দুটি যমজ পাহাড়চূড়া। তাদের স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখে সবাই মুগ্ধ হতে বাধ্য। এদের একটির নাম আনন্দ এবং অন্যটির নাম সুখ। এরা আমার ও আমার দ্বীপের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এদের বাদ দিয়ে আমি এক মুহুর্ত বেঁচে থাকার কথা ভাবতে পারি না। এরা অপরূপ বর্ণোজ্জ্বল, যাদের একেকটি টুকরো কাউকে সারাদিন মাতিয়ে রাখতে পারে। এছাড়া আমার দ্বীপকে চারদিকে ঘিরে রেখেছে নীল সুগভীর সমুদ্র যার নাম শান্তি। এই শান্তি সমুদ্রের জলের স্বাদ কি কেউ পেতে চায়? আশ্চর্য হলেও এটা সত্যি যে এই জলের স্বাদ নোনতা নয়। এর স্বাদ এতটাই স্বস্তিদায়ক যে সবাই চাইবে সারাক্ষণ এখানে ডুবে থাকতে। আমাকে তাজা রাখতে নিয়মিত কাপ ভর্তি সমুদ্র জল নিয়ে আমি পান করি। কেউ যদি জীবনের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে তো তাকে আমি কিছু উপায় দেখাতে পারি। আমি তাকে এক কৌটো ভর্তি সজীব উপাদান দেব যা আমার দ্বীপের আশা নামের এক উপত্যকা থেকে সংগ্রহ করা। সেই কৌটোতে ভরা থাকবে যে রামধনু রঙ্গা সজীব উপাদান তার নামও আশা। আমি সবাইকে এই উপত্যকায় এসে বেরিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এ হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে প্রত্যেকেই তার জীবনের সমস্ত বর্ণবৈচিত্র খুঁজে পাবে। সেই উপত্যাকার কাছাকাছি রয়েছে আমার দ্বীপের সর্বোচ্চ চূড়া যার নাম কল্পনা। এই চূড়াটি আছে এমন একটি পর্বতমালায় যেখানে সুসজ্জিত রয়েছে আরও অন্যান্য চূড়া যাদের নাম প্রেরণা, মর্যাদা, উৎসাহ, সমৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা। আমার পছন্দ অনুযায়ী এই চূড়াগুলিতে আমি প্রায়ই ঘুরে বেড়াই। আমার ভিতরে যখন দুর্বলতা অনুভব করি তখন আমি আত্মবিশ্বাস চূড়াটিকে পেতে চাই এবং কয়েক ঘণ্টার চেষ্টাতে আমি সেই চূড়ার সর্বোচ্চ বিন্দুতে চলে যাই। চূড়াগুলিতে ওঠা সত্যিই খুব পরিশ্রমের কাজ হলেও উঠে গেলে যে অনুভূতি অন্তরে জাগে তার স্বাদ অতুলনীয়। আর আমি যখন কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই তখন উৎসাহ নামের চূড়াটিতে উঠে যাই এবং সেখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করি। প্রেরণা চূড়াটির ক্ষেত্রেও এই একই কথা সত্যি। আমি কে সে সম্পর্কে আমাকে সচেতন করে দেয় আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা চূড়াদুটি। সমৃদ্ধি চূড়াটি সমস্ত কিছুর মঙ্গল এনে দেবে। আমার দ্বীপের কেন্দ্রে আছে একটি বিশাল বয়স্ক গাছ। স্বপ্ন নামের একটি বনাঞ্চলের মধ্যে রয়েছে এই গাছ যেখানে আছে আরও প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। গাছটির নাম জ্ঞান।
