কৃষ্ণপদ দাস

ভাষা সংজ্ঞাপনের মাধ্যম। ভাষিক পরিস্থিতি ও প্রতিবেশ অনুযায়ী বিষয় থেকে রীতি বদলে যায়। সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানীরা বক্তা-শ্রোতা উপলক্ষ্য অনুসারে ভাষাবদলের কথা বলেন। ব্যবহারকারী ছাড়াও, ব্যবহার অনুসারে ভাষাকে ইংল্যান্ডের ভাষাবিজ্ঞানীরা ‘রেজিস্টার’-নাম দিয়েছিলেন।

সামাজিক সংযোগের ক্ষেত্রে মৌখিক ভাষার বাইরে বিভিন্ন শিল্প-মাধ্যমে ‘অভিষ্ঠ দলের’ (Target Group) সঙ্গে বিনিময়ের ক্ষেত্রে ভাষা একটি জরুরি আলোচনার বিষয়। ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শিল্প-মাধ্যম তার নিজস্ব ভাষার সঙ্গে মানানসই হ’য়ে গেছে। আকাশবাণী ও দূরদর্শন এরকমই একটি শিল্পমাধ্যম, যাকে অন্যভাবে আমরা গণমাধ্যমও বলে থাকি। বিজ্ঞান প্রযুক্তির হাত ধরে এমন একটা মাধ্যম তৈরি করা গেছে যা একই সময়ে অনেকের সঙ্গে সংজ্ঞাপনে ব্যাপৃত থাকতে পারে। দৃশ্য এবং শ্রুতির যৌথ সমবায়ে তৈরি হওয়ার কারণে কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে দৃশ্যের ভাষা ও শ্রাব্যের ভাষা দু’দিকেই খেয়াল রাখতে হবে। দর্শক-শ্রোতার কাছে একসঙ্গে সংজ্ঞাপিত হলেও উপস্থাপনের সময় দৃশ্য-শ্রাব্যের শৈল্পিক সমন্বয় সবচেয়ে জরুরি বিষয়। 

একনম্বর গারস্টিন প্লেস থেকে কলকাতা বেতার কেন্দ্র চলে এলো ইডেন গার্ডেন্সে ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এখানে বলে রাখা ভালো শুধুমাত্র দূরদর্শন কেন্দ্রই নয়, আকাশবাণীর ভূমিকাও অতুলনীয়। এখানে বেতারের মধ্যমে বহুবিধ অনুষ্ঠান জনসাধারণের চিত্ত জয় করতে থাকে। ভারতবর্ষে ১৯৬৭-এর ১৫ সেপ্টেম্বর দূরদর্শন দিল্লি কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার শুরু করে। তখন শুধু কৃষি ও শিক্ষার বিষয়টাই প্রাধান্য পেয়েছিল। কলকাতায় ১৯৭৫-এর ৯ আগস্ট বাংলা অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। তখন টালিগঞ্জের রাধা স্টুডিও থেকে সাদা-কালো ছবি সম্বলিত অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। ১৯৮৩-র ৬ জুন, কলকাতায় রঙিন ছবি সম্বলিত সম্প্রচার শুরু হয়। আঞ্চলিক ভাষায় সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে ঐ অঞ্চলের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় ক্রমে দূরদর্শন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কলকাতা কেন্দ্রের বাইরে বিস্তীর্ণ এলাকায় যত সম্প্রচারের সুযোগ বৃদ্ধি হয়েছে; ততই নাগরিক সাংস্কৃতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দূরদর্শন জনমুখী হয়েছে। যদিও, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে তার দৃষ্টিভঙ্গী অনেকখানি কেন্দ্রীয় সরকারের সাপেক্ষে নির্ধারিত হয়, তবুও প্রযুক্তি এবং দর্শক-শ্রোতা অনুষ্ঠানের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা না হলে, গণমাধ্যম হিসেবে দূরদর্শন বিপন্ন হতে বাধ্য। 

