সুদীপ ঘোষাল
রহস্যময় জলবাড়ি
রাতের আকাশে জঙ্গলময় পরিবেশে শিয়াল আর প্যাঁচার ডাকে জলবাড়ি রহস্যময় হয়ে ওঠে। চারপাশে জঙ্গল আর সাপ। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঈশানী নদী। এই নদীকে স্থানীয় লোকেরা কাঁদর বলে থাকে।
পুরোনো মন্দির আর মসজিদ,গির্জা আমার মন টানে। কালের প্রবাহে সেগুলো অক্ষত না থাকলেও পুরোনো শ্যাওলা ধরা কোনো নির্মাণ দেখলেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই
একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে হবে।তন্ময়বাবু গবেষক।এন জি ও , সংস্থার প্রধান কারিগর।
বনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন,তার জগৎ।পশু,প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল।বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে।
তন্ময়বাবুর নিজের হাতে গড়া মা কালীর মূর্তি আছে। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ।কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে।
আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট।ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম।পাশেই ঈশানী নদী। তন্ময়বাবুর ছাত্র খালি হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল,বেজি,,ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক।একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন,স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে।
বর্ষাকালে ঈশানী নদী উদ্দাম হয়ে উঠেছে।এই নদীকে মাঝখানে রেখে বেলুনের চাষিরা চাষ করছেন আনন্দে।এখানকার চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করেন। কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন না। এক চাষি বললেন,আমরা সকলে একত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জৈব সার প্রয়োগ করেই আমরা চাষ করবো।তাতে বন্ধু পোকারা মরবে না। ফলনও হয় বেশি। এক এন জি ও সংস্থার পরামর্শে তাদের এই সঠিক সিদ্ধান্ত অন্য চাষিদের অনুকরণযোগ্য।
এই এন জি ও সংস্থার যুবকরা গ্রামের ভিতর কুকুরদের নির্বিজকরণ কাজে লেগেছে।একটা লম্বা লাঠির ডগায় সূচ বেঁধে তাতে ওষুধভরে চলছে কাজ।কোনো প্রাণী আহত হলে তার সেবাশুশ্রূষা করেন এরা। তারা সাপ ধরতে জানেন। কোনো গ্রামে কোনো সাপ দেখা গেলে এই যুবকেরা সেটি ধরে নিয়ে এসে তাদের সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন।এখনও এই যুবকবৃন্দ কাজ করে চলেছেন মানুষ ও প্রাণীজগতকে ভালোবেসে। বর্ষাকালে প্রচুর বিষধর সাপের আনাগোনা এই অঞ্চলে।এখানে পা দিলেই সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন এখানকার কর্মিবৃন্দ।ঘুরে দেখার জন্য গামবুট দেওয়া হয় পর্যটকদের।
প্রচুর দেশি বিদেশি গাছ গাছালিতে ভরা এই প্রাঙ্গন। একটি কৃত্রিম জলাধার আছে।তার নিচে লাইব্রেরী রুম তৈরির কাজ চলছে।ওপরে জল নিচে ঘর। কিছুটা তৈরি হয়েছে। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে হাজির হয়। সেই পাখিদের নিয়েও চলে গবেষণা। তাদের জন্য সব রকমের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।আর একটি জলাধারে বিভিন্ন ধরণের মাছ রাখা হয়। পা ডুবিয়ে জলে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের চামড়ার মৃত কোষ খায় এইসব বিদেশি মাছেরা। ওপেন বাথরুমে ঈশানীর জল উপলব্ধ।এই রিসর্টগুলিতে সর্বসুখের ব্যবস্থা আছে।শীতকালে অনেক বিদেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। রাতে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর।
বেলুন গ্রামে ঢুকতে গেলে বাবলার বন পেরিয়ে মাটির আদরে হেঁটে যেতে হবে। এখন অবশ্য শিবলুন হল্ট থেকে নেমে বেলুন যাওয়ার পাকা রাস্তা হয়েছে।টোটো,মোটর ভ্যান চলে এই রাস্তা ধরে।চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেতে হারিয়ে যায় মন এক অদ্ভূত অনাবিল আনন্দে।
রাতের জঙ্গলময় পরিবেশে এক ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।গা ছম ছম করে। তবু অদ্ভুত এক নীরবতা গ্রাস করে প্রাণ মন।
বেলুন গ্রামে অবস্থিত একটি প্রকৃতি‑কেন্দ্রিক ইকো রিসর্ট, যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনধারার সঙ্গে পর্যটনকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কলকাতা থেকে প্রায় ১৭৫ কিমি দূরে কাটোয়ার কাছে অবস্থিত এবং স্থানীয়ভাবে “কাটোয়া জলবাড়ি” নামেও পরিচিত। প্রকৃতি ও পরিবেশ প্রায় ৩০ বিঘা জমি জুড়ে গড়ে উঠেছে এই ইকো ভিলেজ, যেখানে জঙ্গল, তিনটি কৃত্রিম জলাশয় এবং শিবাই নদীর তীরবর্তী সবুজ অঞ্চল একসঙ্গে মিলে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বিড়ালপ্রজাতি (যেমন ফিশিং ক্যাট), শিয়াল, মেছোবিড়াল, সরীসৃপ ও প্রায় ১০০ ধরনের প্রজাপতি দেখা যায়, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।জলবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে কয়েকটি কটেজ ও হাট‑স্টাইল কক্ষ, যেগুলো জলাশয়ের উপরে বা জঙ্গলের মাঝে তৈরি, ফলে রাতে শুতে গেলে মনে হয় প্রকৃতির কোলে ভাসছেন। রুমগুলোতে এসি, গিজার, আধুনিক টয়লেট ইত্যাদি সুবিধা থাকলেও ডিজাইনে স্থানীয় বাঁশ‑মাটির শৈলী বজায় রাখা হয়েছে, যাতে পর্যটক সত্যিকারের গ্রাম‑প্রকৃতি অভিজ্ঞতা পান। করার মতো কাজ বেলুন ইকো ভিলেজে পাওয়া যায় নানা জলাশয়ে স্টিল ওয়াটার রাফটিং ও মাছ ধরার ব্যবস্থা আছে। গাইডেড বার্ড‑ওয়াচিং, প্রজাপতি দেখা ও নাইট ট্রেলে শিয়াল, ফক্স, সিভেট, পেঁচা ইত্যাদি দেখার সুযোগ। গ্রাম পদযাত্রা, রিভারসাইড পিকনিক, ক্যাম্পফায়ার ও প্রকৃতি ওরিয়েন্টেশন ক্যাম্প/ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ।
এখানে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ, গাছ কাটা হয় না এবং সাপ, পিঁপড়ে ইত্যাদিকেও হত্যা করা হয় না, যা বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য এক কঠোর নীতি। স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীরা নিজেরাই এই প্রকল্পের অংশীদার, ফলে এখানে পর্যটন শুধু মজার জন্য নয়, প্রকৃতি সংরক্ষণের সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