আমার দ্বীপে রয়েছে বেশকিছু সমৃদ্ধ খনি যেগুলিতে আছে মূল্যবান সমস্ত খনিজ দ্রব্য। এগুলি হল সততা, শালীনতা, ভক্তি ও বিনয়, উদারতা,মহানুভবতা ও মানসম্মান এবং আরোও অনেক কিছু। আমাকে পরিশোধন করার জন্য এই খনিজ সম্পদগুলির অবদান অপরিহার্য। সভ্যতার পঙ্কিলতা আমার মধ্যে যখন দূষণ ঘটায় আমি এই খনিগুলোতে গিয়ে তাদের খনিজ দ্রব্য তুলে আনি। সেসব দিয়ে আমি আমার চরিত্র সংশোধন করি যতক্ষণ না তা আবার আগের মত স্বমহিমায় ফিরে আসে। আমার দ্বীপে যে সমস্ত নদী বয়ে চলেছে তাদের মধ্যে ভালোবাসা হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী যার শাখা নদী হল স্নেহ বা মমতা। কোমলতা, হাসি এবং করুণা হল অন্য কয়েকটি নদী। যখন আমি আমার মধ্যে রুক্ষতা অনুভব করি এই নদীগুলিতে গিয়ে স্নান করে আসি ও নিজেকে পুনরুদ্ধার করি। হাসি হল সেই নদী যে আমার জীবনের সমস্ত আবর্জনা ধুয়ে দেয়। আবেগ নামে একটি বিশাল হ্রদ আছে। মাঝেমধ্যেই আমি আমার চরিত্র হারিয়ে ফেলি এবং নিজেকে মানুষ হিসেবে চিনতে পারিনা। অত্যাধুনিক অমানবিক প্রযুক্তি আমাকে চার পাশ থেকে চেপে ধরে আমার মধ্যে অপরিচিত সংকট সৃষ্টি করে। তখন আমি ওই আবেগ হ্রদে চলে যাই। আমার সমস্ত দ্বীপ জুড়ে রয়েছে যে মূল রাস্তা তার নাম বিশ্বাস। এই পথের অটুট বন্ধন অবশ্য প্রয়োজনীয়। সাহস হল সর্বোচ্চ মালভূমি এবং সারল্য ও উচ্ছ্বাস হল দুটি জলপ্রপাত। দু’রকম হাওয়া আমার দ্বীপ জুড়ে সব সময় বয়ে চলেছে যাদের নাম সান্ত্বনা ও বিনম্রতা।
আমি এখানকার একমাত্র অধিবাসী নই। বহু মানুষ যারা রোজ এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে তারা আমার সঙ্গী হিসেবে প্রবেশাধিকার পায়। লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করতে আমি ভালোবাসি। আমার দ্বীপে আসার জন্য সবাইকে আমি আমন্ত্রণ জানাই। আমি সব সময় নতুন বন্ধু পেতে চাই আর এই কারণে বিভিন্ন বয়স ও চরিত্রের মানুষের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের সবাইকে নিয়ে আমি আমার দ্বীপে মনের আনন্দে দিন কাটাই। প্রত্যেকটি মানুষেরই কিছু না কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা বানিয়েছে। আমি বৈচিত্র ভালোবাসি আর তাই সব মানুষই আমার প্রিয়জন।
আমার দ্বীপের দিন আর রাত সমান আকর্ষণীয়। আমি সব সময় ঘুরে বেড়াতে ভালবাসি। আমি এতে কখনো ক্লান্তি অনুভব করি না। বৈচিত্র্যময় বহুবর্ণ স্বপ্নের নেশায় আমি যখন আকুল হয়ে থাকি তখন গিয়ে প্রবেশ করি আমার দ্বীপের অরণ্যে। প্রত্যেকটি গাছে ঝুলতে থাকে শত শত স্বপ্নে গঠিত ফল এবং কেউ আরো ভিতরে গেলে তার আকণ্ঠ পূর্ণ হয়ে যায় অপূর্ব স্বপ্নময় উপাদানে। সবশেষে কয়েক ঘন্টা পর আমি যখন বন থেকে বেরিয়ে আসি তখন আমার দুচোখ ভরে থাকে প্রাণজুড়োনো আরাম। তারপর আমি সর্বোচ্চ শৈলচূড়া কল্পনাতে উঠতে শুরু করি। নিজেকে তখন মনে হয় যেন আমি এমন এক অত্যাশ্চর্য কাহিনীর লেখক যে লেখা সবাইকে জীবনের অর্থ বুঝিয়ে দেবে এবং এই কারণে আমি আমার চোখ ফেলি অনেক দূরে পর্বতমালার নিম্নাঞ্চলে। রামধনু রঞ্জিত আশা উপত্যকাটিকে আমি আবিষ্কার করি। আশা রঞ্জিত উপত্যকার রং নিয়ে কল্পনার চূড়োয় বসে লেখা আমার ওই কাহিনীর পাঠকদের আনন্দ-কোলাহল আমি শুনতে পাই।