শুরুর দিকে শিক্ষা ও কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানে দূরদর্শন যেমন আবদ্ধ ছিল, বেতার কেন্দ্রের প্রচারও তদরুপ ছিল। ক্রমে নতুন দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে একটা নতুন বিনোদনমূলক ক্ষেত্রে পরিণত হয় এই দুটি মাধ্যম। এই নতুন দর্শক-শ্রোতাদের বড় অংশ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, যারা রেডিও-র সঙ্গে টেলিভিশন সেট কিনতে সমর্থ। অন্যরা বেতার ও দূরদর্শনের অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য তাদের উপর নির্ভরশীল। এই সময়ে, সাত ও আটের দশকে গ্রামাঞ্চলে কৃষকের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং নতুন ক্রেতা তৈরি হওয়ায় দর্শক-শ্রোতার এলাকা ও সংখ্যা দুটিই দ্রুত বাড়তে থাকে। এ-পরিস্থিতিতে মিশ্র রুচির দর্শক-শ্রোতার জন্য আকাশবাণী ও দূরদর্শন তার অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য আনতে শুরু করে। 

এই গবেষণায় আকাশবাণী ও দূরদর্শনের সেই প্রেক্ষিত মাথায় রেখে নাটক এবং কাব্যের সম্প্রচারের ভাষা আকাশবাণী ও দূরদর্শনের ভূমিকা আলোচনা করতে চাই। প্রসঙ্গত, বিবিসি-র উপস্থাপিকা জেনি মারে বলেছিলেন, “যদি তোমার বলার কথা তুমি সহজ ভাষায় লিখতেই না পারো — বলতেই না পারো, তবে তুমি সম্প্রচারকই নও।”

ভাষা নিজের খেয়ালে চলে। সময় থেকে সময়ে ভাষার বদল ঘটে। মানুষ তার নিজের মতো করে ভাষাকে বদলে নেয়। মানুষের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু মিলেমিশেই ভাষার কিছুটা বদল হয়। মানুষের মুখের ভাষাই যখন জনসাধারণের মান্যতা অধিকার করে সম্প্রচারের খাতে বয়, তখন তার প্রয়োগে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হয়।

মিডিয়ায় এখন সারাদিনই কথা আর কথা। টেলিভিশন-রেডিও-র ক্ষেত্রে দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে তো সরাসরি সংযোগও হচ্ছে। বর্তমানে এই দুই মিডিয়ার সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের অবিরাম কথোপকথনের (লাইভ ফোন-ইন) অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠান চলছে। ফলে, মুখ থেকে শুধুমাত্র কিছু শব্দ নিঃসৃত হয় না, টেলিভিশনের পর্দায় পরিবেশকের (অ্যাংকর) চোখ, মুখ, ঠোঁট, হাত, হাতের আঙ্গুল, তাঁর বেশভূষা, সাজসজ্জা, দেহের অঙ্গভঙ্গী – সবই কথা বলে। এছাড়াও পরিবেশকের কণ্ঠস্বর, ধ্বনি এবং উচ্চারণের ঘাত-সংঘাতে বাচনিক এবং অ-বাচনিক এক মিশ্রণ (প্যাকেজ) তৈরি হয়। 

তাই শুধু বর্ণমালার ভাষাই নয়, মিডিয়ায় ভাষা-প্রকাশের ভঙ্গীটাও একটা ভাষা। এর মধ্যে বেগ, অতিবেগ, আবেগ, নিরুদ্বেগ — সব কিছুই মিশে থাকে। না-বলা কথার ভাষাকে এখন অনুসন্ধিৎসুর মতো খুঁজতে হয়। পরিবেশনায় (প্রেজেন্টেশন) এমনই এক বাধ্যতার ভূমিতে অপরিমেয় আগ্রাসী চাহিদার মুখে – দাঁড়িয়ে আছেন এই সময়ের সম্প্রচারক। এই চাহিদা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেই আলোচনার বিষয় নিয়েই ভাবনা। আকাশবাণী ও দূরদর্শনের মাধ্যমে নাটক ও কাব্য সম্প্রচার করলে বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ও ভাষার প্রকাশভঙ্গী নিয়ে কথা বলা যেতেই পারে। সম্প্রচারে উপস্থাপকের সরসতা, সহজতা ও আন্তরিকতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি হচ্ছে ক্রমশ। এর ফলে  নাটক ও কবিতার পরতের পর পরত একে একে উন্মোচিত হয়ে আরও মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে।