এবার বরং আবার ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যাক। যারা জীবন যুদ্ধে পরাজিত এবং যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে আমি তাদের আমার সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি তাদের নিশ্চিতভাবে বলছি যে আমার দ্বীপে এমন অনেক স্থান আছে যেখানে তারা তাদের আগামী দিনগুলিকে অবশ্যই খুঁজে পাবে। এগিয়ে যাওয়ার পথ হয়তো বা একটু কঠিন হলেও হতে পারে কিন্তু লক্ষ্য অধরা থাকবে না কিছুতেই। যদি তারা আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যায় তবে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা পৃথিবীর এক মনোরম স্থান এবং আমার দ্বীপের সর্বোচ্চ মালভূমি সাহস। সেখানে পৌঁছতে পারলে সারা পৃথিবী পায়ের তলায় পড়ে থাকবে। আর সেখানেই পাওয়া যাবে সান্ত্বনা রূপ হাওয়ার স্পর্শ।
হামেশাই আমি মানুষের পীড়িত মুখচ্ছবি দেখতে পাই যারা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। এগুলি হল দুঃখের সাধারণ লক্ষণ যা কোনো মানুষের কাছে সবকিছুকে তিক্ত করে তুলেছে। এ জাতীয় মানসিক অবস্থার অবশ্যই কিছু উপযুক্ত কারণ রয়েছে। আমি এসব কারণ জানতে চাই না, এমনকি আমি তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করি না। তবে আমি তাদের চাপ কমাবার কিছু উপায় দেখাতে পারি। আমি আনন্দ নামের চূড়োটিতে চলে যাই এবং সেখান থেকে খানিকটা উপাদান সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। এক চামচ আনন্দ নিয়ে আমি হাসি নামের নদী থেকে সংগ্রহ করা একমগ জলের সঙ্গে মেশাই। এই মিশ্রণ আমি ওই দুস্থ মানুষটিকে পান করতে বলি। এতে তার দুঃখকষ্ট দূর হয়ে যায় এবং মুখে ঔজ্জ্বল্য ফুটে ওঠে।
হ্যাঁ, আমার দ্বীপ এমনই এক মনোরম স্থান। আমি এখানে থাকি, আমি এখানে আমাকে খুঁজে পাই। আমার জীবন এর অস্তিত্বের সঙ্গে একই সুতোয় বোনা। আসলে আমি আমার জীবনের পথে চলা শুরু করেছিলাম এখানে এবং আমার দ্বীপ এই পরিভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে। অন্য কেউ এখানে বেড়াতে আসতে পারে, এখানকার অনন্যতার স্বাদ পেতে পারে, এমনকি এই স্থানের সম্পদ ছিনিয়েও নিতে পারে, কিন্তু কখনো এর মালিকানা পেতে পারবে না। আমার দ্বীপের একমাত্র অধিকার রয়েছে আমারই হাতে।
জন্মসূত্রে প্রত্যেকেই একটি দ্বীপের অধিকার পায়। সেটি একান্তভাবে তার নিজেরই দ্বীপ। শৈশবে সেই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে ওঠে বহুবর্ণ বৈচিত্র্যময় অজস্র সমস্ত আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন। তারপর সে এগিয়ে চলতে থাকে তার জীবনের পথ ধরে। ক্রমশ সেই দ্বীপে হানাদারদের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তার অজ্ঞাতসারে, হিতাকাংখীরূপে। যত সে কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের স্তরগুলি অতিক্রম করে চলে হানাদারদের আগমন ও আক্রমণের তীব্রতা বাড়তেই থাকে। এভাবে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সে দেখে সে তার জন্মসূত্রে পাওয়া দ্বীপটি হারিয়ে ফেলেছে, দ্বীপ চলে গেছে হানাদারদের অধিকারে। হারিয়ে গেছে তার শৈশবের সব আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন। সে নিজেকে আবিষ্কার করে বিপন্ন, বিদ্ধস্ত, বিষণ্ণ, হতাশ, সর্বহারা, একাকী নির্বাসিত এক সত্ত্বা হিসেবে। অনিবার্য মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে সে কি আবার তার শৈশবের দ্বীপটি হানাদারদের কবল থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে?