দ্রুতই পালটে যাচ্ছে সম্প্রচারের জগত এবং তার ফলে ‘কেবল টিভি’র সুবিধাপ্রাপ্তদের হাতে বা রিমোটে এখন দেশ-বিদেশের অনেক বাংলা চ্যানেল চলে এসেছে। পিছিয়ে নেই আকাশবাণীও। নানা দৃষ্টিকোণ থেকে সম্প্রচারিত নানা ভাষাভঙ্গী ও শৈলীর পরিচয় পাচ্ছেন দর্শক-শ্রোতারা। সব মিলিয়ে ভাষার পরিচিত রূপ বলে আর যেন কিছু থাকছে না। এ-বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা নাটক ও কবিতা সম্প্রচারের জন্য কিভাবে এগোতে পারি? তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা? আরও মনোগ্রাহী করতে হলে নাটক ও কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি – জনসাধারণের কাছে পৌঁছোতে, না কি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে? এই দ্রুততার যুগে দাঁড়িয়ে নাটক ও কবিতার সম্প্রচার কবে থেকে আকাশবাণী ও দূরদর্শনে স্থান করে নিল? জনপ্রিয়ই বা হলো কীভাবে? – এ সবই জরুরি প্রশ্ন। 

“মুখে মুখে প্রতিদিনের ব্যবহারের ভাষায় কলাকৌশলের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ জীব। একলার ব্যবহারে সে আটপৌরে, দলের ব্যবহারে সুসজ্জিত। সকলের সঙ্গে আচরণে মানুষের যে সৌজন্য সেই তার ব্যবহারের শিল্পকার্য। তাতে যত্নপূর্বক বাছাই সাজাই আছে। সর্বজনীন ব্যবহারে ব্যক্তিগত খেয়ালের যথেচ্ছাচার নিন্দনীয়। এ ক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে ও অন্যকে একটা চিরন্তন আদর্শের দ্বারা সম্মান দেয়।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাভাষা পরিচয়)

বাঙালি নাটক ও কবিতাপ্রেমী – এ-কথা অনেকেই বলে থাকেন। সেইসঙ্গে এই কথাটাও যোগ করে থাকেন যে, বাঙালিরা শুধু বাংলা কবিতাকেই গুরুত্ব দেন এটা নয়, নাটককেও প্রাধান্য দেন । অন্য প্রদেশের অন্য ভাষার কবিরা কি কবিতা লিখছেন, সে-সম্বন্ধে বাঙালি কবিতা পাঠকদের তেমন কোনও আগ্রহ নেই। পাঠক হিসাবে বাঙালিদের ঘরকুণো বলে থাকেন কেউ কেউ। সেই বিষয়টি বেশ চিন্তার। আকাশবাণী ও দূরদর্শন এগিয়ে এসেছে এই নাটক এবং কবিতার সম্প্রচারের বিভিন্ন দিক নিয়ে। না, শুধু বাংলা নাটক বা কবিতাই নয়; এখন দর্শক-শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দেয় হরিবংশ রাই বচ্চন, শিবমঙ্গল সিং সুমন, সুমিত্রানন্দন পন্থ, নাগার্জুনের মত শক্তিশালী কবিদের হিন্দী কবিতা পাঠ, উর্দু কবি গালিব, ফায়জ আহমেদ ফায়জ, ক্যায়ফি আজমি, সাহির লুধিয়ানভি, ফিরাক গোরক্ষপুরী, জোশ মলিহাবাদীদের বা এই সময়ের কবিদের অসাধারণ সব কবিতা। কবিতার সাথে সাথে দেশ বিদেশের খ্যাত নামা নাট্যব্যক্তিদের নাটক অনুবাদ করে শ্রোতা ও দর্শকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

এই সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গী কি হলে ভাল হয়, দর্শক-শ্রোতাদের মন-প্রাণ আরও কিভাবে জয় করা যায়, তারই প্রয়াস শুরুর সময় থেকেই নিরন্তর চালাচ্ছে, চালিয়েই যাচ্ছে দূরদর্শন ও আকাশবাণী। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের কবিতার পাশাপাশি নাটকও বর্তমানে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পাঠ্যক্রমে। কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতার পাশাপাশি একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতাও শ্রোতা দর্শকদের মন কেড়েছে। সুস্থ সংস্কৃতির প্রচারের লক্ষ্যে পাড়ায় পাড়ায় এর প্রচলন এখনও চালু আছে। কিন্তু, আকাশবাণী ও দূরদর্শনের ভুমিকাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পঁচিশে বৈশাখের প্রভাতী অনুষ্ঠান তো সরাসরি সম্প্রচার হয়ই। সেখানে রবীন্দ্র-গানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কবিতা আবৃত্তি ও রবীন্দ্র নাটকের সম্প্রচার হয় বেতার ও দূরদর্শনের কল্যাণেই। সকলেই তা জানেন। গণের সংস্কৃতির বা পাবলিক কালচারের মধ্যে ‘বাচিক’ নামে অভিহিত এই শিল্পমাধ্যমটিকে অঙ্গীভূত করার এটি একটি অনন্য প্রয়াস। এছাড়া কবিতা পাঠের আসর, আবৃত্তি সম্প্রচার (কবিতা যখন আবৃত্তি’ দূরদর্শনের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান – প্রযোজনায় ছিলেন এই প্রতিবেদক), স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে কবি ও কবিতাকে গণ-পরিসরে – আমজনতার মধ্যে নিয়ে আসার এই প্রয়াস দূরদর্শন ছাড়াও আকাশবাণী অনেক আগে থেকেই করে আসছে। এইভাবে বাচিক শিল্প – আবৃত্তি ও বাচিক অভিনয় তথা শ্রুতিনাটক এখন স্বতন্ত্র শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে।

আকাশবাণী ও দূরদর্শন সম্প্রচার করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে – প্রথিতযশা নাট্যকারদের জনপ্রিয় নাটকের অভিনয়। এই নাটকগুলো যখন পুনঃপ্রচার হয় তখন আমজনতা আবার নড়েচড়ে বসেন। বেতার ও দূরদর্শন প্রসঙ্গে বলা যায়, এই মাধ্যমটির ভূমিকা ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কবিতাকে জনপ্রিয় করা এবং দ্বিতীয়ত শ্রুতি শিল্পের বিবর্তনের আঙ্গিক শিল্পসাহিত্যের আসরে এখন নিয়মিত স্থান করে নিয়েছে। এই দুটি মাধ্যম এ-ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে, সন্দেহ নেই। কিছু কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেগুলি এ-রকম যদি হয় – শিল্পমাধ্যম হিসেবে আকাশবাণী ও দূরদর্শনের উদ্ভব, গণমাধ্যম হিসেবে বেতার ও দূরদর্শনের ভূমিকাই বা কি? সম্প্রচারের ভাষা এবং গণমাধ্যম সম্পর্কেও আমরা নতুন করে ভাবতে পারি বৈ কি! 

আমরা সকলেই জানি, মহাকাব্য পাঠ ও কথকতার থেকে শুধু বাংলাতেই বাচিক শিল্পের উদ্ভব ঘটেছে। দূরদর্শন, আকাশবাণীও তাকে শহর কেন্দ্রিকতা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বাচিক শিল্পের উদ্ভব থেকে বর্তমানের পর্যায়ে বিকাশ পর্ব ও সেই পর্বে দূরদর্শন ও আকাশবাণীর ভূমিকা নিয়ে আমরা ভাবতেই পারি। আবার এর দ্বারা অদেখা ও না শোনা কবি এবং নাট্যাকারেরা/ অভিনেতারা প্রত্যন্তের মানুষের কাছে দৈহিকভাবে পৌঁছেতে পেরেছেন। তাঁদের কবিতা ও নাটকের প্রচার ও প্রসারে দূরদর্শন ও বেতারের ভূমিকা সত্যিই গ্রহণযোগ্য। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, দূরদর্শন ও আঞ্চলিক সম্প্রচার, বিশেষ করে দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতা ও আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান-পরিকল্পনা দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে অভূতপূর্বভাবে সংযোগ স্থাপন করছে। দর্শক-শ্রোতার রুচি ও বাঙালির সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা এই গণমাধ্যমগুলো দায়িত্বের সঙ্গে পালন করছে। আপনারা ভাবুন – অনুষ্ঠান পরিকল্পনার ভাবনার গভীরতা এবং বিশেষ করে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও অভিনয়ের আসরগুলির কাজকে কত নিপুণভাবে প্রচার করছে দূরদর্শন ও আকাশবাণী। দেখতে পাবেন, কবিতা এবং নাটকের পালাবদলের সঙ্গে নিজস্ব অনুষ্ঠান পরিকল্পনারও সামঞ্জস্য রাখা হচ্ছে। সহজেই অনুমান করা যায়, নাট্যকার/ অভিনেতা, কবি ও কবিতার পাঠকের সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের সংযোগ স্থাপনে কত সুচারু দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। আর মুদ্রণ-সংস্কৃতিও তার ফলে প্রভাবিত হচ্ছে।