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
অধ্যায় : ২
আমার দ্বীপ আমার আমি হল একমাত্র স্থান যেখানে আমি আমার জীবনরক্ষণ ব্যবস্থার সমস্ত প্রয়োজনীয় উপাদান পেয়ে যাই। যদিও জন্ম থেকেই আমি এই স্থানের অধিকারী তবুও জীবনের শুরুতে আমি এখানকার অভিনবত্ব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না। আমার মা আমাকে জীবন শুরুর দিনগুলোর গল্প শুনিয়েছিল। সে আমাকেহাসির নদীতে ভাসতে দেখে দু’হাতে বুকে তুলে নিয়েছিল আর দেখিয়েছিল কিভাবে অন্য নদী ভালোবাসা তার শাখানদী স্নেহকে নিয়ে বয়ে চলে যায়। আমি তার কাছেই জানতে পেরেছিলাম আমার আমি দ্বীপের জ্যোৎস্না এবং তুষারপাত কেমন চরিত্রের, যারা আসলে যথাক্রমে কোমলতা ও সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই নয়। মা আমাকে দুটি ভিন্ন ধরনের বৃষ্টিকেও চিনিয়ে দিয়েছিল, যাদের বলা হয় উদারতা ও খুশি।
তা সত্ত্বেও আমার মা যে সমস্ত বস্তুগুলির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আমি হয়তো সেগুলির প্রকৃত অর্থ ঠিক ঠিক বুঝতে পারতাম না। অবিরাম প্রবাহিত ভালোবাসার কী উপযোগিতা এবং কিভাবে স্নেহ পৃথিবীর বুকে মনোমুগ্ধকর প্রভাব ফেলে? কী ক্ষতি হবে জগতের যদি সহানুভূতি তুষারপাত হিসেবে না উপস্থিত থাকে? কোমলতা হিসেবে আমরা পাই যে জোৎস্নাকে তাকে ছাড়া কি বাঁচতে পারতাম না? খুশি বা পুলক হিসেবে বৃষ্টি যদি না থাকত তাহলে আমাদের জীবনে কী পার্থক্য দেখা যেত? কেন জীবনে প্রায়ই দয়া বা উদারতার বর্ষণ এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? আমার ওই ছোট্ট বয়সেই এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বোঝা সত্যিই অসম্ভব ছিল।
কিন্তু আমার মা সবকিছু আমার কাছে স্পষ্ট ও পরিস্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। তার এই শেখাবার পদ্ধতি ছিল সরল ও সাদাসিধে, যদিও অনেকক্ষেত্রে বিচার করে দেখতে গেলে মনে হবে অভাবনীয়। তার ছিল বাগান করার শখ এবং বাগানের প্রত্যেকটি গাছের জন্য সে আলাদাভাবে যত্ন নিত। সে গাছগুলির পাতা, বৃন্ত ও ডালপালাগুলিকে এমনভাবে স্পর্শ করত যে মনে হত সে যেন তাদের আদর করছে। পত্রপুষ্প ও ফল যখন ডালপালাকে সাজিয়ে তুলত তখন তার আনন্দ না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। সে কখনো কাউকে পাতা ছেঁড়ার বা ফুল তোলার অনুমতি দিত না। মা আমাকে শিখিয়েছিল কিভাবে গাছেদের ভালবাসতে হয়।
দাড়ি, কমা, সেমিকোলনের ব্যবহার আমি জানতাম না— আমি বুঝতাম না কেন আমি অন্যের কথা শুনব ধৈর্য ধরে। মা আমাকে শিখিয়েছিল কেন এবং কিভাবে অন্যকে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশাধিকার দেব। যে লোকগুলোকে আমি রোজ দেখছি তাদের সম্পর্কে আমার মনোভাব কেমন হওয়া উচিত এবং দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কী হবে আমার আচরণ বা প্রতিক্রিয়া। এসব শিক্ষা কখনোই বিরক্তিকর মৌখিক উপদেশ হিসেবে দেওয়া হত না, পরিবর্তে আমার মা আমাকে সমস্তকিছু শেখাত প্রাত্যহিক জীবনের চলাফেরার মধ্য দিয়ে। মুখে না বলে আমিও বরং বিষয়টি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি।
ছোট্ট বয়সে আমি ফড়ি্ংদের সঙ্গে খেলে বেড়াতে ভালবাসতাম। তারা যখন ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াত আমি তাদের পিছনে ছুটোছুটি করে যেতাম। আমার মা দেখে খুব খুশি হত কারণ সে ভাবত এভাবেই আমার মধ্যে প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা জন্ম নেবে। কিন্তু সে জানত না আমার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। উড়ন্ত ফড়িংরা আমার নাগালের বাইরে থাকত বলে আমি তাদের আমার অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইতাম। এক সাম্রাজ্যলোভী বিজেতার মত মানসিকতা গড়ে উঠছিল আমার মধ্যে। হাজার চেষ্টা করেও আমি তাদের ধরতে পারতাম না বলে আমার বেশ রাগ হত। শেষে একদিন আমার চেষ্টা সফল হল, আমি একটি ফড়িং ধরতে পারলাম। আমি এটিকে অন্যান্য সমস্ত ফড়িংদের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে এমনভাবে শাস্তি দিতে চাইলাম যাতে এটি কোনভাবে আমার কাছ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। আমি এর ডানাগুলি ছিঁড়ে ফেললাম। পতঙ্গটির যন্ত্রণাকাতরতা আমাকে বেশ খুশি ও পরিতৃপ্ত করল। কিন্তু এমন একটি অনৈতিক কাজ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। সে খুবই মর্মাহত ও বিপর্যস্ত হল এবং প্রাণপণ চেষ্টা করল পতঙ্গটিকে বাঁচাতে। ফড়িংটি কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে গেল। আমার মা কিন্তু আমাকে খুব বেশি বকাবকি করল না, শুধু আমার দিকে কঠিন ভাবে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘তুই এমন নিষ্ঠুর!’ তার মুখে যে যন্ত্রণা দেখেছিলাম তা বিবেকবোধ জাগিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সে সারাদিনে আর কোন কাজ করল না এবং একা এক জায়গায় বাকি দিন নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। আমি আড়াল থেকে তার চোখে জল দেখতে পেয়েছিলাম। আর সে সারাদিন কিছুই খেল না। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর শিক্ষা কিভাবে পৃথিবীর সমস্ত জীবিত প্রাণীদের ভালবাসতে হয় এ বিষয়টি শেখাবার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তার ওপর, আমার মা আমাকে গান শিখিয়েছিল। সে কিন্তু পেশাদার গায়িকা ছিল না, গান সে শেখেওনি কারো কাছে। কিন্তু হাজার গান তার জানা ছিল। গান গাইতে গাইতে সে সারাদিনের কাজ করত। তার কাছেই আমি শিখেছিলাম কিভাবে গানকে জীবনের সঙ্গী বানাতে হয়। কেবল মানুষের জন্য নয়, প্রকৃতির অন্য সবার জন্য কিভাবে গাইতে হয় তা মা-ই আমাকে শিখিয়েছিল।
ছোট্টবেলার একটি বিশেষ দিনের কথা আমার মনে আছে যেদিন মা আমাকে এক পাহাড়ের তলায় ছায়াচ্ছন্ন মনোরম পরিবেশে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে সে তারপর পাহাড়ে উঠতে শুরু করল। কোথাও কোথাও দুর্গম হলেও সেই আঁকাবাঁকা চড়াই ছিল অপরূপ। চলতে চলতে মা আমাকে সেই চূড়াটির গল্প শোনাচ্ছিল। জীবনে সেই প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে চূড়াটির নাম সুখশান্তি। চূড়ায় পৌঁছে মা আমাকে আঙ্গুল তুলে দ্বীপকে ঘিরে থাকা দূরের সমুদ্র দেখাল আর বলল, ‘দেখো, ওই হচ্ছে শান্তিসমুদ্র।’ সেটি ছিল এক অবিস্মরণীয় দিন।
এভাবেই আমার মা আমার দ্বীপটির সৌন্দর্য ও অভিনবত্ব আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। এই কাজটি সে করেছিল তার সমস্ত জীবন ধরে। কেন আমার দ্বীপটি কেবলমাত্র আমারই দ্বীপ মাত্রাধিক যত্ন নিয়ে সে এই ব্যাপারটি আমাকে বুঝিয়েছিল। এই বিষয়ে আমার বাবার ভূমিকাও কোন অংশে কম ছিল না।
দিনের পর দিন সমস্ত দ্বীপ আমরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। বিশ্বাস নামে রাস্তাটি ধরে ভ্রমণ আমাকে যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করত। একটি বিশেষ দিনের স্মৃতি এখনো আমার মনে টাটকা হয়ে আছে। সেদিন আমরা বিস্তৃত বন্য প্রকৃতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম যার একটি প্রান্তে ছিল দিগন্ত। দিনটি তখন চোখ বোজার জন্য প্রস্তুত আর আকাশ সারা গায়ে নয়নাভিরাম বর্ণবৈচিত্র্য মেখে ছিল শান্ত সমাহিত। বাবা আমাকে বলল, ‘দেখো, দ্বীপটি কত সুন্দর আর একেই বলে প্রশান্তি।’
আমাদের চলার পথ যে সবসময় মসৃণ হত এমন নয়। পথটির আঁকাবাঁকা ব্যাপ্তি দ্বীপের সমস্ত অঞ্চলে প্রসারিত ছিল। বাবা তার জীবনে সমস্তটা পথ অতিক্রম করে গিয়েছিল। এখন সে আমাকে তার সঙ্গী করে নিল। এই পথ ও তার চারপাশের বৈচিত্র ছিল অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয়। চলতে চলতে আমাদের পেরিয়ে যেতে হত পাহাড়-পর্বত, বনভূমি, হ্রদ, রুক্ষ প্রান্তর, নদী-নালা, ঘাসবন, উপত্যকা, গিরিখাত ইত্যাদি কত কী। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বাবা ব্যাখ্যা করত কিভাবে আত্মসম্মান, প্রেরণা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সততা, স্বপ্ন, মহানুভবতা, জ্ঞান, মর্যাদাবোধ ইত্যাদি এই সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া যায়। একবার আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই পথ থেকে বিশ্বাস কিভাবে জন্ম নেয়?’ বাবা আমাকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিল, ‘বিশ্বাস হল এক ধরনের বন্ধন আর তুমি একে পাবে যদি সবসময় এই রাস্তা ধরে চলতে থাক।’ তারপর বাবা আমাকে অনুত্তম বলে একজনের গল্প শুনিয়েছিল যে এই রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করেছিল। কিন্তু সে কোন কারণে বিভ্রান্ত হয়ে মাঝপথেই চলা বন্ধ করে দেয়। সেদিন থেকেই সে সবকিছু হারিয়ে ফেলে আর জীবনে কাউকে বন্ধু হিসেবে পায় না। নিজের মত অবিশ্বাসী লোকদের সঙ্গে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হয়। এইসব লোকেদের আস্থাভাজন হওয়ার যোগ্যতা ছিল না আর তারা পরস্পরকে অবিশ্বাস করে দিন কাটাত। একবার কেউ এই রাস্তা ছেড়ে গেলে আবার একে ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমার সময় আমরা একবার সাহস নামে এক মালভূমিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি বাবার কাছে জানতে চেয়েছিলাম এই মালভূমির চরিত্র। বাবা আমাকে আকাশে উড়ন্ত ঈগলদের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। সে বলেছিল, ‘ওই পাখিগুলিকে দেখো। তারা স্বাধীনতা উপভোগ করছে। তা কিভাবে সম্ভব? এটা সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে ওদের সাহস আছে। তার মানে সাহস থাকলে তুমি স্বাধীনতা পাবে।’
একদিন আমরা এক গভীর জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলাম। সেদিনই প্রথম আমি এই জঙ্গলের নাম ও চরিত্র জানতে পেরেছিলাম। এটি হচ্ছে সেই স্থান যেখানে স্বপ্নেরা বাসা বানিয়ে থাকে। আমার বাবা আমাকে জানিয়েছিল, ‘স্বপ্ন ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না। তাই তোমাকে এই বনে আসতেই হবে।’ তাই আমরা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছিলাম। অঞ্চলটির স্নিগ্ধ-শীতল ছায়া আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিয়েছিল। পাখিরা গান গাইছিল। তাদের কমনীয় কন্ঠের আওয়াজ প্রাণের খুশি ঘোষণা করেছিল। তাদের গান কী বার্তা নিয়ে আসছে বোঝার চেষ্টা করে আমি খুঁজে পেলাম মুক্তির আনন্দ। হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল স্বপ্নেরা। বাবা আমাকে এক এক করে বিভিন্ন পশুপাখি আর গাছপালা চিনিয়ে দিল। তারপর সে আমাকে দেখাল জ্ঞান নামের সেই গাছটিকে। আমি এর বিস্তার দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এটা কত বিশাল হতে পারে তার ধারণাই করতে পারলাম না। আর তার বয়স কল্পনাতীত। সেই সময়ে আমি তার পুরোটা দেখতেই পেলাম না। কেবলমাত্র সেই গাছের ক্ষুদ্র একটি অংশ আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম। বাবা বলেছিল, ‘একদিন তুমি এই গাছে চড়তে পারবে আর সেদিনই তুমি সম্পূর্ণ মানুষ হবে।’
আমাদের অভিযান কিছু গুহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল। স্থানটি ছিল মূলত খনিজ এলাকা। আমার বাবা ওইসব অন্ধকার ও রহস্যজনক গুহাগুলিতে আমাকে নিয়ে যাবে শুনে আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত আমি আমার সমস্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলাম এবং সম্পদের সন্ধানে মাটির তলায় অভিযান চালাবার জন্য যথেষ্ট মনোবল ও সাহস খুঁজে পেলাম। আমার হাত ধরে বাবা আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার সাহায্য ছাড়া এসব খুঁজে পাওয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। সূচিভেদ্য অন্ধকার ভূপৃষ্ঠের তলদেশে এই ভ্রমণ খুব বিপজ্জনক করে তুলেছিল। আমরা পরস্পরকে দেখতে পর্যন্ত পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বাবা যেহেতু আমার হাত সবসময় শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছিল আমি তাই নির্ভয় ছিলাম। উদারতা, মানসম্মান, শালীনতা, মহানুভবতা ও সততা ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ দ্রব্যগুলি আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। বাবা আমাকে এইসব গুণাবলীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল কেন এসব সম্পদ আমার অর্জন করা উচিত। এগুলি সংগ্রহ করা সত্যিই খুব কঠিন কিন্তু একবার অর্জন করতে পারলে সারা জীবন আর হারাবার ভয় থাকবে না। বাবা আমাকে উপদেশ দিয়ে জানিয়েছিল, ‘তোমাকে অনবরত চেষ্টা ও অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে আর তাহলেই তুমি এসব মূল্যবান সম্পদ অর্জন করে নিজেকে সম্পদশালী করে তুলতে পারবে।’প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
![]()