আমরা লক্ষ্য করছি, নাট্যাভিনয়, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তির অনুষ্ঠানের বিষয়ে দর্শক ও শ্রোতাদের চিঠিপত্রের মধ্যেও লুকিয়ে আছে অনেক গভীর উপলব্ধি ও অনুসন্ধানের সূত্র। সেইসঙ্গে এটা উপলব্ধি করা যায় – গণ-সংস্কৃতিতে বা পাবলিক কালচারে নাট্যকার, কবি ও কবিতার বর্তমান সময়ের প্যাটার্ন কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, কোনও সমরূপ সংস্কৃতিক অভ্যাসের দিকে বাংলা কবিতা ও নাটকের গতিবিধি সহজেই অনুমান করতে পারছেন আপনারা। সর্বোপরি রাষ্ট্র, পূঁজি এবং প্রযুক্তির হাত ধরে দূরদর্শন ও আকাশবাণী এই ধরণের অনুষ্ঠানের অভিমুখ নির্বাচন করেছে ও এখনও করে চলেছে। দর্শক-শ্রোতার সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক ব্যপৃত হচ্ছে। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কবিতার ও নাটকের ভাষার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলির পরিবেশনার ধারার বিবর্তনও লক্ষ্যণীয়।

বৃত্তের অর্থে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিসরে আকাশবাণী ও দূরদর্শনের ভূমিকাকে বুঝতে চাইলেও বিশেষভাবে মুদ্রণ-সংস্কৃতি থেকে বাঙালির একটা নতুন সংস্কৃতির রূপান্তরকেও বুঝতে পারবো আমরা। মাধ্যম হিসেবে ভাষা-শিল্পের সম্ভাষণের নতুন এই যে ভূমিকার অবতারণা সেটি কিন্তু চোখ খুলে দেয়। নির্দিষ্টভাবে বাঙালির দীর্ঘদিনের পুরনো একটা সাহিত্য-সংরূপ নতুন শিল্পমাধ্যমে তার পরিসর ও পরিধি তৈরি করছে।

পদ্ধতিগতভাবে প্রাথমিক সূত্র বা Primary Source নির্ধারণ করে, মূলত আকাশবাণী ও দুরদর্শনের ARCHIVE বা অভিলেখাগার ব্যবহার করে বহু তথ্য চোখের সামনে আনতে পারে। 

পরিশেষে বলা যায়, আকাশবাণী ও দূরদর্শন যেভাবে বেশ কয়েক দশক ধরে আবৃত্তি ও অভিনয়কে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে তাতে এই দুটি গণমাধ্যমের সাহসের সঙ্গে কাজ, জয়লাভ ও মহৎকীর্তি এসবই বোঝায়। আর্থ সামাজিক দিক থেকে রাজনৈতিক ছায়াকে অতিক্রম করে সকলের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এই দুটি গণমাধ্যম। কিন্তু একটা গুরু দায়িত্ব আমাদের সকলকে নিতে হবে, এই মহতী ভাষা সঙ্গাপনের যে নিদর্শন আমরা পেয়ে চলেছি তাকে সংরক্ষিত করে রাখা। সেখানেই ধরা পড়বে যুগের ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে এই অভিনয়ের ধারা ও বাচিক শিল্পের নব দিগন্তকে দলিল হিসেবে সংরক্ষিত করে রাখা।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *